PayPal

ভারত শাসন আইন ১৯৩৫

author photo
- Saturday, December 22, 2018

১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন

লন্ডনে তিনটি গােলটেবিল বৈঠকে আলােচনার পর ১৯৩৩ খ্রীঃ ব্রিটিশ সরকার একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করেন। যদিও এই শ্বেতপত্র ভারতের রাজনৈতিক দলগুলির দ্বারা নিন্দিত হয়, ব্রিটিশ সরকার এই শ্বেতপত্রের আলােকে একটি শাসনতন্ত্র রচনার জন্যে লর্ড লিনলিথগোর সভাপতিতে একটি কমিটি নিয়ােগ করেন। এই কমিটিকে ভারতীয় প্রতিনিধিদের মতামত যাচাই করে কাজ করতে বলা হয়। এই উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ ভারত থেকে ২১ জন ও রাজন্য শাসিত অঞ্চল থেকে ৭ জন মনােনীত প্রতিনিধিকে নিয়ােগ করা হয়। এই কমিটি যদিও বহু লােকের সাক্ষ্য নেয় এবং কিছু সুপারিশ করে, কার্যতঃ শ্বেতপত্রের ভিত্তিতেই ১৯৩৫ খ্রীঃ শাসনতন্ত্র রচিত হয়।
১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন
ভারত শাসন আইনের বৈশিষ্ট্য : ১৯৩৫ খ্রীঃ ভারত শাসন আইনকে প্রধানতঃ দুভাগে ভাগ করা যায়, যথা কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা ও প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থা। ১৯৩৫ খ্রীঃ আইন দ্বারা ব্ৰহ্মদেশকে ভারতবর্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। উড়িষ্যা ও সিন্ধু নতুন প্রদেশ হিসেবে জন্মলাভ করে। ১৯১৯ খ্রীঃ মন্টফোর্ড আইন প্রবর্তিত প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থায় Dyarchy বা দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা লােপ করা হয়। প্রদেশের শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রে সকল দপ্তর দায়িত্বশীল নির্বাচিত মন্ত্রীসভার হাতে স্থানান্তরিত করা হয়। ভােটাধিকারের সম্প্রসারণ করে ৬ মিলিয়নের স্থলে ৩০ মিলিয়ন ভােটদাতাকে ভােটদানের অধিকার দেওয়া হয়। মাদ্রাজ, বােম্বাই, বাংলায় দুই কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা চালু করা হয়। অন্যান্য প্রদেশে এক কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা গঠন করা হয়। সরকারি মনােনীত সদস্যের সংখ্যা হ্রাস করা হয়। অনুন্নত শ্রেণী ও এ্যাংলাে-ইণ্ডিয়ানদের জন্যেও সদস্য মনােনয়ন প্রথা লােপ করা হয়। তবে মুসলিমদের জন্যে আসন সংরক্ষণ করা হয়। উচ্চ কক্ষের সদস্য নির্বাচনের জন্যে বড় সম্পত্তির মালিকদের ভােটদানের অধিকার দেওয়া হয়।

প্রদেশগুলিতে নির্বাচিত আইনসভা ও আইনসভার দ্বারা নির্বাচিত মন্ত্রীসভার হাতে সকল দপ্তর ছেড়ে দেওয়া হয়। প্রদেশ তালিকাভুক্ত সকল বিষয়ে তারা শাসন ও আইন রচনার অধিকার পান। কিন্তু আইনসভার আইন রচনার ক্ষমতা থাকলেও, আইনসভার পাশ করা আইনে গভর্ণরের সম্মতির দরকার হয়। গভর্ণরের সম্মতি ব্যতীত এই আইন বৈধ ছিল না। দ্বিতীয়তঃ, আইনসভার অধিবেশন আহ্বান অথবা মুলতুবী অথবা রদ করার, অথবা ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা গভর্ণরের ছিল। এ বিষয়ে মন্ত্রীসভার পরামর্শ অনুযায়ী তিনি চলতে বাধ্য ছিলেন না। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্বার্থ, আই-সি-এস কর্মচারীদের অধিকার রক্ষা, ব্রিটিশ বণিকদের স্বার্থরক্ষা প্রভৃতি ব্যাপারে গভর্ণর মন্ত্রীসভার পরামর্শ নিতে বাধ্য ছিলেন না। জরুরী অবস্থা দেখা দিলে গভর্ণর ৯৩ ধারা প্রয়ােগ করে আইনসভা ভেঙে দিয়ে নিজ হাতে শাসন ক্ষমতা নিতে পারতেন।

কেন্দ্রে ব্রিটিশ ভারত ও দেশীয় রাজন্যবর্গের মনােনীত প্রতিনিধিদের সমবায়ে একটি ফেডারেশন বা যুক্তরাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়। দেশীয় রাজাদের প্রতিনিধিদের জন্যে আইনসভার অর্ধেক আসন বরাদ্দ করা হয়। যদি দেশীয় রাজারা এই নির্ধারিত আসনের অন্ততঃ অর্ধেক সদস্য মনোনয়ন করেন তবেই কেন্দ্রে ফেভারেশন ব্যবস্থা চালু হবে বলা হয়। নতুবা কেন্দ্রে ফেভারেশন চালু করা হবে না। ফেলে দ্বৈতশাসন চালু করা হয়। হস্তান্তরিত বিষয়ে আইন রচনার পর বৈধতার জন্য ভাইসয়ের অনুমােদন দরকার ছিল। ভাইসরয় অনুমােদন দিলেও প্রয়ােজনে ইংল্যান্ডের ভারত সচিব এই আইন নাকচ করতে পারতেন।

