ভাইমার প্রজাতান্ত্রিক জার্মানির উত্থান ও পতন

- November 19, 2018
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়াম জার্মানীতে জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানীর পরাজয় গর্বিত জার্মান জাতির মনে দারুণ অসন্তোষ সৃষ্টি করে। এজন্য জার্মানীতে কাইজারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘটে। কিযেল বন্দরের জার্মান নৌ সেনা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সােভিয়েত রাশিয়ার অনুকরণে শ্রমিক ও সেনাদের নিয়ে কিয়েলে একটি সােভিয়েত স্থাপিত হয়। কিয়েলের অনুকরণে জার্মানীর কয়েকটি শহরে সােভিয়েত স্থাপিত হয়। দক্ষিণ জার্মানীর ব্যাভেরিয়ায় একটি সমাজতন্ত্রী সােভিয়েত স্থাপিত হয়। জার্মানীতে অন্তবিদ্রোহ দেখা দিলে কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়াম পদত্যাগ করে হল্যান্ডে আশ্রয় নেন। জার্মানীর সমাজতান্ত্রিক নেতা ফেড্রারিখ এবার্টের নেতৃত্বে ১৯১৯ থেকে ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জার্মানীতে একটি প্রজাতন্ত্রী ঘােষিত হয়। জার্মানির ভাইমার শহরের নামানুসারে ভাইমার প্রজাতন্ত্র (Weimer Republican) নাম রাখা হয়।
জার্মানির ভাইমার প্রজাতন্ত্র
জার্মান সমাজতন্ত্রী দলের বিদ্রোহ: জার্মান কমিউনিস্ট দল যার নাম ছিল স্পার্টাসিস্ট দল, তার উদ্দেশ্য ছিল এক সমাজতান্ত্রিক সরকার স্থাপন। কিন্তু তাদের সমর্থকের সংখ্যা এত কম ছিল যে, তাদের দ্বারা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করা সম্ভব ছিল না। যাই হােক, স্পার্টাসিস্ট দল সামরিক অভ্যুত্থানের দ্বারা সরকারি ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করে। স্পার্টাসিস্ট নেতা কার্ল লাইবনিখট ও রােজা লাক্সেমবার্গের নেতৃত্বে এই দল ১৯১৯ খ্রীঃ জানুয়ারি মাসে বার্লিন নগরী দখলের চেষ্টা করে। প্রজাতান্ত্রিক সরকারের প্রধান এবার্ট ও তাহার সহকর্মীরা বার্লিনে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত সরকারের সমর্থক স্বেচ্ছাবাহিনী বা ফ্রি কোর লালপন্থী স্পার্টাসিষ্টদের হঠিয়ে বার্লিন নগরীকে অবরােধ মুক্ত করে। ফ্রি কোর বা স্বেচ্ছা সেনাদল ছিল প্রধানতঃ বুর্জোয়া সমর্থিত। এই সেনাদল বহু স্পার্টাসিষ্টদের হত্যা করে। উত্তেজিত জনতা দুই প্রধান কমিউনিষ্ট বা স্পার্টাসিষ্টদের নেতা রােজা লাক্সেমবার্গ ও লাইবনিখটকে হত্যা করে। সরকারি বাহিনী ব্যাভেরিয়ার প্রতিবাদী কমিউনিষ্ট সরকারকেও দমন করে। এছাড়া মিউনিখে কমিউনিষ্ট বিদ্রোহ দমন করা হয়।

ভাইমার প্রজাতন্ত্রের সংবিধান: কমিউনিষ্ট বিদ্রোহ দমনের পর অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট এবার্ট প্রজাতন্ত্রের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করেন। এই নির্বাচনের ফলে জাতীয় সভার মােট ৪২৩ জন সদস্যের মধ্যে ১৬৫ জন এবার্টের সমর্থক নির্বাচিত হয়। জাতীয় সভা এবার্টকে স্থায়ী রাষ্ট্রপতি পদে নিয়ােগ করে। জাতীয় সভা বিখ্যাত ভাইমার (Weimer) সংবিধান গ্রহণ করে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে ১১ আগস্ট। ভাইমার সংবিধান ছিল কাগজ কলমে অসাধারণ গণতান্ত্রিক সংবিধান। এই সংবিধানে জার্মান রাইখকে একটি ঐক্যবদ্ধ শৃঙ্খলাপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়। সংবিধানের মূল কথা ছিল যে, জনসাধারণের সার্বভৌমত্বের ওপরেই সরকার নির্ভরশীল থাকবে। এই সংবিধানে বলা হয় যে, জার্মান প্রজাতন্ত্র জার্মান জনগণের সার্বভৌম শক্তির দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। ভাইমার প্রজাতন্ত্রের কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে সেনাদল, অর্থদপ্তর এবং যােগাযােগ, বৈদেশিক নীতি, মুদ্রা, শুল্কনীতি, রেল প্রভৃতি দপ্তরের ভার রাখা হয়।

