Advertise

রুশ জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি কি?

পোল্যান্ড উপলক্ষে জার্মানির সঙ্গে পশ্চিমা শক্তির যুদ্ধ বাধার উপক্রম হলে, জার্মানি (হিটলার) ও রাশিয়া (স্ট্যালিন) ২৪ আগস্ট, ১৯৩৯ খ্রীঃ ২৩ আগস্ট রুশ জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষর করে। নাৎসী জার্মানী এতদিন ধরে সােভিয়েত সরকারের বিরুদ্ধে যে আক্রমণাত্মক মনােভাব দেখাচ্ছিল এবং সােভিয়েত সাম্যবাদের বিরুদ্ধে যে ঘৃণা প্রকাশ করছিল, তার ফলে এই দুই শক্তির মধ্যে সংঘাতকেই লােকে প্রাকৃতিক নিয়মের মতই সত্ব:সিদ্ধ বলেই মনে করত। এখন উভয় শক্তির মধ্যে অনাক্রমণ চুক্তি বিস্ময়ের উদ্রেক করে।
রুশ জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি ও সমালোচনা
রুশ জার্মান অনাক্রমণ চুক্তির কারণ : এ্যালান বুলকের মতে, এই চুক্তি ছিল হিটলারের One by One নীতির প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি দুই রণাঙ্গনে একই সঙ্গে যুদ্ধ চাননি। যদি তার বিরুদ্ধে ব্রিটেন ফ্রান্স রাশিয়ার আঁতাত গঠিত হত, তবে হিটলারকে পূর্ব রণাঙ্গনে রাশিয়া ও পশ্চিমে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের বিরুদ্ধে একই সময়ে যুদ্ধ করতে হত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে দুই রণাঙ্গনের যুদ্ধে জড়িয়ে কাইজার বিপদে পড়েন। জার্মান সেনাপতিদের এতে আপত্তি ছিল। সুতরাং কুটবুদ্ধি হিটলার এই অনাক্রমণ চুক্তির দ্বারা রাশিয়াকে নিরপেক্ষ রাখেন এবং তিনি পূর্ণশক্তি নিয়ে পশ্চিম রণাঙ্গনে ঝাপিয়ে পড়েন। ১৯৪১ খ্রীঃ পশ্চিমের যুদ্ধে সফলতার পর তিনি রুশ জার্মান অনাক্রমণ সন্ধি ভেঙে রাশিয়া আক্রমণ করেন। তখন রাশিয়া ছিল মিত্রহীন।

হিটলার এই চুক্তির দ্বারা পূর্ব ইউরোপে তার বিস্তার নীতিকে সফল করেন। মিউনিখ চুক্তির পর পূর্ব ইওরােপে তার বিনা যুদ্ধে প্রসারের আর কোন সুযােগ ছিল না। পূর্ব ইউরোপে প্রসারে তার প্রধান বাধা আসত সােভিয়েত সরকারের কাছ থেকে। এখন এই চুক্তির ফলে উভয় স্বাক্ষরকারী নিজ নিজ অঞ্চল ভাগ করে নিতে পারে। রুশ জার্মান অনাক্রমণ চুক্তির দ্বারা হিটলার তার শত্রু ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে মিত্রহন করেন। এ. জে. পি. টেইলারের মতে, হিটলার আশা করেন যে, রুশ মিত্রতা না পাওয়ায়, ব্রিটেন ও ফ্রান্স জার্মানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার কথা ভাববে না। শেষ পর্যন্ত মিউনিখ চুক্তি করে পশ্চিমী গণতন্ত্র পিছু হটবে। তাহলে তিনি বিনা যুদ্ধে তার অভীষ্ট পূরণ করতে পারবেন।

এসমন্ড রবার্টসনের মতে, প্রথমত, সােভিয়েত সরকারের ভয় ছিল যে, এই চুক্তি যদি রাশিয়া না করে, তবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানী চুক্তিবদ্ধ হতে পারে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্রিটেনের কঠোর মনােভাব এই আশঙ্কা সৃষ্টি করে। দ্বিতীয়ত, জার্মান সাম্রাজ্যবাদ যেভাবে পূর্ব ইওরোপের পথে প্রসারিত হচ্ছিল, তা প্রতিহত করতে হলে এই ধরনের একটি চুক্তির প্রয়ােজন ছিল। রুশ জার্মান মৈত্রী জোট গড়া হলে পূর্ব ইওরােপে রুশ সীমান্ত সুরক্ষিত হত। তৃতীয়ত, বাল্টিক রাজ্যগুলি ও পােল্যান্ড, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে জারের সাম্রাজ্যের ভেতর ছিল, তা আবার ফিরে পেতে রুশ জার্মান চুক্তি সহায়ক ছিল। চতুর্থত, Totalitarian বা সর্বাত্মক রাষ্ট্রগুলির পক্ষে আদর্শবাদ অপেক্ষা বাস্তববাদকেই প্রাধান্য দান করা হয়ে থাকে। কাজেই আদর্শের কথা ফেলে রেখে বাস্তব সুবিধার জন্যই রাশিয়া এই চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এর আগে ১৯২২ খ্রীঃ রাশিয়া ও জার্মানীর মধ্যে যদি র্যাপালাে চুক্তি হতে পারে তবে ১৯৩৯ খ্রীঃ রুশ জার্মান চুক্তি গঠনে বাধা ছিল না।

