PayPal

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের কারণ

author photo
- Friday, December 21, 2018

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের কারণ

পলাশীর যুদ্ধের পর একশাে বছরের মধ্যে দেশীয় রাজ্যগুলিকে চুরমার কৱে ইংরেজ বণিকের দল সারা ভারতব্যাপী সাম্রাজ্য স্থাপন করে। নানা কারণে দেশীয় জনসাধারণ ইংরেজ শাসনকে অন্তরের সঙ্গে গ্রহণ করতে পারে নী। সর্বত্র ইংরেজ শাসনের বিরদ্ধে অসন্তোষ দেখা যায়। এই অসন্তোষের ফলে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে বিদ্রোহ হয়। লর্ড ক্যানিং এর শাসনকালে এই মহাবিদ্রোহ ঘটেছিল। এই বিদ্রোহের পশ্চাতে পুঞ্জীভূত অসন্তোষগুলিকে (১) পরোক্ষ ও (২) প্রত্যক্ষ এই দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। আবার পরােক্ষ কারণগুলিকে ৬ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা - (১) রাজনৈতিক, (২) সামাজিক, (৩) অর্থনৈতিক, (৪) সামরিক, (৫) ধর্মীয় ও (৬) শাসন সংক্রান্ত।
সিপাহী বিদ্রোহের কারণ
প্রত্যক্ষ কারণ : সারা দেশে যখন ভয়ংকর বিপ্লবাত্মক পরিস্থিতি গড়ে উঠেছে তখন সেনাবাহিনীতে এনফিল্ড রাইফেল-এর ব্যবহার শুরু হলে ভারতীয় সৈন্যগণ চরম অসন্তুষ্ট হয়। এই রাইফেলের কার্তুজে গরু ও শুয়ােরের চর্বি মেশানাে একপ্রকার মােড়ক থাকত। কার্তুজটি ব্যবহারের পূর্বে মােড়কটি দাঁত দিয়ে কেটে নিতে হত। গােবুর চর্বি দাঁত দিয়ে কাটা যেমন হিন্দু সৈন্যদের কাছে ধর্মচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা তেমনি শুয়ােরের চর্বি ছিল মুসলমান সৈন্যদের কাছে ইসলাম বিরোধী এক মহা অপরাধ। তাই এই কার্তুজ ব্যবহারে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের সৈন্যবাহিনী একযােগে বিরােধিতা করে। সেই সব প্রতিবাদী সিপাহিদের সরকার বন্দি করলে সৈন্যবাহিনীর মধ্যে বিদ্রোহের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। তারই প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে ২৯ মার্চ ব্যারাকপুরের মঙ্গল পাণ্ডে নামে জনৈক সৈনিক বিদ্রোহ ঘােষণা করলে বিদ্রোহ সূচনা হয়। অতি অল্পকালের মধ্যেই দিল্লি, মীরাট, কানপুর, আগ্রা, লখনউ, রােহিলাখণ্ড প্রভৃতি প্রায় সমগ্র ভারতে এই বিদ্রোহ বিস্তৃত হয়ে পড়ে।

রাজনৈতিক কারণ : লর্ড ডালহৌসির স্বত্ববিলােপ নীতির প্রয়ােগে ও কুশাসনে অজুহাতে রাজন্যবর্গের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করেছিল। স্বত্ববিলােপ নীতির প্রয়ােগ করে সাতারা, সম্বলপুর, নাগপুর, ঝাসি প্রভৃতি রাজ্যের অধিকার এবং নানাসাহেবের বৃত্তি ইংরেজর বন্ধ করে দেয়। এমনকি তাঞ্জোর ও কর্ণাটকের রাজপরিবারের ভাতা ইংরেজরা বন্ধ করে। এছাড়া নাগপুর ও অযােধ্যার রাজপ্রসাদ লুণ্ঠন ব্রিটিশ স্বার্থপরতার নীচ মনােভাব প্রকাশ পায়। ফলে সারা ভারতে ব্রিটিশ বিরােধী মনােভাব জেগে ওঠে। অযােধ্যার নবাবের আশ্রিত পরিবারবর্গের দুর্দশা জনসাধারণের মনে বিদ্বেষ জাগিয়ে তােলে। অযােধ্যায় যে নতুন রাজস্বনীতির প্রচলন করা হয় তাতে বহু জমিদার ও তালুকদার তাদের জমিদারি চ্যুত হয়েছিলে। যে সকল দেশীয় রাজ্যগুলিকে ইংরেজরা অধিকার করে নিয়েছিল সেই রাজ্যের কর্মচারীগণ কর্মচ্যুত হয়ে পড়ে এবং ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে।

সামাজিক কারণ : ইংরেজগণ ভারতবর্ষে শাসন বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটাতে চেয়েছিল। রেলপথ নির্মাণ, টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা, সতীদাহ প্রথা দমন, বিধবা বিবাহ প্রভৃতি কার্য যৌক্তিকতার দিক দিয়ে গ্রহণযােগ্য হলেও ইংরেজদের অতিরিক্ত সংস্কারের অনুরাগ হিন্দু সমাজে ভারতীয়দের মনে প্রবল সন্দেহ ও ক্ষোভের সঞ্চার করে। উপরন্তু তাদের ধর্মনাশ হবার আশঙ্কা হয়েছিল। ব্রহ্মযুদ্ধে ভারতীয় সৈনিকদের সমুদ্র পাড়ি দিতে বাধ্য করা হলে তাদের ধর্মনাশের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তারা মনে করেছিল। খ্রিস্টান ধর্মযাজকগণ ও প্রচারকেরা খ্রিস্টধর্ম প্রচারের চেষ্টা করলে হিন্দু মুসলমানগণ মনে করল তাদের ধর্মনাশের চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ইরেজরা ভারতীয়দের কালা আদমি নামে তাচ্ছিল্য ও ঘৃণা করত। এমনকি তাদের ব্যভিচার স্ত্রীলােক নিয়ে হারেম গঠন ও অনৈতিক কার্যকলাপ জনসাধারণকে ক্ষুদ্ধ করে তােলে। ইংরেজের ভূমি রাজস্ব নীতিতে বহু জমিদার ধ্বংস হয়। করভারে জর্জরিত কৃষকগণ দরিদ্র হয়।

