বাংলার কৃষক ও আদিবাসী বিদ্রোহ

- January 22, 2019
ঔপনিবেশিক শাসন যেহেতু সর্বপ্রথম বাংলায় কায়েম হয়েছিল এবং বাংলা থেকেই ভারতের অন্যত্র প্রসারিত হয়েছিল তাই স্বভাবতই এই বিদেশি শাসকদের বিরুদ্ধে আঠারাে শতকের শেষ ও সমগ্র উনিশ শতক ধরে বাংলাদেশের নানা স্থানে একাধিক সশস্ত্র গণপ্রতিরােধ-অভ্যুত্থান-কৃষক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল। এইসব প্রতিরােধ সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিল ঔপনিবেশিক শােষণ লুণ্ঠনের প্রাথমিক শিকার সমাজের প্রান্তবাসী, নীচুতলার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণ, কৃষক-ক্ষেতমজুর, কারিগর। বিপরীত দিকে আবার কখনও কখনও প্রতিপত্তিহীন ভূসম্পত্তি হারানাে জমিদাররাও সমাজের নিম্নবর্গের এই সব প্রতিরােধ অভ্যুত্থানে সামিল হয়েছিল। ব্রিটিশ শাসনাধীনে ভূমি রাজস্বের উত্তরোত্তর বৃদ্ধি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত-এর সূত্র ধরে জমিদার-মহাজনদের নজিরবিহীন শােষণ ও অত্যাচার, জমি থেকে উচ্ছেদ ও বিদেশি শাসক ও বণিক সম্প্রদায়ের স্বার্থে দেশীয় কুটিরশিল্পের ধংসসাধন প্রভৃতি বাংলার গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষদের প্রতিরােধ-সংগ্রামকে অনিবার্য করে তুলেছিল। ১৮৫৭-র মহাবিদেহের অনেক আগে থেকেই এই ধরনের প্রতিরােধ অভ্যুত্থান ও কৃষক-আদিবাসী-জনজাতিদের সশস্ত্র বিদ্রোহ বাংলার রাজনৈতিক তথা সামাজিক জীবনকে আলােড়িত করেছিল। ১৭৬৫ থেকে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ অবধি কোম্পানির শাসনাধীন বাংলায় তথা ভারতে সংঘটিত এই ধরনের সশস্ত্র অভ্যুত্থান ও কৃষক বিদ্রোহগুলি নিয়ে শশীভূষণ চৌধুরী একদা অমূল্য গবেষণা করেছিলেন। ক্যাথলিন গাফ ও এই স্বতঃস্ফূর্ত অভূত্থানগুলির প্রকৃতি নিয়ে সারগর্ভ আলােচনা করেছেন। নিম্নবর্গের ইতিহাস চর্চার পথিকৃৎ রণজিৎ গুহ আলােচ্য পর্বের বিদ্রোহগুলিতে বৈপ্লবিক কৃষক মানসিকতার প্রতিফলন নিয়ে বিশদ গবেষণা করেছেন।
Bengal Peasant and Tribe Revolt
বাংলার কৃষক প্রতিরোধ সংগ্রামের বৈশিষ্ট্য: বাংলার কৃষক কারিগরসহ নিম্নবর্গের মানুষরা একসময় ঔপনিবেশিক শাসন-শােষণ অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মরণপণ সংগ্রামে সামিল হয়েছিল। তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছিল প্রধানত তাদের আর্থিক দুর্দশার জন্য প্রাথমিকভাবে দায়ী ঔপনিবেশিক প্রশাসন ও তার দেশীয় সহযােগী অত্যাচারী জমিদার-নায়েব, মহাজনশ্রেণী। এই পর্বে অসামরিক গণপ্রতিরােধ ও কৃষক-অভ্যুত্থানগুলির মধ্যে গবেষকরা কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য খুজে পেয়েছেন। প্রথমত, প্রাক্ মহাবিদ্রোহ পর্বের গণ প্রতিরােধ ও অভ্যুত্থানগুলি চরিত্রগতভাবে সর্বাত্মক ছিল না, সেগুলি ছিল স্থানীয় প্রকৃতির এবং সাধারণত কৃষি অধ্যুষিত গ্রামাঞ্চলই ছিল তাদের উৎসস্থল। দ্বিতীয়ত, কয়েকটি ক্ষেত্রে সেগুলি ধর্মকে আশ্রয় করে সূচিত হলেও মােটের ওপর ঐ পর্বের কৃষক বিদ্রোহগুলি ধর্ম-বর্ণ-জাতপাত-সম্প্রদায়ের সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে সক্ষম হয়েছিল। এককথায়, নীচতলার সব শ্রেণীর শােষিত মানুষই ঐসব প্রতিরােধের লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করেছিল। তৃতীয়ত, প্রতিরােধকারীরা প্রাথমিকভাবে তাদের দুর্দশার জন্য প্রত্যক্ষভাবে দায়ী অত্যাচারী জমিদার, সুদখাের, মহাজন ইত্যাদিদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নিলেও ক্রমে তাদের আক্রমণের অভিমুখ ঘুরে বিদেশি শাসকদের দিকে। কালক্রমে তাদের লড়াইয়ের মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটানাে। যাইহােক, বাংলার অত্যাচারিত ও শােষিত মানুষদের প্রতিবােধ লড়াইয়ের একটি সংক্ষিপ্ত রেখাচিত্র নীচে বিবৃত হল।

