PayPal

রংপুর কৃষক বিদ্রোহ

author photo
- Tuesday, January 22, 2019

রংপুরের কৃষক বিদ্রোহ

১৭৮৩ সালে কোম্পানী নিযুক্ত ইজারাদার দেবী সিংহের বিরুদ্ধে সংগঠিত রংপুরের কৃষক অভ্যুত্থান উনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে পরিচালিত ভারতের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে একটি তাপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসাবে চিহ্নিত। ভারতের ব্রিটিশ প্রশাসনের একটি গুরত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল অতি অল্প খরচে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়। ওয়ারেন হেস্টিস এই পথের সূচনা করেছিলেন। প্রাথমিকভাবে হেস্টিংস ভূমি রাজস্ব আদায় এবং মূল্যায়নের জন্য একটি কমিটি অব সার্কিট গঠন করেন। সর্বাধিক পরিমাণে রাজস্ব প্রদানের যিনি প্রতিশ্রুতি দিতেন তার সঙ্গে কোম্পানী জমি বন্দোবস্তু করত। এই ব্যবস্থায় ইজারাদাররা কোম্পানীকে প্রদানের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রাজস্ব আদায় করতেন। পাশাপাশি ইজারাদাররা কৃষকের খাজনা সর্বাধিক হারে বাড়িয়ে তােলার চেষ্টা করতেন এবং এই জন্য কৃষকদের ওপর বল প্রয়োগও চলত। এই ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কৃষকশ্রেণী। কৃষকদের যখন সহ্যের সীমা অতিক্রান্ত হত তখন তারা বিদ্রোহ ঘােষণা করত। রংপুর বিদ্রোহ ছিল এই ধরনেরই কৃষক অসন্তোষের একটি উল্লেখযােগ্য দৃষ্টান্ত। যা ভারতের ব্রিটিশ প্রশাসনকে আতঙ্কিত করে তুলেছিল।
রংপুর বিদ্রোহের নেতা নুরুলউদ্দিন
দেবী সিংহ ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর একজন দুঃসাহসী ভাগ্যান্বেষী যিনি তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা র সুযোগ নিয়ে যথেষ্ট।খ্যাতি লাভ করেছিলেন। তিনি পশ্চিম ভারত প্রশাসনের থেকে মুর্শিদাবাদে এসেছিলেন এবং কোম্পানীর ইজারাদারে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি পূর্ণিয়া (বিহার) জেলা থেকে রাজস্ব আদায়ের অধিকার লাভ করেছিলেন এবং এর শাসক হয়েছিলেন। দেবী সিংহ নায়েব নাজিম রেজা খানকে 16 লক্ষ টাকা দিয়ে এই অধিকার লাভ করেছিলেন। দেবী সিংহের সরকার পুর্ণিয়াতে একটি সন্তাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। তার প্রতিনিধিদের একটি অংশের উদ্দেশ্য ছিল যে কােন উপায়ে সর্বাধিক পরিমাণে রাজস্ব আদায় করা। নিরপরাধ জনসাধারণের ওপর মাত্রাতিরিক্ত অত্যাচারের ফলে জনগণ পূর্ণিয়া ছেড়ে চলে যেতে থাকে। ফলে ঐ অঞ্চল পরিত্যক্ত হয়ে যেতে থাকে। দেবী সিংহের অত্যাচারের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে তিনি হেস্টিংসের দ্বারা বরখান্ত হন। কিন্তু দেবী সিংহ হেস্টিংসকে অর্থ দিয়ে বশীভূত করেন এবং প্রাদেশিক রেভিনিউ বাের্ডের সদস্য হন। তিনি ইজারা কিনতে থাকেন এবং বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়ে ওঠেন। ১৭৮০ খ্রীঃ তিনি মুর্শিদাবাদের একজন ছােট রাজা রাধানাথ সিংহের দেওয়ান নিযুক্ত হন। ১৭৮১ খ্রীঃ দেবী সিংহ রংপুর এবং দিনাজপুরের প্রতিবেশী পরগণার ইজারা ক্রয় করেন।

পূর্ণিয়ার ন্যায় রংপুর এবং দিনাজপুরেও তিনি যে কোন উপায়ে সর্বাধিক পরিমাণ রাজস্ব বৃদ্ধির নীতি গ্রহণ করেছিলেন। এই অঞ্চলে রাজস্বের হার অতিরিক্ত পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। সাধারণ রাজস্ব ছাড়াও তার প্রতিনিধিরা নানা প্রকার কর আরােপ করত যা সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও দুর্দশাপূর্ণ করে তুলেছিল। দেবী সিংহের প্রতিনিধিদের হাত থেকে রায়তদের পলায়নের কোন পথ ছিল না। রায়তরা যদি বকেয়া মেটাতে ব্যর্থ হত তাহলে তাদের উপর অমানুষিক অত্যাচার করা হত। রায়তরা রাজস্ব কমানাের উপযুক্ত কারণ দর্শালেও তাদের বকেয়া কখনও কমানাে হত না। রাজস্বের জন্য নিষ্ঠুর অত্যাচার কৃষকদের শেষপর্যন্ত জমিদারের কাছে যেতে বাধ্য করত। হাজার হাজার কৃষক জমি হারিয়েছিলেন। তারা গৃহহীন ও ভূমিহীন হয়ে পড়েছিলেন। এমনকি জমিদাররা যাৱা রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ইজারাদারদের সাথে স্বত্বভােগী হিসাবে কাজ করত তারাও দেবী সিংহর হাত থেকে নিস্তার পায় নি। এই জমিদাররাও অনেক ক্ষেত্রে দেবী সিংহের অধীনস্থ ব্যক্তিদের দ্বারা নানাভাবে অপমানিত হত। জেলা কর্তৃপক্ষের কাছে এ বিষয়ে পিটিশন পাঠানাে হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে রংপুরের কৃষক সম্প্রদায়ের সামনে প্রতিবােদ কে আর কোন পথ খােলা ছিলনা। ১৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ১৮ ই জানুয়ারী বিভিন্ন গ্রামের কৃষক সম্প্রদায় টেপা (Tapa) গ্রামে সংঘবদ্ধ হন এবং দেবী সিংহের রাজত্বের অবসানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বিদ্রোহীরা নিজেদের একটি স্বাধীন সরকার গঠন করে। বিদ্রোহীদের সরকার ৫ সপ্তাহ টিকে ছিল। বিদ্রোহীর নুরুলউদ্দিনকে তাদের নেতা এবং অপর একজন কৃষক দয়ারাম শীলকে তার সহযােগী হিসাবে নিযুক্ত করে।