অর্থনৈতিক কারণ : ইংরেজদের সুপরিকল্পিত ও নির্লজ্জ অর্থনৈতিক শােষণ ও লুণ্ঠন ভারতীয়দের ক্ষুদ্ধ করে। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই একশাে বছর ধরে ইংরেজগণ বিপুল পরিমাণ সােনা, রূপা প্রভৃতি মূল্যবান ধাতু ভারতবর্ষ হতে স্বদেশে পঠাতে থাকায় ভারতের অর্থনৈতিক কাঠামাে ভেঙে পড়ে। ইংরেজদের সঙ্গে অসম বাণিজ্যিক প্রতিযােগিতায় ভারতীয়রা এটে উঠতে পারছিল না। ইংরেজরা বহুদিন ধরে দস্তকের অপব্যবহার করে ও শুল্করহিত ইংল্যান্ডে জাত পণ্যসামগ্রী নিয়ে বাণিজ্য করে ভারতীয় বণিকদের অর্থনৈতিক ক্ষতি করেছিল। বিলাতি শিল্পজাত দ্রব্য আমদানির ফলে দেশীয় ক্ষুদ্র শিল্পগুলি (কুটিরশিল্প ও তাঁত শিল্প) ক্রমেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, অন্যদিকে ইংরেজরা ম্যাঞ্চেস্টারে তৈরি বস্ত্র সুলভ মূল্যে ভারতে বিক্রি করে মুনাফা লুটতে থাকে। চৌকিদারি কর বৃদ্ধি, পথকর চাপানাে, যানবাহনের ওপর কর জনসাধারণের অসন্তোষের কারণ ছিল। ইংরেজ অপশাসনে কৃষক, শ্রমিক, কারিগার সর্বস্তরের মানুষ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শােষিত হয়েছিল। ডালহৌসি দ্বারা নিযুক্ত ইনাম কমিশন প্রায় বিশহাজার জমিদারি বাজেয়াপ্ত করায় দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা আরও খারাপ হয়। রাজ্যচ্যুত রাজাদের সঙ্গে তাদের অসংখ্য কর্মচারী ও আশ্রিত ব্যক্তিরাও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে পঙ্গু হয়ে পড়ে।

সামরিক কারণ : ইউরােপীয়দের তুলনায় ভারতীয় সৈনিকদের বেতনের স্বল্পতা ও বৈষম্যমূলক ব্যবহার সৈনিকদের মনে ক্ষোভের কারণ ছিল। ইংরেজ সামরিক কর্মচারীগণ সিপাহিদের প্রতি পশুর মতাে এবং উদ্ধত অপমানজনক ব্যবহার করত। ভারতীয় অফিসার ও সিপাহিদের পদোন্নতির কোনাে সুযােগ ছিল না। অন্যদিকে ইউরােপীয় কর্মচারী ও সৈনিকদের পদােন্নতি হত। দুরদুরান্তে যুদ্ধযাত্রা করতে হলে ইংরেজ সৈন্যদের অধিক পরিমাণে ভাতা দেওয়া হত। ভারতীয় সৈনিকদের সে সুযােগ ছিল না।

ধর্মীয় কারণ : সিপাহিদের নিকট পাদরিদের খ্রিস্টধর্ম সম্বন্ধে বক্তৃতা, জেলখানায় ও বিভিন্ন জায়গায় তাদের অবাধ প্রবেশ ও উপদেশ দান এবং ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা হিন্দু মুসলমানদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এ ছাড়া সতীদাহ প্রথা নিবারণ, বিধবা বিবাহ আইন, রেলপথ, টেলিগ্রাফ প্রবর্তন ভারতীয় জনগণের মধ্যে সন্দেহের উদ্রেক করেছিল। ভেলােরে সিপাহিদের চামড়ার টুপি ব্যবহার ও দাড়ি কামিয়ে ফেলবার আদেশ তাদের ক্রুদ্ধ করে। ব্যারাকপুরে সিপাহিদের সমুদ্র অতিক্রম করে ব্রম্মদেশ দেশে যাবার আদেশ ধর্মনাশের কারণ বলে তারা মনে করে।

শাসন সংক্রান্ত কারণ : ভারতের ওপর ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হবার ফলে ভারতীয় অভিজাত সম্প্রদায় তাদের পূর্বতন প্রভাব ও মর্যাদা হারায়। নতুন শাসনব্যবস্থায় অভিজাত সম্প্রদায়ের উচ্চ পদলাভের সম্ভাব্য সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ হয়। সরকারি সকল উচ্চপদ একমাত্র ইউরােপীয়দের জন্য নির্দিষ্ট করে রাখা হয়। সামরিক বিভাগেও উচ্চপদ লাভের কোনাে সম্ভাবনা ছিল না। বেসামরিক বিভাগে সর্বাপেক্ষা উচ্চপদ বলতে সদর আমিনের পদ মাত্র। নতুন শাসনব্যবস্থায় ভারতীয়দের পদোন্নতির সম্ভাবনা প্রায় ছিল না।

No comments:

Post a Comment