ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ।

author photo
- Thursday, January 24, 2019
advertise here

ফকির ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহ।

সন্ন্যাসী বিদ্রোহ (Monastic Rebellion):


বাংলায় ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে সন্ন্যাসী (ইংরেজি Monks) বিদ্রোহকে প্রথম কৃষক বিদ্রোহ বলা যায়। সন্ন্যাসী বিদ্রোহের ব্যাপ্তিকাল ছিল ১৭৬৩ থেকে ১৮০০ সাল। ওয়ারেন হেস্টিংস এই বিদ্রোহকে হিন্দুস্থানের যাযাবর, পেশাদার ডাকাতদের উপদ্রব বলে বর্ণনা করেছেন। বিদ্রোহীরা সকল স্থানেই ভূমিহীন, নিরন্ন কৃষকদের সমর্থন পায়। বিদ্রোহীরা কেবলমাত্র জমিদার মহাজনদের গৃহ লুটপাট করে, ইংরেজের রাজকোষ লুঠ করে, কৃষকদের ওপর কোনো উৎপীড়ন করে নী। উইলিয়াম হান্টার সর্বপ্রথম সন্ন্যাসী বিদ্রোহকে কৃষক বিদ্রোহ বলে। বাংলা, মালদহ, দিনাজপুর, রংপুর, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর প্রভুতি অঞ্চলের কৃষকরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। এই বিদ্রোহের সঙ্গে মুসলমান ফকির সম্প্রদায়ের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। এই বিদ্রোহ শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হয়।

সন্ন্যাসী বিদ্রোহের নেতা:

সন্ন্যাস বিদ্রোহের নেতা ছিলেন ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরানী ও শোভন আলি শাহ। ভবানী পাঠক ১৭৮৭ সালে ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে এক জলযুদ্ধে তিনি সন্ন্যাসী বিদ্রোহ চলাকালে পরাজিত ও নিহত হন। দেবী চৌধুরানীও পরাস্ত হন। ইংরেজ দমন নীতির ফলে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের অবসান হয়।

ফকির বিদ্রোহ (Fakir rebellion)

ইংরেজ কোম্পানির অত্যধিক হারে রাজস্ব আদায়, কৃষকদের জমি থেকে উৎখাত, রেশম চাষীদের উপর জুলুম, তীর্থকর আদায় প্রভুতি নীতির বিরুদ্ধে বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের নির্যাতিত কৃষকরা অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে (১৭৬৩-১৮০০ সালে) সুফি সম্প্রদায়ভুক্ত সশস্ত্র ফকিরদের নেতৃত্বে বিদ্রোহ করে। সন্ন্যাসী বিদ্রোহের সঙ্গে ফকির বিদ্রোহের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। এই বিদ্রোহ শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হয়।

ফকির বিদ্রোহের নেতা:

ফকির বিদ্রোহের নেতা ছিলেন মজনু শাহ, মুসা শাহ চিরাগ আলি ও জেহেরি শাহ।

মজনু শাহ মৃত্যু:

১৭৮৬ সালে বগুড়া জেলায় মঞ্জরার যুদ্ধে ইংরেজ সেনার গুলিতে আহত হয়ে মজনু প্রাণত্যাগ করেন। মজনু শাহর পর ফকির বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন মুসা শাহ।



ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহের কারণ:

১) বাংলা ও বিহারে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করত সন্ন্যাসী ও ফকিরদের অনেকে কৃষকে পরিণত হয়। ইংরেজরা তাঁদের শোষণ নিপীড়ন করেছিল ।

২) প্রতি বছর এক বিশেষ সময়ে এই সন্ন্যাসী ফকির কৃষকরা তীর্থে যেত। কিন্তু ইংরেজরা উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে তাদের উপর তীর্থকর বসায় এতে তারা ক্ষুব্দ হয়েছিল।

৩) ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সময় ইংরেজদের পৈশাচিক শোষণ ও অত্যাচারের দৃশ্য দেখে বিদ্রোহীরা ইংরেজ, মহাজন ও জমিদারদের উপর আস্থা হারায়।

৪) ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ধার্য করা অত্যধিক রাজস্ব, জমি থেকে ইচ্ছামতো কৃষক উচ্ছেদ প্রভৃতি কারণে বাংলা-বিহারের কৃষকরা ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়।