কেন্দ্রে অঙ্গরাজ্যগুলির প্রতিনিধিদের নিয়ে রাইখষ্ট্যাগ সভা গঠিত হলেও এই সভার আইন রচনার ক্ষমতা ছিল না। নিম্নকক্ষ আইন পাশ করলে তা কিছুদিন মূলতুবী রাখতে পারত। আসল ক্ষমতা ছিল নিম্নকক্ষ বা রাইখষ্ট্যাগের হাতে। এই সভার সদস্যরা ২০ বছর বয়সী জার্মান নরনারীদের গােপন ভােটে নির্বাচিত হত। ভাইমার সংবিধানে রাষ্ট্রপতি ৭ বছরের জন্যে সর্ব সাধারণের ভােটে নির্বাচিত হবেন বলা হয়। অর্থাৎ ভাইমার সংবিধানে মার্কিন সংবিধান থেকে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি এবং ব্রিটিশ ও সুইস সংবিধান থেকে পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রের আদর্শ গ্রহণ করে। যদিও তাত্বিক দিক থেকে রাষ্ট্রের কার্যনির্বাহক ক্ষমতা ছিল রাষ্ট্রপতির হাতে, আসলে তা ছিল চ্যান্সেলর বা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীসভার হাতে। রাষ্ট্রপতি এই চ্যান্সেলরকে মনােনয়ন করতেন। কিন্তু চ্যান্সেলর ও তার মন্ত্রীসভা তাদের কাজের জন্যে রাইখষ্ট্যাগের কাছে দায়ী থাকবেন। ভাইমার সংবিধানে একসঙ্গে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ও নির্বাচিত পার্লামেন্টের ব্যবস্থা এই সংবিধানকে আদর্শ গণতান্ত্রিক সংবিধানে পরিণত করে।

৮ নং ধারা অনুযায়ী জরুরী অবস্থা দেখা দিলে নাগরিক স্বার্থ রক্ষার জন্যে রাষ্ট্রপতি বিশেষ ক্ষমতা প্রয়ােগ করতে পারতেন। যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার জার্মানীর সকল প্রদেশের ওপর সরাসরি কর আদায়ের অধিকার পায়। এই সংবিধানে সুইস সংবিধানের মত রেফারেন্ডামের ব্যবস্থা ছিল। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি সম্পর্কে জনমত যাচাই করে তবে বাবস্থা গ্রহণের কথা সংবিধানে বলা হয়। আইন প্রনয়ণে জনগণের প্রস্তাবকে গুরুত্ব দেওয়ার বিধান রাখা হয়। এই সংবিধানে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষার গ্যারান্টি দেওয়া হয়, যথা - বাক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় অধিকার রক্ষার স্বাধীনতা, আইনের চক্ষে সকল নাগরিকের সমান অধিকার, ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকার প্রভৃতি।

ভার্সাই সন্ধি স্বাক্ষর: ভার্সাই সন্ধিকে জার্মান পার্লামেন্টের চূড়ান্ত অনুমােদন দানের বিষয়টি প্রজাতান্ত্রিক সরকারের সম্মুখে বিশেষ প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদী ও নাৎসী দল এই সন্ধি অনুমােদনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। এমনকি একজন জার্মান সেনাপতি এই পরিকল্পনা দেন যে, ভাসাই সন্ধি অগ্রাহ্য করে পূর্ব জার্মানী থেকে মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরােধ চালান দরকার। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি এবার্টের উন্মাদনাময়ী ভাষণে অভিভূত হয়ে জাতীয় পরিষদের সদস্যরা ভার্সাই সন্ধিতে স্বীকৃতি দেন। এবার্ট বুঝেছিলেন যে, পরাজিত জার্মানীর পক্ষে ভার্সাই সন্ধি স্বাক্ষর ছাড়া গতি নেই। কিন্তু সাধারণ জার্মানরা সেকথা বুঝত না। তাদের চোখে ভার্সাই সন্ধি ছিল এক অতি নিষ্ঠুর, রক্তাক্ত সন্ধি, যে সন্ধিতে প্রজাতন্ত্রী সরকার স্বাক্ষর দেয়। ভাইমার প্রজাতন্ত্রের যেটুকু জনপ্রিয়তা ছিল, তা এজন্য বিনষ্ট হয়।

