সন্দ্বীপের কৃষক বিদ্রোহ

- January 22, 2019
১৭৬৯ সালে নোয়াখালি জেলার দরিদ্র মুসলিম কৃষকদের বিদ্রোহ সন্দীপ বিদ্রোহ নামে পরিচিত। বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত নোয়াখালি জেলার অন্তর্গত কয়েকটি দ্বীপের সমষ্টি হল সন্দীপ অঞ্চল । সন্দ্বীপের অধিকাংশ অধিবাসী ছিল মুসলিম। আবু তোরাব চৌধুরী এই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্ণর ভেরেলেস্ট সাহেবের বেনিয়ান গোকুল ঘোষালকে সন্দ্বীপের জমি জরিপের ও রাজস্ব ধার্য করার জন্য নিয়োগ করে। এর অত্যাচারের ফলে সন্দ্বীপের কৃষকরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।
সন্দ্বীপের কৃষক বিদ্রোহ
মোগল শাসনামলে এই দ্বীপগুলো মোগলদের দ্বারা অধিকৃত হয় এবং এর শস্য শ্যামল রূপে মুগ্ধ হয়ে মোগলদের অনেকেই এখানে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে। পরে নিম্ন শ্রেণীর হিন্দুরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে এই দ্বীপগুলো মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল হয়ে পড়ে। ১৫৭৪ সালে মোগলরা পূর্ববঙ্গ জয়ের ফলে সন্দ্বীপকে তারা দখলযুক্ত করে।

সন্দ্বীপের স্বাধীন রাজা ছিলেন দিলাল। তাঁর প্রকৃত নাম দেলওয়ার খাঁ, তিনি প্রথম জীবনে দাস ছিলেন। দেলওয়ার খাঁ পরবর্তী সময়ে নিজস্ব শক্তি ও প্রতিভাবলে রাখাল ও কৃষকদের নিয়ে সৈন্যবাহিনী গঠন করেন এবং মোগলদের কাছ থেকে সন্দ্বীপের শাসনভার কেড়ে নিয়ে ৫০ বছর রাজত্ব করেন। দেলওয়ার খাঁর মৃত্যুর পর মোগল রাজস্ব সচিব বা আহাদদার সন্দ্বীপের ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের বশীভূত করে তাঁদের কাছে ইজারা বন্দোবস্ত করেন।

ইজারাদাররা কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করে সচিবের কাছে জমা দিত। কিন্তু এই ভাবে রাজস্ব আদায় সম্ভব হতো না। তখন দেলওয়ার খাঁর জামাতা চাঁদ খাঁ ছিলেন সন্দ্বীপের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি। মোগল শাসকরা চাঁদ খাঁর সঙ্গে ১৬৭০ খ্রিষ্টাব্দে সন্দ্বীপের সর্বময় ইজারা বন্দোবস্ত করেন। চাঁদ খাঁর পক্ষে এই বিশাল অঞ্চলের রাজস্ব আদায় সম্ভব হতো না বলে তিনি তাঁর নিজের, দুইজন আত্মীয় (বখতিয়ার মহম্মদ ও মহম্মদ হানিফ) এবং তৎকালীন কানুনগো দপ্তরের একজন কর্মচারীর (চন্দ্রদ্বীপ নিবাসী মধুসূদন চৌধুরী) মধ্যে সন্দ্বীপের সর্বময় ইজারার অংশ ভাগ করে দেন। ইংরেজ শাসকনকালে এরাই পরবর্তীকালে সন্দ্বীপের জমিদার হন।

গভর্ণর ভেরেলেস্ট আমলে খিদিরপুরের ভূকৈলাসের ঘোষাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা গোকুল ঘোষাল সন্দ্বীপের শেষ আহাদদার বা সচিব ছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ ও বিহারের গভর্নর ভেরেলেস্ট সাহেবের সদর দপ্তরের কেরানি ও বেনিয়ান। গভর্নর ভেরেলেস্ট সাহেবের অনুগ্রহেই তিনি ১৭৬৩ সালে বেনামীতে সন্দ্বীপের আহাদদারি বা সচিব লাভ করেন। গোকুল ঘোষাল সন্দ্বীপের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হন। তাঁর পেছনে ছিল ইংরেজ বণিক রাজের শক্তি।

