PayPal

রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্য

author photo
- Monday, October 29, 2018

রাষ্ট্রকূট রাজবংশ

অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাগে চালুক্য শক্তির পতনের পর দক্ষিণ ভারতে রাষ্ট্রকূটদের (ইংরেজি: Rashtrakutas) প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তারা দুই শতাব্দীর অধিককাল ধরে দাক্ষিণাতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাদের আধিপত্য বজায় রাখেন। তাদের বংশপরিচয় বা আদি বাসস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। এ সম্পর্কে বিভিন্ন মতবাদ প্রচলিত আছে। (১) নবম শতাব্দীর একটি রাষ্ট্রকূট অনুশাসন লিপিতে তাদের মহাভারত-এর বিখ্যাত যদুবংশীয় বীর সাত্যকি-র বংশধর বলে বর্ণনা করা হয়েছে। রাষ্ট্রকূট সভাকবিরা রাষ্ট্রকূট রাজ তৃতীয় গোবিন্দকে ভগবান কৃষ্ণের সঙ্গে তুলনা করেছেন। (২) অনেকের মতে সম্রাট অশােকের শিলালিপিতে বর্ণিত রথিক বা রাষ্ট্রীকরা হল রাষ্ট্রকূটদের পূর্বপুরুষ। (৩) বর্নেলের মতে তারা অন্ধ্রদেশের তেলেগু রেড্ডি বা কৃষক সম্প্রদায়ভুক্ত। (৪) অনন্ত আলতেকরের মতে, তারা কর্ণাটকের অধিবাসী এবং তাদের মাতৃভাষা কানাড়ি। (৫) ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার মনে করেন যে, রাষ্ট্রকুট কথাটির অর্থ হল কোনও রাষ্ট্র বা প্রদেশের প্রধান। তারা চালুক্য রাজাদের অধীনে দাক্ষিণাত্যের বিভিন্ন অঞ্চলে শাসনকর্তা হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। চালুক্য শাসকদের দুর্বলতার সুযােগে খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে তারা দাক্ষিণাত্যে স্বাধীন রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। রাষ্ট্রকূট বংশের প্রথম শাসক ছিলেন ইন্দ্র। রাষ্ট্রকূট বংশের রাজধানী ছিল মান্যখেত (বর্তমান কর্ণাটক রাজ্যের গুলবার্গা জেলায়)।
রাষ্ট্রকূট রাজবংশের নিদর্শন
দন্তিদুর্গ (৭৫৩-৭৫৮ খ্রিস্টাব্দ) : ইন্দ্রের পর সিংহাসনে বসেন তার পুত্র দন্তিদুর্গ। রাষ্ট্রকূট রাজবংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন দন্তিদুর্গ। তিনি চালুক্যদের সামন্তরাজা ছিলেন। দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্যের সামন্ত হিসেবে ৭৩৮ খ্রিস্টাব্দে গুজরাটে আরব আক্রমণ প্রতিরােধে তিনি উল্লেখযােগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেন। বলা হয় যে, আরবদের বিরুদ্ধে তার সাফল্যে সন্তুষ্ট হয়ে দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য তাকে পৃথিবীবল্লভ অভিধায় ভূষিত করেন। দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্যের মৃত্যুর পর (৭৪৬ খ্রিঃ) তিনি স্বাধীন রাজা হিসেবে রাজ্যজয় শুরু করেন এবং গুজরাট, মালব, মধ্যপ্রদেশ ও বেরার জয় করেন। তার শক্তি বৃদ্ধিতে আতঙ্কিত চালুক্য রাজ দ্বিতীয় কীর্তিবর্মন তার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন এবং খান্দেশের যুদ্ধে পরাজিত হন। এর ফলে মহারাষ্ট্রের উত্তর ভাগ দন্তিদুর্গের অধিকারে চলে আসে, চালুক্য বংশের অবসান ঘটে এবং রাষ্ট্রকুট বংশ প্রতিষ্ঠিত হয় (৭৫৩ খ্রিঃ)। তিনি মহারাজাধিরাজ উপাধি গ্রহণ করেন।

