ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ - Fakir Sannyasi Rebellion

- January 24, 2019
বাংলায় ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে সন্ন্যাসী ফকির বিদ্রোহকে প্রথম কৃষক বিদ্রোহ বলা যায়। সন্ন্যাসী ফকির বিদ্রোহের ব্যাপ্তিকাল ছিল ১৭৬৩ থেকে ১৮০০ সাল। ওয়ারেন হেস্টিংস এই বিদ্রোহকে হিন্দুস্থানের যাযাবর, পেশাদার ডাকাতদের উপদ্রব বলে বর্ণনা করেছেন। বিদ্রোহীরা সকল স্থানেই ভূমিহীন, নিরন্ন কৃষকদের সমর্থন পায়। বিদ্রোহীরা কেবলমাত্র জমিদার মহাজনদের গৃহ লুটপাট করে, ইংরেজের রাজকোষ লুঠ করে, কৃষকদের ওপর কোনো উৎপীড়ন করে নী। উইলিয়াম হান্টার সর্বপ্রথম সন্ন্যাসী বিদ্রোহকে কৃষক বিদ্রোহ বলে। বাংলা, মালদহ, দিনাজপুর, রংপুর, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর প্রভুতি অঞ্চলের কৃষকরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। এই বিদ্রোহের সঙ্গে মুসলমান ফকির সম্প্রদায়ের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। এই বিদ্রোহ শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হয়।
বাংলার ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ
সন্ন্যাসীদের উদ্ধব : ভারতবর্ষে সন্ন্যাসীদের উদ্ধব ঘটেছিল অদ্বৈত স্কুলের দশটি শাখা থেকে যা দশনামী নামে পরিচিত। এই দশটি শাখা হল-গিরি, পুরী, ভারতী, বান, অরণ্য, প্রভাত, সাগর, তীর্থ, আশ্রম, সরস্বতী। অদ্বৈত দর্শন প্রচারের উদ্দেশ্যে শঙ্করাচার্য দেশের চারপ্রান্তে চারটি মঠ বা ধর্মোপাসনা কেন্দ্র গড়ে তােলেন। শঙ্করাচার্যের শিষ্যরা দীক্ষা গ্রহণ অনুষ্ঠানে এই দশটি নাম গ্রহণ করতেন। এইভাবে শঙ্করাচার্যের দশনামী ব্যবস্থা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অতিদ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু শত বৎসরের মধ্যে সন্ন্যাসীদের মধ্যে দুটি প্রধান ভাগ লক্ষ্য করা গিয়েছিল। এই সন্ন্যাসীদের মধ্যে একটি গােষ্ঠী উদ্দেশ্যহীনভাবে ভ্রমণে বিশ্বাসী ছিলেন যারা নাগা সন্ন্যাসী নামে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। অপর গােষ্ঠী স্থায়ীভাবে বসবাসের পক্ষপাতী ছিলেন এবং পরে বিভিন্ন পেশা গ্রহণ করেছিলেন। তারা অবিবাহিত থাকার নীতি পরিত্যাগ করে বিবাহ করেছিলেন এবং একটি স্থিরীকৃত জীবনযাত্রা গ্রহণ করেছিলেন। স্থায়ী সন্ন্যাসীরা গোসাই নামে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। পুথিগত বিদ্যার পাশাপাশি সন্ন্যাসীরা যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষার উপরও গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ধীরে ধীরে মঠগুলি ব্যবসা এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক কার্যকলাপের মূল কেন্দ্রে চলে আসে। বহু সন্ন্যাসী কঁচা রেশম, বিভিন্ন পণ্যদ্রব্য, পােষাক পরিচ্ছদ প্রভৃতি ব্যবসায় নিযুক্ত হন। এলাহাবাদ, বান্দা, অযােধ্যা, ঝাসী, রাজপুতানা, শাহাবাদ, রামগড়, ঢাকার রমনা প্রভৃতি স্থানে অসংখ্য মঠের উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে হিম্মত বাহাদুর, মতি গিরি, পরাণ গিরি, গণেশ গিরি, মােহন গিরি, বেনি গিরি প্রভৃতি সন্ন্যাসী নেতারা উত্তর ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কে লিপ্ত ছিলেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে সন্ন্যাসীদের মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে যে দলাদলি শুরু হয়েছিল, তার ফলে তারা বেতনভােগী সেনা হিসাবে কাজ করতে শুরু করেন। ধনী সন্ন্যাসীরা টাকা ধার দেওয়ার কাজে নিযুক্ত হয়েছিলেন। তাছাড়া সন্ন্যাসীরা দলবদ্ধভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে তীর্থযাত্রী হিসাবে ভ্রমণ করতেন।

