কৃষক বিদ্রোহের কারণ - Cause of Peasant Movement

- January 21, 2019
কৃষক ও উপজাতি বিদ্রোহের কারণগুলি এক হলেও বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে কিছু পার্থক্য আছে। ইংরাজ শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে কোম্পানী সরকার তাদের অধিকৃত অঞ্চলে নতুন ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা প্রবর্তন করে। এই ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা প্রবর্তনের সময় কেবলমাত্র কোম্পানীর স্বার্থের কথা মাথায় রাখা হয়। তার ফলাফল ভারতীয় কৃষকদের ওপর কি হতে পারে এ সম্পর্কে বণিক কোম্পানীর বিশেষ মাথাব্যথা ছিল না। এই ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার আসল ঝোঁক ছিল জমি থেকে যতদূর সম্ভব কোম্পানির আয় বদ্ধি করা। এর ফলে ভূমি রাজস্ব অসাধারণভাবে বৃদ্ধি করা হয় এবং কৃষককে তার চাপ বহন করতে হয়। ১৭৬৫-১৭৬৬ খ্রীঃ কোম্পানী বাংলা থেকে রাজস্ব পেত কৃষকের ১, ৬০, ২১, ০১১ টাকা। ১৭৯৩ খ্রীঃ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু হলে তা দাড়ায় ১৭৯৩-১৭৯৪ খ্রীঃ ৩, ১৭, ৭০, ২৮০ টাকায়। এর থেকে বোঝা যায় যে, কি পরিমাণ রাজস্ব বৃদ্ধি করা হয়।
কৃষক মাঠে ধান কাটছে
তারপর ছিল সেস বা উপকর কোম্পানীর আশ্রিত জমিদাররা এর থেকে বহু গুণ বেশী কর হাতেকলমে আদায় করত। মধ্যস্বত্বভোগীরা জমিদারের কাছ থেকে বন্দোবস্ত নিয়ে আরও বেশী হারে চাষীর পিঠে করের বােঝা চাপাত। চাষীর জমিতে স্বত্ব না থাকায় উচ্ছেদের ভয়ে তাকে এই শােষণের শিকার হতে হয়। এজন্য মাঝে মাঝে কৃষক বিদ্রোহ দেখা দেয়। শুধুমাত্র জমিদারী বা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অঞ্চলে এই শােষণ ছিল না। রায়তওয়ারা অঞ্চলেও ব্যাপক করবৃদ্ধির জন্যে কৃষকের অসন্তোষ দেখা দেয়।

কোম্পানীর শাসন প্রবর্তিত হলে ভূমি রাজস্ব ফসলের ভাগের পরিবর্তে মুদ্রায় আদায় করার নিয়ম চালু করা হয়। অষ্টাদশ শতকে মুদ্রা সঙ্কটের জন্যে মুদ্রা সহজলভ্য ছিল না। কৃষকদের পক্ষে মুদ্রায় রাজস্ব প্রদান ছিল কষ্টসাধ্য। এই মুদ্রা যােগাড়ের জন্যে কৃষককে তার ক্ষেতের ফসল কম দামে মহাজনের কাছ বিক্রি করতে হত। উপজাতি বিশেষতঃ সাঁওতাল কৃষকদের ক্ষেত্রে এই মুদ্রা অর্থনীতির ফল ছিল ভয়াবহ। মােট কথা, কোম্পানীর আমলে নতুন ভূমি রাজস্ব ও মুদ্রা অর্থনীতি গ্রাম সমাজকে ভেঙে দিতে থাকে। এজন্য কৃষকের দুরবস্থার সীমা ছিল না।

