ত্রিশক্তি মৈত্রী বা আঁতাত / ট্রিপল আঁতাত

author photo
- Wednesday, December 19, 2018
advertise here

ত্রিশক্তি মৈত্রী বা আঁতাত/ ট্রিপল আঁতাত গঠনের পটভূমি বা কারণ (Background of the Triple Entente):


অস্ট্রিয়া-জার্মান চুক্তি ও রি-ইন্সুরেন্স চুক্তির প্রতিক্রিয়া (Austro-German deal and Re-insurance Treaty Reaction):


১৮৯০ খ্রি: বিসমার্কের পতনের পর জার্মান সম্রাট কাইজার উইলিয়াম তার মন্ত্রী ফ্রেডারিক হলস্টিনের পরামর্শে রাশিয়ার সঙ্গে অনাক্রমনমুলুক রি-ইন্সুরেন্স চুক্তি বাতিল করেন। এর ফলে রাশিয়া মনে করেন যে, বলকানে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অস্টিয়াকে জার্মানী সাহায্য করতে ইচ্ছুক। এতে রাশিয়ার জার অপমানিত বোধ করে। এমতবস্থায় রুশ মন্ত্রিসভা স্থির করে যে, জার্মান অষ্টিয়া জোটের বিরুদ্ধে শক্তিসাম্য রক্ষার জন্য ফ্রান্সের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়। ১৮৭০ খ্রি: ফ্রাঙ্কো-জার্মান যুদ্ধের পর থেকে ফ্রান্সের সঙ্গে জার্মানির ঘোর বিরোধী ছিল। রুশ মন্ত্রী কারকফ (Karkoff) ছিলেন ফরাসী জোটের সমর্থক।


কাইজারের রুশ বিরোধী নীতি (Anti-Russian policies of Kaiser) :

জার্মান কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়াম বুলগেরিয়ার সিংহাসনে এক জার্মান রাজবংশ স্থাপন করার পর, জার্মান সেনাপতিদের দ্বারা বুলগেরীয় সেনাদল গঠনের চেষ্টা করা হলে, রাশিয়া অসন্তুষ্ট হয়। পূর্ব ইউরোপে জার্মান অনুপ্রবেশ ঘটলে রুশ স্বার্থ বিঘ্ন ঘটে। কাইজারের মন্ত্রী ফ্রেডারিক হলস্টিন ছিলেন রুশ বিরোধী। তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে অপমানজনক মন্তব্য করেন। কাইজার ব্রিটেনের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনের আগ্রহ স্থাপন করেন। ফলে রাশিয়ার জার্মানির বিরুদ্ধে সন্দেহ ও অবিশ্বাস তীব্র হয়। ১৮৯৭ সালে রাশিয়ায় অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। এইজন্য রাশিয়া সরকার জার্মানির কাছে ঋণ চান। কিন্তু কাইজার অস্বীকার করে।


১৮৯৪ খ্রি: ফ্রাঙ্কো-রুশ চুক্তি (The Franco-Russian Treaty of 1894) :