ফকিরদের উদ্ধব : ফকিররা সুফী ঐতিহ্যের কাছে তাদের উদ্ভবের জন্য ঋণী ছিলেন। সুফী ঐতিহ্যবাহী ফকিরদের মধ্যে বিভিন্ন ভাগ ছিল। যেমন-মাদারিয়া (Madariya), কালানদ্রিয়া (Kalandriya) প্রভৃতি। ফকিরদের বিভিন্ন গােষ্ঠীগুলির মধ্যে মাদারিয়া (Madariya) ছিল বিখ্যাত। মাদারি ফকিরদের আবির্ভাব ঘটেছিল সুফী সাধক বাদীউদ্দিন শাহ-ই-মাদর এর প্রচলিত শিক্ষার মাধ্যমে। ১৬৫৯ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার শাসক শাহ সুজা একটি সনদের মাধ্যমে ফকিরদের কিছু সুবিধা প্রদান করেছিলেন যার মাধ্যমে ফকিরদের যে কোন স্থানে স্বাধীনভাবে ভ্রমণের অধিকার প্রদান করা হয় এবং ফকিরদের শুল্ক থেকে ছাড় দেওয়া হয়। ফকিরা পরগাতে বসবাস করতেন। মাদারি ফকিরদের দরগাগুলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযােগ্য হল গােরক্ষপুর, মাখনপুর, পূণিয়া, মহেশথানগর, শেরপুর, মালদা, দিনাজপুর, মুর্শিদাবাদ প্রভৃতি। ফকিররা ব্যবসা বা টাকা ধার দেওয়ার কাজে যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু তার বেতনভােগী সেনা হিসাবে কাজ করতেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে মাদারিয়া ফকিরদের নেতা ছিলেন মজনু শাহ যিনি মাখনপুরে বাস করতেন। অন্যান্য নেতাদের মধ্যে ছিলেন মুসা শাহ, চিরাগ আলি শাহ, কবম শাহ প্রমুখ।

ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহের কারণ : ১) বাংলা ও বিহারে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করত সন্ন্যাসী ও ফকিরদের অনেকে কৃষকে পরিণত হয়। ইংরেজরা তাঁদের শোষণ নিপীড়ন করেছিল ।
২) প্রতি বছর এক বিশেষ সময়ে এই সন্ন্যাসী ফকির কৃষকরা তীর্থে যেত। কিন্তু ইংরেজরা উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে তাদের উপর তীর্থকর বসায় এতে তারা ক্ষুব্দ হয়েছিল।
৩) ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সময় ইংরেজদের পৈশাচিক শোষণ ও অত্যাচারের দৃশ্য দেখে বিদ্রোহীরা ইংরেজ, মহাজন ও জমিদারদের উপর আস্থা হারায়।
৪) ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ধার্য করা অত্যধিক রাজস্ব, জমি থেকে ইচ্ছামতো কৃষক উচ্ছেদ প্রভৃতি কারণে বাংলা-বিহারের কৃষকরা ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়।
৫) রাজস্ব আদায়ের নামে লুন্ঠন ও কোম্পানির কর্মচারীদের নির্দয় অত্যাচার বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
৬) ফকির ও সন্ন্যাসীদের মধ্যে অনেকে কাঁচা রেশম ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল। কোম্পানির কর্মচারীরা নানা ভাবে তাদের এই ব্যবস্যা করতে বাধা দিত।