কোম্পানীর আমলে ভূমি রাজস্ব আদায়ের নতুন নিয়ম চালু হয়। আগে সমস্ত গ্রাম সমাজ থেকে ভূমি রাজস্ব আদায় করা হত। এখন প্রতি রায়তকে ব্যক্তিগতভাবে রাজস্ব আদায় দিতে বাধ্য করা হয়। রাজস্ব আদায় দিতে না পারলে কৃষককে উচ্ছেদ করার ব্যবস্থা হয়। কোম্পানী চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করে জমিদারকেই জমির মালিকানা দেন। রায়তকে জমির মালিকানা না দেওয়ায় রায়ত কার্যতঃ জমিদারের ভূমিদাসে পরিণত হয়। জমিদার রায়তকে উচ্ছেদ করে চড়া হারে নতুন প্রজাকে জমি বন্দোবস্ত দিয়ে ইচ্ছামত মুনাফা বাড়ায়। কোম্পানী হপ্তাম আইন দ্বারা রাজস্ব আদায়ের জন্যে রায়তের অস্থাবর সম্পত্তি বা ঘটি বাটি দখল করার অধিকার জমিদারকে দিলে, জমিদাররা এই ক্ষমতার অপব্যবহার করে রায়তের জীবন অতিষ্ঠ করে।

জমিদাররা রায়তের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের ঝঞ্ঝাট এড়াতে অধীনস্থ জমিদারদের জমি বন্দোবস্ত দিয়ে দেয়। এদের বলা হত পত্তনীদার। অধীনস্থ জমিদাররা আবার তাদের জমিদারী স্বত্বকে অধীনস্থ ক্ষুদ্র জমিদারদের কাছে বন্দোবস্ত দেয়। এদের নাম ছিল দর পত্তনীদার। এর নীচে আরও ক্ষুদ্র জমি মালিক ছিল দর-দর-পত্তনীদার এবং তার নীচে জোতদার। সবার নীচে কৃষক। এই মধ্যস্বত্বভােগী শ্রেণী প্রত্যেক স্তরে অধনস্থ জমি গ্রহীতার ওপর খাজনার পরিমাণ বৃদ্ধি করত। শেষ পর্যন্ত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত সমস্ত খাজনার বােঝা চাপাত হতভাগ্য রায়তের ওপর। যেহেতু রায়তের জমিতে কোন মালিকানা স্বত্ব ছিল না সেহেতু উচ্ছেদের ভয়ে রায়তকে এই বিরাট শােষণের বােঝা বইতে হত। মাঝে মাঝে পরিত্রাণের জন্যে কৃষক বিদ্রোহ ঘটত। জমিদারী ও মধ্যস্বত্বভােগী ব্যবস্থা ছিল কোম্পানীর ভূমি রাজস্ব নীতির দুর্ভাগ্যজনক কুফল।

কোম্পানীর শাসনের গােড়ার দিকে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় রেজা খা ও সিতাৰ রায় প্রভৃতি নবাব নাজিমদের ওপর। এঁরা ছিলেন ভয়ানক অত্যাচারী। এঁরা কেবলমাত্র রায়তের কাছ থেকে বর্ধিত রাজস্ব আদায় করে সন্তুষ্ট ছিলেন না। এদের অধীনস্থ জমিদাররাও ইচ্ছামত শােষণ চালায়। নবাৰ নাজিমদের আমলে ভূমি রাজস্ব অকস্মাৎ ১ কোটি ২৩ লক্ষ টাকা থেকে ২ কোটি ২০ লক্ষ টাকায় পৌছে যায়। এই সঙ্গে ফসল কাটার সময় অভাবী কৃষকদের কাছ থেকে সস্তা দরে ধান ও চাল ক্রয় করে খরা ও বন্যার সময় বেশি দামে বিক্রি করত। বাংলা ১১৭৬ সালে ইংরেজি ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, জনস্মৃতিতে যাকে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বলা হয় তা ছিল কোম্পানির ও রেজা খার এই শস্য ক্রয় নীতির ফল।

