PayPal

বাংলার নারীবাদের উদ্ভব ও বিকাশ

author photo
- Saturday, January 26, 2019

বাংলার নারীবাদ

নারীবাদের তিনটি ধারা যথা - উদারনৈতিক, সমাজবাদী ও র‍্যাডিক্যাল। ১৯২৩ সালে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় 'নারীর মূল্য' লেখেন। বেগম রোকেয়ার 'অবরোধবাসিনী' (১৯৩১)-তে মুসলিম নারী মুক্তির ধারণা স্পষ্ট হয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করেন। বাঙালি নারীর আত্মমর্যাদা রক্ষা, শিক্ষা ক্ষেত্রে সতীদাহ নিবারণে রাজা রামমোহনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিধবা বিবাহ প্রচলনের চেষ্ঠা আর বহুবিবাহ রহিত করার ক্ষেত্রে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলার নারীবাদ
ব্রাহ্মসমাজের নেতা কেশবসেন — অন্তঃপুবিকাদের শিক্ষার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ১৮৪৯ সালে বেথুন সাহেবকে নারী শিক্ষার উদ্যোগ আয়ােজনকে সার্থক করার জন্য ভূমিদান করলেন দক্ষিণারঞ্জন মুখােপাধ্যায়। ইনিই বাংলার প্রথম রেজিস্ট্রি বিবাহ করেছিলেন-বর্ধমান রাজার বিধবা পত্নী রাণী বসন্ত কুমারীকে নিয়ে পলায়ন ও বিবাহ-সে সময়কার তীব্র সমাজ আন্দোলনের উৎস হয়েছিল।

উনিশ শতকে একটু একটু করে শিক্ষা পাচ্ছিলেন আলােকপ্রাপ্ত নারীরা। তরু দত্ত, সরলা দেবী চৌধুরী, প্রিয়ম্বদা দেবী, লেডি অবলা বসু, কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়, স্বর্ণকুমারী দেবী। জীবনের নানা ক্ষেক্ষে এঁরা বিশেষ ভূমিকা নিয়েছেন। তবে অধিকাংশই স্বামী বা পরিবারের অন্য কারো সাহায্য পেয়েছেন/কংগ্রেস সভানেত্রী সরােজিনী নাইডু (১৮৭৯ - ১৯৪১) কিংবা উত্তরপ্রদেশ তথা ভারতের কোনাে প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সুচেতা কৃপালন (১৯০৮ - ১৯৭৪), বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ লীলা রায় (১৯০০ ১৯৭০) এর ক্ষেত্রে এই ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অল্পবয়সে বিধবা হয়েছেন অথচ জীবনকে নিরাশার চোখে দেখেননি, এমন কয়েকজনের নাম বাংলার সংস্কৃতিতে স্মরণীয়। স্বামী-পুত্র হারিয়ে কৃষ্ণকামিনী দাস (১৮৬৪ - ১৯১৯) যেভাবে শিক্ষা ও সাহিত্যসেবা করেছেন তা অতুলনীয়। গিরীন্দ্রমােহিনী দাসী (১৮৫৮ - ১৯৯৪)-র সাহিত্যসেবা মুলত স্বামীর মৃত্যুর পর। মানকুমারী বসু (১৮৬৩ - ১৯৪৩)-র সাহিত্য সাধনাও বিধবা হবার পর। মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি বিধবা হন।

নারীবাদী চেতনার উদ্দাম সম্ভবত মােক্ষদায়িনী দেবীব লেখায়। ১৮৭০ সালে তিনি মহিলাদের জন্য একটি পাক্ষিক পত্রিকা বাংলা মহিলা শুরু করেন। বন প্রসূন নামক কাব্য অন্তৰ্গত কবিতা বাঙালি বাবু-তে র‍্যাডিক্যাল নারীবাদের ইঙ্গিত ধরা পড়েছে। কবিতাটি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাঙালির মেয়ের জবাব।

বাংলার নারী সমাজের কোনাে কোনাে মহিয়সী চরিত্র পতিতা শ্রেণীর। তাদের কেউ বাংলার নাট্যমঞ্চে অভিনেত্রী হিসাবে আত্মনিয়োগ করেছেন। স্টার রঙ্গমঞ্চ প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে এই শ্রেণীর নারী বিনােদিনী দাসী (১৮৬৩ - ১৯৪২) অগ্রবর্তী। পুরুষ-মহাপুরুষ সান্নিধ্য তিনি পেয়েছেন তাকে এতহাসিকভাবে প্রয়ােগ করেছেন। নারীবাদী চেতনার ধারায় এই শ্রেণীর ভূমিকা অনস্বীকার্য।