ক্যাপ বিদ্রোহ: ভার্সাই সন্ধির শর্ত অনুসারে, প্রজাতন্ত্রী সরকার নৌবাহিনীর একাংশ ভেঙে দেওয়ার আদেশ দিলে উলফগ্যাং ক্যাপ নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বে জার্মান নৌ সেনা বার্লিন দখল করে এক প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার (১৯২০ খ্রীঃ) ঘােষণা করে। জার্মান কমিউনিষ্টরা এই সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে ধর্মঘট ডাকলে এর পতন ঘটে। যুদ্ধ ফেরৎ বেকার পদচ্যুত সেনাদল আর গ্রামের নিরানন্দময় জীবনে ফিরে যেতে রাজী ছিল না। এই বাতিল সেনাদলকে বলা হত Free Corps বা ফ্রাই কোর। এদের সঙ্গে প্রজাতন্ত্র বিরােধী দক্ষিণপন্থীদের, বিশেষতঃ নাৎসী দলের ঘনিষ্ঠ যােগ ছিল। প্রজাতন্ত্রী সরকারের সামরিক অফিসাররা বেশীরভাগ প্রজাতন্ত্রের অনুগত ছিলেন না। তারা গােপনে ফ্রিকোরকে অন্ত্র সরবরাহ করতেন। দক্ষিণপন্থীরা ভাবতেন যে, প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের জন্যে ফ্রিকোরের সহায়তা লাগবে। নাৎসী দল ক্ৰমে এদের নিজস্ব জঙ্গী বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করে এবং ব্যাভেরিয়াকে কেন্দ্র করে দক্ষিণপন্থীরা প্রজাতন্ত্র বিরােধী চক্রান্ত চালায়। এইভাবে দক্ষিণপন্থী বিদ্রোহ প্রজাতন্ত্রী সরকারকে ব্যতিব্যস্ত করে।

বামপন্থী বিদ্রোহ: জার্মানীতে বামপন্থী বিদ্রোহ দেখা দেয়। জার্মান কমিউনিষ্ট দল ব্যাভেরিয়াতে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার ঘােষণা করে। কেন্দ্রীয় সরকার এই স্বতন্ত্রবাদী আন্দোলন দমনে বিফল হয়। শেষ পর্যন্ত হিটলারের নাৎসী বাহিনী গৃহযুদ্ধ দ্বারা ব্যাভেরিয়ার বিপ্লব ধ্বংস করে। এর ফল এই হয় যে, নাৎসী দল সাধারণ লােকের আস্থা অর্জন করে। প্রজাতন্ত্রী সরকার অযােগ্য প্রমাণিত।

অর্থনৈতিক দুরাবস্থা: ১৯৩০ খ্রীঃ বিশ্ব অর্থনৈতিক সঙ্কট দেখা দেয়। এজন্য জার্মান প্রজাতন্ত্র মার্কিন ঋণ থেকে বঞ্চিত হয়। এর ফলে জার্মানীর ব্যাঙ্ক ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলি বন্ধ হয়ে যায়। দেশে হাহাকার দেখা দেয়। মধ্যবিত্ত শ্রেণী ভাইমার সরকার সম্পর্কে হতাশাগ্রস্ত হয়ে নাৎসী দলের প্রচারে প্রভাবিত হয়। মুদ্রাস্ফীতির ফলে বেতনভােগী ও পেনশনভােগী মধ্যবিত্তদের সঙ্গে শ্রমিক শ্রেণীরও দুর্গতি বাড়ে। ভাইমার প্রজাতন্ত্রের এই দুর্গতির সুযােগে বামপন্থী ও দক্ষিণপন্থী উভয় গােষ্ঠীর চরমপন্থীরা কেন্দ্রীয় সরকার দখলের জন্যে চেষ্টা চালায়। জার্মানীর হামবুর্গে (Hamburg) একটি কমিউনিষ্ট অভ্যুত্থান ঘটে। ব্যাভেরিয়া থেকে নাৎসী দলও অভুথানের ডাক দেয়। এই সময় প্রধানমন্ত্রী গুস্তাফ ট্রাসম্যান সংবিধানের ৪৮ ধারা অনুযায়ী জরুরী ক্ষমতা হাতে নিয়ে দৃঢ় হাতে হামবুর্গের বিদ্রোহ দমন করেন। ব্যাভেরিয়ার রাজ্য সরকারকে নাৎসী পুটস বা ক্ষমতা অধিকারের প্রচেষ্টা দখলে বাধ্য করেন।