এই সমস্ত অসন্তোষকে কেন্দ্র করে ১৭৬৩ সালে ঢাকায় সর্বপ্রথম ফকির ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহ শুরু হয়। ক্রমে তা দাবানলের ন্যায় মালদহ, রংপুর, দিনাজপুর, কোচবিহার, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর প্রভৃতি জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। অত্যাচারিত ও নির্যাতিত দরিদ্র কৃষক, মোগল সেনাবাহিনীর বেকার সৈন্য এবং সন্ন্যাসী ও ফকিরদের বিভিন্ন সম্প্রদায় সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ অংশ নেয়।

সন্ন্যাসী ফকির বিদ্রোহের গতিপ্রকৃতি : ইংরেজ কুঠীগুলি সন্ন্যাসী ও ফকিরদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়ে দাড়িয়েছিল। ১৭৬৩ খ্রিষ্টাব্দে ফকিররা ঢাকা ফ্যাক্টরী আক্রমণ করেন। এই আক্রমণের কারণে সমস্ত সিপাহীরা প্রাণভয়ে পলায়ন করে এবং কারখানার মালিক মি. লিসেস্টার পলায়ন করেন। পরে ক্যাপ্টেন গ্রান্ট এই কারখানাগুলিকে পুনরুদ্ধার করেন। একই বছরে সন্ন্যাসীরা রাজশাহীর রামপুর বােয়ালিয়া ফ্যাক্টরী আক্রমণ করে। ফ্যাক্টরীর প্রধান মি. বেনেটকে সন্ন্যাসীর ঘেরাও করে ও পরে তাকে হত্যা করে। ১৭৬৭ খ্রীঃ প্রায় ৫০০০ সন্ন্যাসী সিরকার সরণে প্রবেশ করে এবং কোম্পানীর সিপাহীদের সঙ্গে খণ্ড যুদ্ধ করে। এই যুদ্ধে কোম্পানীর প্রচুর ক্ষতি হয়। এই সময় থেকে উত্তরবঙ্গ সন্ন্যাসী ও ফকিরদের শক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

১৭৭০ খ্রীঃ বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের পর প্রকৃত আন্দোলন শুরু হয়েছিল। ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দ দুর্ভিক্ষ ফলে বাংলায় এক তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যু হয়। মানুষ গাছের পাতা, ঘাস খেতে লাগল। কিন্তু বহু মানুষের মৃত্যু সত্ত্বেও কোম্পানীর রাজস্বের পরিমাণ ১৭৭১ খ্রিষ্টাব্দে যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছিল। এটা প্রমাণ করে যে দুর্ভিক্ষের পর মানুষ যখন ক্ষধার্ত, দিশাহীন মৃত্যুপথযাত্রী তখনও কিন্তু কোম্পানীর সরকার গ্রামীণ জনসাধারণের অবস্থার উন্নতির জন্য বিন্দুমাত্র সহানুভূতি প্রদর্শন করেনি। বরং নিষ্ঠুর অত্যাচার ও দমননীতি চালিয়ে গিয়েছিল যার অনিবার্য ফল ছিল চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও রাজস্বের পরিমাণ উল্লেখযােগ্য হারে বৃদ্ধি।

