১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের প্রকৃতি।

author photo
- Saturday, January 19, 2019
advertise here

সিপাহী বিদ্রোহ বা মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি ও চরিত্র।

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মহাবিদ্রোহ ভারতের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। একে "জলবিভাজিকা" বলা হয়। স্যার লেপেন গ্রিফিনের কথায়, এই বিদ্রোহ ভারতীয় আকাশ থেকে বহু কালো মেঘ দূরে সরিয়ে দেন। এই বিদ্রোহের প্রকৃতি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।


দুটি ভিন্ন মত (Two different views):

এক মত অনুসারে একে "সিপাহী বিদ্রোহ" ও অপর মতানুসারে এই বিদ্রোহকে "জাতীয় বিদ্রোহ" বলা হয়। ভারত সচিব আর্ল স্ট্যানলি একে প্রথম সিপাহী বিদ্রোহ ও ব্রিটিস্ প্রধানমন্ত্রী ডিজেরেলি একে প্রথম জাতীয় বিদ্রোহ বলে ঘোষণা করেছেন।

ঐতিহাসিক উপাদান (Historical elements):

ঐতিহাসিক বিপান চন্দ্রের "The Modern India" ড: সুরেন্দ্রনাথ সেন এর "Eighteen Fifth Seven" রমেশচন্দ্র মজুমদারের "History of Freedom Movement in India" ড: শশীভূষণ চৌধুরীর "Civil Rebellion in the Indian Mutinies 1857-1859" প্রভুতি গ্রন্থ থেকে এই বিদ্রোহের গুরত্ব জানা যায়। এই বিদ্রোহের প্রকৃতির বিভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়।

সিপাহী বিদ্রোহ (Military Revolts):

১) স্যার জন লরেন্স, জন সিলি, চার্লস রবার্টস প্রমুখ এই বিদ্রোহকে সিপাহী বিদ্রোহ রুপে আখ্যা দিয়েছেন।

২) অক্ষয়কুমার দত্ত, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, কিশোরীচাঁদ মিত্র, হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, রাজনারয়ণ বসু ও দুর্গাদাস বন্দোপাধ্যয় প্রমুখেরা এই বিদ্রোহকে সিপাহী বিদ্রোহ বলেছেন।

জাতীয় বিদ্রোহ:

১) ইংরেজ ঐতিহাসিক প্রমুখ J.B. Norton, W. Key, Malleson, Dr. A. Duff, Outram, Charles Clones, Dezereli এই বিদ্রোহকে জাতীয় বিদ্রোহ রুপে চিহ্নিত করেছেন।



২) দেশীয় ঐতিহাসিক মেহেদী হাসান, শশীভূষণ চৌধুরী ও সুশোভন সরকার প্রমুখ জাতীয় বিদ্রোহের প্রতি মত দেন।

সামন্ততান্ত্রিক বিদ্রোহ:

রজনীপাম দত্ত তার "India Today" গ্রন্থে এই বিদ্রোহকে রক্ষণশীল সামন্ততান্ত্রিক অভ্যুত্থান বলে উল্লেখ করেছেন।

প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ:

বিনায়ক দামোদর সভারকার তার "Indian War of Independence" গ্রন্থে এই বিদ্রোহকে "ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম" বলে উল্লেখ করেছেন।

সাধারণ মানুষের ভূমিকা (Common people role):

সিপাহীদের ক্ষোভের সঙ্গে জনসাধারণের অসন্তোষ এই বিদ্রোহে ছিল। ম্যালেসন জনসাধারণের সংযোগের কথা স্বীকার করেছেন।

১) পণ্ডিত জহরলাল নেহেরু তার রচিত "Discovery Of India" গ্রন্থে এই বিদ্রোহের প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্রের কথা ব্যক্ত করেছেন।

2) ড: সুরেন্দ্রনাথ সেনের মতে "সিপাহীদের বিদ্রোহ দিল্লির বাহাদুর শাহকে সম্রাট ঘোষণা করায় একটি রাজনৈতিক চরিত্র পায়। ... যা কেবলমাত্র ধর্মীয় স্বাধীনতার যুদ্ধ হিসাবে আরম্ভ হয়েছিল তা পরিণত হয় স্বাধীনতার যুদ্ধে।" কোনো কোনো অঞ্চলে এই বিদ্রোহ জাতীয় বিদ্রোহের রূপ নিয়েছিল। কিন্তু ভারতের সর্বত্র সমানভাবে ছড়িয়ে পরেনি।

৩) ড: শশীভূষণ চৌধুরী ১৮৫৭ খ্রি: বিদ্রোহের গ্রামীণ ভারতের ওপর প্রভাব বিশ্লেষণ করে বলেছেন যে, "গ্রামীণ মানুষের জমির সত্ব নষ্ট হওয়ায় এবং খাজনার চাপ তাদের ওপর বৃদ্ধি পাওয়ায় তীব্র ইংরেজ বিরোধী মনোভাব দেখা দেই।" গ্রামঞ্চলেরে সাধারণ মানুষ ও কৃষকশ্রেণীর যোগদান লক্ষ্য করে এই বিদ্রোহকে জাতীয় স্বাধীনতার যুদ্ধের মর্যাদা দিয়েছেন।



৪) কমিউনিস্ট নেতা ই. এম. এস. নাম্বুড্রিপাদ এই বিদ্রোহকে সামরিক অভ্যুত্থান বলে অভিহিত করলেও ড: রণজিৎ গুহ ও গৌতম ভদ্র এই বিদ্রোহে জনসাধারণের ব্যাপক অংশগ্রহণকে গুরত্ব দিয়েছেন।

৫) মার্কসবাদী ঐতিহাসিক হিরেন্দ্রনাথ মুখোাধ্যায় ও অধ্যাপক সুশোভন সরকার সিপাহী বিদ্রোহকে স্বাধীনতার যুদ্ধ ও জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম বলে অভিমত প্রকাশ করেন।

৬) ড: মজুমদারের কথায়, "The so called first National war of Independence in 1857 is neither first, nor National, nor a war of Independence."  কারণ এতে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ছিল না। বিদ্রোহ ছিল শুধুমাত্র অঞ্চলভিত্তিক।

মূল্যায়ণ (Evaluation):

অধ্যাপক রুদ্রাংসু মুখার্জি ও হরপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় মনে করেন, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ অত্যন্ত তাপর্যপূর্ণ ছিল। সাম্প্রতিক কালের বিখ্যাত কেমব্রিজ ঐতিহাসিক সি. এ. বাইলি বলেন যে, এই বিদ্রোহের প্রকৃতি মূল্যায়ণ করা যায়। তার মতে, "The Indian Rebellion of 1857 was not one movement be it a peasant movement, or a war national liberation, it was many."  ড: কল্যাণকুমার সেনগুপ্ত তার সাম্প্রতিক প্রকাশিত "Recent Writings on the Revolt of 1857-A Survey" গ্রন্থে বিশ্বের বিভিন্ন বিদ্রোহের সঙ্গে তুলনা করে একে জাতীয় বিদ্রোহ বলেছেন।
Advertisement advertise here