সিপাহী বিদ্রোহ বা মহাবিদ্রোহের ফলাফল কি ছিল?

সিপাহী বিদ্রোহ বা মহাবিদ্রোহের ফলাফল কি ছিল?

- January 17, 2019
১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত মহাবিদ্রোহ ভারতের জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাসে এক অতি উল্লেখযােগ্য ঘটনা। ঐতিহাসিক ড. লেপেল গ্রিফিনের মতে, ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মহাবিদ্রোহ ভারতীয় আকাশ থেকে বহু কালাে মেঘ সরিয়ে দেয়। জহরলাল নেহেরু তাঁর Discovery of India গ্রন্থে লিখেছেন, এই বিদ্রোহ দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে না পড়লেও, এই বিদ্রোহ সারা ভারতকে বিশেষত ব্রিটিশ প্রশাসনকে কাপিয়ে তুলেছিল। এই বিদ্রোহ ভারতীয় সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির উপর গভীর প্রভাব ফেলে।
সিপাহী বিদ্রোহ বা মহাবিদ্রোহের ফলাফল কি ছিল?
মহারানির ঘােষণাপত্র: সিপাহী বিদ্রোহের পর মহারানি ভিক্টোরিয়া ১ লা নভেম্বর নিজের হাতে ভারতের শাসনভার গ্রহণ করে এক ঘােষণাপত্রের মাধ্যমে ভারতীয়দের নানাভাবে আশ্বস্ত করেন। এই ঘােষণাপত্রে বলা হয় — (1) ভারতবাসীর ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যাপারে ব্রিটিশ সরকার হস্তক্ষেপ করবে না। (2) জাতিধর্মবর্ণনির্বিশেষে যোগ্যতাসম্পন্ন ভারতীয়দের চাকরিতে নিযুক্ত করা হবে। (3) স্বত্ববিলােপ নীতি ও অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি পরিত্যক্ত হবে। (4) স্বাক্ষরিত সন্ধি ও চুক্তিগুলিকে মান্য করা হবে। (5) বন্দি সিপাহি ও ভারতীয়দের মুক্তি দেওয়া হবে। আই সি এস চাকরিতে নিয়োগের জন্য ১৮৬১ সালে এক আইন দ্বারা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে কর্মচারী নিয়োগের নীয়ম চালু করা হয়। একারনে মহারানির ঘােষণাপত্রকে ভারতের মহাসনদ বলা হয়।

ভারত শাসন আইন: ব্রিটিশ সরকারের মন্ত্রিসভার ও পার্লামেন্ট মহাসভার অধীনে ভারতের শাসনকে আনা হয়। ব্রিটিশ মন্ত্রীসভায় একজন ভারত বিষয়ক মন্ত্রী নিয়োগ করা হয়। তার খেতাব হয় "ভারত সচিব"। তিনি এখন থেকে ব্রিটিশ মন্ত্রীসভার পক্ষে ভারতবাসীর প্রধান হন। ভারত সচিবকে পরামর্শ দানের জন্য ১৮৫৮ খ্রি: আইনে একটি কাউন্সিল গঠন করা হয়। আগের মতো বডলাট তার ক্ষমতায় থাকেন। তবে তার উপাধি হয় গভর্ণর জেনারেল ও ভাইসরয়। প্রথম ভাইসরয় হয় লর্ড ক্যানিং।

ভারত সচিব পদ সৃষ্ট: পূর্বতন ডিরেক্টর সভা ও বাের্ড অফ কন্ট্রোল-এর যাবতীয় ক্ষমতা দেওয়া হয় ভারত সচিব নামে ব্রিটিশ মন্ত্রীসভার এক ক্যাবিনেট মন্ত্রীকে।

ইন্ডিয়া কাউন্সিল: ভারত সচিবকে সাহায্যের জন্য ১৫ জন সদস্য নিয়ে গঠন হয় ইন্ডিয়ান কাউন্সিল। এই শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তনকে ঐতিহাসিক কিথ নিছকই একটি আনুষ্ঠানিক পরিবর্তন বলে উল্লেখ করেন। কারণ ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং অ্যাক্ট, ১৮১৩, ১৮৩৩ ও ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দের চার্টার আইনে কোম্পানি শাসনকে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ছিল।