১৭৭১ খ্রীঃ প্রথম আড়াই দশকে হাজার হাজার সন্ন্যাসী সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিং, বগুড়া, রংপুর প্রভৃতি স্থানে একত্রিত হতে শুরু করেন। মজনু শাহ ১৭৭১ খ্রীঃ মার্চ মাসে বাংলায় প্রবেশ করেন। ১৭৭২ খ্রীঃ জানুয়ারী মাসে রাজশাহীর সরকারী পরিদর্শক একটি রিপাের্টে বর্ণনা করেছেন ফকিররা কিভাবে কাছারি থেকে ১,০০০ টাকা ছিনিয়ে নিয়েছিল। জয়াসীনের কাছারি থেকেও ফকিররা ১,৬৯০ টাকা ছিনিয়ে নিয়েছিল। এই সময়ে মজনু শাহ ও তার অনুগামীরা বগুড়া ও দিনাজপুর থেকে প্রচুর অর্থ সংগ্রহ করে। ১৭৭২ খ্রীষ্টাব্দের শেষ দিকে সন্ন্যাসীদের বিভিন্ন গােষ্ঠীগুলি পূর্ণিয়া জেলাতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। সন্ন্যাসীরা রংপুরের ভবানীগঞ্জ কাছারিও আক্রমণ করে। ১৭৭২ খ্রীঃ ডিসেম্বর মাসে রংপুরে কোম্পানীর বাহিনীর সঙ্গে সন্ন্যাসীদের একটি খণ্ডযুদ্ধ সংঘটিত হয়। ক্যাপ্টেন টমাসের নেতৃত্বে কোম্পানীর বাহিনী পরিচালিত হয়েছিল। এই বাহিনী ১৭৭২ খ্রীঃ ৩০শে ডিসেম্বর রংপুরের শ্যামগঞ্জে হাজারেরও বেশী সন্ন্যাসীকে আক্রমণ করে। প্রাথমিকভাবে সিপাহীরা জয় লাভ করে এবং সন্ন্যাসীরা পলায়ন করে। ক্যাপ্টেন টমাস এবং তার সিপাহীরা সন্ন্যাসীদের অনুসরণ করেন এবং সন্ন্যাসীদের বিরুদ্ধে তাদের সব গােলাবারুদ ব্যবহার করে ফেলেন। সন্ন্যাসীরা উপলব্ধি করে যে কোম্পানীর বাহিনীর সব গােলাবারুদ শেষ হয়ে গেছে তখন তারা সিপাহীদের ঘিরে ধরে আক্রমণ চালায় এবং ক্যাপ্টেন টমাসকে হত্যা করে। সিপাহীদের গোপন আস্তানা চিনিয়ে দিয়ে গ্রামবাসীরা সন্ন্যাসীদের সাহায্য করে। গ্রামবাসীরা অনেকে নিজেরা লাঠি হাতে সন্ন্যাসীদের দলে যোগদান করে। সন্ন্যাসীদের এই সাফল্য ঔপনিবেশিক শাসকদের বিচলিত করেছিল।

সন্ন্যাসীরা কোন প্রকার শুল্ক ছড়ায় জমি ভোগ করার অধিকার ভোগ করত। এই শুল্কহীন জমি ময়মনসিং, দিনাজপুর, রংপুর, মালদা প্রভৃতি স্থানে বিদ্যমান ছিল। কোম্পানীর সরকার এই শুল্কহীন রায়তীস্বত্বকে তাদের আয়ের পক্ষে ক্ষতিকর বলে বিবেচনা করেছিল। আর এই কারণেই কোম্পানী শুল্কহীন রায়তীস্বত্বকে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে। এই ব্যবস্থা সন্ন্যাসী ও মঠগুলির উপর দারুণ আঘাত এনেছিল কেননা সন্ন্যাসীরা এই সমস্ত শুল্কহীন রায়তীস্বত্বের উপর নির্ভরশীল ছিল। তাছাড়া সন্ন্যাসী ও ফকিররা জনসাধারণের কাছ থেকে যে সেবার দান গ্রহণ করত, কোম্পানী কর্তৃপক্ষ মনে করেছিল, তাও তাদের রাজস্ব বৃদ্ধির পরিপন্থী। সন্ন্যাসীরা অনেক সময় জমিদারদের টাকা ধার দিতেন। এই টাকা দিয়ে জমিদার তার খাজনা পরিশােধ করত। বিনিময়ে জমিদারদের কাছ থেকে সন্ন্যাসীরা কিছু সুদ পেতেন। কিন্তু কোম্পানীর সরকার এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে এবং সুদের হার কমিয়ে দেয়। কোন পীরের মৃত্যুর পর স্মৃতি রক্ষার উদ্দেশাে অনুষ্ঠিত দিনাজপুরের নেকমার্ডার হাটে বিক্রীত দ্রব্যের উপর সন্ন্যাসীরা যে কর সংগ্রহ করত সেখানেও কোম্পানী হস্তক্ষেপ করে। কোম্পানীর সরকার অস্ত্র নিয়ে সন্ন্যাসী ও ফকিরদের ভ্রমণের উপরেও নিষেধাজ্ঞা জারী করেছিল।