সন্ন্যাসী ফকির বিদ্রোহ: ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে পূর্ব ও উত্তরবঙ্গের সন্ন্যাসী, ফকির ও কৃষিজীবীরা প্রথম প্রতিরােধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। ১৭৬৩ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত চলা এই সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহের মূল কারণ ছিল কোম্পানির পরিবর্তিত শােষণমূলক নীতি পদ্ধতি ও কোম্পানির দেশীয় ইজারাদারদের জুলুম ও অত্যাচার। বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিলেন ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরাণী, ফকির মজনু শাহ, চিরাগ আলি, মুসা শাহ প্রমুখ। বিদ্রোহের প্রসার ঘটেছিল মালদা, দিনাজপুর, কুচবিহার সহ অধুনা বাংলাদেশের রংপুর, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর প্রভৃতি অঞ্চলে। ফকিররা অধিকাংশই ছিল কৃষিজীবী। কোম্পানির ভূমিরাজস্ব আদায় পদ্ধতি ও ইজারাদারদের অত্যাচার তাদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছিল। এরা অনেকেই রেশম ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং কোম্পানির কর্মচারীর তাদের কাছ থেকে কাচামাল হিসেবে রেশম জোরপূর্বক আদায় করত। এছাড়া তীৰ্থকর আরােপণ ও পীরস্থানে যাওয়ার ক্ষেত্রে নানারূপ বাধানিষেধ সন্ন্যাসী ও ফকিরদের রুষ্ট করেছিল।

এক সময় অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তারা হাতে অস্ত্র তুলে নেয়। তাদের বিদ্রোহে এলাকার দারিদ্র্যপীড়িত কৃষকরাও সক্রিয় সমর্থন জানিয়েছিল। সশস্ত্র প্রতিরােধ বাহিনী গঠন করে বিদ্রোহীরা কোম্পানির কুঠি, নীলকুঠি, রাজস্ব দপ্তর ও বাণিজ্য চৌকি, জমিদারদের বাড়ি আক্রমণ করেছিল। এই বিদ্রোহের প্রধান নেতা ফকির মজনু শাহ কোম্পানির ফৌজের সঙ্গে লড়াইয়ে বগুড়াতে আহত হন ও পরে বিহারে আত্মগােপনকালে মারা যান। বঙ্কিমচন্দ্র তার আনন্দমঠ ও দেবী চৌধুরাণী উপন্যাসে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের একটি রূপরেখা অঙ্কন করে গেছেন। প্রকৃতিতে এই বিদ্রোহ ধর্মীয় পুনরুত্থানবাদী উদ্যোগ অপেক্ষা বহুলাংশে গণপ্রতিরােধ ছিল।