১৮৬১ সালের আইন: ১৮৬১ সালের কাউন্সিল আইন পাশ করে ভাইসরয়ের আইন পরিষদে ৬-১২ জন সদস্যের মধ্যে বেসরকারি ইংরেজ ও ভারতীয়নের সংখ্যা অর্ধেক হয়। ভারতীয় সদস্যদের কোনাে মর্যাদা দেওয়া হত না।

প্রাদেশিক বিকেন্দ্রীকরণ নীতি: ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে লর্ভ মেয়ো, ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে লর্ড লিটন ও ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে লর্ড ক্যানিং বিকেন্দ্রীকরণ নীতি গ্রহণ করে প্রাদেশিক শাসন পরিষদ ও আইনসভাগুলিকে কিছু কিছু ক্ষমতা দান করেন।

স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন: প্রদেশগুলিকে অর্থনৈতিক ক্ষমতা দান করায় স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থায় উন্নতি হয়। স্থানীয় পৌরসভা ও জেলা বাের্ডগুলি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানীয় জলের বন্দোবস্ত প্রভৃতি উন্নতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থার উন্নতিতে লর্ড রিপনের নাম স্মরণীয়।

ভারতসম্রাজ্ঞী: ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে মহারানি ভিক্টোরিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতসম্রাজ্ঞী বলে ঘােষণা করা হয়। এর পর থেকে ভারতীয় রাজন্যবর্গ হন তাঁর অধীনস্থ সামন্ত বা প্রজা।

সামরিক বিভাগের পরিবর্তন: ভারতের সামরিক বিভাগকে নতুন করে গঠন করা হয়। দেশীয় সৈন্যসামন্তের সংখ্যা হ্রাস করে ইংরেজ সৈন্যের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। প্রেসিডেন্সি সেনাবাহিনীকে পৃথক করা হয়। গােলন্দাজ বাহিনীতে ভারতীয়দের নিয়ােগ নিষিদ্ধ করা হয়। সীমান্তরক্ষা ও অভ্যন্তরীণ শান্তি রক্ষার দায়িত্ব ইউরােপীয় সামরিক কর্মচারীদের উপর অর্পণ করা হয়।

মােগল সাম্রাজ্যের অবসান: মহাবিদ্রোহের ফলে মােগল সাম্রাজ্যের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটে। শেষ মােগল সম্রাট বাহাদুর শাহ বন্দি অবস্থায় রেঙ্গুনে প্রেরিত হন এবং তার পুত্র ও পৌত্রগণকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এভাবে মােগল বংশের অবসান ঘটে।

সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন: মহাবিদ্রোহ দমনের পর ভারতের সামাজিক ক্ষেত্রে এক বিশাল পরিবর্তন দেখা যায়। নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভারতীয় সমাজের পুনর্গঠন শুরু হয়। কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস ত্যাগ করে হিন্দুগণ পাশ্চাত্য শিক্ষা, সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞান গ্রহণ করে আধুনিকতার পথে যাত্রা শুরু করে। অন্যদিকে ভারতীয় মুসলমানগণ পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সভ্যতা গ্রহণের সুযােগ না নিয়ে পিছিয়ে পড়ে।

ভারতে রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ: সাধারণ ভারতবাসী তার রাজনৈতিক অবস্থা সম্বন্ধে সজাগ হয়ে উঠল এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের ফলে ক্রমশ ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসােসিয়েশন ও ভারতের জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবে সিপাহি বিদ্রোহ ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নব যুগের সূচনা করে।।

নবযুগের সূচনা: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের পর ভারতের ইতিহাসে এক নবযুগের অভ্যুদয় হয়। ভারতবাসীদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ধর্মচর্চার সুযােগ বৃদ্ধি পায়। শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সংখ্যা বাড়ল। ডাক-তার-রেল ও যােগাযােগ ব্যবস্থার ফলে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সঙ্গে যােগাযােগ ও আদানপ্রদান বৃদ্ধি পেল। জেগে উঠল সংঘ চেতনা। শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের নেতৃত্বে ইংরেজ বিরােধী সনােভীর সম্প্রসারিত হল।