প্রথম বিশ্বযুদ্ধে কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়ামের দায়িত্ব।

author photo
- Tuesday, December 18, 2018
advertise here

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জার্মান।


প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর প্যারিসের শান্তি বৈঠকে বিজয়ী মিত্রশক্তি জার্মানিকে যুদ্ধপরাধি ঘোষণা করে। মিত্রশক্তির সমর্থক ঐতিহাসিকরা কাইজার নীতিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য দায়ী করেন।

জার্মান জাতিয়তাবাদী ঐতিহাসিক ভ্যালেন্টাইন এই মতের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন যে, ত্রিশক্তি আঁতাত গঠনের পর ইউরোপের দুই বৃহৎ স্থলশক্তি ও বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জলশক্তি একযোগে জার্মানিকে বেষ্টন করে। এর ফলে আত্মরক্ষার জন্য কাইজার অস্টিয়ার পক্ষ নিয়ে যুদ্ধে যোগ দেন। সৈন্যবলের দিক থেকে ফ্রান্স ও রাশিয়া ত্রিশক্তি আঁতাতের এই দুই শক্তির স্থলসৈন্যর সংখ্যা জার্মানির অপেক্ষা অনেক বেশি ছিল।


জার্মান ঐতিহাসিক Wolfgang Haig বলেন যে, ইউরোপীয় শক্তিগুলি যথা ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়া মনস্তাত্বিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে তাদের নিজ নিজ প্রাধান্য কায়েমি সার্থকে রক্ষা করতে ব্যস্ত ছিল। জার্মানির মত একটি নতুন রাষ্ট্রের উন্নতি তারা সহ্য করতে পারেনি। জার্মানির দোষ ছিল যে, জার্মানী ইউরোপের বৃহৎ শক্তিগুলির অন্যতম হতে চাইছিল। এজন্য জার্মানির বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলুক মনোভাব নিয়ে এই শক্তিগুলি ভার্সাই সন্ধির দ্বারা জার্মানিকে ধ্বংস করতে চায়।


জার্মান ঐতিহাসিক জন ফে তার "Origin of First World War" গ্রন্থে বলেন যে, ত্রিশক্তি আঁতাত গঠিত হলে জার্মানী বিপন্ন হয়। আঁতাত শক্তিগুলি আলাপ-আলোচনা করে বিরোধের অবসান করতে পারতো। মিত্রশক্তি তা করেনি। ১৯১৩ খ্রি: পর কাইজারের ধারণা হয় যে, বলকানে যুদ্ধের জন্য অস্টিয়া প্রস্তুত হচ্ছে। অষ্টিয়াকে নিয়ন্ত্রন করা তার সাধ্য নয় দেখে শেষ চেষ্টা হিসেবে ফ্রান্স ও রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করেন। সেরাজেভোর হত্যাকাণ্ডের জন্য সার্বিয়া সরকারের গোপন চক্রান্ত ছিল। ফ্রান্সের আলসাস-লোরেন পুনরুদ্ধারের জন্য কঠোর মনোভাব, বল্কানে অস্টো-রাশিয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ব্রিটেনের নৌ-আধিপত্য ও উপনিবেশে প্রাধান্য রক্ষার জন্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।

আধুনিক জার্মান ঐতিহাসিক ইমানুয়েল জাইস, জেমস জোল, ফিশার প্রমুখ বলেন যে, ওয়েলট পলিটিক (Welt Politik) নীতির প্রতিক্রিয়া কাইজার বিচার করেনি। তিনি বিসমার্কের আত্মতৃপ্তি (Satiation) নীতি ত্যাগ করেন। কাইজারের নীতি ছিল "Either whole or nothing" "হই সবটা চাই, নতুবা কিছু চাই না।" তিনি নৌ-নির্মাণ, উপনিবেশ দখল, দূরপ্রাচ্যআফ্রিকার প্রসার নীতি গ্রহণ করেন। তিনি ওয়েলট পলিটিক বলতে কী বোঝায় তা ব্যাখ্যা না করাই, তার বিরুদ্ধে সন্দেহ ও অবিশ্বাস তীব্র হয়।




