১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের কারণ

author photo
- Friday, December 21, 2018
advertise here

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের কারণ (Cause of the Revolt of 1857):


সিপাহী বিদ্রোহ বা মহাবিদ্রোহের কারণগুলিকে মোটামুটি কয়েকটি প্রধান ভাগে-ভাগ করা যায় । যথা- (ক) অর্থনৈতিক কারণ, (খ) সামাজিক কারণ, (গ) রাজনৈতিক কারণ, (ঘ) ধর্মীয় কারণ, (ঙ) সামরিক কারণ, (চ) প্রত্যক্ষ কারণ।


(ক) মহাবিদ্রোহের অর্থনৈতিক কারণ (Economic Causes):

ভারতবর্ষে অর্থনৈতিক শোষণ চালানো ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। এজন্য ব্রিটিশ রাজত্বের সূচনা থেকেই তাঁরা দেশীয় অর্থনীতিকে ধ্বংস করে তার উপর ঔপনিবেশিক অর্থনীতি চাপিয়ে দেয়। তারা এদেশের প্রচলিত ব্যবসা-বাণিজ্য নষ্ট করে দিয়েছিল, কুটির শিল্পগুলি ধ্বংস করে এবং দেশের যাবতীয় মূলধন ও সম্পদ হস্তগত করে এদেশের অর্থনীতির উপর একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল। দেশীয় ব্যবসা বাণিজ্যের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এবং কুটির শিল্পগুলি ধ্বংস হওয়ার ফলে অসংখ্য মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছিল। দেশে বেকারি ও দারিদ্র বৃদ্ধি পায় এবং দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। প্রজাসাধারণ কৃষির উপর অত্যধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। কোম্পানির ভ্রান্ত নীতির ফলে একদিকে যেমন জমিদার ও মহাজন শ্রেণির উদ্ভব হয়েছিল, তেমনি অন্যদিকে ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। কোম্পানির কর্মচারী এবং জমিদার ও মহাজনদের শোষণ ও অত্যাচারে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেছিল । ইতস্তত সংঘটিত প্রজা বিদ্রোহ বা কৃষক বিদ্রোহের মাধ্যমে তাদের পুঞ্জিভূত ক্ষোভের প্রকাশ ঘটার পর ১৮৫৭ খ্রি: সিপাহি বিদ্রোহের মধ্যে দিয়ে তার সর্বাত্মক প্রকাশ ঘটে। এক মহাবিদ্রোহের সূত্রপাত ঘটে।


(খ) মহাবিদ্রোহের সামাজিক কারণ (Social Causes):

কোম্পানি রাজত্বের সূচনায় ইংরেজ শাসকবর্গ এদেশের সংস্কারের জন্য তেমন আগ্রহ দেখায়নি। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর সূচনা থেকে প্রগতিশীল ভারতবাসীর আগ্রহের আতিশয্যে ব্রিটিশ শাসকবর্গ সামাজিক কুপ্রথা এবং কুসংস্কারের অবসান কল্পে একের পর এক বিধি প্রণয়ন করতে থাকেন এবং ভারতীয়দের সামাজিক জীবনে আঘাত হানে। সতীদাহ প্রথার অবলুপ্তি, বিধবাবিবাহ প্রচার, স্ত্রীশিক্ষার প্রবর্তন, বাল্যবিবাহ নিবারণ প্রভৃতি ব্যবস্থা রক্ষণশীল হিন্দুদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে এবং তারা পুঞ্জীভূত ক্ষোভ প্রকাশ করার অপেক্ষায় থাকে। পাশ্চাত্য শিক্ষা-দীক্ষা, সংস্কৃতির প্রভাবে ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হয়। এতে রক্ষনশীল ভারতীয়দের মনে ইংরেজদের উদ্দেশ্যে সন্দেহর দানা বাঁধতে শুরু করে। তাঁদের ধারণা হয়, সমগ্র ভারতবর্ষকে ধর্মান্তরিত করার জন্য ইংরেজগণ পরিকল্পিত উপায়ে তোড়জোড় শুরু করে এবং তাদের ধর্মান্তরিত করার নীতি বলে মনে করেন।। তদুপরি সামাজিক ক্ষেত্রে ভারতীয়দের প্রতি বৃটিশ সরকারের অবজ্ঞা এবং উপেক্ষা, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বঞ্চনা তাঁদের মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাবের জন্ম দেয় । ভারতীয়দের সেই বিরূপ মনোভাব সিপাহি বিদ্রোহ বা মহাবিদ্রোহের পরোক্ষ ইন্ধন জোগায়।





