১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে সিপাহী বিদ্রোহের বিস্তার।

author photo
- Thursday, January 17, 2019
advertise here

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের বিস্তার।

১৮৫৭ খ্রি: মহাবিদ্রোহের সূত্রপাত হয় কলিকাতার ১২ মাইল উত্তরে গঙ্গাতীরে ব্যারাকপুর সেনা ছাউনিতে। সিপাহি বিদ্রোহ প্রথমে শুরু হয় মঙ্গল পান্ডের নেতৃত্বে। ২৯ মার্চ, ১৮৫৭ খ্রি: মঙ্গল পান্ডের সামরিক আদালতে ফাঁসি হয়। ২৩ এপ্রিল মীরাটের ৯০ জন সিপাহী বিদ্রোহ করে। ১০ মে, ১৮৫৭ খ্রি: মীরাটের সিপাহীরা বিদ্রোহী ঘোষণা করে। এরপর বিদ্যুৎ গতিতে বিদ্রোহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।


সিপাহী বিদ্রোহের কেন্দ্র ও নেতৃবৃন্দ:

১) মীরাটের সিপাহীরা দিল্লীতে এলে, দিল্লীর সিপাহীরা মেজর উইলোবিকে পরাস্ত করে দুর্গ ও অস্ত্রগার দখল করে নেয়। দিল্লী ও মীরাটের সিপাহীরা বাহাদুর শাহকে ভারত সম্রাটরুপে ঘোষণা করে। দিল্লী নগর বিদ্রোহী সিপাহীদের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। দিল্লীতে সিপাহীদের প্রকৃত নেতৃত্ব দেন জোয়ান বখতখান। ইংরেজ সেনা দিল্লী দখল করার পর জোয়ান বখতখান লক্ষ্ণৌ চলে আসেন। লক্ষ্ণৌতে ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধে ১৩ই মে, ১৮৫৯ খ্রি: জোয়ান বখতখান প্রাণ হারান।

২) উত্তর ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে এবং জনসাধারণ বিদ্রোহে যোগদান করে। অযোধ্যা, রোহিলখণ্ড, দোয়াব, বুন্দেলখন্ড, মধ্য প্রদেশের গোয়ালিয়র, বিহারের বিরাট অংশ ও পূর্ব পঞ্জাব নিয়ে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। ইন্দোরের হোলকারের সেনারা বিদ্রোহীদের পক্ষ নেয়।


৩) কানপুরে পেশবা দ্বিতীয় বাজিরাওয়ের দত্তক পুত্র নানাসাহেব বিদ্রোহীদের নেতৃত্ব দেন। তার ভাতা লর্ড ডালহৌসি সত্ব-বিলোপ আইন দ্বারা বাতিল করায় তিনি এই বিদ্রোহে যোগদান করেন। তিনি তার অনুচর তাতিয়া টোপি ও আজিমুল্লাহ খানের উপর যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব দেন। নানাসাহেব পরাজিত হয়ে নেপালে পালিয়ে যান।

৪) লক্ষ্ণৌ-এর বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন অযোধ্যার নবাবের বেগম। ইংরেজ সেনাপতি হেনরি লরেন্সকে লক্ষ্ণৌতে পরাস্ত করেন। অবশেষে স্যার কলিন ক্যাম্বেল লক্ষ্ণৌ পুনরুদ্ধার করেন।

৫) ঝাঁসির বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ। লক্ষ্মীবাঈ ছিলেন ঝাঁসির রাজা গঙ্গাধর রাওয়ের বিধবা রাণী। তার কোনো পুত্র সন্তান ছিল না। তাই ডালহৌসি দত্তক বেআইনি বলে ঝাঁসি রাজ্য দখল করেন। সেনাপতি হিউরোজের আক্রমণে তিনি ঝাঁসি ত্যাগ করে সিন্ধিয়ার গোয়ালিয়র দুর্গ দখল করেন। এবং এতে তাতিয়া টোপি যোগ দেন। ১৮৫৮ খ্রি: ১৭ই জুন সেনাপতি স্যার হিউরোজের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত ও মৃত্যু বরণ করেন।