গুস্তাভ স্ট্রেসম্যান নীতি: দেশের এই সঙ্কট সময়ে গুস্তাভ স্ট্রেসম্যান নামে এক বিশিষ্ট রাজনীতি হাল ধরার চেষ্টা করেন। তিনি পশ্চিমী শক্তির সঙ্গে আপােষ নীতি নিয়ে তাদের সাহায্যে জার্মানির উন্নয়নের চেষ্টা করেন। তাঁর নীতির নাম ছিল পরিপূর্ণতা নীতি (Policy of Fulfilment)। এর সাহায্যে তিনি ক্ষতিপূরণ সমস্যা ও ভার্সাই সন্ধি কঠোর শর্তগুলি সংশােধনের আশা করেন। স্ট্রেসম্যানের এই নীতি মােটামুটিভাবে সফল হতে থাকে। ১৯২৪ খ্রীঃ ডাওয়েজ পরিকল্পনা দ্বারা জার্মানীকে প্রদেয় ক্ষতিপূরণ কর অর্থের পরিমাণ কমানো হয়। জার্মানীকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঋণ দেয়। ১৯২৫ খ্রীঃ বিখ্যাত লোকার্নো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির ফলে আপাততঃ ফরাসী জার্মান বিরোধ প্রশমিত হয়। জার্মানী, ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের সঙ্গে ভার্সাই সীমান্ত স্বীকার করে। পােল্যান্ড ও চেকোস্লোভাকিয়ার সঙ্গে সকল প্রকার বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে মিটিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ১৯২৮ খ্রীঃ জার্মানি কেলগ ব্রিয়া চুক্তিতে স্বাক্ষর দেয়। জার্মানী লীগ অফ নেশনসের সদস্য পদ লাভ করে। ক্ষতিপূরণ সমস্যার চুড়ান্ত সমাধানের জন্যে ১৯২৯ খ্রীঃ ইয়ং পরিকল্পনা রচিত হয়। এর দ্বারা জার্মানীর প্রদেয় মােট ক্ষতিপূরণের পরিমাণ হ্রাস করা হয়। জার্মানীকে সহজ কিস্তিতে ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশােধ করতে দেওয়া হয়।

Advertisement
১৯২৯ খ্রীঃ গুস্তাভ স্ট্রেসম্যানের অকস্মাৎ মৃত্যু ঘটার ফলে জার্মানী থেকে শেষ বিচক্ষণ রাজনীতিবিদের তিরােধান ঘটে। ভাইমার প্রজাতন্ত্রকে রক্ষা করার মত কোন নেতা না থাকায়, এই প্রজাতন্ত্রের ধ্বংসের পথ প্রস্তুত হয়। জার্মান যুবশক্তি প্রজাতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি আস্থাহীন হয়ে পড়ে। বেকার সমস্যা, অর্থনৈতিক দুর্দশায় জর্জরিত জার্মানী প্রতিক্রিয়াশীল নাৎসীবাদ ও বামপন্থী সমাজতন্ত্রবাদের মধ্যে দোলায়িত হতে। এই সময় জার্মানীকে স্থিতি দান করার মত শক্তি নব নিযুক্ত রাষ্ট্রপতি ফিল্ড মার্শাল হিন্ডেনবুর্গের ছিল না।