Advertisement
এর সঙ্গে যুক্ত হয় মহাজন শ্রেণীর শােষণ। জমিদার শ্রেণী ছিল ইংরাজের শােষণের বর্শামুখ। বর্শা ফলককে যেমন পিছন থেকে এক দণ্ড দ্বারা চালিত করা হয়, তেমনই জমিদারদের সামনে রেখে পিছন থেকে কোম্পানী সরকার তাদের চালনা করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মহাজন শ্রেণী। কৃষক তার খাজনার টাকা যােগাড়ের জন্যে মহাজনের কাছে জমি ও বাড়ী বন্ধক রেখে চড়া সুদে টাকা ধার করতে বাধ্য হত। এই টাকা নায্য সুদে আদায় না করে চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ আদায় করা হত। মহাজনের টাকা মেটাতে অপারগ হওয়ায় কৃষকেরা মহাজনের হস্তগত হয়। সরকারের আইনগুলি প্রধানতঃ জমিদার ও মহাজনের স্বার্থ রক্ষার সহায়ক ছিল। তাছাড়া মামলা মােকদ্দমার খরচা এত বেশী এবং আইন এত জটিল ও আদালতে মামলা এত বিলম্বিত ছিল যে, দরিদ্র কৃষকের পক্ষে কোন অন্যায়ের প্রতিকার করা সম্ভব ছিল না।

অনেক ক্ষেত্রে ধর্মের প্রভাবে কৃষকরা সংঘবদ্ধ হয়ে উঠত। যেমন ওয়াহাবি আন্দোলন ও ফরাজী আন্দোলন এবং সাঁওতাল বিদ্রোহে দেখা গিয়েছিল। তাছাড়া ধর্মবিশ্বাসের ওপর আঘাত পড়ায় অর্থনৈতিক কারণে অসন্তষ্ট কৃষকরা কোন কোন ক্ষেত্রে বিদ্রোহী হয়। ধর্মীয় নেতার তথাকথিত অলৌকিক ক্ষমতা তাকে অবতারের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে। ধর্মীয় নেতার এই অলৌকিক শক্তি তাদের শােষণ থেকে মুক্ত করবে এই বিশ্বাস নিয়ে কৃষকরা বিদ্রোহে ঝাপিয়ে পড়ে।

এছাড়া কোম্পানীর বাণিজ্য ও শিল্পনীতি গ্রামীণ সমাজের সংহতি ধ্বংস করে দেয়। শিল্প বিপ্লবের আগে ভারতের কুটির শিল্পজাত দ্রব্য ও কৃষিপণ্য কোম্পানী এবং ইংরেজ বণিকরা নামমাত্র দামে কিনে নিয়ে ইওরােপের বাজারে বিক্রী করে বিরাট মুনাফা লুঠত। ইংরাজের রাজনৈতিক আধিপত্যের সুযােগ নিয়ে ইংরাজ বণিকরা প্রাথমিক উৎপাদক ও কৃষকদের অর্ধমূল্যে অথবা সিকি মূল্য এবং কোম্পানির কর্মচারীদের টাকা পিছু কমিশন নিয়ে জিনিস বিক্রতে বাধ্য করত। শিল্পবিপ্লবের ফলে শোষণ আরও তীব্র হয়। ইংলন্ড থেকে ব্যাপক হারে কারখানায় তৈরি কাপড় ও অন্যান্য মাল ভারতের বাজারে স্থপীকৃত করা হয়। সস্তা দরের বিলাতী মালের সঙ্গে প্রতিযােগিতায় কারিগর শ্রেণী হস্তশিল্পের দ্রব্য বিক্রি করতে না পেরে শিল্পকে জবিকা হিসেবে ত্যাগ করে। এই সকল বেকার কারিগর যথা জোলা, তাতি শ্রেণী কৃষিকেই জবিকা হিসেবে বেছে নেয়। এর ফলে জমিতে ভীড় বাড়ে। কৃষকের দারিদ্র্য বৃদ্ধি পায়।
Advertisement