জার্মানির ভাইমার প্রজাতন্ত্র (১৯১৯-১৯৩৩)

author photo
- Monday, November 19, 2018
advertise here

ভাইমার প্রজাতান্ত্রিক জার্মানির উত্থান ও পতন ১৯১৯-১৯৩৩ (The Rise and fall of Weimer Republican Germany):

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়াম জার্মানিতে জনপ্রিয়তা কমে যায়। এবং জার্মানিতে কাইজারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। কিয়েল বন্দরের জার্মান নৌসেনা বিদ্রোহ করে। কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়াম পদত্যাগ করেন এবং হল্যান্ডে পালিয়ে যান। জার্মানির সমাজতান্ত্রিক নেতা ফ্রেডারিক এবার্টের (Fredrick Ebert) নেতৃত্বে জার্মানিতে একটি প্রজাতন্ত্র গঠিত হয়।

জার্মান সমাজতান্ত্রিক দলের বিদ্রোহ (German Socialist Party Revolt):

জার্মান কমিউনিস্ট দল যার নাম ছিল স্পর্টাসিস্ট (Spartatcist) দল, এদের উদ্দেশ্য ছিল এক সমাজতান্ত্রিক সরকার গঠন। কিন্তু তাদের সমর্থক ছিল খুবই নগণ্য। স্পর্টাসিস্ট নেতা কার্ল লাইভনিখট ও রোজা লক্সেমবার্গ এর নেতৃত্বে ১৯১৯ সালে বার্লিন নগর দখলের চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত ফ্রি কোর (Free Corps) লালপন্থী স্পর্টাসিস্টদের পরাজিত করে বার্লিন মুক্ত করে।

জার্মানির ভাইমার প্রজাতন্ত্রের সংবিধান (Constitution of the Weimer Republican of Germany):

অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবার্ট প্রজাতন্ত্রের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করেন। এই নির্বাচনের ফলে জাতীয় সভার মোট ৪২৩ জন সদস্যর মধ্যে ১৬৫ জন এবার্টের সমর্থক নির্বাচিত হন। জাতীয় সভা এবার্টকে স্থায়ী রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করে। জাতীয় সভা ভাইমার (Wiemer) সংবিধান গ্রহণ করে ১৯১৯ খ্রি: ১১ আগস্ট। এই সংবিধানের মূল কথা ছিল, জনসাধারণের সার্বভৌমত্বের ওপরেই সরকার নির্ভরশীল থাকবে। এই সংবিধানে বলা হয়, জার্মান প্রজাতন্ত্র জার্মান জনগণের সার্বভৌম শক্তির দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। ভাইমার সংবিধানে রাষ্ট্রপতি ৭ বছরের জন্য সর্ব সাধারণের ভোটে নির্বাচিত হবেন বলা হয়। রাষ্ট্রপতি চ্যান্সেলরকে নিযুক্ত করতেন। কিন্তু চ্যান্সেলর ও তার মন্ত্রিসভা তাদের কাজের জন্যে রাইখস্টাগের কাছে দায়ী থাকতেন। ৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী জরুরি অবস্থা দেখা দিলে নাগরিক স্বার্থ রক্ষার জন্য রাষ্ট্রপতি বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারতেন। এই সংবিধানে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষার কথা বলা হয়, বাক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় অধিকার রক্ষার স্বাধীনতা, আইনের চোখে সকল নাগরিক সমান, ট্রেড ইউনি়য়ন গঠনের অধিকার প্রভুতি।

ভাইমার প্রজাতন্ত্রের ভার্সাই সন্ধি স্বাক্ষর (Weimer Republican Versailles treaty Signature):

জার্মানির সমাজতান্ত্রিক নেতা ফ্রেডারিক এবার্টের (Fredrick Ebert) নেতৃত্বে জাতীয় পরিষদের সদস্যরা ভার্সাই সন্ধিতে স্বীকৃতি দেন। ফলে এই সরকারের জনপ্রিয়তা কমে যায়। অন্যান্য দল এই সরকারের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