পড়ুন:- সিপাহী বিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ।




৬) বিহারের জগদিশপুরের জমিদার কুনওয়ার সিং ছিলেন আশিতিপর বৃদ্ধ। তিনি বিহার, অযোধ্যা ও মধ্য ভারতে যুদ্ধ করেন। তিনি আরার যুদ্ধে ইংরেজদের পরাজিত করে। কিন্তু যুদ্ধে আহত হয়ে ১৮৫৮ খ্রি: তার মৃত্যু হয়।

মহাবিদ্রোহে জনসাধারণের অংশগ্রহণ:

ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী ভারতীয় সিপাহিদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জনগণের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সংগ্রামে নেমে ছিল।

(ক) মহাবিদ্রোহে জনগণের প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ:

অযোধ্যা, দিল্লী, মধ্যভারত, বিহার, লক্ষ্ণৌ প্রভৃতি অঞ্চলে বিদ্রোহ প্রকৃত গণবিদ্রোহের রূপ ধারণ করেছিল।

১) গ্রামাঞ্চলে কোম্পানি প্রবর্তিত নতুন ভূমিরাজস্ব আইন দ্বারা সুরক্ষিত সুদখোর মহাজন ও নতুন জমিদারদের বাড়িঘর ও কাছারি লুঠ করা হয় ও পুড়িয়ে দেওয়া হয়। যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় গুন্ডারা এই সব লুঠতরাজে অংশ নিয়েছিল।

২) ব্যবসায়ী ও মহাজনদের উপর কর বা খাজনা বসিয়ে বিদ্রোহী সিপাহিদের খাদ্যশস্য ও যুদ্ধের রসদপত্র কেনা হয়।




৩) দিল্লী, লক্ষ্ণৌ, রায়বেরিলি প্রভৃতি শহরের জনসাধারণ তাদের বল্লম, টাঙ্গি, ছুরি, দা, কাস্তে প্রভৃতি নিয়ে বিদ্রোহী সিপাহিদের সঙ্গে যোগ দেয় এবং কোম্পানির অনুগত সেনাদের সঙ্গে হাতাহাতি লড়াই চালায়।

৪) দিল্লী, অযোধ্যা, বিহার কানপুর, লক্ষ্ণৌ প্রভৃতি অঞ্চলে রাস্তাঘাট নষ্ট করে গোরু-মোষ-ঘোড়ার গাড়ি ও স্থানীয় নৌকাগুলি সরিয়ে ফেলে কোম্পানির সেনাবাহিনীর রসদপত্র সরবরাহের কাজে বাধা দেওয়া হয়।

(খ) মহাবিদ্রোহে জনগণের পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ:

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহে ভারতের জনগণ বিদ্রোহীদের প্রতি সহানভূতিশীল হয়ে পরোক্ষভাবে যোগদান করেছিল।

পড়ুন:- সিপাহী বিদ্রোহের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য।

১) স্থানীয় ভৃত্য, পরিচারক ও আয়ারা তাদের গৃহে কাজকর্ম বন্ধ করে দিয়ে ইংরেজদের বিপদে ফেলেছিল।

২) সিপাহী ও বিদ্রোহীদের হাতে ফিরিঙ্গি ইংরেজদের লঞ্চনায় তারা উল্লাস প্রকাশ করত।

৩) ইংরেজকে কোন সংবাদ না করে, ভীতিপ্রদ গুজব রটিয়ে ইংরেজদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করে।

মন্তব্য:

যদিও ভারতীয় জনগণের একটা বড়ো অংশ, যেমন- বোম্বাই, মাদ্রাজ, পশ্চিম পাঞ্জাব, বাংলা প্রভৃতি এবং ভারতের ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি ইংরেজ কোম্পানির বিরুদ্ধে ১৮৫৭ খ্রি: বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেনি, তবু ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে যে গণবিদ্রোহের রূপ ধারণ করেছিল, একথা অস্বীকার করা যায়না।
Advertisement advertise here