ভারতীয় সামন্ততন্ত্রের বিতর্ক

- October 08, 2018
প্রাচীন ভারতে সামন্ততন্তের বিকাশ সম্পর্কিত তত্ত্বটি প্রথম উপস্থাপন করেন ড: ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত। পরবর্তীকালে দামোদর ধর্মানন্দ কোশাম্বি এবং মার্কসবাদী নেতা এস. এ. ডাঙ্গে এ সম্পর্কে মতামত প্রকাশ করেন। ডঃ রামশরণ শর্মা এ বিষয়ে সংগঠিত মতবাদ গড়ে তােলেন। বি. এন. এস. যাদব, ডঃ দ্বিজেন্দ্রনাথ ঝা, ডঃ রােমিলা থাপার, ভক্তপ্রসাদ মজুমদার এই মতবাদের প্রতি সমর্থন জানান। অপরপক্ষে ডঃ দীনেশচন্দ্র সরকার, হরন্স মুখিয়া , ব্রজলাল চট্টোপাধ্যায়, ব্রতীন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায়, চম্পক লক্ষ্মী, রণবীর চক্রবর্তী এই মতবাদের বিরােধিতা করেছেন।
ভারতীয় সামন্ততন্ত্র
সামন্ততন্ত্রের বৈশিষ্ট্য : ১) সামন্ত সমাজের সর্বোচ্চ স্তরে ছিলেন রাজা। রাজা হলেন দেশের সব জমির মালিক এবং সকল ক্ষমতার উৎস। তার একার পক্ষে রাজ্যের সকল জমি চাষ করা বা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করা সম্ভব ছিল না। তাই তিনি কিছু সামন্ত বা ডিউক ও আর্ল - এর মধ্যে তার সকল জমি এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমত ভাগ করে দেন। তারা হলেন রাজার সামন্ত (Vassal) এবং রাজা হলেন সামন্তদের প্রভু (Lord)। ডিউক এবং আর্ল - রা আবার আরও ক্ষুদ্র সামন্ত বা ব্যাৱণ - দের মধ্যে জমি ও ক্ষমতা ভাগ করে দেন। ব্যারণরা হলেন ডিউক ও আর্লদের সামন্ত এবং ডিউক ও আর্লরা হলেন ব্যারণ - দের সামন্তপ্রভু। ব্যারণরা আবার অনুরূপ পদ্ধতিতে জমি ও ক্ষমতা ভাগ করে দেন নাইট - দের মধ্যে। নাইটরা হল সামন্তপ্রভুদের সর্বনিম্ন স্তর। তাহলে দেখা যায় যে ডিউক, আর্ল এবং ব্যারণরা হলেন একাধারে সামন্তপ্রভু (Lord) এবং প্রজা (Vassal)। ডিউক ও আর্লদের আনুগত্য ছিল রাজার কাছে। অন্যদিকে ব্যারণদের আনুগত্য ছিল ডিউক ও আর্লদের কাছে রাজার কাছে নয়, এবং তারা রাজার হুকুম মানতে বাধ্য ছিলেন না। ঠিক সেই রকম নাইটদের আনুগত্য ছিল ব্যারণদের কাছে — ডিউক বা আর্লদের কাছে নয়। এর ফলে কেন্দ্রীয় সরকার দুর্বল হয়ে পড়ে ।
২) ভূমিকেন্দ্রীক এই ব্যবস্থায় সামন্তপ্রভু (Lord) ও তার অধীনস্থ প্রজা (Vassal) পারস্পরিক বিশ্বাস ও আনুগত্যের বন্ধনে আবদ্ধ থাকতেন এবং উভয়েরই কিছু পারস্পরিক দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল।
৩) রাজা, ডিউক, আর্ল, ব্যারণ, নাইট — কেউই তাদের জমি নিজেরা চাষ করতেন না। জমি চাষ করত তাদের অধীনস্থ ভূমিদাসরা (Serf)। তাদের জীবন ছিল দুর্বিষহ - ক্রীতদাসদের চেয়েও অধম। ক্রীতদাসদের বিক্রি করা যেত বা মুক্তি দেওয়া যেত, কিন্তু ভূমিদাসদের জমি থেকে বিচ্ছিন্ন করা যেত না — সে জমির সঙ্গেই আবদ্ধ থাকত। জমি বিক্রি হলে, সেই জমির সঙ্গে যুক্ত ভূমিদাস নতুন মালিক পেত।
৪) এই ব্যবস্থায় কৃষির উপর অতিরিক্ত গুরুত্ব আরােপ করায় শিল্প ও বাণিজ্যের অবনতি ঘটে। শিল্প - বাণিজ্য গ্রামকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে জন্ম নেয় আবদ্ধ অর্থনীতি।
৫) মুদ্রার স্বল্পতা দেখা দেয়।
৬) জীবনযাত্রা কৃষিভিত্তিক ও গ্রামকেন্দ্রিক হওয়ায় নগরগুলি ধ্বংসের দিকে অগ্রসর হয়।
৭) আঞ্চলিকতার বিকাশ ঘটে।