(গ) সিপাহী বিদ্রোহের রাজনৈতিক কারণ (Political Causes):

শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদী শাসকবর্গ যেভাবে একের পর এক দেশীয় রাজ্যগুলিকে গ্রাস করতে থাকে এবং রাজবংশের উচ্ছেদ করতে থাকে, তাতে দেশীয় রাজন্যবর্গ এবং তাদের কর্মচারিরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ওয়ারেন হেস্টিংস থেকে লর্ড ডালহৌসি পর্যন্ত সকলেই সমস্ত প্রকার রীতিনীতি ও মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়ে ভারতীয় রাজ্যগুলি অধিকার করেন । লর্ড ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতির প্রয়োগ করে সাতারা, সম্বলপুর, নাগপুর, ঝাঁসী প্রভুতি রাজ্য দখল করেন। পেশবা দ্বিতীয় বাজিরাওয়ের দত্তক পুত্ত নানাসাহেবের ভাতা লোপ করা হয়। মোগল বাদশাহের অপমান ও অপসারণ মুসলিমদের মনে দারুন আঘাত হানে। লর্ড ডালহৌসি বশ্যতামুলুক সন্ধির দ্বারা অযোধ্যা রাজ্য অধিগ্রহণ করে। ফলে ব্রিটিশ বিরোধী অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত রাজন্যবর্গের সঙ্গে এইসব অসন্তুষ্ট মানুষ হাত মেলান। ফলে বিদ্রোহ তীব্র আকার ধারণ করে। রেবারেন্ড লালবিহারি দে (Rev. Lal Behari De) তার "ড: আলেকজান্ডার ডাফের জীবনী (Life of Dr. Alexander Duff)" গ্রন্থে বলেছেন যে, তিনি যখন বিদ্রোহের সময় উত্তর ভারতের চাকরি স্থল থেকে কলকাতায় ফিরছিলেন বিদ্রোহীরা তাকে আশ্রয় দেন। বিদ্রোহীদের নেতা মৌলভি শিক্ষিত বাঙালিদের ইংরেজের প্রতি ভাবের জন্য তাকে ভৎসনা করেন। বিপিনচন্দ্র (Bipan Chandra) তার "Modern India" গ্রন্থে বলেছেন যে, "জনসাধার যখন বিদ্রোহ দ্বারা কোন সরকারকে ফেলে দিতে চায়, তখুন শুধুমাত্র এই ফেলে দেওয়ার ইচ্ছা থেকে বিদ্রোহ হয়নি, তার সঙ্গে চাই এই বিশ্বাস যে, তাদের বিদ্রোহের দ্বারা সরকারকে ফেলে দেওয়ার প্রকৃত ক্ষমতা তাদের আছে।"




(ঘ) মহাবিদ্রোহের ধর্মীয় কারণ (Religious Causes):

১৮৩৭ খ্রি: দুর্ভিক্ষের সুযোগে উত্তর-পশ্চিম ভারতে বহু শিশুকে খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষিত করা হয়। ফলস্বরূপ ভারতের খ্রিস্টান মিশনারিদের কার্যকলাপ সামগ্রিকভাবে রক্ষনশীল ভারতীয়দের মনে ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাবের জন্ম দেয়। তাঁদের প্রগতিবাদী কার্যকলাপ মানুষের ধর্ম বিশ্বাসে প্রচন্ড আঘাত হানে এবং সরকারের বিরুদ্ধে বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি হয়। মুসলিমগণ যাঁরা দীর্ঘকাল রাজ্যশাসনের দায়িত্বে ছিলেন তাঁরা অপসারিত হওয়ায় ধর্মপ্রাণ মুসলিম সম্প্রদায় ব্রিটিশের প্রতি চাপা অসন্তোষ পোষণ করতে থাকেন । তাঁদের ক্ষমতাচ্যুতি এবং দুরাবস্থার জন্য তাঁরা ব্রিটিশকে দায়ী করতেন। তাঁদের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন ধুমায়িত হয়। ওয়াহাবি আন্দোলনের মাধ্যমে সেই বিদ্রোহ প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠে। তবে জুডিথ ব্রাউন (Judith Brown) তার "Modern India - Origins of An Asian Democracy" গ্রন্থে বলেন যে, কোম্পানির নীতির ফলে ভারতবাসীর ধর্মবিশ্বাসে র ক্ষতির কোন সম্ভাবনা ছিল না।" ড: আর. সি. মজুমদার তার "History of Freedom Movement, Vol. I. P. 277." গ্রন্থে জুডিথ ব্রাউনের মতের সমালোচনা করেন। এই সমস্ত ঘটনা ১৮৫৭ এর মহাবিদ্রোহের ইন্ধন জুগিয়েছিল।