চুয়াড় বিদ্রোহ: ১৭৬৭-৯৯ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার বাঁকড়া, মেদিনীপুর ও ধানভূম অঞ্চলে চুয়াড় বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল। চুয়াড়রা স্থানীয় ভূস্বামীদের অধীনে পাইক-বরকন্দাজের কাজ করত এবং তার পরিবর্তে নিষ্কর জমি ভােগ করত। কোম্পানি প্রবর্তিত নতুন ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা এইসব নিম্নবর্গের মানুষদের রেহাই দেয়নি। একসময় তারা নিরুপায় হয়ে কোম্পানি রাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। ১৭৬৭-১৭৬৯, ১৭৮৩-১৭৮৪ এবং ১৭৯৮-১৭৯৯ সালে তিনটি পর্যায়ে এই প্রতিরােধ সংঘটিত হয়েছিল। কোম্পানির রাজস্বনীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জমিদাররাও অনেকে এই বিদ্রোহে সামিল হয়। বাঁকুড়ার রাইপুর অঞ্চলের জমিদার দুর্জন সিংহ এই চুয়াড় বিদ্রোহের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। বলা বাহুল্য, কোম্পানির প্রশাসন নির্দয়ভাবে শেষ অবধি এই বিদ্রোহ দমন করেছিল।

রংপুর বিদ্রোহ: ১৭৮৩ সালে রংপুর অঞ্চলের কৃষকরা হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে কোম্পানির রাজস্ব ইজারাদার দেবী সিংহের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভুথান ঘটিয়েছিল। রংপুর কৃষক বিদ্রোহ ঝড়ের বেগে দিনাজপুর ও কুচবিহারে ছড়িয়ে পড়েছিল। হাজার হাজার সশস্ত্র কৃষক দেবীসিংহের প্রাসাদ আক্রমণ করে ধ্বংসাবশেষে পরিণত করেছিল। স্থানীয় জমিদাররা অনেকেই সেদিন বিদ্রোহীদের হাতে প্রাণ হারান। রংপুরের কালেক্টর গুডল্যাড বেশ কয়েক কোম্পানি সেনা নিয়ে বিদ্রোহী চাষীদের মােকাবিলায় অবতীর্ণ হলে এই অভ্যুত্থান সাম্রাজ্যবাদবিরােধী লড়াইয়ে পরিণত হল। এই বিদ্রোহের প্রাথমিক পর্বে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন নুরুলউদ্দিন যিনি খাজনা বন্ধের ডাক দিয়েছিলেন। পরবর্তী পর্যায়ে বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিলেন 'নবাব' উপাধিধারী দির্জেনারায়ণ। গােরা সেনারা পাশবিকতার সঙ্গে এই বিদ্রোহ দমন করেছিল যদিও কোম্পানির প্রশাসন দেবীসিংহকেও ইজারাদারের পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। খাজনা বন্ধ আন্দোলনের ডাক বাংলার অন্যত্র কৃষককুলকেও প্রভাবিত করেছিল। ১৭৮৬ সালে বীরভূমের কৃষকরাও খাজনাবন্ধ আন্দোলন শুরু করেছিল।

