চুয়াড় বিদ্রোহের ইতিহাস।

author photo
- Thursday, January 24, 2019

চুয়াড় বিদ্রোহ (Chuar Rebellion)।

চুয়াড়রা ছিল মেদিনীপুর জেলার জঙ্গলমহলের অধিবাসী। চুয়াড়রা ছিল এক সশস্ত্র উপজাতি। যুদ্ধ বিগ্রহ ছিল তাদের পেশা। চুয়াড় বিদ্রোহ সম্পর্কে জানা যায় মেদিনীপুরের সেটেলমেন্ট অফিসার জে. সি. প্রিস এর
চুয়াড় রিবেলিয়ান (The Chuar Rebellion)। পরবর্তী কালে তিনজন গবেষক চুয়াড় বিদ্রোহ নিয়ে


আলোচনা করেছেন। এস. বি. চৌধুরী তার 'সিভিল ডিসটারব্যানসেস ডিউরিং দ্যা ব্রিটিশ রুল ইন ইন্ডিয়া (Civil Disturbances During the British Rule in India), সুপ্রকাশ রায় তার "ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম" এবং বিনোদ এস. দাস তার 'সিভিল রিবেলিয়ান ইন দ্যা ফ্রন্টিয়ার বেঙ্গল (Civil Rebellion in the Frontier Bengal), এবং 'চেঞ্জিং প্রোফাইলস অব দ্যা ফ্রন্টিয়ার বেঙ্গল (Changing Profiles of the Frontier Bengal), গ্রন্থে চুয়াড় বিদ্রোহ নিয়ে আলোচনা করেছেন।


চুয়াড় বিদ্রোহের কারণ:

সাধারণত তারা মেদিনীপুর বাঁকুড়া ও ধলভূমের স্থানীয় জমিদারদের অধীনে রক্ষী বাহিনীর কাজ করত। এজন্য এদের পাইক বলা হত। এরা পাইকের কাজ করে বেতনের পরিবর্তে যে জমি পেত তার নাম ছিল পাইকান জমি। মুঘল যুগের শেষ দিকে এই জমিদার প্রায় অর্ধ স্বাধীন হয়ে যায়। এখন কোম্পানির শাসন স্থাপিত হলে এই সকল জমিদারদের ওপর কোম্পানি সরকার অত্যন্ত চড়া হারে ভূমি রাজস্ব ধার্য করলে তা দেওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়। চুয়াড় পাইকরা আশঙ্কা করে যে, জমিদারদের জমিদারী সরকার বাজেয়াপ্ত করলে তাদের পাইকান জমিগুলো হাতছাড়া হবে। তাছাড়া কোম্পানি নুন উৎপাদনের উপর একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। ফলে নিমকি মহল সংকটের সম্মুখীন হয়। তাছাড়া তাদের গ্রাম সমাজ ভেঙে যাবে। এজন্য তারা জমিদারদের পক্ষ নিয়ে কোম্পানির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে। সরকার বিদ্রোহী জমিদারদের শায়েস্তা করার জন্য সেনা পাঠালে সমগ্র জঙ্গলমহল জুড়ে চুয়াড়গণ বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সেনাপতি ফার্গুসনের সঙ্গে যুদ্ধের পর ১৭৬৭ সালে ঘাটশিলার বা ধলভুমের রাজা জগন্নাথ ধল বিদ্রোহ ঘোষণা করে। চুয়াড়রা বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধের পর পরাজিত হয়। কোম্পানি জগন্নাথের ভ্রাতুষ্পুত্রকে জমিদারী ফিরিয়ে দেয়। এর পরও ১৭৮৩ সালে, ১৭৯৮-১৭৯৯ সালে পুনরায় চুয়াড় বিদ্রোহ হয়। ১৭৯৮ সালে বিদ্রোহে রাইপুরের দুর্বল সিংহ নেতৃত্ব দেন। কোম্পানির সেনাদল এই বিদ্রোহ দমন করে। ১৭৭১ সালে ধাদকার শ্যামগঞ্জনের নেতৃত্বে চুয়াড়রা বিদ্রোহ করে ও ব্যর্থ হয়। ১৭৯৮ সালের মার্চ মাসে রাইপুর পরগনায় শুরু হয় প্রকৃত চুয়াড় বিদ্রোহ। অম্বিকানগর, সুপুর, বাঁকুড়ার দক্ষিন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। রাণী শিরোমণির আমলে চুয়াড় বিদ্রোহ ঘটে এবং নাড়াজোলের রাজা ত্ৰিলোচন খানের দ্বারা চুয়াড়রা পরাজিত হয়। দ্বিতীয় চুয়াড় বিদ্রোহের সময় ইংরেজ সরকার রাণী শিরোমণিকে চুয়াড় বিদ্রোহের নেতা ভেবে ১৭৯৯ খ্রীস্টাব্দে বন্দী করে।



চুয়াড় বিদ্রোহের নেতা:

রাজা জগন্নাথ ধল, রানী শিরোমনি, রঘুনাথ মাহাত, গোবর্ধন দিকপতি, দুর্জন সিংহ, অচল সিংহ, ধাদকার শ্যামগঞ্জন প্রমুখেরা বিভিন্ন সময় এই কৃষক বিদ্রোহের নেতৃত্ব প্রদান করেন।

চুয়াড় বিদ্রোহের ফলাফল:

১) ব্রিটিশ শাসনের অত্যাচারের বিরুদ্ধে পিছিয়ে পড়া চুয়াড়রা বিদ্রোহ শুরু করে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল৷ কেননা নিরক্ষর চুয়াড়রা আঠারো শতকে ব্রিটিশ সরকারের শাসনের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ শুরু করে তা ভারতের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের শুরু করেছিল, অন্তত একশ বছর পরে৷
২) জমিদার ও কৃষকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে চুয়াড় বিদ্রোহে শামিল হয়।
৩) চুয়াড়দের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার উদ্দেশ্যে সরকার এখানকার শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটায়। বিষ্ণুপুর শহরটিকে কেন্দ্র করে দুর্গম বনাঞ্চল নিয়ে জঙ্গলমহল নামে একটি বিশেষ জেলা গঠন করা হয়৷

Tag: সন্দ্বীপের কৃষক বিদ্রোহ। বাংলার কৃষক বিদ্রোহ। রংপুর বিদ্রোহ। কৃষক বিদ্রোহের কারণ। ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ।





COMMENTS