(ঙ) মহাবিদ্রোহের সামরিক কারণ (Military Casues):

সেনাবিভাগে ব্রিটিশ ও ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে বেতন, পদোন্নতি, বদলি ইত্যাদির ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের বৈষম্যমূলক আচরণ ভারতের সৈন্যদের মনে মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয় । সিন্ধুআফগানিস্তানে নিযুক্ত সেনাদলকে বিশেষ ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও ভারতীয় সেনাগণ সেই ভাতা থেকে বঞ্চিত হতেন । তাঁদের ধর্ম বিশ্বাসকে মর্যাদা না দিয়ে তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সামরিক কর্তৃপক্ষ তাঁদের যত্রতত্র বদলি ও নিয়োগের ব্যবস্থা করতেন। জাত ও ধর্ম হারাবার ভয়ে সিপাহিগণ কালাপানি পার হয়ে ব্রহ্মদেশ বা অন্যত্র যেতে অস্বীকার করতে থাকে। অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় কারণে যখন তাঁরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত তখনই লর্ড ক্যানিং -এর প্রবর্তিত সামরিক নিয়োগ বিধি অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দিয়েছিল। এই বিধি বলে ভারতীয় সিপাহিদের যেকোনো কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে ইউরোপে ক্রিমিয়ার যুদ্ধে (১৮৫৪-১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দ) ইংল্যান্ডের জয়লাভ সত্ত্বেও ব্রিটিশ সামরিক বিভাগের দুর্বলতা ভারতীয় সেনাদের উত্সাহিত করে। তাঁদের ধারণা জন্মায় যে, ভারতে অনুরূপ ব্যাপক অভ্যুত্থান ঘটাতে পারলে সেই অভ্যুত্থান দমন করা ইংরেজ বাহিনীর পক্ষে সম্ভব হবেনা। আরো একটি ধারণা এক্ষেত্রে কাজ করেছিল যে, ভারতে ব্রিটিশ শাসন একশো বছর স্থায়ী হবে। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে সেই শাসনেরই শতবর্ষপূর্তি।





(চ) সিপাহী বিদ্রোহ বা মহাবিদ্রোহের প্রত্যক্ষ কারণ (Mainly Causes):

১ ৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বহু আগে থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও সামরিক কারণে সিপাহিদের ক্ষোভ যখন ক্রমশ পূঞ্জীভূত হয়েছিল। ঠিক সেই সময়ে এনফিল্ড রাইফেল (Enfield Rifle) নামে এক নতুন ধরনের রাইফেলের প্রবর্তন তাদের ক্ষোভে অগ্নিসঞ্চার করে। এনফিল্ড রাইফেলে যে কার্তুজ (Cartridge) ব্যবহার করা হত, সেই খোলসটি দাঁতে কেটে রাইফেলে ভরতে হত । গুজব রটে যায় যে, এই কার্তুজে গরু ও শুয়োরের চর্বি মেশানো রয়েছে। ধর্মচ্যুত হওয়ার আশঙ্কায় কোম্পানির সেনাবাহিনীর হিন্দু ও মুসলমান সিপাহিরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং এই টোটা বা গুলি ব্যবহার করতে অস্বীকার করেন। কলকাতার উত্তরে ব্যারাকপুর ছাউনিতে মঙ্গল পান্ডে নামে এক ব্রাহ্মণ সিপাহী উত্তেজিত হয়ে ১৮৫৭ খ্রি: ২৯ মার্চ ইংরেজ অফিসারকে আক্রমণ করে। এরপর বিভিন্ন ছাউনী ও জনসাধারণের মধ্যে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে।
Advertisement advertise here