হিটলার যখন ১৯৩৯-এর আগষ্টে ষ্ট্যালিনকে জানান যে, জার্মানী ও রাশিয়ার স্বার্থের মধ্যে প্রকৃত কোন সংঘাত নেই। বাল্টিক ও কৃষ্ণ সাগরের মধ্যে এমন কোন প্রশ্ন নেই যার সমাধান উভয় দেশের মধ্যে সন্তোষজনকভাবে করা যায় না। তখন ষ্ট্যালিন অনুকুল মনােভাব নিয়ে সাড়া দেন। মলােটভ শর্ত দেন যে, অগ্রে রুশ জার্মান বাণিজ্যিক চুক্তি হবে, তারপর রুশ জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি হবে। ২১ শে আগষ্ট, ১৯৩৯ খ্রীঃ রুশ জার্মান বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২৩শে আগষ্ট, ১৯৩৯ খ্রীঃ রুশ জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। উভয় দেশের মধ্যে কোন দীর্ঘ, তিক্ত, বিতর্কিত আলােচনা হয়নি।

রুশ জার্মান অনাক্রমণ চুক্তির শর্ত : রুশ জার্মান চুক্তির প্রকাশ্য শর্ত ছিল যে, (১) রাশিয়া ও জার্মানী অন্ততঃ ১০ বছরের জন্যে কেহ কাহাকেও আক্রমণ না করার প্রতিশ্রুতি দেয়। (২) দুই স্বাক্ষরকারীর মধ্যে কোন বিবাদ দেখা দিলে তা শান্তিপূর্ণভাবে মিটিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। (৩) কোন তৃতীয় শক্তি বা একাধিক শক্তি যদি দুই স্বাক্ষরকারীর কাহাকেও আক্রমণ করে, তবে অপর স্বাক্ষরকারী আক্রমণকারীর সঙ্গে যােগ না দিতে অঙ্গীকার করে। (৪) রুশ জার্মান চুক্তির গােপন শর্তে বলা হয় যে, (ক) পূর্ব ইওরােপে দুই স্বাক্ষরকারী নিজ নিজ প্রভাবাধীন অঞ্চল (spheres of influence) স্থির করে নেয়। (খ) যদি তিন বাল্টিক রাজ্য, ফিনল্যান্ড, পর্ব পােল্যান্ড ও বেসারাবিয়ায় কোন পরিবর্তন করা হয়, তাহলে এই স্থানগুলি সােভিয়েত সীমানাভুক্ত হবে। (গ) লিথুয়ানিয়ার উত্তর সীমান্ত সোভিয়েত ও জার্মানীর প্রভাবাধীন অঞ্চলের সীমান্ত হবে। (ঘ) এই শর্তগুলি গোপন রাখা হবে। (ঙ) পােল্যান্ডে রুশ জার্মান সীমান্ত সান, ভিশ্চুলা নদী ও নারার্ড দ্বারা চিহ্নিত হবে।

রুশ জার্মান অনাক্রমণ চুক্তির বিফলতা : আসলে রুশ জার্মান চুক্তি স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। রুশ নেতাদের একথা ১৯৩৯-এ বােঝা উচিত ছিল। প্রথমত, পূর্ব ইওরােপে প্রসারণবাদী নাৎসী জার্মানী রুশ জার্মান চুক্তির দ্বারা স্থির করা সীমারেখা মানতে রাজী হয়নি। পশ্চিমের পরাজয়ের পর হিটলার পূর্ব ইওরােপে ঝাপ দেন। দ্বিতীয়তঃ, রুমানিয়া, লিথুয়ানিয়ার ওপর রুশ অধিকার নিয়ে জার্মানীর সঙ্গে বিরােধ দেখা দেয়। তৃতীয়তঃ, যদি এ্যালান বুলকের ব্যাখ্যা সত্য হয় তবে হিটলারের নীতি ছিল One by One। পশ্চিমের যুদ্ধ শেষ হলে তিনি পূর্বে দৃষ্টি দেন। চতুর্থতঃ, হিটলার আশঙ্কা করতেন যে, টিলজিটের সন্ধি ভেঙে রাশিয়া যেমন নেপােলিয়নের বিরুদ্ধে ব্রিটেনের পক্ষ নেয়, সােভিয়েত সরকার হয়ত শেষ পর্যন্ত নিরপেক্ষতা ভেঙে ইঙ্গ মার্কিন শক্তির পক্ষে চলে যাবে। তার আগেই তিনি রাশিয়া আক্রমণ করেন।

রুশ জার্মান অনাক্রমণ চুক্তির তাপর্য : নাৎসি সােভিয়েত অনাক্রমণ চুক্তি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। রুশ ঐতিহাসিকদের মতে এই চুক্তির দরুন সােভিয়েত ইউনিয়ন নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে আক্রমণ প্রতিরােধ করার জন্য দু বছর সময় চেয়েছিল এবং এই সময়ের মধ্যে স্ট্যালিন সােভিয়েত ইউনিয়নকে প্রস্তুত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফলে পরবর্তীকালে ১৯৪২ সালে নাৎসি জার্মানি সােভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করলে সােভিয়েত বাহিনীর পক্ষে লড়াই চালিয়ে যাওয়া সম্ভবপর হয়েছিল। শুধু তাই নয় স্ট্যালিন গ্রাডের যুদ্ধে নাৎসিবাহিনীকে পরাস্ত হতে হয়েছিল। এই চুক্তির দরুন পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ এবং সােভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যে পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাসের বীজ গড়ে ওঠে তা পরবর্তী পর্যায়ে Cold War বা ঠান্ডা লড়াই এর সময়ে পারস্পরিক সন্দেহ ও ভুল বােঝাবুঝির সূত্রপাত করে। ফলে নাৎসি বিরােধী মহাজোট গড়ে উঠলেও এই মহাজোট উভয় তরফে যে অবিশ্বাসের বাতাবরণ সৃষ্টি করে তার দরুন পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জটিল আকার ধারণ করে।