ভাইমার প্রজাতন্ত্রের পতন: ভাইমার সংবিধান দ্বারা একটি আদর্শ প্রজাতান্ত্রিক সংবিধান রচিত হয়। কিন্তু এই সংবিধানকে কার্যকরী করার জন্য উপযুক্ত সামাজিক পরিকাঠামাে গঠন করা হয়নি। শাসনব্যবস্থায় কাইজারের যুগের রাজতন্ত্রবাদী আমলারাই বহাল ছিল। এই আমলারা প্রজাতন্ত্রের নির্দেশ মান্য করত না। জার্মানীর বিচারবিভাগে ও সমাজব্যবস্থায় কাইজারের যুগের সামন্ততান্ত্রিক ও বুর্জোয়া শিল্পপতিরাই প্রাধান্য ভােগ করত। এই শ্রেণীগুলির প্রজাতন্ত্র সম্পর্কে ঘাের অনীহা ছিল। এরা ছিল রাজতন্ত্রবাদী অথবা স্বৈরতন্ত্রবাদী। ডেভিড টমসনের মতে, এই সামাজিক পরিকাঠামাের মধ্যে প্রজাতন্ত্রের টিকে থাকার সম্ভাবনা ছিল ক্ষীণ। আর. ডি. কর্ণওয়েল বলেছেন যে, ভাইমার প্রজাতন্ত্র জার্মানীর পরাজয়কালে জন্মলাভ করায় এবং জনসাধারণের সক্রিয় সমর্থন না পাওয়ায়, গােড়া থেকে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ হতে থাকে।

আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে ভাইমার সংবিধানের অপর একটি বড় ক্রটি ছিল সংবিধানের ৪৮নং ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির জরুরী অবস্থা ঘােষণা করে সংবিধানকে মূলতুবী রাখার অধিকার এবং প্রয়ােজনে সংবিধানের কোন কোন বিশেষ ধারা রদ বা মূলতুবী করার অধিকার। ৪৮নং ধারাকে নীতি সম্মত ও নায্যভাবে প্রয়ােগ করতে হলে, রাষ্ট্রপতির পদে একজন নীতিপরায়ণ, গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল ও সংবিধানের প্রতি আনুগত্যপরায়ণ লােকের দরকার ছিল। জার্মানীর জনগণের এর আগে গণতন্ত্র সম্পর্কে কোন অভিজ্ঞতা ছিল না। কাজেই তার সুযােগ নিয়ে যদি কোন ন্যায়নীতিহীন রাষ্ট্রপতি ক্ষমতায় আসতেন, তবে তিনি ৪৮নং ধারার অপব্যবহার করে প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করতে পারতেন। কার্যতঃ হিন্ডেনবুর্গের মৃত্যুর পর হিটলার ক্ষমতায় এসে ৪৮নং ধারার সাহায্যে সংবিধান রদ করে দেন।

ভাইমার প্রজাতন্ত্র যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ধাক্কা সামলাতে পারেনি। একদিকে মহাযুদ্ধের পর জার্মান অর্থনীতিতে দেখা দেয় বিরাট ধ্বস। তার সঙ্গে যুক্ত হয় ক্ষতিপূরণের দাবী। জার্মানীতে সােনার সঞ্চয় কমে যাওয়ার ফলে জার্মান মার্কের দাম ভয়ানকভাবে পড়তে থাকে। জার্মানীতে অর্থনৈতিক এই মার্কের দামের সুস্থিতি আনতে না পারায় মুদ্রাস্ফীতির চাপে জার্মান অর্থনীতি ধ্বসে পড়ে। ১৯১৪ খ্রীঃ ১ ব্রিটিশ পাউণ্ড সমান ছিল ১৫ জার্মান মার্ক। ১৯২৩ খ্রীঃ নভেম্বরে ১ ব্রিটিশ পাউণ্ড সমান হয় ১৬, ০০০ মিলিয়ন মার্ক। মুদ্রার দাম পড়ে গেলে প্রজাতন্ত্র সীমাহীন কাগজের নােট ছাপাই করে মূল্যমানে সুস্থিতি রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করে। তাতে ফল হয়নি। ১ কাপ কফি কিনতে এক তাড়া কাগজের মার্কের দরকার হয়। শেষ পর্যন্ত জার্মান মুদ্রার গ্রহণযােগ্যতা বিনষ্ট হয়।