ভারতে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব : ডঃ রামশরণ শর্মা ৩০০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে সামন্ততন্ত্রের উন্মেষ, বিকাশ ও অবক্ষয়ের কাল বলে চিহ্নিত করেছেন। তার মতে ৩০০ থেকে ৬০০ খ্রিস্টাব্দ হল উন্মেষকাল, ৬০০ থেকে ৯০০ খ্রিস্টাব্দ হল বিকাশকাল এবং ৯০০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ হল সামন্তপ্রথার চুড়ান্ত বিকাশ ও অবক্ষয়ের কাল।

ডঃ রামশরণ শর্মা বলেন যে, প্রাচীনকালে ধর্মীয় কারণে ব্রাহ্মণকে জমিদান করা বা অগ্রহার ব্যবস্থা থেকেই ভারতে সামন্তব্যবস্থার উদ্ভব। পরবর্তীকালে হিন্দু মন্দির, জৈন ও বৌদ্ধমঠ প্রভৃতিকে ভূমি বা গ্রামদানের প্রথা প্রচলিত হয়।

মৌর্য, কুষাণ, গুপ্ত বংশ এবং হর্ষবর্ধনের আমলে সরকারি কর্মচারীরা অনেকে বেতনের বিনিময়ে সমৃদ্ধশালী গ্রাম বা ভূখণ্ড ভােগ করতেন। পরাজিত রাজন্যবর্গ ও তাদের অনুচরদের জন্যও এই ব্যবস্থা ছিল। সামরিক প্রশাসনেও সামন্ততান্ত্রিকতা প্রকট হয়ে ওঠে। যুদ্ধের সময় রাজাকে সেনা সরবরাহের শর্তে সামরিক নেতারা জমি ভােগ করতেন। রাষ্ট্রকূট রাজাদের এ ধরনের প্রচুর শিলালিপি পাওয়া যায়। সামরিক প্রয়ােজন বৃদ্ধি পাওয়ায় একাদশ শতাব্দীতে এ ধরনের ভূমিদান প্রচুর বৃদ্ধি পায়।

এছাড়া স্থানীয় প্রধান, বিভিন্ন উপজাতি ও গােষ্ঠী নায়করাও নির্দিষ্ট ভূখণ্ড ভােগ করতেন। এদের মধ্যে নানা স্তর ছিল। এইসব শাসক ও ভূস্বামীদের পদ ও ভূমির উপর তাদের অধিকার বংশানুক্রমিক হয়ে পড়ে। নিজ এলাকায় তারা শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা, বিচারকার্য পরিচালনা ও কর আদায় করতেন। এইভাবে দেশে এক সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যেখানে সমাজের প্রধানরা ভূমিতে কোনও কায়িক শ্রম না করে ভূমি থেকেই জীবিকানির্বাহ করনে।

সামন্ততন্ত্র ব্যবস্থায় রাজা ও কৃষকের মধ্যে নতুন এক মধ্যস্বত্বভােগীর আবির্ভাব হয় - (i) মহীপতি ( ii ) স্বামী ও ( ii ) কর্ষক। মহীপতি হলেন রাজা। দ্বিতীয়জন স্বামী হলেন জমির প্রাপক এবং কর্ষক হল কৃষক সমাজ।