কাইজার রাশিয়ার সঙ্গে রি-ইন্সুরেন্স চুক্তির গুরত্ব বোঝেননি। তিনি এককভাবে রি-ইন্সুরেন্স চুক্তি নাকচ করেন, এতে জার অপমানিত বোধ করে। ১৮৯৩ খ্রি: ফ্রাঙ্কো-রুশ১৯০৭ খ্রি: ইঙ্গ-রুশ আঁতাত হলে কাইজার তার ভুল বুঝতে পারেন। রাশিয়া বুঝতে পারেন যে, অস্টিয়ার সঙ্গে দ্বিশক্তি চুক্তির ফলে জার্মানী অষ্টিয়ার স্বার্থকে নিজ স্বার্থ বলে মনে করত।

কাইজার ব্রিটেনের সঙ্গে মিত্রতা চাননি। চেম্বারলেনহাল্ডেন মিশন কাইজাররের মিত্রতা স্থাপনে ব্যর্থ হয়। কাইজারের আপোষ বিরোধী নীতির ফলে ব্রিটেন ত্রিশক্তি আঁতাত গঠন করেন। জার্মান প্রধানমন্ত্রী ফণ বুল "খোলা হাত" নীতি গ্রহণ করায় ব্রিটেনের আপোষ প্রস্তাবে সাড়া দেয় নি। ত্রিশক্তি আঁতাতের অনেক আগেই জার্মান সেনাপতি স্লিফেন পরিকল্পনা করেন। ফ্রাঙ্কো-রুশ আঁতাতের পরেই এই পরিকল্পনা হয়। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে এই পরিকল্পনাকে "Preventive War বা প্রতিরোধ মূলক যুদ্ধ" আখ্যা দেন।



জার্মান সরকার মনে করতেন তারা বিশ্বে নব বিধান স্থাপনের অধিকারী। টিউটনিক সভ্যতার ধারক, বাহকরুপে জার্মানী নিজেকে মনে করত। প্যান জার্মানবাদিরা বলত যে, জার্মান রাইখ, বিশ্ব রাইখে পরিণত হতে চলেছে। কাইজার ও এই মনোভাবে সামিল হন। কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও বিনীত বাক্য ব্যবহার তিনি বর্জন করেন। ত্রিশক্তি আঁতাত গঠিত হলেও ব্রিটেন ইউরোপের শান্তি শৃঙ্খলা চাইত। কাইজার মরক্কো সংকট রাশিয়া সংকট সৃষ্টি করায় ত্রিশক্তি আঁতাতকে সামরিক চুক্তিতে রূপান্তরিত করা হয়। কাইজার সহ জার্মান নেতারা জানতেন যে, নৌ-নির্মাণ ও ওয়েলট পলিটিক নীতি যুদ্ধ অনিবার্য করবে।

ইতিমধ্যে জার্মানী তার প্রধান মিত্র অষ্টিয়া ও বলকান সমস্যার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে। জার্মান নেতারা মনে করেন যে, ইউরোপে জার্মানির জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও বানিজ্য বিস্তারের উপযুক্ত স্থান হল বলকান।

১৯১৪ খ্রি: জুলাই মাসে সেরাজেভো হত্যাকাণ্ড হলে অষ্টিয়া সুযোগ পান। তথাপি অষ্টিয়ার বিদেশমন্ত্রী কাউন্ট বার্থলড সার্বিয়ার সঙ্গে ভার্সাই সংকটের মীমাংসার জন্য চেষ্টা করেন। কিন্তু কাইজার সার্বিয়ার বিরুদ্ধে চরমপত্র পাঠান ও যুদ্ধ ঘোষণা করতে অষ্টিয়াকে বাধ্য করেন। কাইজাররের প্রাশিয় সেক্রেটারি ১৮১৪ খ্রি: ১৮ জুলাই জার্মান সামরিক ও অসামরিক উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের এক গোপন নোট দ্বারা জানান যে, অষ্টিয়ার সঙ্গে সার্বিয়ার যুদ্ধ আসন্ন। সার্বিয়ার পিছনে আছে রাশিয়া। সুতরাং। বিভিন্ন দিক থেকে বিচার করলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ দায়িত্ব থেকে কাইজার মুক্ত নয়। তবে এই সঙ্গে বলা দরকার যে, অন্যান্য শক্তিগুলিরও হাত পরিষ্কার ছিল না।

উল্লেখ বই (Reference Book):

1. Rene Carrie - Diplomatic History of Europe.
2. Fay - Origin of the World War.
3. Gooch - History of Modern Europe.
4. Oxford - Genesis of the War.
5. David Thompson - Europe since Nepoleon.
Advertisement advertise here