স্বাধীনতা স্বকীয়তা আত্মচেতনার ফল। রাজনীতির সংগ্রাম মাতঙ্গিনী হাজরা (১৮৭০ - ১৯৪২) বা নারী সমাজের আত্মচেতনার দিগদর্শন সঙ্গিনী কৈলাসবাসিনী দেবী এই দিক থেকে আলােচ্য। শহীদ মাতঙ্গিনীর অনুপ্রেরণা স্বাধীনতা সংগ্রামে। কৈলাসবাসিনীর চেষ্টা হিন্দু মহিলাগণের হীনাবস্থা-র সন্ধানে (১৮৬৩)। আর একজনের কথা এই প্রসঙ্গে স্মরণীয় মৃণালিনী সেন (১৮৭৯ - ১৯৭২)। অল্প বয়সে বিধবা এই নারী কবিখ্যাতি পেয়েছিলেন। তারপর ২৬ বছর বয়সে দ্বিতীয় বিবাহ হয় কেশবচন্দ্র সেনের দ্বিতীয় পুত্র নির্মল চন্দ্র সেনের সঙ্গে। ইংল্যান্ড ও ভারতে মহিলাদের ভােটাধিকারের দাবিতে আন্দোলনে ছিলেন অগ্রণী মহিলা। নারীবাদী চেতনার এই অনন্য দৃষ্টান্ত বাংলার আর কোন নারীর আছে? গান্ধীজীকে বাংলা শিখিয়েছিলেন মৃণালিনী। প্রথম মনােপ্লেনে চড়েছিলেন। মুক্তির তুঙ্গ সিদ্ধি বলে এসব তথ্য নিশ্চয় ধরা সম্ভব।

বাঙালী মহিলার অস্মিতা ও অঙ্গীকার বিষয়ে উপন্যাস লিখেছেন আশাপূর্ণা দেবী (১৯০৯ - ১৯৯৫)। তার প্রথম প্রতিশ্রুতি, সুবর্ণলতা আর বকুলকথা বাঙালী নারীর আত্ম উন্মােচনের দলিল।

স্বাধীনতার পর বাংলা সাহিত্য সাধনায়, বিদ্যাবত্তায় যারা নারীবাদকে স্পষ্ট করেছেন তাদের মধ্যে কেতকী কুমারী ডাইসন, গায়ত্রী স্পিভ্যাক চক্রবর্তী, কবিতা সিংহ, বাণী, সুকুমারী ভট্টাচার্য, সুচি ভট্টাচার্য, সুমিতা চক্রবর্তী, মালিনী ভট্টাচার্য, ইলা মিত্র প্রমুখের কথা বিশেষভাবে মনে পড়ছে। এই পর্যায়ে যার কথা না বললে লেখা অসম্পূর্ণ থাকে তার নাম মহাশ্বেতা দেবী। এই লেখিকার কৃতিত্ব শুধুমাত্র আত্মসচেতনার উদাহরণ প্রতিষ্ঠায় নয় — বাংলার সমাজ সচেতন ভাবাদর্শের প্রকাশেও।

ফয়জুন্নেসা চৌধুরী (১৮৪৮ - ১৯০৫) অবশ্য স্বাধীনতার আগেই দানশীলতার জন্য নওয়াব উপাধি পেয়েছিলেন। সাহিত্যে বেগম সুফিয়া কামাল, সেলিনা হােসেন কিংবা তসলিমা নাসরিনের কথা উল্লেখযােগ্য। শেষােক্ত মহিলা নারীবাদ প্রচারের জন্য নানাভাবে ধর্মাজী ও রাজনৈতিক ব্যবসায়ীদের লাঞ্ছনা সহ্য করেছেন।

বাংলার নারীবাদী চেতনা বিকাশে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবী বিদ্যাচর্চা কেন্দ্রের ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়। এই কেন্দ্রটি বেশ কিছুদিন ধরে বাংলার নারীবাদী চিন্তনের বিকাশ নিয়ে ধারাবাহিক গবেষণা করে চলেছে।

No comments:

Post a Comment