১৭৭৬ খ্রীঃ পর থেকে একদিকে সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহী এবং কোম্পানীর সরকারের মধ্যে সংঘর্ষ আরও স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট রূপ পরিগ্রহ করেছিল। এই সময় সন্ন্যাসী ও ফকিররা সরকারী রাজকোষ, কাছারী লুঠ করার নীতি গ্রহণ করেছিল। এইভাবে মজনু শাহ ১৭৮১ খ্রীঃ রাজশাহী জেলা থেকে ৫,০০০ টাকা লাভ করেছিলেন। ১৭৮৩ খ্রীঃ মালদা ফ্যাক্টরীর এজেন্ট মি. গ্রান্ট এর একটি রিপাের্ট থেকে জানা যায় যে জনসাধারণের থেকে রাজস্ব হিসাবে সংগৃহীত সরকারী অর্থ ফকিররা লুঠ করেছিলেন। ১৭৮৬ খ্রীঃ আবার মজনু শাহ দিনাজপুর জেলার গিলবাড়ী পরগণার তহশিলদারকে অপহরণ করে অর্থ দাবী করেন। মজনু শাহ ছাড়া ফকিরদের অন্যান্য নেতাদের মধ্য ছিলেন মুসা শাহ, করম শাহ, চিরাগ আলী শাহ, জেহেরি শাহ প্রমুখ। ১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে মুসা রংপুর এবং উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলাগুলিতে বিদ্রোহ পরিচালনা করতে শুরু করেন। ১৭৮৭ সালের জুলাই আগস্ট মাসে মুসা শাহ দিনাজপুর জেলায় বেশ কিছু সরকার বিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করেন। এই আক্রমণের সময় তিনি সরকারী রাজকোষ লুণ্ঠন করেন এবং কোম্পানি রাজস্ব হিসেবে যে অর্থ জমা ছিল তা ছিনিয়ে নেন। ১৭৯০ সালে ময়মনসিং জেলায় চিরাগ আলির নেতৃত্বে ফকিরা সরকারী রাজস্ব লুণ্ঠন করেন।