ফরাসী মন্ত্রী ডেলক্যাসি ফ্রাঙ্কো-রুশ মিত্রতার জন্য আগ্রহী হয়। রাশিয়ার অর্থ সংকটে ফরাসী সরকার মাত্র ৩% সুদে রাশিয়াকে ঋণ দেয়। ফ্রান্স থেকে এক নৌবহর শুভেচ্ছা সফরে রাশিয়ার ক্রনস্ট্যান্ড বন্দরে আসে। এরপর রুশ সেনাপতি ওব্রুচেভ এবং ফরাসী সেনাপতি বউসডাফ্রি উভয় দেশের মধ্যে এক সামরিক চুক্তি সম্পাদন করেন ১৮৯১ খ্রি:। এরপর ১৮৯৩ খ্রি: ফ্রাঙ্কো-রুশ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতে স্থির হয় যে, জার্মানী ফ্রান্সকে আক্রমণ করে অথবা জার্মানির সমর্থন নিয়ে ইতালী ফ্রান্সকে আক্রমণ করে তবে রাশিয়া জার্মানির বিরুদ্ধে সেনা সমাবেশ করবে। অপরদিকে, যদি জার্মানী রাশিয়াকে আক্রমণ করে, অথবা জার্মান সমর্থন নিয়ে অস্টিয়া রাশিয়াকে আক্রমণ করে তবে ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে সেনা সমাবেশ করবে। এভাবে রুশ ফরাসী জোট গঠিত হয়। ফ্রাঙ্কো-রুশ চুক্তি ছিল আন্তর্জাতিক চুক্তি। এরফলে ফ্রান্সের মিত্রহীনতা দুর হয়। জার্মানির বিরুদ্ধে জোট গঠনের সূচনা হয়।

জার্মানির নৌ পরিকল্পনা : ইঙ্গ-জার্মান সম্পর্ক ও বিফলতা (German Naval Plan: Eng-German Relationship and Failure):




জার্মান নৌ-সেনাপতি তিরপিৎসের নেতৃত্বে ১৯০০ খ্রি: থেকে নৌ-নির্মাণ করলে ব্রিটেন আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ব্রিটেন মনে করে, জার্মান নৌবহর উত্তর সাগরে প্রাধান্য পেলে ব্রিটেনের নিরাপত্তা বিপন্ন হবে। এই পরিস্থিতিতে ব্রিটেনের একদল নেতা মনে করেন যে, ব্রিটেনের উচিত জার্মানির সঙ্গে মিত্রতা করা। যেহেতু আফগানিস্থান, তিব্বতপারস্য এবং মাঞ্চুরিয়া নিয়ে ব্রিটেনের সঙ্গে রাশিয়ার বিবাদ ছিল। অপরদিকে মিশরমরক্কো নিয়ে ফ্রান্সের সঙ্গে ব্রিটেনের বিবাদ ছিল। সেহেতু ফ্রাঙ্কো-রুশ জোটের বিরুদ্ধে ইঙ্গ-জার্মান জোটের দ্বারা শক্তিসাম্য রক্ষা করা যাবে বলে মনে করা হয়। কিন্তু ব্রিটিশ মন্ত্রী চেম্বারলেনের প্রস্তাবে কাইজার কর্ণপাত করেনি। লর্ড হলডেন জার্মানিতে মিত্রমিশন নিয়ে গেলে কাইজার অগ্রাহ্য করে। ১৯০২ খ্রি: ইঙ্গ-জাপান মৈত্রী ছিল রুশ বিরোধী জোট। যেহেতু ১৮৯৩ খ্রি: ফ্রাঙ্কো-রুশ আঁতাত দ্বারা রাশিয়া জার্মানির শত্রু দেশে পরিণত হয়। তাই ইঙ্গ-জাপান মিত্রতা চুক্তি দ্বারা ব্রিটেন একদিকে জাপানকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহার করে, অপরদিকে জার্মানিকে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু কাইজার সরকারের তীব্র ব্রিটিশ বিরোধিতা ও নৌনির্মাণ নীতির ফলে ইঙ্গ-জার্মান মিত্রতা বিফল হয়।



১৯০৪ খ্রি: ইঙ্গ-ফরাসী চুক্তি (The Anglo-French Treaty of 1904):

ফরাসী মন্ত্রী ডেলক্যাসি ব্রিটেনের সঙ্গে সমঝোতা করতে সম্মত হয়। ব্রিটেনের রাজা সপ্তম এডওয়ার্ড ফ্রান্স পরিদর্শনে গেলে তাকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। এরফলে ১৯০৪ খ্রি: ইঙ্গ-ফরাসী কনভেনশন বা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর শর্ত ছিল - মিশরে ব্রিটেনকে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠাই বাধা না দেওয়া। ব্রিটেন মরক্কোয় ফ্রান্সকে বাধা না দেওয়া। শ্যামদেশ, মাদাগাস্কার, নিউ ফাউন্ডল্যান্ড প্রভুতি স্থানে উভঁয় দেশ নিজ নিজ কর্তৃত্বের এলাকা স্থির করে। ইঙ্গ-ফরাসী চুক্তিকে আন্তরিক চুক্তি বা Entente Cordiale বলা হয়।