প্রথম কৃষ্ণ (৭৫৮-৭৭৩ খ্রিঃ) : দন্তিদুর্গের পর সিংহাসনে বসেন তার পুত্র (মতান্তরে খুল্লতাত) প্রথম কৃষ্ণ। তিনি পুনরায় চালুক্য রাজ কীৰ্তিবর্মনকে পরাজিত করে সমগ্র মহারাষ্ট্রে নিজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করেন এবং এর ফলে চালুক্য বংশের পতন ঘটে (৭৬০ খ্রিঃ)। তিনি মহীশূরের গঙ্গরাজা ও বেঙ্গির চালুক্য বংশীয় রাজাকে পরাস্ত করেন । এর ফলে সমগ্র মহারাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রদেশ রাষ্ট্রকূটদের অধিকারে আসে। তার আমলের একটি উল্লেখ্যযােগ্য ঘটনা হল ইলােরার বিখ্যাত শিবমন্দির, কৈলাসনাথের মন্দির নির্মাণ। ইলােরার পাহাড় কেটে মন্দিরটি নির্মিত। মন্দিরগাত্র অপূর্ব ভাস্কর্যমণ্ডিত।

দ্বিতীয় গােবিন্দ (৭৭৩-৭৮০ খ্রিঃ) : এরপর সিংহাসনে বসেন তার পুত্র দ্বিতীয় গােবিন্দ। তিনি আরামপ্রিয় ও অকর্মণ্য এই নৃপতি নিজ ভ্রাতা দ্রুব-র হাতে শাসনভার অর্পণ করে নিজে আমােদ-প্রমােদে ডুব দেন। প্রথম ধ্রুব ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকে। ফলে দ্বিতীয় গোবিন্দ শাসনক্ষমতা থেকে প্রথম ধ্রুবকে সরাতে চাইলে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। তিনি দ্বিতীয় গোবিন্দকে পরাজিত করে সিংহাসনে বসেন।

প্রথম ধ্রুব (৭৮০-৭৯৩ খ্রিঃ) : প্রথম ধ্রুব মহীশূরের গঙ্গ-বংশীয় রাজা, বেঙ্গির চালুক্য-রাজ ও পল্লব-রাজ দন্তিবর্মনকে পরাজিত করে সমগ্র দাক্ষিণাত্যে নিজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি উত্তর ভারতেও রাজ্যবিস্তারে উদ্যোগী হন এবং এর ফলে প্রতিহার ও পাল রাজাদের সঙ্গে তার সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। প্রতিহার-রাজ বৎসরাজ ও পালরাজা ধর্মপালকে পরাজিত করে তিনি গাঙ্গেয় উপত্যকায় নিজ আধিপত্য বিস্তার করে দাক্ষিণাত্যে ফিরে আসেন। তিনি ধ্রুব নিরুপম, ধ্রুব ধারাবর্ষ, শ্রীবল্লভ প্রভৃতি উপাধি গ্রহণ করেন। তার আমলেই রাষ্ট্রকুট শক্তি প্রবল পরাক্রান্ত হয়ে ওঠে।