ফকিরদের পাশাপাশি, সন্ন্যাসীরাও বাংলা প্রেসিডেন্সির বিভিন্ন প্রদেশে ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছিলেন। ১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দে দুর্ভিক্ষ বাংলার তাতীদের সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করেছিল। ফলে বহু কর্মচ্যুত তাতী সন্ন্যাসীদের দলে যোগ দিয়েছেন। ১৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দে গভর্নর জেনারেল হেস্টিংস কোর্ট অব ডিরেক্টরসকে প্রদত্ত একটি রিপােটে বলেন যে রংপুর জেলায় রাজস্ব আদায় সন্ন্যাসীদের অবিরত আক্রমণ এবং লুণ্ঠনের ফলে ব্যাহত হচ্ছে। এই সময়ে সন্ন্যাসীদের নেতৃত্বে বিদ্রোহীর সংখ্যা ৫০,০০০০ ছড়িয়ে গিয়ে ছিল। ১৭৭৩ খ্রীঃ জানুয়ারী মাসে প্রায় ৫,০০০ সন্ন্যাসী ময়মনসিং জেলায় জাফরশাহী পরগণা আক্রমণ করে ১,৬০০ টাকা সংগ্রহ করেন। মােতি গিরি, ধর্ম গিরি প্রভৃতি নেতাদের নেতৃত্বে বিভিন্ন জমিদারদের উপর আক্রমণ চালানাে হয়েছিল। ১৭৮০-র দশকে ভবানী পাঠক এবং দেবী চৌধুরাণী নামে দুজন সন্ন্যাসী নেতার আবির্ভাব ঘটে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার আনন্দমঠ উপন্যাসে এই দুই নেতার কার্যকলাপকে সুস্পষ্ট ভাবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু এই বিবরণ অনেক ক্ষেত্রে অভিসন্ধিমূলক এবং অতিরঞ্জনের দোষে দুষ্ট। এই বর্ণনা অনেক ক্ষেত্রে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের বিকৃত ছবিকে তুলে ধরে। ভবানী পাঠক রংপুর, ময়মনসিং এবং বগুড়া জেলায় সক্রিয় ছিলেন। তিনি ছিলেন বাজপুরের বাসিন্দা এবং তিনি ফকির নেতা মজনু শাহর সঙ্গে সংযােগ রক্ষা করে চলতেন। ১৭৮৭ খ্রীঃ ভবানী পাঠক ও তার অনুগামীরা বাণিজ্য জাহাজ আক্রমণ করেন এবং ব্রিটিশ বণিকদের সম্পত্তি লুণ্ঠন করে। ১৭৮৭ খ্রীঃ লেফটেন্যান্ট ব্রেনান (Brennan) এর সঙ্গে সংঘর্ষে পাঠক মারা যান। সরকারী রিপাের্ট এবং রংপুর জেলা অভিধান থেকে জানা যায় যে দেবী চৌধুরাণী ছিলেন একজন ছােট জমিদার যিনি ভবানী পাঠকের নেতৃত্বে পরিচালিত বিদ্রোহকে সমর্থন করেছিলেন। দেবী চৌধুরাণী সরকারকে রাজস্ব প্রদান করতে না পেরে পলায়ন করেন এবং বিদ্রোহে যােগ দেন। ভবানী পাঠকের মৃত্যুর পর তিনি আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছিলেন।

১৮০০ খ্রীঃ নাগাদ সন্ন্যাসী এবং ফকির বিদ্রোহ অস্তমিত হয়ে আসে। শেষপর্যন্ত শােভন আলী শাহ উত্তরবঙ্গে বিদ্রোহ পরিচালনা করেছিলেন এবং তিনি দিনাজপুর জেলার শালবাড়ী পরগণা অঞ্চলে সরকারী রাজস্ব বাজেয়াপ্ত করেন। ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে সন্ন্যাসী ও ফকিরদের একটি যৌথ দল রাজশাহী জেলায় বিদ্রোহ পরিচালনা করে। ১৭৯৯ সালে সরকার শােভন আলীকে গ্রেপ্তারের জন্য ৪,০০০ টাকা পুরস্কার হিসাবে ঘােষণা করে। ১৮০০ সালের পর এই আন্দোলন বন্ধ হয়ে যায়।