সরকারি কর্মচারীদের আনুগত্যের অভাব (Lack of loyalty to government employees):

প্রজাতন্ত্রী সরকারের কর্মচারীগণ ছিল কাইজার আমলের। এরা প্রজাতন্ত্রের প্রতি অনুগত ছিল না। এমনকি প্রধান সেনাপতি হ্যান্স ফন সেক্ট (Hans Von Seeckt) কেন্দ্রীয় সরকারের অজ্ঞাতে জার্মান সেনার প্রশিক্ষণের জন্য সোভিয়েত সরকারের সঙ্গে গোপন ব্যবস্থা করেন।

জার্মানিতে ক্যাপ বিদ্রোহ (Cap revolt in Germany):

মিত্রশক্তি ভার্সাই সন্ধির শর্ত অনুযায়ী জার্মান সেনাদল ভেঙে দেবার দাবী জানাই। এর ফলে উলফগ্যাং ক্যাপ নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বে জার্মান নৌ-সেনা বার্লিন দখল করে এক প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার (১৯২০) ঘোষণা করে। জার্মান কমিউনিস্টরা এই সমিরিক সরকারের বিরুদ্ধে ধর্মঘট ডাকলে এর পতন ঘটে। এই বাতিল সেনাদলকে বলা হত ফ্রী কোর। প্রজাতন্ত্রী সরকারের সামরিক অফিসাররা বেশিরভাগ প্রজাতন্ত্রের অনুগত ছিল না। তারা গোপনে ফ্রীকোরকে অস্ত্র সরবরাহ করতেন। নাৎসি দল ক্রমে এদের জঙ্গি বাহিনীতে পরিণত করে এবং ব্যভেরিয়াকে কেন্দ্র করে দক্ষিণপন্থীরা প্রজাতন্ত্র বিরোধী চক্রান্ত চালায়।



জার্মানিতে বামপন্থী বিদ্রোহ (Leftist rebellion in Germany):

এই সময় জার্মানিতে বামপন্থী বিদ্রোহ দেখা দেয়। জার্মান কমিউনিস্ট দল ব্যভেরিয়াতে প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার ঘোষণা করে। হিটলারের নাৎসি বাহিনী গৃহযুদ্ধ দ্বারা ব্যভেরিয়ার বিদ্রোহ ধ্বংস করে। নাৎসি দল ক্রমে সাধারণ মানুষের আস্থা পান। প্রজাতন্ত্রী সরকার অযোগ্য প্রমাণ হয়।

যুদ্ধোত্তর জার্মানির মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দা (Postwar German inflation and economic recession):

মুদ্রাস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি জার্মানির জনজীবনকে নষ্ট করে। ঐতিহাসিক E. H. Carr এর মতে, "ভার্সাই সন্ধি অপেক্ষা মুদ্রাস্ফীতি ছিল ভাইমার জার্মানির কাছে প্রধান বিপদ।" জার্মান মুদ্রার দাম কমে যায়। মুদ্রার ঘাটতি পূরণের জন্য প্রচুর কাগজের নোট চাপায়। জিনিসপত্রের দাম বাড়তে থাকে। ইতিমধ্যে ১৯৩০ খ্রি: বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। এই সময় জার্মানির হামবুর্গে (Hamburg) কমিউনিস্ট অভ্যুত্থান ঘটে। ব্যভেরিয়া থেকে নাৎসি দল অভ্যুত্থানের ডাক দেয়। এই সময় প্রধানমন্ত্রী গুস্তাফ স্ট্রাসম্যান সংবিধানের ৪৮ ধারা অনুযায়ী জরুরি ক্ষমতা হাতে নিয়ে হামবুর্গের বিদ্রোহ দমন করেন।

গুস্তাফ স্ট্রাসম্যানের বিদেশ নীতি (Gustav Stressemann policy):