তৃতীয় গোবিন্দ (৭৯৩-৮১৪ খ্রি:) : প্রথম ধ্রুব তার কনিষ্ঠ পুত্র তৃতীয় গোবিন্দকে সিংহাসনে মনোনীত করে যান। একই সাথে তার জ্যৈষ্ঠ পুত্র স্তম্ভকে গঙ্গাদেবীর শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। এতে স্তম্ভ সন্তুষ্ট ছিলনা। ফলে তিনি বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন, এই কাজে তাকে সাহায্য করেন পল্লববংশীয় রাজারা এবং শিবরাম নামে এক গঙ্গাবংশীয় যুবরাজ। তৃতীয় গোবিন্দ তাকে পরাজিত করেন, এবং পুনরায় গঙ্গাদেবীর শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। তৃতীয় গোবিন্দ পল্লব রাজ দন্তিবর্মন, বেঙ্গী রাজ চতুর্থ বিষ্ণুবর্মন তার বস্যতা স্বীকার করেন। তিনি প্রতিহার রাজ নাগভট্টকে পরাজিত করে উত্তর ভারতে প্রতিহার শক্তির একচেটিয়া আধিপত্যের সম্ভাবনা দূর করেন। বাংলার পালরাজ ধর্মপাল ও তার প্রতিনিধি কনৌজের চক্রায়ধু তার আনুগত্য মেনে নেন। রাষ্ট্রকুট লিপি থেকে জানা যায় যে, তিনি উত্তরভাতের আরও বহু রাজাকে পরাজিত করেন এবং হিমালয় পর্যন্ত রাজ্যবিস্তার করে ৮০০ খ্রিস্টাব্দে দাক্ষিণাত্যে ফিরে আসেন। তৃতীয় গোবিন্দ-র উত্তর ভারতে রাজ্যেবিস্তারের কালে বেঙ্গীর চালুক্য রাজ বিজয়াদিত্য বিদ্রোহ ঘােষণা করেন। তিনি তাকে সিংহাসনচ্যুত করে তার ভাই ভীমকে সিংহাসনে বসান। ইতিমধ্যে দাক্ষিণাত্যের গঙ্গ, পল্লব, চাল, পাণ্ড্য, কেরল প্রভূতি রাজন্যবর্গ রাষ্ট্রকূট বিরােধী শক্তিজােট গঠন করলে তিনি তাঁদের পরাজিত করেন এবং পল্লব রাজধানী কাঞ্চি দখল কৱেন। সিংহলের রাজাও তার আনুগত্য মেনে নেন। তাকে বিনাবাক্যে রাষ্ট্রকূট বংশের সর্বশ্রেষ্ট রাজা হিসেবে গণ্য করা যায়।

প্রথম অমােঘবর্ষ (৮১৪-৮৭৭ খ্রিঃ) : তৃতীয় গােবিন্দের মৃত্যুর পর তার নাবালক পুত্র প্রথম অমােঘবর্ষ সিংহাসনে বসেন। এই সময় তারা অভিভাবক হিসেবে রাজকার্য পরিচালনা করতেন তৃতীয় গোবিন্দর ভ্রাতুষ্পুত্র এবং গুজরাট ও মালবের শাসনকর্তা কর্ক তিনি এই বংশের শ্রেষ্ঠ নরপতিদের অন্যতম ছিলেন। এই সময় বিদ্রোহ দেখা দেয়, এই বিদ্রোহে যোগদান করেন বেঙ্গীর রাজা দ্বিতীয় বিজয়াদিত্য। প্রথম অমােঘবর্ষ নিজ হাতে ক্ষমতা নেন ৮৩০ খ্রিস্টাব্দ। তিনি খুব শান্তিপ্রিয় রাজা ছিলেন। তিনি নাসিক থেকে মান্যখেটে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। তিনি বেঙ্গীর চালুক্যদের যুদ্ধে পরাজিত করেন, কিন্তু মহীশূরের গঙ্গ রাজাদের বিরুদ্ধে কুড়ি বছর যুদ্ধ চালিয়েও তিনি পরাজিত হন। সামরিক দুর্বলতার জন্য তিনি উত্তর ভারতে ত্রিশক্তি যুদ্ধে অংশগ্রহণে সক্ষম হন নি। পূর্বপুরুষদের মত তার সামরিক বা রাজনৈতিক প্রতিভা না থাকলেও তিনি সাহিত্য ও সংস্কৃতির উৎসাহী পৃষ্ঠপােষক ছিলেন। তার রচিত রত্নমালিকা ও কবিরাজমার্গ সুধীজন সমাদৃত কন্নড় ভাষায় দুটি উল্লেখযােগ্য গ্রন্থ। তিনি নিজে ব্রাহ্মণ্যধর্মাবলম্বী হলেও জৈন ধর্মের প্রতি তার গভীর অনুরাগ ছিল। জৈন পণ্ডিত জীনসেন এবং গণিতসার সংগ্ৰহ নামক গ্রন্থের লেখক মহাবিজয়াচার্য তার রাজসভায় সম্মানীয় অতিথি ছিলেন। জীনসেনের পার্শ্বঅভুদ্যয় গ্রন্থটি তারই পৃষ্ঠপােষকতায় রচিত হয়। আরব পর্যটক সুলেমানের মতে তিনি বিশ্বের চারজন শ্রেষ্ঠ রাজার অন্যতম ছিলেন। বাকি তিনজন হলেন চিনের সম্রাট, বাগদাদের খলিফা ও কনস্টান্টিনােপলের সুলতান।

দ্বিতীয় কৃষ্ণ (৮৭৭-৯১৪ খ্রিঃ) : অমােঘবর্ষের পর তার পুত্র দ্বিতীয় কৃষ্ণ সিংহাসনে বসেন। তার আমলে বেঙ্গীর চালুক্যরাজা তৃতীয় বিজয়াদিত্য কলচুরীর রাজার সহায়তায় রাষ্ট্রকুট সাম্রাজ্য আক্রমণ করে। প্রাথমিক যুদ্ধে দ্বিতীয় কৃষ্ণ পরাজিত হলেও অবশেষে তিনি চালুক্যদের পরাজিত করেন এবং বিজয়াদিত্যের উত্তরাধিকারী ভীমকে বন্দি করেন ও তাকে নিজের সামন্তরাজায় পরিণত করেন। দ্বিতীয় কৃষ্ণের আমলের অপর উল্লেখযােগ্য ঘটনা হল প্রতিহাররাজ ভােজের সাথে যুদ্ধ। এই যুদ্ধে দ্বিতীয় কৃষ্ণ পরাজিত হন এবং মালোব ও গুজরাট হাতছাড়া হয়। বৈবাহিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও দ্বিতীয় কৃষ্ণ চোল রাজ্য আক্রমণ করেন, কিন্তু যুদ্ধে পরাজিত হয়ে অপমানজনক সন্ধি স্বাক্ষরে বাধ্য হন।

তৃতীয় ইন্দ্র (৯১৪-৯২২ খ্রিঃ) : দ্বিতীয় কৃষ্ণের পর তার পৌত্র তৃতীয় ইন্দ্র সিংহাসনে বসেন। তিনি রাষ্ট্রকুট বংশের লুপ্ত গৌরব কিছুটা পুনরুদ্ধারে সক্ষম হন। তিনি প্রতিহার রাজ মহীপালকে পরাজিত করে কনৌজ নগরী ধ্বংস করেন। দাক্ষিণাত্যে প্রত্যাবর্তনের পথে তিনি উজ্জয়িনী দখল করেন। দক্ষিণে চালুক্য রাজ চতুর্থ বিজয়াদিত্যেকে পরাজিত ও নিহত করেন।

দ্বিতীয় অমােঘবর্ষ (৯২২-৯৩০ খ্রি:) : তৃতীয় ইন্দ্র মৃত্যুর পর তার পুত্র দ্বিতীয় অমােঘবর্ষ সিংহাসনে বসেন। চতুর্থ গোবিন্দ তাকে হত্যা করেন।

চতুর্থ গোবিন্দ (৯৩০-৯৩৬ খ্রি:) : চতুর্থ গোবিন্দ ছিলেন দ্বিতীয় অমােঘবর্ষের ছোট ভাই। তিনি অত্যাচারী শাসক ছিলেন। তাঁর শাসনকালে কনৌজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল। বেঙ্গীর চালুক্যরা তাঁকে পরাজিত করে এবং তার অনেক অঞ্চল হারিয়ে যায়। চতুর্থ গোবিন্দ কন্নড় কবি রবিনাগভট্টের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন।

তৃতীয় অমােঘবর্ষ (৯৩৬-৯৪০ খ্রি:) : চতুর্থ গোবিন্দর খুল্লতাত তৃতীয় অমােঘবর্ষ গোবিন্দকে ক্ষমতাচ্যুত করে সিংহাসনে বসেন। তিনি অন্ধ্রের ভেমুলাবাদার সামন্ত রাজা অরিকেসরি এবং গোবিন্দ চতুর্থের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী অন্যান্য ভ্যাসালদের সহায়তায় ক্ষমতায় এসেছিলেন। তাঁর অসমাপ্ত রাজত্ব সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায়নি। তাঁর আগ্রাসী মনোভাব এবং ধর্মীয় মেজাজ তাকে তাঁর সাম্রাজ্যের শাসনে কোন আগ্রহ দেখাতে দেয়নি, তার মূল শাসনক্ষমতা ছিল পুত্র তৃতীয় কৃষ্ণের হতে। তাঁর বিয়ে হয়েছিল ত্রিপুরীর কালাচুরি রাজবংশের রাজকন্যা কুন্দকাদেবীর সঙ্গে। তাঁর কন্যা পশ্চিম গঙ্গার রাজা দ্বিতীয় বুতুগাকে বিয়ে করেছিলেন, যাকে যৌতুক হিসাবে একটি বিশাল অঞ্চল দেওয়া হয়েছিল।

তৃতীয় কৃষ্ণ (৯৪০-৯৬৮ খ্রি:) : রাষ্ট্রকুট বংশের শেষ উল্লেখযােগ্য রাজা হলেন তৃতীয় কৃষ্ণ। তিনি উত্তর ও দক্ষিণ ভারতে রাষ্ট্রকুট আধিপত্য বিস্তৃত করেন। তিনি মহীশূর পুনর্বার জয় করেন। উত্তরে প্রতিহার রাজ মহীপালকে পরাজিত করে তিনি কালাঞ্জর ও চিত্রকুট দখল করেন। তিনি পল্লবদের রাজধানী কাঞ্চি ও চোল নগরী তাঞ্জর অধিকার করেন এবং কেরল ও পাণ্ড্যদের পরাজিত করে রামেশ্বর সেতুবন্ধে বিজয়স্তম্ভ প্রােথিত করেন। ৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে পুনর্বার উত্তর ভারতে অভিযান চালিয়ে তিনি মালব, উজ্জয়িনী ও বুন্দেলখণ্ড জয় করেন। সিংহলের রাজাও তার বশ্যতা মেনে নেন। তিনি নিজেকে সকল দক্ষিণ দিগাধিপতি বলে অভিহিত করেছেন। রাষ্ট্রকুট বংশের পরবর্তী শাসকগণ ছিল কোট্টিগ অমোঘবর্ষ (৯৬৮-৯৭২ খ্রি:) তিনি নিত্যবর্ষ উপাধি নেন, চতুর্থ অমােঘবর্ষ বা কার্ক (৯৭২-৯৭৩ খ্রি:)।

পতন : তৃতীয় কৃষ্ণের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রকুট শক্তি দ্রুত পতনের দিকে অগ্রসর হয়। অযোগ্যতা ও প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের বিদ্রোহ এই পতনকে ত্বরান্বিত করে। ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে কল্যাণীর চালুক্য বংশীয় রাজা দ্বিতীয় তৈলপ বা তৈল শেষ রাষ্ট্রকুট রাজ চতুর্থ অমােঘবর্ষ বা কার্ক-কে পরাজিত করলে রাষ্ট্রকুট বংশের বিলােপ ঘটে।

শাসনব্যবস্থা : রাষ্ট্রকুট শাসনব্যবস্থায় রাজা ছিলেন সর্বোচ্চ প্রশাসক। তিনি প্রতিদিন রাজদরবারে উপস্থিত থেকে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। তারা মহারাজাধিরাজ, পরমভট্রারক প্রভৃতি উপাধি ধারণ করতেন। রাজা কর্তৃক মনােনীত মন্ত্রীগণ শাসনকার্যে সহায়তা করতেন। যুবরাজ ও অন্যান্য কুমারগণ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিযুক্ত হতেন। মন্ত্রীদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, রাজস্বমন্ত্রী ছিলেন বিশেষ ক্ষমতাশালী।