নুরুলউদ্দিন স্থানীয় কৃষকদের উপর এক নিষেধাজ্ঞা জারী করে দেৰী সিংহকে খাজনা প্রদান করতে নিষেধ করেন। কৃষকরা জনগণের কাছ থেকে চাঁদা তুলে একটি তহবিল গঠন করে। এই বিদ্রোহ কোচবিহার ও দিনাজপুরে প্রসারিত হয়েছিল। রাজকোষ, কাজারি এবং স্থানীয় জেলগুলি আক্রান্ত হয়েছিল এবং দেবী সিংহের প্রতিনিধিদের হত্যা অথবা বিতাড়িত করা হয়েছিল। রাজস্ব প্রদানে অসমর্থ বন্দী কৃষকদেরকেও তারা মুক্ত করেছিল।

স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সৈন্য সমাবেশ করতে হয়েছিল। বিদ্রোহীরা ব্রিটিশ সেনার বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেছিল। অসংখ্য কৃষক লাঠি, তীর, বর্ষা, বল্লম নিয়ে প্রতিরােধ আন্দোলনে সামিল হয়েছিল। মণ্ডলঘাটের দুই প্রান্তে একটি খণ্ডযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল। এই যুদ্ধে রংপুর বিদ্রোহের নেতা নুরুলউদ্দিন গুরুতরভাবে আহত হন। দয়ারাম শীলকে হত্যা করা হয়েছিল। শেষপর্যন্ত বিদ্রোহীরা পাটগ্রামের যুদ্ধে পরাজিত হন। কয়েক শত বিদ্রোহীকে হত্যা করা হয়েছিল এবং কয়েক শত বিদ্রোহীকে ফাসিতে ঝােলানাে হয়েছিল। এই বিদ্রোহের কারণ অনুসন্ধানের জন্য পিটারসনের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠিত হয়েছিল। কমিশনের রিপাের্টে এই হিংসাত্মক কার্যকলাপের জন্য দেবী সিংহকে দায়ী করা হয়েছিল। কিন্তু হেস্টিংস দেবী সিংহের পক্ষে ছিলেন এবং তিনি অপর একটি অনুসন্ধান কমিটি নিয়ােগ করে দেবী সিংহের বিরুদ্ধে আনা অভিযােগগুলি খণ্ডন করেছিলেন।

রংপুর বিদ্রোহের ফলাফল : রংপুর বিদ্রোহের তাৎপর্যগুলিকে নিম্নলিখিতভাবে সংক্ষেপে আলােচনা করা যেতে পারে। (১) প্রথম থেকেই দেবী সিংহের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহীরা একটি ঐক্যবদ্ধ প্রতিরােধ গড়ে তােলে। তারা শ্রেণী, জাতি এবং ধর্ম প্রভৃতিকে উপেক্ষা করে একটি শক্তিশালী প্রতিরােধী দল গড়ে তুলতে সমর্থ হয়। হিন্দু এবং মুসলিম উভয়েই তাদের সাধারণ শত্রুদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। (২) এটি ছিল প্রকৃতপক্ষে একটি কৃষক বিদ্রোহ যদিও তার নেতৃত্ব এসেছিল গ্রামপ্রধান বা বসুনিয়াদের কাছ থেকে। এরা সাধারণ জনতার আস্থা অর্জন করেছিলেন। (৩) রংপুর বিদ্রোহের তাপর্যকে অনেক সময় অতিরঞ্জিত করা হয়ে থাকে। এই বিদ্রোহ ইজারাদারদের কবল থেকে কৃষকদের মুক্ত করতে পেরেছিল। ইংরেজ সেনাবাহিনীর দমননীতি সত্ত্বেও বিদ্রোহীরা আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করছিল এবং তারা আমৃত্যু তাদের দাবীগুলির প্রতি অনুগত ছিল। তাৎক্ষণিক অর্থে এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়েছিল, কিন্তু সদুরপ্রসারি বিচার করলে বলা যায় এই বিদ্রোহ পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল। বিদ্রোহ ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করেছিল ইজারা ব্যবস্থার ক্রটি সম্পর্কে সতর্ক হতে, আর এটি ভারতের ব্রিটিশ প্রশাসনকে অনুপ্রাণিত করেছিল রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে। যার প্রকাশ ঘটেছিল ১৭৯৩ খ্রীঃ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে।