PayPal

নাদির শাহের ভারত আক্রমণ

author photo
- Thursday, December 20, 2018

পারস্য সম্রাট নাদির শাহের ভারত আক্রমণের কারণ ও ফলাফল:


মুঘল সম্রাটরা উত্তর-পশ্চিম সীমান্তকে রক্ষার জন্য কাবুলকান্দাহার জয় করেন। ঔরঙ্গজেবের আমলে কান্দাহার হাতছাড়া হলেও কাবুলের উপর আধিপত্য ছিল। কিন্তু ১৭০৭ খ্রি: ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারদের দুর্বলতা, গৃহযুদ্ধ এবং গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ফলে ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অবহেলিত হয়ে পড়ে। এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে ১৭৩৯ খ্রি: মুঘল সম্রাট মহম্মদ শাহের রাজত্বকালে পারস্যর সম্রাট নাদির শাহ ভারত আক্রমণ করে।


পারসীক নাদির শাহের ভারত আক্রমণের পটভূমি (Background):



পারস্যর সফভি বংশিয় শাহ তামাস্পকে (Shah Tamasp) সিংহাসনচ্যুত করে, ১৭৩৬ খ্রি: নাদির শাহ সিংহাসনে বসেন। তিনি ১৭৩৮ খ্রি: কান্দাহার আক্রমণ করে স্থানীয় বিদ্রোহী আফগান উপজাতিগুলিকে বিতাড়িত করেন। এই বিক্ষুব্ধ আফগান উপজাতিগুলি ভারত সীমান্ত পার হয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। নাদিরের ভারত আক্রমণের আশঙ্কা করে, কাবুলের মুঘল শাসনকর্তা দিল্লির কাছে বার্তা পাঠান। কিন্তু দিল্লি দরবারের অলস ও তাদের অদূরদর্শী অভিজাতরা এই সতর্ক বার্তাকে গুরত্ব দেননি। নদিরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী আফগান উপজাতিগুলি ভারতে আশ্রয় নিলে, নাদির শাহ মুঘল সরকারের নিকট প্রতিবাদ জানান। ভারতে আফগান অনুপ্রবেশ বন্ধ করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি মুঘল দরবারে দূত পাঠান। কিন্তু তাকে দিল্লিতে আটকে রাখেন। এজন্য নাদির শাহ ভারত আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন।

নাদির শাহের ভারত আক্রমণের রাজনৈতিক কারণ (Political Causes):

নাদির শাহের ভারত আক্রমণের মূল কারণ ছিল রাজনৈতিক। কান্দাহার হতে পালিয়ে আসা ভারতে অবস্থানকারী বিদ্রোহী আফগানদের দমন করা ছিল তার লক্ষ্য। ভারত অভিযানের আগে নাদির শাহ বলেন যে, হিন্দু রাজত্বের ধ্বজাধারী মারাঠাদের দমন করে মুঘল সাম্রাজ্যকে রক্ষা করাও তার উদ্দেশ্য। এটি ছিল ভারতীয় মুসলিমদের সমর্থন লাভের জন্য নিছক রাজনৈতিক প্রচার।





নাদির শাহের ভারত আক্রমণের অর্থনৈতিক কারণ (Economic Causes):

ভারতের ধন-সম্পদের লোভ নাদির শাহ ভারত আক্রমণের কারণ। তিনি ছিলেন ভুঁইফোড়। তিনি প্রথম জীবনে অত্যন্ত দরিদ্র ও প্রায় অজ্ঞাতকুলশীল ছিলেন। অর্থলোভ ও নিষ্ঠুরতা তার সহজাত ছিল। কর্নালের যুদ্ধে জয়লাভের পর তিনি প্রায় ৫০ লক্ষ্ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবী করেন। মারাঠা ঐতিহাসিকদের মতে, অযোধ্যার সুবাদার সাদাত খান এবং দক্ষিণের সুবাদার নিজাম-উল-মুলুক, নাদির শাহকে ভারত আক্রমণের জন্য প্ররোচনা দেন। তবে বিষয়টি বিতর্কিত। মূলত: ভারতের ঐশ্বর্যর হাতছানি নাদির শাহকে ভারত আক্রমণে সাহায্য করে।

নাদির শাহের দিল্লি আক্রমণ ও কর্ণালের যুদ্ধ (The Battle of Karnal)

নাদির শাহ ১৭৩৮ খ্রি: ভারত অভিযান শুরু করেন। তিনি কাবুল ও গজনী দখল করে পাঞ্জাবে আসেন। পেশোয়ালাহোর দখল করলে মুঘল সম্রাট মহম্মদ শাহ পাঞ্জাবের কর্ণালে নাদির শাহকে বাধা দেন। ১৭৩৯ খ্রি: কর্ণালের যুদ্ধে মহম্মদ শাহ পরাজিত হন। এবং তাদের মধ্যে সন্ধি হয়। তিনি সম্রাটকে সঙ্গে নিয়ে দিল্লি প্রবেশ করেন এবং ৭০ কোটি টাকা আদায় করেন। দিল্লি ছাড়ার আগে তিনি ময়ূর সিংহাসন, কোহিনুর মণি প্রভুতি নিয়ে যান। এবং সন্ধির শর্ত অনুযায়ী, সিন্ধুনদের পশ্চিম তীরবর্তী অঞ্চল লাভ করেন।





নাদির শাহের ভারত আক্রমণের গুরত্ব ও ফলাফল (The importance and results of Nadir Shah's invasion of India):

নাদির শাহের আক্রমণে মুঘল সম্রাটের মর্যাদা নষ্ট হয়। সিন্ধু, কাবুল, পাঞ্জাব ও লাহোর মুঘলদের হাতছাড়া হয়ে যায়। মুঘল সাম্রাজ্যের পতন তরান্বিত হয়। মুঘলদের দুর্বলতা মারাঠা শক্তি ও ইংরেজ বণিকদের পথ সুগম করে। পরাজিত মহম্মদ শাহ ক্ষতিপূরণ বাবদ ৫৩ লক্ষ্ টাকা প্রদানের শর্তে সন্ধি স্বাক্ষর করেন। নাদির শাহের আক্রমণে ফলে নাদিরের অনুকরণে হাল্কা কামান ও উন্নত বন্দুকের ব্যবহার ভারতে প্রচলিত হয়। রোহিলা আফগানরা এই উন্নত সমরাস্ত্র ব্যবহার করে শক্তিশালী হয়।

কর্ণালের যুদ্ধের গুরত্ব ও ফলাফল (The importance and consequences of Karnal's war):

কর্ণালের যুদ্ধে নাদির শাহের হাতে মুঘল সম্রাট মহম্মদ শাহের পরাজয়ের ফলে -
১) মুঘল সাম্রাজ্যর মর্যাদা বিনষ্ট হয়।
২) সিন্ধু নদীর পশ্চিম তিরিস্থ সমস্ত অঞ্চল মুঘল সাম্রাজ্যের হাতছাড়া হয়ে যায়।
৩) অর্থ ও পণ্য প্রায় ৭০ কোটি টাকার সম্পদ নাদির শাহ লুণ্ঠন করলে রাজকোষ শূন্য হয়ে যায়।
৪) মুঘল সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়।

No comments:

Post a Comment