বাংলার কৃষক বিদ্রোহ।

author photo
- Tuesday, January 22, 2019
advertise here

বাংলার কৃষক বিদ্রোহ (Bengal Peasant Revolt)।

ইংরেজ কর্মচারীদের অত্যাচার, অবহেলা, শোষণ ও জমিদারদের উৎপীড়ন, মহাজনদের চড়া সুদের হার প্রভুতি কারণে বাংলার কৃষক শ্রেণী ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিদ্রোহের পথ বেছে নেয়। এবং সারা বাংলায় বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠে।

সন্ন্যাসী ফকির বিদ্রোহ:

ভারতের ভ্রাম্যমান বিভিন্ন সন্ন্যাসী ও ফকির সম্প্রদায় বাংলা, বিহারের নানা অংশে স্থায়ীভাবে বসবাস করত। কৃষিকাজের মাধ্যমে তারা জীবিকা নির্বাহ করত। কিন্তু কোম্পানির সৈরচারী নীতি তাদেরকে বিদ্রোহের পথে ঠেলে দেয়। ১৭৬৩ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত মোট ৪০ বছর এই বিদ্রোহ চলে। ঢাকাতে এই বিদ্রোহ শুরু হলেও অচিরেই তা মালদহ, রংপুর, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, কুচবিহার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ভবানী পাঠক, দেবী চৌধরানী, মজনু শাহ, চিরাগ আলী প্রমুখ ছিল এই বিদ্রোহের নেতা। সেনাবাহিনীর সহয়তায় শেষ পর্যন্ত সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ দমন করা হয়।

রংপুর কৃষক বিদ্রোহ:

দিনাজপুরের নাবালক রাজা রাধানাথ সিংহের দেওয়ান দেবী সিংহ রাজস্ব আদায়ের নামে প্রজাদের সর্বস্ব লুট করতেন। এর প্রতিবাদে ১৭৮৩ সালে রংপুরে হিন্দু মুসলিম কৃষকরা নুরুল উদ্দিনের নেতৃত্বে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সরকার এই সমস্ত অঞ্চলে বিশাল সেনা নিয়োগ করে বিদ্রোহ দমনে উদ্যত হয়। নির্মম অত্যাচারের মাধ্যমে রংপুর কৃষক বিদ্রোহ দমন করা হয়।

পাইক বিদ্রোহ:

বিভিন্ন জমিদারের জমিদারী এলাকায় যে সকল কর্মচারী শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা করতেন তারা পাইক নামে পরিচিত। এই কাজের জন্যে অনেক সময় তারা নগদ বেতনের পরিবর্তে বিনা খাজনায় জমি পেতেন। একে বলা হত পাইকান। কোম্পানির আমলে বিভিন্ন জমিদারের জমিদারী বাজেয়েপ্ত হওয়ায় সেই সকল পাইকরা জমি থেকে বঞ্চিত হয়। ১৮১৭ সালে ওড়িশ্যার খুরদা রাজের কর্মচুত সেনাপতি বিদ্যাধর মহাপাত্রের নেতৃত্বে পাইকরা ইংরেজ প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। চরম অত্যাচারের মাধ্যমে সরকার এই বিদ্রোহ দমন করে।


চুয়াড় বিদ্রোহ:

চুয়াড়রা ছিল মেদিনীপুরের জঙ্গলমহল নামক অঞ্চলের অধিবাসী। কৃষি ও পশুপালন ছিল তাদের পেশা। তাদের উপর রাজস্বের বোঝা চাপিয়ে দিলে তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ১৭৬৮ সাল থেকে ১৭৯৯ সাল পর্যন্ত এই বিদ্রোহ চলে। রাজা জগন্নাথ ধল , রানী শিরোমণি, চুনিলাল খান, দুর্জন সিংহ এই বিদ্রোহ সংগঠিত করে। চরম অত্যাচারের মাধ্যমে সরকার চুয়াড বিদ্রোহ দমন করে।

সন্দ্বীপের কৃষক বিদ্রোহ:

সন্দীপ ছিল নোয়াখালী জেলার অন্তর্গত। বঙ্গোপসাগরের কয়েকটি দ্বীপের সমষ্টিকে সন্দীপ বলা হয়। সন্দ্বীপের বেশির ভাগ অধিবাসী ছিল মুসলমান। গভর্নর ভেরেলেস্ট সাহেব বেনিয়ান গোকুল গোষালকে খাজনা আদায়ের দায়িত্ত্ব দিলে, তিনি অত্যাচার করে বেশি খাজনা আদায় করতে থাকে। ফলে ১৭৬৯ সালে আবু তোরাপের নেতৃত্বে বিদ্রোহ করে। শেষ পর্যন্ত সন্দ্বীপের কৃষক বিদ্রোহ দমন করে।

পাগলপন্থী কৃষক বিদ্রোহ:

১৮২৫-১৮২৭ সালে ময়মনসিংহে পাগলপন্থী বিদ্রোহে পাগলপন্থী ধর্মপ্রচারক করম শাহের অনুগামী টিপুগারো সকল মানুষ সমান এই তত্ত্ব প্রচার করে ময়মনসিংহের কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করেন। গারো জাতি প্রায় দুই বছর ধরে কোম্পানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালায়। ১৮২৭ সালে টিপুগারো বন্দী হয়ে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হন। এই বিদ্রোহের অন্যান্য নেত্রীবৃন্দ হল জানকুপাথর ও দোবরাজপাথর।


পাবনা কৃষক বিদ্রোহ:

পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহকুমার ইউসুফশাহী পরগনার হিন্দু ও মুসলমান কৃষকরা জমিদারদের খুশিমতো খাজনা বৃদ্ধি ও দখলী রায়তের অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে ১৮৭৩ সালে একটি বিদ্রোহ সংগঠিত করে। এই আন্দোলন ছিল অসাম্প্রদায়িক ও বহুলাংশে হিংসা মুক্ত। কৃষকরা "আগ্রেরিয়ান লীগ" গড়ে তুলে আইনানুগ পথে জমিদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। এই কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন সম্পন্ন কৃষক ঈশান চন্দ্র রায়, খুদি মোল্লা, শম্ভূনাথ পাল। সরকার এই কৃষক বিদ্রোহ দমন করে।

নীল বিদ্রোহ:

১৮৫৯-১৮৬০ সালে বাংলাদেশের মালদহ, রাজশাহি, যশোর, পাবনা, ফরিদপুর, নদিয়া, বারাসাত প্রভুতি অঞ্চলের নীল চাষকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন হয়। এই বিদ্রোহের নেতা ছিলেন চৌগাছার দিগম্বর বিশ্বাস ও বিষ্ণু চরণ বিশ্বাস, নড়াইলের মহেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। ইংরেজ সরকার এই বিদ্রোহ দমন করে।

এছাড়া বারাসাত বিদ্রোহ, ১৮৫০ সালে ত্রিপুরার তিপ্রা বিদ্রোহ, ১৮৬৩ সালে জামাতিয়া বিদ্রোহ, ১৮০৮-১৮১৬ সালে মেদিনীপুরে নায়েক বিদ্রোহ প্রভুতি ছিল বাংলার কৃষক বিদ্রোহ।
Advertisement advertise here