রাষ্ট্রকুটশাসকদের প্রত্যক্ষ শাসিত অঞ্চলগুলি প্রদেশ, বিষয় ও ভুক্ত এই তিনভাগে বিভক্ত ছিল। শাসনব্যবস্থার সর্বনিম্ন একক ছিল গ্রাম। প্রদেশ বা রাজ্যের শাসনকর্তাকে বলা হত রাষ্ট্রপতি। নিজ এলাকায় আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখা, সামরিক বাহিনীকে নিয়ন্ত্রিত করা প্রভৃতি কাজ রাষ্ট্রপতিকে করতে হত। বিষয়-এর প্রধান শাসককে বলা হত বিষয়পতি, গ্রামগুলির শাসনের ভার ছিল গ্রাম প্রধানের উপর। শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য গ্রাম প্রধানের অধীনে একটি সুশিক্ষিত লাঠিয়াল বাহিনী থাকত। গ্রাম মহাজন বা গ্রাম মহাত্তার নামক গ্রামের বয়ােজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের পরামর্শক্রমে গ্রাম প্রধান গ্রাম শাসন করতেন। গ্রামের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নমূলক কাজও গ্রাম প্রধানকে করতে হত। রাষ্ট্রের আয়ের প্রধান উৎস ছিল ভূমি রাজস্ব। উৎপন্ন ফসলের এক চতুথাংশ কর হিসেবে গৃহীত হত। এছাড়া জলকর, খনিজ দ্রব্যের উপর কর প্রভৃতিও আদায় করা হত। দেশগ্রামুক্ত নামে রাজস্ব কর্মচারীদের উপর কর আদায়ের ভার ন্যস্ত থাকত। রাষ্টকুট সাম্রাজ্যে সামন্তশাসনেরও অস্তিত্ব ছিল। শাসনতান্ত্রিক ব্যাপারে সামন্তরাজাগণ ছিলেন স্বাধীন। তারা রাষ্ট্রকুটরাজাদের নিয়মিত কর দিতেন এবং যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনী দিয়ে সাহায্য করতেন।

ধর্ম : রাষ্ট্রকুট রাজাৱা পরধর্মসহিষ্ণু ছিলেন। রাষ্টকট সাহাজ্যে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও ইসলামি ধর্মের সহাবস্থান লক্ষ করা যায়। রাষ্ট্রকুট রাজারা কেবলমাত্র শৈব ও বৈষ্ণব ধর্মেরই নয় তারা জৈন ধর্মেরও পৃষ্ঠপােষক ছিলেন। খ্রিস্টীয় নবম শতকে প্রথম কৃষ্ণ ইলােরার বিখ্যাত পাহাড় কাটা কৈলাসনাথের (শিব) মন্দিরটি নির্মাণ করেন। তিনিই আবার জৈন ধর্মের পৃষ্ঠপােষক ছিলেন। তার উত্তরাধিকারী প্রথম অমােঘবর্ষ জৈনধর্ম গ্রহণ করলেও হিন্দু দেবী মহালক্ষ্মী-র নিষ্ঠাবান উপাসক ছিলেন। রাজা দ্বিতীয় কৃষ্ণ, তৃতীয় ইন্দ্র এবং চতুর্থ ইন্দ্র ও জৈন ধর্মের পৃষ্ঠপােষক ছিলেন। এ সময় বৌদ্ধ ধর্মের উল্লেখযােগ্য কেন্দ্র ছিল বােম্বাই-এর নিকটবর্তী কানহেরি, শােলাপুর জেলার কাম্পিল এবং ধারওয়ার জেলার দম্বল। এইসব স্থানে বেশ কিছু বৌদ্ধবিহার নির্মিত ছিল। এ সময় অবশ্য বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব ক্ষীণ হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রকুট রাজারা মুসলিম ব্যবসায়ীদের তাদের রাজ্যে বসবাসের এবং ইসলাম ধর্ম প্রচারের অনুমতি দিয়েছিলেন। বলা হয় যে, রাষ্ট্রকুট সাম্রাজ্যের সমুদ্র তীরবর্তী বহু নগরে নামাজ পড়ার জন্য বড়ো বড়ো মসজিদ ছিল। ডঃ সতীশ চন্দ্র বলেন যে, রাষ্ট্রকূট রাজাদের উদারনীতির ফলে দেশের বহির্বাণিজ্যের প্রসার ঘটে এবং রাষ্ট্রকূটদের সম্পদ বৃদ্ধি পায়।

