PayPal

চুয়াড় বিদ্রোহ ইতিহাস

author photo
- Thursday, January 24, 2019

বাংলার চুয়াড় বিদ্রোহ

চুয়াড়রা ছিলেন উপজাতি সম্প্রদায় যাৱা মেদিনীপুর জেলার জঙ্গলমহলের বসবাস করতেন। ১৭৬৭-৯৯ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার বাকুড়া, মেদিনীপুর ও ধানভূম অঞ্চলে চুয়াড় বিদ্রোহ সংগঠিত হয়েছিল। ঔপনিবেশিক শাসনের প্রাথমিক পর্বে জঙ্গল মহল বিস্তৃত ছিল, মেদিনীপুর থেকে রাচি, বাকুড়া এবং পুরুলিয়া ও বীরভূম জেলার কিছু অংশে। অষ্টাদশ শতকের ৭০ এর দশক থেকে চুয়াড়রা ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে অদম্য প্রতিরােধ আন্দোলন গড়ে তোলেন কিন্তু চুয়াড়দের সর্বাপেক্ষা বৃহৎ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল ১৭৯৮-১৭৯৯ খ্রিঃ যা ইতিহাসে চুয়াড় বিদ্রোহ নামে পরিচিত। চুয়াড় বিদ্রোহ সম্পর্কে পুরনাে রচনাগুলির মধ্যে উল্লেখযােগ্য হল মেদিনীপুরের সেটলমেন্ট অফিসার J. C. Price এর দ্য চুয়াড় রিবেলিয়ান (The Cruar Rebellion)।
বাংলার চুয়াড় বিদ্রোহ
পরবর্তী কালে তিনজন গবেষক চুয়াড় বিদ্রোহ নিয়ে বিস্তৃত আলােচনা করেছেন। এস. বি. চৌধুরী তার সিভিল ডিসটারব্যানসেস ডিউরিং দ্য ব্রিটিশ রুল ইন ইন্ডিয়া (Civil Disturbances During the British Rule in India), সুপ্রকাশ রায় তার ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং বিনােদ এস. দাস তার সিভিল রিবেলিয়ান ইন দ্য ফ্রন্টিয়ার বেঙ্গল (Civil Rebellion im the Frontier Bengal) এবং চেঞ্জিং প্রােফাইলস অব দ্য ফ্রন্টিয়ার বেঙ্গল (Changing Profiles of the Frontier Bergeal) গ্রন্থে চুয়াড় বিদ্রোহ নিয়ে আলােচনা এবং ব্যাখ্যা করেছেন।

চুয়াড়দের সর্দাররা পাইক নামে পরিচিত ছিলেন। পাইকরা বহু শতাব্দী ধরে শুল্কহীন জমি ভােগ করে আসছিলেন। বিনিময়ে তার শাসককে প্রয়ােজনের সময়ে সেনাবাহিনী দিয়ে সাহায্য করতেন। কৃকরা পাইকদের এই শুল্কহীন জমিতে চাষাবাদ করতেন। এই জমিগুলি পাইকান জমি বা পাইকজাগীর নামে পরিচিত ছিল যা আসল মহলের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিল। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী রাজস্ব বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে এই পাইকান জমিতে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে। যে কোন ধরনের শুল্কহীন জমি মানেই তা আর্থিক ক্ষতির কারণ বলে কোম্পানী মনে করেছিল। সুতরাং কোম্পানী পাইকান জমিগুলি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। এই ব্যবস্থা জঙ্গল মহলের সমগ্র পাইক সম্প্রদায় এবং কৃষককে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে। ফামিং সিস্টেমের প্রবর্তন অধিকাংশ জমিদাকে সংশ্লিষ্ট স্থানে কোণঠাসা করে দিয়েছিল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (Permanent settlement ) পর জঙ্গল মহলের জমিদাররা সঠিক সময়ে রাজস্ব প্রদান করতে বাধ্য হয় এবং জমিদারী থেকে অধিকারচুত্য হয়ে আরও বেশী কোণঠাসা হয়ে পড়ে। তাছাড়া কোম্পানী লবণ উৎপাদনের উপর একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। ফলে নিমকি (লবণ উৎপাদক শ্রেণী) মহল সংকটের সম্মুখীন হয়।