পাগলপন্থীদের আন্দোলন: উনবিংশ শতাব্দীর বাংলায় প্রথম উল্লেখযােগ্য কৃষক বিদ্রোহটি ছিল ১৮২৪-১৮৩৩ সালে ময়মনসিংহের শেরপুর অঞ্চলের পাগলপন্থী আন্দোলন। ঐ এলাকার হতদরিদ্র কৃষকরা ফকির করম শাহ-এর প্রভাবে পাগলপন্থী ধর্মধারার অনুগামী ছিল। ইংরেজ প্রশাসনের ভুমিরাজস্ব বৃদ্ধি ও নানা ধরনের অত্যাচারে বিপর্যস্ত হয়ে পাগলপন্থী কৃষকরা একসময় সশস্ত্র বিদ্রোহ সংগঠিত করেছিল। পাগলপন্থী গারাে বিদ্রোহীদের নেতৃত্বদাতা ছিলেন পূর্বোক্ত করম শাহ-এর পুত্র টিপু শাহ। গবেষকদের মতে পাগলপন্থীরা একটি ভিন্ন ধর্মীয় গােষ্ঠীরূপে পরিচিত হলেও তাদের আন্দোলনে ধর্মের ভূমিকা মুখ্য ছিল না, শােষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে কৃষকদের প্রতিবাদী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটেছিল এই আন্দোলনে। ঐতিহাসিক বিনয় ভূষণ চৌধুরী পূর্ববঙ্গের পাগলপন্থীদের আন্দোলনের দুটি পর্যায়ের উল্লেখ করেছেন। প্রথমটি ছিল জমিদারি শােষণ ও অপশাসনের বিরুদ্ধে এবং দ্বিতীয়টি ছিল জমিদার ও কোম্পানির প্রশাসনের সম্মিলিত শক্তি জোটের বিরুদ্ধে। তিনি এই আন্দোলনকে একটি স্বতঃফুর্ত গণঅভ্যুত্থান বলে অভিহিত করেছেন। ইংরেজ সরকার কড়া হাতে এই আন্দোলন স্তব্ধ করে দিয়েছিল।

ওয়াহাবি আন্দোলন: আঠারাে শতকের ধর্মপ্রাণ মুসলমান আব্দুল ওয়াহাব এর নেতৃত্বে আরব দুনিয়ার ইসলামের শুদ্ধিকরণের লক্ষ্যে ওয়াহাবি আন্দোলনের সূচনা হলেও পরবর্তী সময়ে তা ভারতে বিশেষ করে বাংলায় প্রসারিত হয়েছিল এবং সশন্ত্র বিদ্রোহে রুপান্তরিত হয়েছিল। ১৮২১ সালে তিনি কলকাতায় আসেন। বারাসাত অঞ্চলে মীর নিসার আলি বা তিতুমীর ওয়াহাবি ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশে ওয়াহাবি আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৮৩১ সাল নাগাদ বারাসাত অঞ্চলে ওয়াহাবি আন্দোলনে পুরোদমে শুরু হয়েছিল। বিদ্রোহী ওয়াহাবিরা পুড়া, লাওঘাট্টি, রামচন্দ্রপুর প্রভূতি গ্রাম আক্রমণ করে, বাজার হাট লুটপাট চালাতে থাকে। প্রাথমিক পর্বে তিতুমিরের বাহিনী ব্রিটিশ বাহিনীকে প্রতিহত করেছিল। তিতুমিরের নেতৃত্বে ওয়াহাবি বিদ্রোহ ক্রমে দক্ষিণবঙ্গের একটা বড় অংশে অত্যাচারী হিন্দু জমিদার ও নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে শােষিত কৃষক শ্রেণীর আন্দোলন থেকে কালক্রমে সাম্রাজ্যবাদ ঔপনিবেশিক শাসনবিরােধী বৃহত্তর মুক্তি সংগ্রামে রূপান্তরিত হয়েছিল। তিতুমির তার গ্রাম নারকেলবেড়িয়ায় একটি বাঁশের কেল্লা তৈরি করেন এবং বাদশাহ উপাধি গ্রহণ করেন। ১৮৩১ এর ১০ নভেম্বর ব্রিটিশ বাহিনী কামান নিয়ে নারকেলবেড়িয়া আক্রমণ করে। স্বভাবতই কামানের গােলাবর্ষণের সামনে বাঁশের কেল্লা ও তিতুর বাহিনী দীর্ঘক্ষণ লড়াই চালাতে পারেনি। যুদ্ধক্ষেত্রেই তিতুমির বীরের মৃত্যুবরণ করেন ও তার আটশাে অনুগামী ওয়াহাবি যােদ্ধাকে বন্দী করে ইংরেজরা নিয়ে যায়। পরে তাদের ফাঁসি অথবা দ্বীপান্তর হয়। চরম নিষ্ঠুরতার সঙ্গে ঔপনিবেশিক সরকার নিম্নবর্গীয় মানুষদের এই গণঅভুথানকে দমন করেছিল।

