১৯০৬ সালের জাতীয় শিক্ষা পরিষদ

- January 26, 2019
বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশী আন্দোলনের উন্মাদনার পরিবেশে পরিষদের জন্ম হয়। জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন শুরু হয়। এর আগে ১৯০৪ সালে লর্ড কার্জন ভারতীয়দের জাতীয় আশা আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে তার শিক্ষা সংকোচন নীতি ঘােষণ করেন। শিক্ষিত ভারতীয়রা ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ হয়। এরপরই কার্জন বঙ্গভঙ্গের ঘােষণা করলেন। ফলশ্রতি হিসাবে দেখা দিল স্বদেশী আন্দোলন, সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বর্জন এবং বিদেশী শিক্ষার পরিবর্ত স্বদেশী শিক্ষা ও শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন।
জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন ১৯০৬
এই স্বদেশী আন্দোলনের পাশাপাশি জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন গড়ে ওঠে। ডন সােসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সতীশচন্দ্র মুখােপাধ্যায় এই আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন। সোসাইটির পক্ষে স্যার আশুতোষ চৌধুরী বাংলার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে পার্ক স্ট্রিটের বেঙ্গল ল্যান্ড হোল্ডার্স এসােসিয়েশনের অফিসে ১৯০৫ সালের ১৬ই নভেম্বর এক বৈঠক করেন। সেখানে একটি প্রাদেশিক কমিটি তৈরি হয়। কমিটির সদস্যদের মধ্যে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্যার শুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, রাসবিহারী ঘােষ, চিত্তরঞ্জন দাস, সতীশচন্দ্র মুখােপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারকনাথ পালিত, সুবােধ মল্লিক, ব্ৰজেন শীল, বিপিন পাল, ভূপেন বসু, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, নীলরতন সরকার প্রমুখ মনীষীরা। প্রাদেশিক কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯০৬ সালের ১৬ই মার্চ সতীশচন্দ্রের ডন সােসাইটি জাতীয় শিক্ষা পরিষদে রূপান্তরিত হল। ১লা জুন পরিষদকে রেজেস্ট্রি করা হয় । তৈরি করা হল একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা পরিকল্পনা।

জাতীয় শিক্ষা পরিষদ কর্তৃক জাতীয় শিক্ষা পরিকল্পনার প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি ছিল। (১) মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান। তবে ইংরেজিকে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে রাখা হয়। (২) বিজ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গে কলা, সংস্কৃতি ও মানবিক বিদ্যাচর্চার বাবস্থা করা হয়। (৩) নীতি, ধর্ম ও শারীর শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। (৪) প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজনীতি, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ে গবেষণার পরিকল্পনা করা হয়।

১৯০৬ সালের ১৪ই আগস্ট রাসবিহারী বসুর সভাপতিত্বে কলকাতার টাউন হলে এক বিরাট সভায় অনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ অনুমােদিত বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ ও স্কুল স্থাপনের কথা ঘােষণা করা হয়। ঐ সভায় উপস্থিত জনগণের সামনে স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় জাতীয় শিক্ষা পরিষদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ব্যাখ্যা করে বলেন, “প্রচলিত ইংরাজী শিক্ষাব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে। নিঃসন্দেহে এই শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনের আবশ্যিকতা দেখা দিয়েছে। জাতীয় শিক্ষা পরিষদ সেজন্য এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, জাতীয় প্রথায় শিক্ষা দেওয়া শুধু বাঞ্ছনীয় নয়, একান্ত প্রয়ােজনীয়।" রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বক্তব্যকে সমর্থন করে বলেছিলেন যে “স্কুল কলেজের শিক্ষা আমাদের পরাস্ত করেছে। আমরা বিদেশী শিক্ষার তলায় চাপা পড়ে গেছি।” তিনি ঔপনিবেশিক শিক্ষার নাগপাশ ছিন্ন করে শিক্ষার মুক্ত অবস্থায় উওীর্ণ হবার আশা প্রকাশ করেন। অরবিন্দ ঘােষ হলেন বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ ও স্কুলের অধ্যক্ষ এবং সতীশচন্দ্র হলেন অবৈতনিক কর্মাধ্যক্ষ। কলা, বিজ্ঞান ও কারিগরি বিদ্যা এই তিনটি শাখায় কলেজের পাঠক্রমকে ভাগ করা হয়। রাধাকুমুদ মুখােপাধ্যায়, বিনয় সরকার, সতীশ মুখােপাধ্যায়, ইন্দ্ৰনাথ মল্লিক, ক্ষীরােদপ্রসাদ বিদ্যাবিনােদ প্রমুখ বিখ্যাত ব্যক্তিরা এই প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত শিক্ষকতা করতেন। এছাড়া বাইরে থেকে যারা নিয়মিত বক্তৃতা দিতে আসতেন তারা হলেন, সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ইতিহাসে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানাজী, অর্থনীতিতে পিয়ারীমােহন মুখার্জী, উপনিষদে হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, গণিতে স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, পদার্থ বিদ্যায় রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী। ১৯০৭ সালে এই বিদ্যায়তনের ছাত্রসংখ্যা ছিল ২৭০ জন।