শস্য ব্যবসায় একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পরে ১৭৭০ এর দুর্ভিক্ষ জঙ্গল মহলের আদিবাসী কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। ধলভূমের রাজা জগন্নাথ ধল ব্রিটিশ শাসনকে মেনে নিতে চাননি। জগন্নাথ ধল ১৭৭০ খ্রীঃ বিদ্রোহ করেন এবং এই সময়ে চুয়াড়রা কোম্পানীর বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিবার গড়ে তোলে। চুয়াড়রা বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধের পর পরাজিত হয়। কোম্পানি জগন্নাথের ভ্রাতুষ্পুত্রকে জমিদারী ফিরিয়ে দেয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর ৮০ দশক থেকে জঙ্গল মহলের সংকট একটি ব্যাপক আকার ধারণ করে এবং চুয়াড়রা সর্দার অধিকারচুত্য জমিদারদের নেতৃত্বে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন করতে থাকেন। ১৭৮৩, ১৭৮৯-১৭৯০ এবং ১৭৯৮-১৭৯৯ খ্রীঃ চুয়াড়রা যথাক্রমে কালিয়াপাল, রামগড় এবং পাটকুমে প্রতিরােধ গড়ে তােলে। পাটকুম অঞ্চলের বিদ্রোহ ছিল সর্ববৃহৎ যা জলদা রামগড়, এবং তোমার অঞ্চলে ১৭৯৪ খ্রীঃ মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ১৭৯৫ খ্রিষ্টাব্দে সংকট আরাে ব্যাপক আকার ধারণ করে যার শেষ পরিণতি ছিল ১৭৯৮-১৭৯৯ এর বিধ্বংসী বিদ্রোহ। ১৭৭১ সালে ধাদকার শ্যামগঞ্জনের নেতৃত্বে চুয়াড়রা বিদ্রোহ করে ও ব্যর্থ হয়। ১৭৯৮ সালের মার্চ মাসে রাইপুর পরগনায় শুরু হয় প্রকৃত চুয়াড় বিদ্রোহ। অম্বিকানগর, সুপুর, বাঁকুড়ার দক্ষিন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। রাণী শিরোমণির আমলে চুয়াড় বিদ্রোহ ঘটে এবং নাড়াজোলের রাজা ত্ৰিলোচন খানের দ্বারা চুয়াড়রা পরাজিত হয়। দ্বিতীয় চুয়াড় বিদ্রোহের সময় ইংরেজ সরকার রাণী শিরোমণিকে চুয়াড় বিদ্রোহের নেতা ভেবে ১৭৯৯ খ্রীস্টাব্দে বন্দী করে।

১৭৯৫ খ্রীঃ পাচেট জমিদারী বিক্রীর জন্য ঘােষিত হয়েছিল। ১৭৯৮ খ্রীঃ দুর্জন সিং, যিনি ছিলেন বাঁকুড়ার রায়পুরের জমিদার তার অধিকার থেকে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন। ১৭৯৮ খ্রীঃ ক্ষমতাচ্যুত দুর্জন সিং ১,৫০০ জন চুয়াড়ের সহযােগিতা নিয়ে রায়পুর পরগণা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁরা বাজার এবং কাছারিতে অগ্নিসংযােগ করে। ক্রমশ অসন্তোষ প্রসারিত হতে থাকে। বছরের শেষে বাসুদেবপুর, তমলুক, কাশিজোড়া, জলেশ্বর, বলরামপুর, রামগড়, শালবনী প্রভৃতি স্থানে বিদ্রোহ প্রসারিত হয়। ১৭৯৯ খ্রীঃ বিদ্রোহ আরাে সুস্পষ্ট আকার গ্রহণ করে। ১৭৯৯ খ্রীঃ ফেব্রুয়ারী মাস থেকে চুয়াড়দের অত্যাচারের স্পষ্ট বিবরণ তুলে ধরে মেদিনীপুরের কালেক্টর জে. ইমহফ (J. Imhoff) অসংখ্য চিঠি ফোর্ট উইলিয়াম পাঠান। গ্রাম পােড়ানাে হয়েছিল, খাদ্যশস্য শস্য লুট করা হয়েছিল এবং যারা চুয়াড়দের বিরুদ্ধে কোম্পানীর পক্ষে কথা বলেছিল তাদের তৎক্ষণাৎ হত্যা করা হয়েছিল। কর্ণাগর (Karnagar)-এর রাণী সহ অসংখ্য অধিকারচ্যুত জমিদার চুয়াড়দের সমর্থনে এগিয়ে এসেছিল। ১৭৯৯ খ্রীঃ এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে মেদিনীপুরের সর্বাপেক্ষা বৃহৎ বাজার আনন্দপুর চুয়াড়দের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল। এমনকি মেদিনীপুর শহরেও আক্রমণের সম্ভাবনা তৈরী হয়েছিল। একটি বিশাল সেনাবাহিনী প্রেরণ করে এবং নিষ্ঠুর দমননীতির দ্বারা কোম্পানীর সরকার কোনক্রমে চুয়াড়দের দমন করতে সক্ষম হয়।