ফরায়েজী আন্দোলন: ফরায়েজী বিদ্রোহের বিস্তার ঘটেছিল পূর্ববঙ্গের ঢাকা, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, বাখরগঞ্জ প্রভৃতি অঞ্চলগুলিতে। এই ধর্মাশ্রয়ী কৃষক অত্যুত্থানের নেতৃত্ব ছিলেন ফরিদপুরের হাজি শরিয়তুল্লা ও তার পুত্র মহম্মদ মহসিন ওরফে দুদুমিঞা। হাজি শরিয়তুল্লা ইসলাম ধর্মের সংস্কার সাধনের পাশাপাশি বাংলার দরিদ্র মুসলমান চাষীদের পক্ষ নিয়ে অত্যাচারী হিন্দু জমিদার ও নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে প্রতিরােধ গড়ে তুলতে উদ্যোগী হন। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র মহম্মদ মহসিন বা দুদুমিঞা সেই প্রতিরােধ আন্দোলনের নেতৃত্বে আসেন। এই সময় ফরাজি বিদ্রোহ তার ধর্মীয় চরিত্রের উর্ধ্বে উঠে ক্রমশ নিপীড়িত কৃষক শ্রেণীর অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সংগ্রামে রূপান্তরিত হয়েছিল। ১৮৩৮ সালে দুদুমিঞা তার অনুগামী কৃষকদের জমিদারি খাজনা দিতে ও নীল চাষ করতে নিষেধ করেন। ১৮৪৮ সালে দুদুমিঞা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে ও বিচারে তার আর্থিক জরিমানা সহ কারাদণ্ড হয়। ১৮৬০ মতাম্বরে ১৮৬২ সালে ঢাকায় দুদুমিঞা মারা যান। দুদুমিঞার মৃত্যুর পরেও বিক্ষিপ্তভাবে ফরাজি বিদ্রোহ চলেছিল। কার্যত, দুদুমিঞা পরবর্তী দুর্বল নেতা সংগঠকের অভাবে একসময় ফরায়েজী আন্দোলন স্থিমিত হয়ে পড়ে।

নীল বিদ্রোহ: জমিতে নীল বােনাকে কেন্দ্র করে অবিভক্ত বাংলার নদীয়া, যশােহর, চব্বিশ পরগণা, দিনাজপুর, মালদা, বর্ধমান, মেদিনীপুর, হাওড়া প্রতি জেলায় কৃষকদের ওপর ইউরােপীয় নীলকরদের ক্রমবর্ধমান চাপ ও অত্যাচারকে কেন্দ্র করে ১৮৫৯-১৮৬০ সালে নীল বিদ্রোহ সংগঠিত হয়েছিল। বাংলার কৃষকদের মূল প্রতিপক্ষ ছিল নীলকুঠির সাহেবরা অর্থাৎ ইন্ডিগাে প্ল্যান্টাররা। এই আন্দোলনের ক্ষেত্রে বাংলার কৃষককুল যে মানসিক দৃঢ়তা ও চেতনার প্রমাণ দিয়েছিল তা অভূতপর্ব। দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ নাটকে (১৮৬০) নীলকর সাহেবদের নৈরাজ্যের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র অঙ্কিত রয়েছে। নীল বিদ্রোহে নেতৃত্বে দিয়েছিলেন যশােহর জেলার চৌগাছার দুই ভাই বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস ও দিগম্বর বিশ্বাস, নড়াইলের জমিদারের নায়েব মহেশচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়, মালদহের ওয়াহাবি সংগঠক রফিক মণ্ডল, খুলনার রহিমুল্লা প্রমুখ প্রতিবাদী কৃষকদের প্রতিরােধ সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। শেষ অবধি ১৮৬১ সালে নীল কমিশন গঠন করে সরকার এই সংগঠিত কৃষক বিদ্রোহের রাশ টেনে দেন।