কেন্দ্রীয় ফেডারাল আইনসভায় ৩০ - ৪০ % আসন রাজন্যবর্গের মনােনীত কর্মচারীদের দেওয়া হয়। কেন্দ্রের সঙ্গে ব্রিটিশ সিংহাসনের সম্পর্ক ছিল আইনসভার এক্তিয়ারের বাইরে। এই আইনে ভারতকে ডােমিনিয়ন স্টেটাস দানের কথা বলা হয়নি। তবে এই আশ্বাস দেওয়া হয় যে, নতুন সংবিধান চালু হলে প্রচলিত প্রথা অনুসারে ভারত ব্রিটিশ কমনওয়েলথের অন্য সদস্যদের মতই আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ক্ষেত্রে স্বাধীনতা পেতে পারে।

মুসলিম লীগের আপত্তি : ফেডারেশন প্রস্তাবে জিন্নাহ ও মুসলিম লীগ তীব্র আপত্তি জানান। কারণ ফেডারেশন হলে কেন্দ্রীয় লােকসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বণ্টন হলে, হিন্দু সদস্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেত। মুসলিম সদস্যরা সংখ্যালঘু হয়ে যেত। জিন্নাহ চান মুসলিমদের আধিপত্য। সুতরাং জিন্নাহ ১৯৩৫ খ্রীঃ কেন্দ্রীয় ফেডারেশন প্রস্তাবে সম্মতি দেননি। ত্রিপাঠীর মতে ব্রিটিশ সরকার, দেশীয় রাজনাবর্গ ও লীগ নেতাদের মধ্যে কেন্দ্রে ফেডারেশন গঠনের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র ছিল। ঐতিহাসিক রাসব্রক উইলিয়ামস পাতিয়ালার মহারাজা ও জামনগরের জাম সাহেবকে বুদ্ধি যােগাচ্ছিলেন।

কংগ্রেসের আপত্তি : কংগ্রেসের দিক থেকে ১৯৩৫ খ্রি: এর আইন অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ফেডারেশনে যোগদানে আপত্তি তোলা হয়। কংগ্রেসের আপত্তি ছিল নীতিগত। (১) প্রদেশে নির্বাচিত মন্ত্রীসভা গঠনের ব্যবস্থা থাকলেও মন্ত্রিসভার কাজে গভর্ণরের হস্তক্ষেপের অধিকার ছিল। তার সম্মতি ছাড়া কোনো আইন বৈধ ছিল না। (২) ডোমিনিয়ন স্টাটাস দানের কোন শর্ত ১৯৩৫ খ্রি: আইনে উল্লেখ করা হয়নি। (৩) কেন্দ্রে মন্ত্রীসভার হাতে পূর্ণ ক্ষমতা ছিল না। আইনসভার পাশ করা আইন বড়লাট নাকচ করতে পারতেন। আইনসভার সার্বভৌম ক্ষমতা ছিল না। (৪) দেশীয় রাজাদের অন্ততঃ অর্ধেক কেন্দ্রে যোগ দিতে রাজী হলে তবেই কেন্দ্রের ফেডারেশন হবে বলা হয়। (৫) কেন্দ্রের আইনসভার ১/২ আসন দেশীয় রাজ্যকে দেওয়া ছিল অগণতান্ত্রিক। এর দ্বারা কেন্দ্রীয় সরকারের দেশীও রাজাদের অমঙ্গলজনক প্রভাব বাড়ত। তারা মুসলীম লীগের ১/৩ সদস্যর সঙ্গে যোগ দিলে জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস সদস্যদের কোণঠাসা করে ফেলতেন। দেশের অগ্রগতিমূলক কোন আইন পাশ করা যেত না।

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া : ৯৩ ধারা অনুসারে গভর্ণর আইনসভা ভেঙে দিতে পারত ও নিজ হাতে ক্ষমতা নিতে পারত। এই সকল কারণে ১৯৩৫ খ্রি: ভারত শাসন আইনের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের তীব্র আপত্তি ছিল। জওহরলাল নেহরু ১৯৩৫ খ্রি: ভারত শাসন আইনকে "দাসত্বের এক নতুন অধ্যায়" বলে উল্লেখ করেন। শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ কেন্দ্রীয় ফেডারেশন গঠনের প্রস্তাব বর্জন করে, কিন্তু প্রদেশে নির্বাচনের মাধ্যমে আইনসভা ও মন্ত্রিসভা গঠনে রাজী হন। প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার কাজে গভর্ণর অযথা হস্তক্ষেপ করবেনা আশ্বাস দিলে কংগ্রেস এই আইন মেনে নেয়, এবং ১৯৩৭ খ্রি: নির্বাচনে কংগ্রেস জয়লাভ করে বিভিন্ন প্রদেশে মন্ত্রিসভা গঠন করে। এই নির্বাচনে মুসলিম লীগের পরাজয় ঘটে।

১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের গুরুত্ব : ভারতের শাসনতান্ত্রিক ক্রমবিকাশের ইতিহাসে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের প্রধান গুরত্ব হল -
১) এই আইন ভারতে যুক্তরাষ্ট্রিয় ও দায়িত্বশীল শাসনব্যবস্থার ভিত্তি রচনা করে।
২) প্রদেশগুলিতে স্বায়ত্তশাসনের নীতি বাস্তবায়িত হয়।
৩) এই আইনের উপর ভিত্তি করে পরবর্তীকালে ভারতীয় সংবিধান গড়ে উঠে।
৪) এই আইনের ভিত্তিতে দুই কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা গঠিত হয়।
৫) ভারতে প্রথম ১৯৩৭ সালে নির্বাচন হয়।
৬) জাতীয় দল হিসেবে কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়।

No comments:

Post a Comment