সিপাহী বিদ্রোহের চরিত্র ও প্রকৃতি

- January 19, 2019
১৮৫৭ সালে মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি বা চরিত্র নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ব্রিটিশ লেখক J. Kaye তার A History of the Sepoy war in India এবং W. Malleson তার History of the Indian Mutiny গ্রন্থে এই বিদ্রোহের সামরিক চরিত্রের দিকেই গুরুত্ব আরােপ করেছেন এবং এনফিল্ড রাইফেলের প্রচলনকেই সিপাহী বিদ্রোহের প্রধান কারণ হিসাবে উল্লেখ করেছেন। তারা সিপাহী বিদ্রোহের পশ্চাতে ভারতীয় জনসাধারণের বৃহত্তর অংশের ভূমিকাকে অগ্রাহ্য করেছেন। এই সকল ঐতিহাসিকদের একমাত্র প্রচেষ্টা যে মহাবিদ্রোহের গুরুত্বকে খর্ব করা তা সহজেই অনুমেয়। Kaye এবং Malleson এই বিদ্রোহের চরিত্রের একটি সামাজ্যবাদী ব্যাখ্যা প্রদান করতে চেয়েছেন যা ভারতের ব্রিটিশ শাসনকে বৈধতা দান করতে সাহায্য করবে।
Sepoy Mutiny 1857
তবে আশ্চর্যের বিষয় কয়েকজন ভারতীয় ঐতিহাসিকও এই বিদ্রোহের চরিত্রকে সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। আর R. C. Mazumdar তার The Sepoy Mutiny and the Revolt of 1857 গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন যে এই বিদ্রোহ জাতীয় স্বাধীনতার যুদ্ধ ছিল না, বরং একটি সীমাবদ্ধ রাজনৈতিক ও সামরিক অভুথান ছিল। তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে, ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের ক্ষেত্রে মহাবিদ্রোহ অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। S. Sen তার Eighteen Fifty Seven গ্রন্থে এই বিদ্রোহের সামরিক দিকটিই আলােকপাত করেছেন। তিনি ব্রিটিশ জনসাধারণের সাহসিকতার কথা বিস্তৃতি ভাবে তুলে ধরলেও ভারতীয় জনসাধারণের কথা তার লেখার মধ্যে বিশেষ খুজে পাওয়া যায় না। রজনীকান্ত গুপ্ত তার "সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস" গ্রন্থে এই বিদ্রোহকে প্রথম জাতীয়তাবাদী মহিমা দান করেন এবং দেশীয় রাজ্যগুলি সম্পর্কে ব্রিটিশদের নীতি সম্পর্কে সমসাময়িক বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছেন। কিন্তু যথার্থ অর্থে ভারতের প্রথম জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিক ভি. ডি. সাভারকার তার History of the war of Independence গ্রন্থে সর্বপ্রথম এই বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতার যুদ্ধ বলে অভিহিত করেন।

আধুনিক ঐতিহাসিকের মন্তব্য করেছেন যে, প্রাথমিকভাবে সিপাহী বিদ্রোহ হিসেবে শুরু হলেও এটি একটি জনপ্রিয় চরিত্র ধারণ করেছিল। তবে এই আন্দোলন স্বতঃস্ফূর্ত এবং অপরিকল্পিত ভাবে গড়ে উঠেছিল কিনা বা কোন সুষ্ঠু পরিকল্পনা এর মধ্যে ছিল কিনা তা সুনিশ্চিতভাবে জানা যায় না। বিদ্রোহীরা এ বিষয়ে কোন নথিপত্র রেখে যায় নি। আর এই কারণেই ঔপনিবেশিক তথ্যপঞ্জীর ওপর আমাদেরকে বিশেষভাবে নির্ভর করতে হয়।