পাবনা বিদ্রোহ: ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দের পাবনার কৃষক বিদ্রোহের প্রধান কারণ ছিল যথেচ্ছভাৰে জমির খাজনাবৃদ্ধি। এই বিদ্রোহ ছিল জমিদারদের বিরুদ্ধে সম্পন্ন কৃষক ও জোতদার শ্রেণীর বিদ্রোহ। ১৮৫৯ সালের দশম আইনকে অগ্রাহ্য করে পাবনার জমিদার স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে বর্ধিত হারে কর আদায় করতাে। জমিদারদের অনুসৃত নতুন জমি জরিপ পদ্ধতিও কৃষকদের ক্ষোভ বাড়িয়েছিল। ১৮৭৩ সালে পাবনার কৃষকরা জমিদারি খাজনা দেওয়া বন্ধ করে দিয়ে আদালতের আশ্রয় নিয়ে লড়াই চালাতে মনস্থির করে। তাদের উদ্যোগে গঠিত কৃষিজীবী সমিতি প্রতিষ্ঠার এক বছরের মধ্যেই সমগ্র পাবনা জেলা জুড়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল। পাবনা বিদ্রোহের নেতা ও সংগঠকদের মধ্যে উল্লেখযােগ্য ছিলেন দৌলতপুরের জোতদার ও ব্যবসাদার ঈশানচন্দ্র রায়, মেঘুল্লা গ্রামের প্রধান সম্ভুনাথ পাল, জোতদার খুদিমােল্লা প্রমুখ। বিদ্রোহী কৃষকরা তাদের নিজস্ব লেঠেল বাহিনী গঠন করেছিল। ব্রিটিশ ইন্ডিয়া অ্যাসােসিয়েশন এর মতো জমিদারদের প্রাধানাপূর্ণ সংগঠন এই বিদ্রোহে জমিদারদের পাশে দাঁড়ায়। হিন্দু প্রেট্রিয়ট ও অমৃতবাজার পত্রিকা-র মতাে কাগজে পাবনার কৃষক বিদ্রোহকে নৈরাজ্যের নামান্তর বলে চিহ্নিত করা হয়। মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের একাংশে অবশ্য বিদ্রোহ কৃষকদের পাশেই ছিল। এই বিদ্রোহ থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকার প্রজার স্বার্থ বজায় রাখতে ১৮৮৫ সালে প্রজাস্বত্ব আইন পাশ করে।

পাইক বিদ্রোহ: বিভিন্ন জমিদারের জমিদারী এলাকায় যে সকল কর্মচারী শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা করতেন তারা পাইক নামে পরিচিত। এই কাজের জন্যে অনেক সময় তারা নগদ বেতনের পরিবর্তে বিনা খাজনায় জমি পেতেন। একে বলা হত পাইকান। কোম্পানির আমলে বিভিন্ন জমিদারের জমিদারী বাজেয়েপ্ত হওয়ায় সেই সকল পাইকরা জমি থেকে বঞ্চিত হয়। ১৮১৭ সালে ওড়িশ্যার খুরদা রাজের কর্মচুত সেনাপতি বিদ্যাধর মহাপাত্রের নেতৃত্বে পাইকরা ইংরেজ প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। চরম অত্যাচারের মাধ্যমে সরকার এই বিদ্রোহ দমন করে।

সন্দ্বীপের কৃষক বিদ্রোহ: সন্দীপ ছিল নোয়াখালী জেলার অন্তর্গত। বঙ্গোপসাগরের কয়েকটি দ্বীপের সমষ্টিকে সন্দীপ বলা হয়। সন্দ্বীপের বেশির ভাগ অধিবাসী ছিল মুসলমান। গভর্নর ভেরেলেস্ট সাহেব বেনিয়ান গোকুল গোষালকে খাজনা আদায়ের দায়িত্ত্ব দিলে, তিনি অত্যাচার করে বেশি খাজনা আদায় করতে থাকে। ফলে সন্দ্বীপের জনগণ ও জমিদাররা ১৭৬৯ সালে আবু তোরাপের নেতৃত্বে বিদ্রোহ করে। শেষ পর্যন্ত সরকার সন্দ্বীপের কৃষক বিদ্রোহ দমন করে।