চুয়াড় বিদ্রোহের নেতা : রাজা জগন্নাথ ধল, রানী শিরোমনি, রঘুনাথ মাহাত, গোবর্ধন দিকপতি, দুর্জন সিংহ, অচল সিংহ, ধাদকার শ্যামগঞ্জন প্রমুখেরা বিভিন্ন সময় চুয়াড় বিদ্রোহের নেতৃত্ব প্রদান করেন।

চুয়াড় বিদ্রোহের কারণ : চুয়াড় বিদ্রোহের কারণ আলােচনা প্রসঙ্গে জে. সি. প্রাইস (J. C. Price) দেখিয়েছেন যে কোম্পানীর কর্তৃপক্ষের দ্বারা পাইকান জমি অধিগ্রহণ বিদ্রোহের মূল কারণ হিসাবে কাজ করেছিল। অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী ঐতিহাসিকদের মতে চুয়াড় বিদ্রোহ ছিল বন্য প্রতিরােধমূলক এবং এই কারণেই তা, Price এর মতে, চরম নিষ্ঠুর প্রকৃতির। বিনােদ এস. দাস চুয়াড় বিদ্রোহকে সাধারণ মানুষের আন্দোলন হিসাবে ব্যাখ্যা করেছেন কারণ তা সাধারণ জনগণের সমর্থন লাভ করেছিল। সুতরাং চুয়াড়দের যে নিষ্ঠুরতা তা একেবারে নির্বোধ ছিল না কারণ তা সক্রিয় সমর্থন লাভ করেছিল। সুপ্রকাশ রায় দেখিয়েছেন যে, যদিও ঔপনিবেশিক শাসকরা চুয়াড়দের অসন্তোষের কারণগুলি অনুধাবন করেছিল তথাপি চুয়াড়দের নিষ্ঠুরতায় তারা অত্যন্ত বিরক্ত হয়েছিল। সুপ্রকাশ রায় মনে করেন যে চুয়াড়দের এই নিষ্ঠুরতা ছিল ঔপনিবেশিক শােষণের প্রতিক্রিয়া। ঔপনিবেশিক শাসকরাই এই নিষ্ঠুরতার জন্য দায়ী ছিল। উনবিংশ শতাব্দীতেও চুয়াড়রা ঔপনিবেশিক শােষণের বিরুদ্ধে তাদের লড়াই চালিয়ে গিয়েছিল। সুতরাং এস. বি. চৌধুরী যথাযথই বলেছেন যে, ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থাই চুয়াড়দের একটি শক্তিশালী বিদ্রোহ গড়ে তােলার মূল উপাদান সরবরাহ করেছিল।

চুয়াড় বিদ্রোহের ফলাফল : (১) ব্রিটিশ শাসনের অত্যাচারের বিরুদ্ধে পিছিয়ে পড়া চুয়াড়রা বিদ্রোহ শুরু করে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল৷ কেননা নিরক্ষর চুয়াড়রা আঠারো শতকে ব্রিটিশ সরকারের শাসনের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ শুরু করে তা ভারতের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের শুরু করেছিল, অন্তত একশ বছর পরে৷
(২) জমিদার ও কৃষকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে চুয়াড় বিদ্রোহে শামিল হয়।
(৩) চুয়াড়দের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার উদ্দেশ্যে সরকার এখানকার শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটায়। বিষ্ণুপুর শহরটিকে কেন্দ্র করে দুর্গম বনাঞ্চল নিয়ে জঙ্গলমহল নামে একটি বিশেষ জেলা গঠন করা হয়৷

No comments:

Post a Comment