১৯০৭ খ্রি: ইঙ্গ-রুশ চুক্তি (The Anglo-Russian Treaty of 1907):

দূরপ্রাচ্য রুশ-জাপান যুদ্ধে (১৯০৪-১৯০৫ খ্রি:) জাপানের নিকট রাশিয়া পরাজিত হয়। রাশিয়ার এই পরাজয়ের ফলে ব্রিটেনের সঙ্গে রাশিয়ার মাঞ্চুরিয়া অঞ্চল নিয়ে বিরোধ কমে যায়। দূরপ্রাচ্য পরাজয়ের পর রাশিয়া পুনরায় বলকানের দিকে দৃষ্টি দেন। এজন্য জার্মানী ও অস্টিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার যুদ্ধের সম্ভবনা বাড়ে। এমতবস্থায় রাশিয়া ব্রিটেনের সঙ্গে মিত্রতা লাভে আগ্রহ দেখায়। রাশিয়ার সঙ্গে যে সকল বিষয়ে ব্রিটেনের বিরোধ ছিল, তার মীমাংসার জন্য ফরাসী মন্ত্রী ডেলক্যাসি মধ্যস্ততা করে। কাইজার পুনরায় রাশিয়ার সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনে চেষ্টা করেন। কাইজার জোরকে (Bjorke) নামক স্থানে জারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজ পক্ষে আনার চেষ্টা করেন। ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত হ্যারল্ড নিকলসনের সঙ্গে রুশ মন্ত্রী আইভোলস্কির আলোচনার ফলে ১৯০৭ খ্রি: ইঙ্গ-রুশ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।



ত্রিশক্তি আঁতাত বা ট্রিপল আঁতাত ১৯০৭ খ্রি: গঠন (Triple Entente structure):

ইঙ্গ-রুশ চুক্তির ফলে উভয় স্বাক্ষরকারী আফগানিস্থান ও তিব্বতের স্বাধীনতা রক্ষায় সম্মত হয়। পারস্যের ক্ষেত্রে উভয় দেশ নিজ নিজ প্রভাবযুক্ত এলাকা স্থির করে নেন। পারস্যকে তিনটি অঞ্চলে ভাগ করে দক্ষিণ পারস্য ব্রিটিশ প্রভাব এবং উত্তর পারস্য সিংহল, জর্জিয়া, আজেরবাইজান অঞ্চলে রুশ প্রভাব রক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। মধ্য পারস্যর নিরপেক্ষতা রক্ষা করা হয়। এইভাবে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়ার মধ্যে ত্রিশক্তি আঁতাত বা মৈত্রী গঠিত হলে ইওরোপ দুটি শক্তি শিবিরে ভাগ হয়ে যায়। একদিকে ১৮৮২ খ্রি: জার্মানী, ইতালী, বুলগেরিয়া, রুমানিয়া, তুরস্ক, অষ্টিয়া সমর্থিত ত্রিশক্তি মৈত্রী বা ত্রিশক্তি চুক্তি (Triple Alliance)। অপরদিকে ১৯০৭ খ্রি: ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়ার ত্রিশক্তি আঁতাত (Triple Entente)।

উল্লেখ বই (Reference Book):

1. Rene Carrie - Diplomatic History of Europe.
2. Fay - Origin of the World War.
3. Gooch - History of Modern Europe.
4. Oxford - Genesis of the War.
5. David Thompson - Europe since Nepoleon.
Advertisement advertise here