সাঁওতাল বিদ্রোহ: বাংলার সাঁওতাল বিদ্রোহ দুটি পর্বে বিভক্ত ছিল - (১) ১৮৫৫-১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ ও (২) ১৮৭১-১৮৮২ সালের খেরওয়ার আন্দোলন। সাঁওতাল বিদ্রোহ হিল উনবিংশ শতাব্দীতে উপজাতীয় সমাজিক সংহতির বিরুদ্ধে বহিরাগতদের হস্তক্ষেপ ও অর্থনৈতিক শােষণ পীড়নের প্রতিবাদে সংগ্রামী চেতনার বহিঃপ্রকাশ। সাঁওতালরা নিজেদের সময় ও শ্রম দিয়ে সাঁওতাল পরগনা (দামিন-ই-কোহ) অঞ্চলকে বাসযােগ ও উর্বর করে তুললে ক্রমে দিকু অর্থাৎ বহিরাগত হিন্দু জমিদার ও মহাজনরা নানা অসাধু উপায় অবলম্বন করে তাদের সেইসব জমি খাস করে চলেছিল। উচ্চবর্ণের জমিদার ও মহাজন ব্যবসায়ীদের শােষণ মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে তারা বিদ্রোহ ঘােষণা করেছিল। কোম্পানির নজিরবিহীন ভূমিরাজস্ব বৃদ্ধি তাদের জীবন দুর্বিষহ করেছিল। এরফলে ১৮৫৫ সালের গোড়ায় শুরু হল সশস্ত সাঁওতাল বিদ্রোহ হুল। বিদ্রোহী সাঁওতাল নেতা সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরবের নেতৃত্বে অতঃপর সাঁওতালরা অত্যাচারী জমিদার, ঠিকাদার, মহাজন, নীল কুঠিয়াল ও ইংরেজ পুলিশের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। ১৮৫৬ সালে বিদ্রোহী সাঁওতাল নেতা কানু ধরা পড়েন ও তার ফাঁসি হয়।

দ্বিতীয় পর্বে ১৮৭১-১৮৮২ সাল পর্যন্ত চলা সাঁওতাল বিদ্রোহ খেরওয়ার আন্দোলন নামে পরিচিত ছিল। নজিরবিহীন খাজনা বৃদ্ধি ও সাঁওতাল মােড়লদের (মাঝি) দুঃসহ দারিদ্র্য ও প্রতিপত্তি নাশ এই বিদ্রোহের অন্যতম কারণ ছিল। এই পর্যায়ে বিদ্রোহী সাঁওতালদের সংগঠিত করেছিল ভগীরথ মাঝি, যদু মাঝি প্রমুখ। নেতৃস্থানীয়দের কারারুদ্ধ করে ইংরেজ সরকার এই বিদ্রোহের রাশ টেনেছিল।

বাংলার অন্যান্য কৃষক ও উপজাতি বিদ্রোহ: ১৭৬৭ সালে ত্রিপুরা রাজ্য সমশের গাজী ত্রিপুরা রাজ ও কোম্পানি শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। ১৭৮৪ সালে যশোহর কৃষক বিদ্রোহ, ১৭৯৬ খ্রিস্টাব্দে খুলনা কৃষক বিদ্রোহ, ১৭৮৬-১৭৮৯ সালে বীরভূমে কৃষক বিদ্রোহ, ১৮০৮-১৮১৬ সালে মেদিনীপুরে নায়েক বিদ্রোহ, ১৮১২ সালে ময়মনসিংহে কৃষক বিদ্রোহ। ১৮৫০ সালে ত্রিপুরায় তিপ্রা বিদ্রোহ, ১৮৬৩ সালে জামাতিয়া বিদ্রোহ ও ১৮৪৪-১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে কুকি বিদ্রোহ ছিল অধিবাসী কৃষক বিদ্রোহ।।