জাতীয় শিক্ষা পরিষদ বিদ্যালয় স্তর থেকে শুরু করে শিক্ষার উচ্চতম স্তর পর্যন্ত ব্যাপক ও বহুমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে নতুন পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়। প্রাথমিক স্তর অর্থাৎ পাঠশালা থেকেই হাতের কাজকে আবশ্যিক করা হয়। মাধ্যমিক স্তর থেকে পাঠের ব্যবস্থা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষায় ভারতীয় সংস্কৃতির আলোচনা ও পঠন পাঠনের ব্যবস্থা করা হয়। এজন্য সংস্কৃত, পালি, মারাঠি ও হিন্দি শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা হয়। কলেজ স্তরে উচ্চতর বিজ্ঞানের পাঠক্রম রাখা হয়। কলেজের কারিগরি বিভাগে বৃত্তিমূলক কাজের প্রশিক্ষণ দেবার ব্যবস্থা করা হয়। প্রয়োগমুলুক শিক্ষা হিসাবে কাঠের কাজ, লোহার কাজ, ঢালায়ের কাজ, যন্ত্রপাতি চালনা ইত্যাদির প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

জাতীয় শিক্ষার প্রকৃতি নিয়ে পরিষদের নেতাদের মধ্যে মতভেদ ছিল। তারকনাথ পালিত ও নীলরতন সরকার মনে করতেন ভারতের ভবিষ্যত উন্নতি নির্ভর করছে কারিগরী ও বিজ্ঞান শিক্ষার উপর। তাদের উদ্যোগে ১৯০৬ সালে কারিগরি শিক্ষা উন্নয়ন সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরিষদের সভাপতি রাসবিহারী ঘোষ এই সমিতির সভাপতি হন। ওই বছর সমিতি কলকাতায় বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে। এখানে কারিগরি ও বিজ্ঞান পড়ানো হত। কিন্তু আর্থিক অসুবিধার জন্য ১৯১০ সালে এই সমিতি জাতীয় শিক্ষা পরিষদের সঙ্গে মিশে যায়।

জাতীয় শিক্ষা পরিষদ পরিচালিত জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন কেবলমাত্র কলকাতায় সীমাবদ্ধ ছিলনা। বাংলার বিভিন্ন জেলায় এবং বাংলার বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলার বিভিন্ন জেলায় পরিষদ অনুমোদিত জাতীয় মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বাংলার ১০ টি শহরে পরিষদের আর্থিক সহায়তায় মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। পরিষদ অনুমোদিত বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪২ টি। ভারতের অন্যান্য প্রদেশ জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। তিলকের চেষ্টায় বোম্বাইতে জাতীয় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। মাদ্রাজেও বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। বাংলার পরিষদের আদর্শে অন্দ্রপ্রদেশে ভারতীয় জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠিত হয়। ১৯০৬ সালে জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে জাতীয় শিক্ষার সমর্থনে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯১৮ সালে বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল দুটি। কেবলমাত্র জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের নেতারা যাদবপুরে যে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজটি স্থাপন করেছিলেন সেটি আজও রয়েছে। ১৯৫৬ সালে যাদবপুর কলেজটি বিশ্ববিদ্যালয় মর্যাদা পায়।
Advertisement