যামিনী মােহন ঘোষ এবং আধুনিক গবেষক আনন্দ ভট্টাচার্য মনে করেন যে, সন্ন্যাসী ও ফকিররা ছিল বহিরাগত এবং বাংলায় তাদের কোন সামাজিক ভিত্তি ছিল না। সন্ন্যাসী বিদ্রোহ সম্পর্কে উপরােক্ত আলােচনা প্রমাণ করে যে, সন্নাসী ও ফকিরদের বহু নেতা যেমন মজনু শাহ, উত্তর ভারতের জেলাগুলি থেকে এসেছিলেন। সমসাময়িক ব্রিটিশ তথ্যগুলি ৫,০০০, ১,০০০ এমনকি ৫০,০০০ সন্ন্যাসী এবং ফকিরের একতিকরণের কথা বলে। সুপ্রকাশ রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন যে ৭০ এবং ৮০-র দশকে দুর্ভিক্ষের পর যখন বাংলায় চরম দারিদ্র্য এবং কোনরূপ খাদ্যশস্য, অর্থ কিছুই ছিল না তখন কোন উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বহিরাগতরা বাংলায় প্রবেশ করবে। দ্বিতীয়ত অসংখ্য বিদ্রোহ, ক্যাপ্টেন টমাসের হত্যা সংক্রান্ত ঘটনা প্রমাণ করে যে, বৃহৎ নেতা বা নেত্রীদের নেতৃত্বে যে দরিদ্র কৃষক, তাতিরা একত্রিত হয়েছিল তার কিন্তু বাইরের কেউ ছিলেন না বরং তারা ছিলেন বাংলার মাটিতেই বেড়ে ওঠা মানুষ। তারাই ছিলেন এই আন্দোলনের মূল পরিচালিকা শক্তি। সুতরাং সন্ন্যাসী এবং ফকির বিদ্রোহ বহিরাগতদের কোন আন্দোলন ছিল না, বরং এটা ছিল এদেশীয় জনতার আন্দোলন।

Advertisement
ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহের ফলাফল : বিদ্রোহীরা সর্বদাই কোম্পানীর রাজস্ব ব্যবস্থাকে আক্রমণ করেছিল। দরিদ্র জনগনকে তারা কখনো আক্রমণ করেনি। তারা কোম্পানীর সেনা অফিসারদের হত্যা করেছিল। সুরঞ্জন চ্যাটার্জী দেখিয়েছেন যে বিদ্রোহীরা মনে করেছিল যে, যদি কোম্পানীর রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বাধা প্রদান করা হয় তাহলে তা প্রশাসনের ওপর তীব্র আঘাত হানবে। সুতরাং এই দাবি করা অযৌক্তিক হবে না যে সন্ন্যাসী এবং ফকিররা কিছুটা রাজনৈতিক ভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তারা ছিলেন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরােধী।

মজনু শাহ ১৭৭২ খ্রীঃ নাটোরের মহারাণী ভবানীর কাছে যে পিটিশন দাখিল করেছিলেন সেখানে তিনি ভবানীকে ফকিরদের দিকে যত্ন নেওয়ার আবেদন জানিয়েছিলেন, কারণ ভবানী ছিলেন দেশের শাসক। সুতরাং ফকির এবং সন্ন্যাসীদের কাছে নবাগত কোম্পানীর প্রশাসন ছিল বিদেশী এবং তারা দেশে কোম্পানীর শাসনাকে গ্রহণ করতে রাজী ছিল না। অতীশ দাশগুপ্ত দেখিয়েছেন যে প্রথাগত শাসকদের প্রতি এই বিশ্বস্ততা ছিল বিপ্লবীদের একটি নৈতিক ভাষ্য।

সুপ্রকাশ রায় মন্তব্য করেছেন যে, সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ ছিল একটি বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে বিকশিত হওয়া কৃষক বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহ ছিল সন্ন্যাসী ও ফকিরদের নেতৃত্বে সংগঠিত দরিদ্র কৃষক, কর্মচ্যুত সৈনিক, তাতী এবং সমাজের অন্যান্য নিম্নশ্রেণীর মানুষের স্বপ্নের সমবেত রূপ।

এ. এন. চন্দ্র দেখিয়েছেন যে, যদিও সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়েছিল তথাপি এই বিদ্রোহ স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্ষেত্রে পথ প্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল। সুপ্রকাশ রায়ের মতে, ঔপনিবেশিক শাসনের শুরু থেকে ভারতের কৃষক সম্প্রদায় সসস্ত্র বিদ্রোহ সংগঠনের মাধ্যমে তাদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। সুতরাং সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহের তাৎপর্য আলােচনা প্রসঙ্গে একথা বলা অযৌক্তিক হবে না যে সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত্তিপ্রস্তর নির্মাণে সহায়তা করেছিল।
Advertisement