৫) রাজস্ব আদায়ের নামে লুন্ঠন ও কোম্পানির কর্মচারীদের নির্দয় অত্যাচার বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দেয়।

৬) ফকির ও সন্ন্যাসীদের মধ্যে অনেকে কাঁচা রেশম ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল। কোম্পানির কর্মচারীরা নানা ভাবে তাদের এই ব্যবস্যা করতে বাধা দিত।

এই সমস্ত অসন্তোষকে কেন্দ্র করে ১৭৬৩ সালে ঢাকায় সর্বপ্রথম ফকির ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহ শুরু হয়। ক্রমে তা দাবানলের ন্যায় মালদহ, রংপুর, দিনাজপুর, কোচবিহার, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর প্রভৃতি জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। অত্যাচারিত ও নির্যাতিত দরিদ্র কৃষক, মোগল সেনাবাহিনীর বেকার সৈন্য এবং সন্ন্যাসী ও ফকিরদের বিভিন্ন সম্প্রদায় সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ অংশ নেয়।

সন্ন্যাসী বিদ্রোহের বিফলতার:

১) কৃষকদের ইংরেজ সেনার সঙ্গে যুদ্ধ করার কোন অভিজ্ঞতা ছিল না। সন্ন্যাসী ফকিরদের উদ্যম থাকলেও যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতা ছিল না।

২) সন্ন্যাসীদের মুখে বন্দেমাতরম ধ্বনি শোনা যায়। কিন্তু ইংরেজকে বিতাড়িত করে কি ধরনের শাসন তারা চান সে সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণা ছিল না।

৩) সন্ন্যাসী ও ফকিরদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভেদ দেখা দিলে আন্দোলন দুর্বল হয়ে যায়। সন্ন্যাসী বিদ্রোহের কাহিনী অবলম্বনে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র তার বিখ্যাত উপন্যাস আনন্দমঠ রচনা করেন যা বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনকে প্রেরণা দেই।



ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহের ফলাফল:

ফকির ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ছিল উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রথম প্রতিরোধ আন্দোলন যা প্রায় ৪০ বছর ধরে চলেছিল। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক হান্টার সন্ন্যাসী, ফকির, দস্যু প্রভুতি শব্দগুলি ব্যবহার করেছেন। অন্যান্য বৃটিশ কাগজপত্রে সন্ন্যাসীদের ডাকাত, লুণ্ঠুনবাজ বলে বর্ণনা করেছেন। যামিনী মোহন ঘোষ সন্ন্যাসী ফকির বিদ্রোহ মধ্যে হিংসা ও দস্যুতা ব্যতীত কিছু খুঁজে পাননি।

মজনু শাহ ১৭৭২ সালে নাটোরের মহারানী ভবানীর কাছে যে পিটিশন দাখিল করেছিল, সেখানে তিনি ভবানিকে ফকিরদের দিকে যত্ন নেওয়ার আবেদন করে। সুতরাং সন্ন্যাসী ফকির বিদ্রোহ ছিল নবাগত ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে।

সুপ্রকাশ রায় মন্তব্য করেন যে, সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ ছিল একটি বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে বিকশিত হাওয়া কৃষক বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহ ছিল ফকির সন্ন্যাস বিদ্রোহ দরিদ্র কৃষক এবং সমাজের নিম্নশ্রেণীর মানুষের স্বপ্নের সমবেত রূপ।

এ. এন. চন্দ্র বলেন যে, যদিও ফকির ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়েছিল তথাপি এই বিদ্রোহ স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক ভূমিকা পালন করে। সুপ্রকাশ রায়ের মতে, উপনিবেশিক শাসনের শুরু থেকে ভারতের কৃষক সম্প্রদায় সসস্ত্র বিদ্রোহ সংগঠনের মাধ্যমে তাদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেতে চায়। সুতরাং সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত্তিপ্রস্তর নির্মাণে সহায়তা করেছিল।

Tag: সন্দ্বীপের কৃষক বিদ্রোহ। রংপুর বিদ্রোহ। কৃষক বিদ্রোহের কারণ। চুয়াড় বিদ্রোহ।
Advertisement advertise here