সিপাহী বিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ

author photo
- Wednesday, January 09, 2019
advertise here

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ (The Causes of the failure of the Great Rising of 1857):


ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনের বিরুদ্ধে পুঞ্জিভূত ক্ষোভ ও অসন্তোষকে কেন্দ্র করে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে ২৯ মার্চ বিদ্রোহের সূচনা হয়। বিদ্রোহে সেনাবাহিনীর সমর্থন, জনগণের সক্রিয় সমর্থন ও সহানুভূতি থাকা সত্বেও মহাবিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতার পেছনে একাধিক কারণ ছিল -

১) নির্দিষ্ট লক্ষ্যর অভাব:

একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও জাতীয় পন্থা না থাকায় বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে বিদ্রোহ চলতে থাকে। ড: মজুমদার ও ড: সেনের মতে সুপরিকল্পিত যুদ্ধ না হওয়ায় এই বিদ্রোহের পতন ঘটে।

২) গণসমর্থনের অভাব:

একমাত্র অযোধ্যা, কানপুর, লখনউ, ঝাঁসি, দিল্লি প্রভৃতি দু-চারটি অঞ্চল ছাড়া আর কোথাও জনগণ বিদ্রোহীদের সমর্থনে এগিয়ে আসেনি। দেশীয় রাজারা অনেক ক্ষেত্রে সিপাহিদের বিরুদ্ধে ইংরেজদের প্রতি উদাসীন ছিল।



৩) আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতা:

সিন্ধু, রাজপুতনা, গুজরাট ও সমগ্র দক্ষিণ ভারত এই বিদ্রোহের প্রভাবমুক্ত ছিল। আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতা এই বিদ্রোহের ব্যর্থতার প্রধান কারণ।

পড়ুন:- সিপাহী বিদ্রোহের অগ্রগতি ও অংশগ্রহণ।

৪) রক্ষণশীলতা:

রজনী পাম দত্ত এই বিদ্রোহকে সামন্ততান্ত্রিক বলে উল্লেখ করেন। এই রক্ষণশীলতার জন্য বিদ্রোহ জাতীয় বিদ্রোহের রূপ নিতে পারেনি।

৫) নেতাদের মধ্যে সংহতির অভাব:

ঝাঁসির রানী লক্ষীবাই, বিহারের কুনওয়ার সিং প্রমুখ নিজ স্বার্থে এই বিদ্রোহে যোগদান করেন। নানা সাহেব মারাঠা শক্তির পুন:প্রতিষ্ঠার জন্য ও দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ মোগল সাম্রাজ্যর  সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার জন্যে কোনো জাতীয় সংহতি ছিল না।

৬) বিভিন্ন জাতি ও দেশীয় রাজাদের বিরোধিতা:

ভারতের বিভিন্ন জাতি ও দেশীয় রাজারা বিদ্রোহের বিরোধিতা করে ব্রিটিশদের সমর্থন করেছিল। হায়দ্রাবাদের নিজাম, কাশ্মীরের মহারাজা, সিন্ধিয়া, পাতালিয়াগুর্খা বীর স্যার জঙ্গবাহাদুর প্রভৃতি দেশীয় রাজা ও অসংখ্য ছোটো-বড়ো জমিদার বিদ্রোহ দমনে ব্রিটিশকে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করেছিল ও পুরষ্কার লাভ করেছিল।

পড়ুন:- সিপাহী বিদ্রোহের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য।

৭) সঠিক পদ্ধতির অভাব:

মহাবিদ্রোহের সাফল্যের জন্য যে রণকৌশল গ্রহণ করা দরকার ছিল তা অনেক ক্ষেত্রেই নেতৃবর্গের অজানা ছিল। ত্রুটিপূর্ণ রণকৌশল এবং অযোগ্য সামরিক পদ্ধতির জন্য এই বিদ্রোহ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল।

৮) আধুনিক অস্ত্রসস্তের অভাব:

ঐতিহাসিক প্রমোদ সেনগুপ্ত মনে করেন, ইংরেজরা মেশিন গান ব্যবহার করে। কিন্তু ভারতীয়দের কাছে ছিল ঢাল, তলোয়ার ইত্যাদি।

৯) যোগাযোগের অভাব:

ভারতীয়দের মধ্যে যোগাযোগের তেমন ব্যবস্থা না থাকলেও ব্রিটিশদের মধ্যে টেলিগ্রাফ, টেলিফোন, রেলব্যবস্থা ছিল।



১০) নিয়মানুবর্তিতার অভাব:

শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে জয়লাভের জন্য যে নিয়মানুবর্তিতার প্রয়জন সেটা ভারতীয়দের মধ্যে ছিল না।

১১) মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সমর্থনের অভাব:

পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিশেষত বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সভ্য মানুষরা এই বিদ্রোহকে গুরত্ব দেননি।

১২) সুযোগ্য নেতৃত্বের অভাব:

হ্যাভলফ, আউট্রাম, লরেন্স প্রমুখ রণনিপুণ সেনাপতিদের কাছে নানাসাহেব, তাতিয়া তোপি, লক্ষীবাই কিংবা ভারতীয় সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব নিতান্তই দুর্বল ছিল।

১৩) বিশ্বাসঘাতকতা:

ভারতীয়দের মধ্যে সাহসী শিখ, গোর্খারাজপুত সিপাহীরা ব্রিটিশদের সাহায্য করেছিল।

মন্তব্য (Comment):

ড: রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন সাধারণ লক্ষ্য না থাকার ব্যর্থতা অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। (The most important Cause among this was the lack of general plan...what we found is number of isolated outbreaks.)
Advertisement advertise here