তিনি পশ্চিমী শক্তির সঙ্গে আপোষ নীতি নিয়ে জার্মানির উন্নতির চেষ্টা করে। তার নীতির নাম ছিল পরিপূর্ণতা নীতি (Policy of Fulfilment)। এর সাহায্যে তিনি ক্ষতিপূরণ সমস্যা ও ভার্সাই সন্ধির কঠোর শর্তগুলি সংশোধনের আশা করেন। ১৯২৪ সালে ডাওয়েজ পরিকল্পনা (Dawes Plan) দ্বারা জার্মানির ক্ষতিপূরণ কমানো হয়। জার্মানিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঋণ দেয়। ১৯২৫ সালে লোকার্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির দ্বারা ফ্রান্স জার্মান বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়। জার্মানী, ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের সঙ্গে ভার্সাই সীমান্ত স্বীকার করে। ১৮২৮ সালে জার্মানী কেলগ-ব্রিয়া চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। জার্মানী লীগ অফ নেশনসের সদস্য পদ লাভ করে। ক্ষতিপূরণ সমস্যার সমাধানের জন্য ১৮২৯ সালে ইয়ং পরিকল্পনা (Young Plan) রচিত হয়।



গুস্তাফ স্ট্রাসম্যানের মৃত্যু (Death):

১৮২৯ সালে গুস্তাফ স্ট্রাসম্যানের মৃত্যু হয়। এবং নব নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হন ফিল্ড মার্শাল হিন্ডেনবুর্গ (Fild Marsal Hindenburg)। তিনি ছিলেন দুর্বল। এই সুযোগে ১৯৩০ সালে নির্বাচনে নাৎসি ও কমিউনিস্ট দল বহু আসন দখল করেন।

জার্মানিতে নাৎসি দলের উত্থান ও ভাইমার প্রজাতন্ত্রের পতন (Rise Nazi Party and Collapse Weimer Republican):

দক্ষিণপন্থী নেতা হিটলার তার "বিয়ার হল অভ্যুত্থান" দ্বারা জার্মানিতে নাৎসি বিপ্লবের সূচনা করেন। তিনি জার্মান বেকার যুবক ও যুদ্ধ ফেরৎ সেনাদল নিয়ে তার আধা সামরিক S. A. বা ঝটিকা বাহিনী গঠন করেন। জার্মানিতে সাধারণ নির্বাচনের সময় তিনি জার্মান কমিউনিস্ট ও সমাজতন্ত্রী দের সভাগুলিকে S. A. বা ঝটিকা বাহিনী দ্বারা ভেঙে দেন। কল কারখানার শ্রমিক ইউনিয়নগুলি তিনি ভেঙে দেন। জার্মান পার্লামেন্ট অগ্নিদগ্ধ হলে তিনি কমিউনিস্টদের দায়ী করে মিথ্যা প্রচার করেন। ১৮৩০ সালে অর্থনৈতিক মন্দার ফলে ভাইমার প্রজাতন্ত্রের অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। এই সুযোগে নাৎসিদল বেকারদের চাকুরদানের কথা বলেন। সাধারণ নির্বাচন হলে ১২ জন সদস্যর স্থলে আইনসভার ১০৭ জন সদস্য লাভ করে। রাষ্ট্রপতি হিন্ডেনবুর্গ নাৎসি নেতা হিটলারকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করে ১৯৩৩ সালে। হিটলার ভাইমার সংবিধানের ৪৮ ধারা প্রয়োগ করে সংবিধান ও পার্লামেন্ট মুলতুবি করেন। এর ফলে হিটলার সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হন। রাষ্ট্রপতি হিন্ডেনবুর্গ মৃত্যু হলে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর দুই ক্ষমতা নিজ হাতে নিয়ে নাৎসি শাসন চালু করে। এবং জার্মানির ভাইমার প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটে ১৯৩৩ সালে
Advertisement advertise here