সাহিত্য : সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও এই যুগ এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিক ও পণ্ডিতরা রাষ্ট্রকুট রাজসভা অলঙ্কৃত করতেন। প্রথম অমােঘবর্ষ সাহিত্য সংস্কৃতির পৃষ্ঠপােষক ছিলেন। সংস্কৃত গ্রন্থ আদিপুরাণ-এর লেখক জৈন কবি জীনসেন, গণিতসার সংগ্রহ নামক গ্রন্থের লেখক বীরাচার্য এবং অমােঘবৃত্তি নামক ব্যাকরণ গ্রন্থের রচয়িতা শকটায়ন তার রাজসভা অলঙ্কৃত করতেন। নলচম্পু নামক গ্রন্থের লেখক ত্রিবিক্রম খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীর সূচনায় আবির্ভূত হন। তৃতীয় কৃষ্ণের রাজত্বকালে হলায়ুধ রচনা করেন কবিরহস্য। অমােঘবর্ষ রত্নমালিকা নামে কানাড়ি ভাষায় কাব্য সমালােচনা বিষয়ক একটি গ্রন্থ এবং কবিরাজমার্গ নামে একটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। তার পৃষ্ঠপােষকতায় জীনসেন রচনা করেন পাশ্বঅভ্যুদয়। বর্ধমানচরিত রচয়িতা আসসা এবং নেমিপুরাণ রচয়িতা গুণবর্মা ছিলেন রাষ্ট্রকূট যুগের বিশিষ্ট কানাড়ি সাহিত্যিক। পম্পা, পন্না ও রন্না কানাড়ি কাব্যসাহিত্যের ত্রিরত্ন বলে স্বীকৃত।

শিল্পকলা : রাষ্ট্রকুটরা বহু মঠ ও মন্দির নির্মাণ করেন। রাষ্ট্রকূট রাজ প্রথম কৃষ্ণ কর্তৃক নির্মিত ইলােরার প্রসিদ্ধ পাহাড় কাটা কৈলাসনাথ মন্দির ও গুহামন্দিরগুলি রাষ্ট্রকূট স্থাপত্যের বিশিষ্ট উদাহরণ। ডঃ স্মিথ কৈলাসনাথ মন্দিরকে গর্বের বস্তু বলে উল্লেখ করেছেন। শিল্প বিশেষজ্ঞ পার্সি ব্রাউন এর মতে, কৈলাসনাথ মন্দিরটি কেবলমাত্র শিল্পের ক্ষেত্রে একটি বিশাল কাজই নয় — প্রস্তর স্থাপত্যের ক্ষেত্রে এটি অদ্বিতীয়। অজন্তা, মালখেদ, এলিফ্যান্টা ও অন্যান্য স্থানের গুহামন্দিরগুলির গাত্রে খােদিত দেবদেবীর মূর্তিগুলি রাষ্ট্রকুট ভাস্কর্যের অপরূপ নিদর্শন। রাষ্ট্রকূটদের স্থাপত্যশৈলীকে অ্যাডাম হার্ডি কন্নড় দ্রাবিড় শৈলী নামে চিহ্নিত করেছেন। এলিফ্যান্টার স্থাপত্য ও ভাস্কর্য রাষ্ট্রকূটদের সাংস্কৃতিক অবদান হিসেবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

No comments:

Post a Comment