বৃহত্তর অর্থে বলতে গেলে ১৮৫৭ এর বিদ্রোহ সম্পর্কে দুটি পরস্পরবিরােধী বিতর্কের মূল ভিত্তি হিসাবে গড়ে উঠেছে। একদল ঐতিহাসিক এই বিদ্রোহকে সিপাহী বিদ্রোহ বলতে আগ্রহী। অন্যদল এই বিদ্রোহকে স্বাধীনতার যুদ্ধ আখ্যা দিয়েছেন। সম্ভবত এই দুটি চরমপন্থার মধ্যেই এই বিদ্রোহের আসল চরিত্র নিহিত আছে। প্রথমদিকে এই বিদ্রোহ ছিল কেবল সামরিক বিদ্রোহ। সারা দেশব্যাপী বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ এই সামরিক অভুথানের সুযােগ গ্রহণ করে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করে। আমাদের হাতে প্রচুর প্রমাণ আছে যার সাহায্যে আমরা প্রমাণ করতে পারি কৃষকরা যেমন এই সুযােগে জমিদার ও মহাজনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল, সাধারণ মানুষ সেইরকম আইন আদালত, রাজস্ব ব্যবস্থা ও পুলিশ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। অন্যদিকে সাধারণ গ্রামবাসী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছিল। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে এই বিদ্রোহ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। তবে এক্ষেত্রে উল্লেখ্য প্রত্যেক জায়গায় এই বিদ্রোহের চরিত্র অনুরূপ ছিল না। ডঃ রুদ্রাংশু মুখার্জী দেখিয়েছেন অযােধ্যায় এই বিদ্রোহ একটি জনপ্রিয় চরিত্র ধারণ করেছিল। পুরাে উত্তর ভারতে এই বিদ্রোহের চরিত্র সম্পর্কে অনুরূপ মন্তব্য করা হয়। বিহারের কৃষক, কারিগর, শ্রমিক প্রভূতিরা বিদ্রোহীদের সঙ্গে সামিল হয়েছিল। কয়েক হাজার কৃষক লক্ষ্ণৌ রেসিডেন্সি আক্রমণ করে। কিন্তু ভারতের অন্যান্য স্থানে এই বিদ্রোহ ততটা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারিনি।

সিপাহী বিদ্রোহকে জাতীয়তাবাদী চরিত্র প্রদান করেছিল তা হল তাদের দিল্লী চলাে শ্লোগান এবং মুঘল শাসনের প্রতি বিদ্রোহীদের আনুগত্য। মুঘল সম্রাটকে সিংহাসনে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে ভারতের স্বাধীনতা ও ঐক্যের আদর্শকে তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে বাহাদুর শাহ ব্রিটিশ রাজত্বের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য দেশীয় রাজ্যগুলিকে নিয়ে একটি কনফেডারেশন সৃষ্টির জন্য দেশীয় রাজাদের অনুপ্রাণিত করেন। যা কিন্তু এই বিদ্রোহের মধ্যে জাতীয়তাবাদী উপাদানের অভিত্বের কথাকে তুলে ধরে। এই বিদ্রোহ যে গতিতে উত্তর ভারতে প্রসারিত হয়েছিল তার পরিপ্রেক্ষিতে মনে হয় যে এক ধরণের সাংগঠনিক ষড়যন্ত্র বিদ্রোহের পশ্চতে ছিল। কিন্তু বিদ্রোহ যখন পূর্ণরূপ পরিগ্রহ করেছিল তখন কিন্তু তা পর্যাপ্ত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। কিন্তু এটা স্বীকার করতেই হবে যে ভারতের রাজনৈতিক ভাগ্য বা আন্দোলনের শেষ লক্ষ্য সম্পর্কে বিদ্রোহীদের মধ্যে কোন সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না। এই বিদ্রোহে সবচেয়ে উল্লেখযােগ্য দুর্বলতা ছিল বিদ্রোহের নেতাদের সামন্ততান্ত্রিক চরিত্র। ভারতীয় রাজারা যারা এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেছিল তারা সামন্ততান্ত্রিক স্বার্থকেই বেশী প্রাধান্য দিয়েছিল এবং তারা সম্ভবতঃ দেশপ্রেম বা জাতীয়তাবাদী আদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়নি।

উপসংহারে আমরা বলতে পারি, যদিও এই বিদ্রোহের একটি মিশ্র চরিত্র ছিল। তবু এর জাতীয়তাবাদী চেতনাটি ছিল খুব উজ্জ্বল। এমনকি এই বিদ্রোহের সামরিক, সামন্ততান্ত্রিক ও ঐতিহ্যিক চরিত্র জাতীয়তাবাদী চরিত্রের কাছে কিছুটা দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। বর্তমানে ঐতিহাসিক গবেষণার মাধ্যমে একটি সত্য প্রকাশিত হয় যে যদিও এই বিদ্রোহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রপে প্রকাশিত হয়েছিল তা সত্ত্বেও সারা উত্তর ভারতে এর ব্রিটিশ বিরােধী চরিত্রই প্রাধান্য পেয়েছিল।
Advertisement