১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের মহামন্দার ধাক্কা ভাইমার প্রজাতন্ত্রের আসন্ন পতনের পথকে বিস্তৃত করে। ই. এইচ. কারের মতে, এর ফলে জার্মানী রপ্তানি বাণিজ্য ৬৩০, ০০০, ০০০ পাউণ্ড থেকে এক বছরে (১৯৩২ খ্রীঃ) ২৮০, ০০০, ০০০ পাউণ্ডে নেমে যায়। জার্মানীর নথীভুক্ত বেকারের সংখ্যা ২, ০০০, ০০০ থেকে ৩ বছরে ৬, ০০০, ০০০ সংখ্যায় দাড়ায়। যে সরকারের রাজনৈতিক শিকড় সমাজের গভীরে ছিল না, বিরােধী দলগুলির অনেকেই ভাইমার সংবিধানের প্রতি অনুগত ছিল না, সেই সরকারের পক্ষে এত বড় অর্থনৈতিক ধ্বস থেকে নিজেকে রক্ষা করা ছিল প্রায় অসম্ভব। রবার্ট এরগ্যাং এর মতে, অর্থনৈতিক মন্দা ভাইমার প্রজাতন্ত্রের প্রতি মৃত্যুবাণ ছুড়ে দেয়। ভাইমার সরকার এই মহামন্দার মােকাবিলায় ব্যর্থ হলে প্রজাতন্ত্র বিরােধী দলগুলি বিশেষতঃ নাৎসীদল ভাইমার সরকারের পতন ঘটাতে তীব্রতর চেষ্টা শুরু করে। ভার্সাই সন্ধি, যুদ্ধে পরাজয়, মহামন্দা সকল কিছুর জন্য তারা ভাইমার প্রজাতন্ত্রকে দায়ী করে প্রচারে ঢাক পেটাতে থাকে। নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণী যারা এতদিন ছিল ভাইমার প্রজাতম্বের প্রধান খুঁটি, তারা মহামন্দার ফলে বিভ্রান্ত হয়ে, নাৎসী প্রচারে প্রভাবিত হয়। বেকার শ্রমিকরাও মন্দার খপ্পরে কর্মহীন হয়ে প্রজাতন্ত্রের প্রতি আস্থা হারায়।

দক্ষিণপন্থী নেতা এডলফ হিটলার তার বিয়ার হল অভ্যুত্থান দ্বারা জার্মানীতে নাৎসী বিপ্লবের সূচনা করেন। তিনি জার্মান বেকার যুবক ও যুদ্ধ ফেরৎ সেনাদল নিয়ে তার আধা সামরিক S. A. বা ঝটিকা বাহিনী গঠন করেন। জার্মানীতে সাধারণ নির্বাচনের সময় তিনি জার্মান কমিউনিষ্ট ও সমাজতন্ত্রীদের সভাগুলিকে S. A. ঝটিকা বাহিনী দ্বারা ভেঙে দেন। কলকারখানার শ্রমিক ইউনিয়নগুলিকেও তিনি এই বাহিনী দ্বারা ভেঙে ফেলেন। জার্মান পার্লামেন্ট অগ্নিদগ্ধ হলে তিনি কমিউনিষ্টদের এজন্য দায়ী করে মিথ্যা প্রচার চালান। ১৯৩০ খ্রীঃ অর্থনৈতিক সঙ্কটে জার্মানীর ভাইমার সরকারের অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। এই সুযােগে নাৎসীদল বেকারদের চাকুরীদনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনপ্রিয়তা বাড়ায়। সাধারণ নির্বাচনে তারা ১২ জন সদস্যের স্থলে আইনসভায় ১০৭ জন সদস্য লাভ করে। এর ফলে নাৎসী দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে নির্বাচিত হয়। রাষ্ট্রপতি হিডেনবুর্গ নাৎসী নেতা এডলফ হিটলারকে প্রধানমন্ত্রী বা চ্যান্সেলর নিয়োগ করেন। হিটলার চ্যান্সেলর হয়ে ভাইমার সংবিধানের ৪৮নং ধারা প্রয়োগ করে জরুরী অবস্থা ঘােষণা করে সংবিধান ও পার্লামেন্ট মূলতুবী করেন। এর ফলে হিটলার সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হন। রাষ্ট্রপতি হিন্ডেনবুর্গের মৃত্যু হলে হিটলার একাধারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী উভয় ক্ষমতা নিজহাতে সংহত করে নাৎসী শাসন চালু করেন। এভাবে জার্মানীর ভাইমার প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটে।
Advertisement