এদিকে ১৬৯০ খ্রিষ্টাব্দে চাঁদ খাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বংশের চতুর্থ পুরুষ ১৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে আবু তোরাপ চৌধুরী চাঁদ খাঁর জমিদারির এক অংশ লাভ করেন। আবু তোরাপের জমিদারি বৃহৎ ছিল না, তবু তিনি ছিলেন শৌর্যবীর্যশালী অতিশয় দূরাকাঙ্ক্ষী জমিদার। আবু তোরাপের অধীনে ১৫০০ দাসদাসী ছিল। সন্দ্বীপের জমিদার আবু তোরাপ গোকুলের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লেন। অল্পকালের মধ্যে আবু তোরাপ সব জমিদারকে তাড়িয়ে সন্দ্বীপের কর্তা হয়ে বসেন। গোকুল এটা সহ্য করতে না পেরে গোকুল বিতাড়িত জমিদারদের নিয়ে নবাব দরবার ও বাংলার প্রকৃত শাসক ইংরেজদের কাছে অভিযোগ পেশ করলেন। ইংরেজ গভর্নর আবু তোরাপকে দমনের জন্য ক্যাপ্টেন নলিকিনকে পাঠান। ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যভাগে সন্দ্বীপের কিল্লাবাড়িতে ক্যাপ্টেন নলিকিনের সঙ্গে আবু তোরাপের ভীষণ যুদ্ধ হয় এবং যুদ্ধে আবু তোরাপের বাহিনী ধ্বংস হয় ও তিনি নিহত হন। এটা সন্দ্বীপের ইতিহাসে প্রথম কৃষক বিদ্রোহ নামে পরিচিত।

আবু তোরাপের মৃত্যুর পর সরকার তাঁর সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে এবং অপর জমিদারিগুলোর মালিকদের ফিরিয়ে দেয়। গোকুল ঘোষাল সন্দ্বীপের আহাদদার হওয়ার সুযোগে আবু তোরাপের জমিদারি জৈনিক ভবানীচরণ দাস কর্মচারীর নামে বন্দোবস্ত করেন। পরে গোকুল ঘোষাল আরো অত্যাচারী হয়ে উঠেন এবং অন্যান্য জমিদারিগুলি গ্রাস করতে থাকেন। এর বিরুদ্ধে বাংলার তৎকালীন গভর্নর কার্টিয়ার সাহেবের কাছে সুবিচারের দাবি জানিয়ে দরখাস্ত দিলে কার্টিয়ার এই দরখাস্ত মুর্শিদাবাদে নায়েব দেওয়ান সৈয়দ রেজা খাঁর কাছে পাঠান। রেজা খাঁ সমস্ত জমিদারদের জমিদারি ফিরিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন। কিন্তু সেই আদেশ গোকুল ঘোষাল সুকৌশলে নাকচ করে দেন। গোকুল ঘোষালের অত্যাচার, কর বৃদ্ধির ফলে কৃষকরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন।

১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে গোকুল ঘোষালের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সন্দ্বীপের কৃষকরা মরিয়া হয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই বিদ্রোহ সন্দ্বীপের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে, এবং জমিদাররাও এই বিদ্রোহে যোগ দেন। গোকুল ঘোষাল বিদ্রোহ দমন করতে না পেরে ইংরেজদের কাছে অবিলম্বে একদল সৈন্য প্রেরণের জন্য আবেদন করেন। ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দের শেষভাগে একদল সৈন্যবাহিনী সন্দ্বীপে এসে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেয়। ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দের এই বিদ্রোহ ইংরেজদের টনক নড়িয়ে দেয়। এবং ১৭৭২ সালে ইংরাজ কোম্পানি আহাদদারের পদ বিলুপ্ত করে একজন আমিন নিয়োগ করেন। কিন্তু কোম্পানি গোকুল ঘোষালকে বিতাড়িত করে নি। তবুও গোকুল ঘোষাল তার নিজ কর্তৃত্ব করতে থাকে। তখন জমিদাররা আবার কম্পানির শরণাপন্ন হন। অবশেষে মুর্শিদাবাদের রেভিনিউ বোর্ড ১৭৭৮ সালে ডানকান নামে একজন কর্মচারীকে তদন্তের জন্য পাঠায়। ডানকান গোকুল ঘোষালের কুকীর্তির কথা কোম্পানিকে জানালে কোম্পানি আবু তোরাপের পুত্র আলী রাজা ছাড়া সব জমিদারি জমিদারদের কাছে ফিরিয়ে দেয়। আবু তোরাপের জমিদারী ভবানীচরণ দাসের নামে গোকুল ঘোষাল ভোগ করতে থাকে। গোকুল ঘোষাল ও ভবানীচরণ দাসের অত্যাচারে পুনরায় ১৮১৯ সালে সন্দ্বীপের কৃষক বিদ্রোহ দেখা দেয়। ১৯৫৫ সালে সন্দ্বীপের জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হয়।