এই যুগে কুশীনগর, হস্তিনাপুর, রামগ্রাম, কৌশাম্বী, কপিলাবস্তু, শ্রাবস্তী, বৈশালী প্রভৃতি নগরের পতন ঘটে এবং পরিত্যক্ত হয়। ডঃ শর্মা একে বলেছেন নগরের রক্তাল্পতা (Urban anaemia)।

মৌর্য যুগের কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থায় সামন্তব্যবস্থার বিকাশের কোনও সুযােগ ছিল না। গুপ্তযুগে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত তার সাম্রাজ্য সামন্তদের দ্বারা শাসন করাই সুবিধাজনক বলে মনে করতেন এবং তার অধীনে অনেক সামন্তরাজা ছিলেন। পুষ্যমিত্র ও হুন আক্রমণকালে সামন্তরাজাদের গুরুত্ব যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। সাতবাহন, বাকাটক, পাল, প্রতিহার ও রাষ্ট্রকুট রাজারা এ ধরনের ভূমিদান করতেন। এর ফলে রাজকীয় কতৃত্ব, ক্ষমতা ও মর্যাদা যথেষ্ট পরিমাণে হ্রাস পায়। অপরপক্ষে, সামন্তদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। রাজা সম্পূর্ণভাবে সামন্তদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন এবং রাজ্যের এই অভ্যন্তরে সামন্তশাসিত অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য গড়ে ওঠে।

কৃষকদের অবস্থা শােচনীয় হয়ে পড়ে এবং তারা ক্রমশ জমিতে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। কৃষককে আগে বলা হত গহপতি, কুটুম্বী প্রভৃতি। কিন্তু পরবর্তীকালে তাদের সম্পর্কে আশ্রিতহালিক, বদ্ধহল প্রভৃতি শব্দ প্রয়ােগ করা হতে থাকে। নতুন এই শব্দগুলি জমির সঙ্গে তাদের অচ্ছেদ্য বন্ধন এবং তাদের শােচনীয় অবস্থার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে।

সমালোচনা : ডঃ দীনেশচন্দ্র সরকার বলেন যে, প্রাচীন ও মধ্যযুগে ভারতের ভূমিব্যবস্থাকে সামন্তপ্রথার সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না, এবং বিকেন্দ্রীকৃত শাসনব্যবস্থা মানেই কিন্তু সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা নয়। তার মতে, যাকে ভারতীয় সামন্ততন্ত্র বলা হচ্ছে তা আসলে চিরাচরিত জমিদারি প্রথা। তিনি বলেন যে, রাজা কখনােই ভারতের সব জমির মালিক ছিলেন না। অপরপক্ষে, সামন্তপ্রথার প্রাথমিক কথাই হল রাজা দেশের সব জমির মালিক।

ড: দীনেশচন্দ্র সরকার এই পর্বের তাম্রলিপি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, অগ্রহার ব্যবস্থার দ্বারা ক্ষমতা হ্রাস পায় নি বা তার আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয় নি। বিভিন্ন লিপি থেকে জানা যায় যে, এই ধরনের জমিগুলি থেকে সাধারণত দানগ্রহিতায় রাজস্ব আদায় করতেন, কিন্তু রাজা ইচ্ছা করলে আদেশনামা জারি করে এইসব জমি থেকে কর আদায় করতে পারতেন এবং রাজবিরোধী কাজের জন্য দানগ্রহিতাকে জমি থেকে উৎখাত করতে পারতেন।

ডঃ হরবন্স মুখিয়া বলেন যে, এই সময় ভারতীয় উৎপাদন ব্যবস্থায় ভূমিদাসের অস্তিত্ব ছিল এবং ভূস্বামী ও কৃষকের মধ্যে সামন্ততান্ত্রিক তত্ত্ব অনুযায়ী আধিপত্য - অধীনতার সম্পর্কও গড়ে ওঠে নি। সুতরাং তিনি এই উৎপাদন ব্যবস্থাকে সামন্ততন্ত্র আখ্যা দিতে রাজি নন। এই যুগে কৃষক জমির সঙ্গে অচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ ছিল না। পুরাণে তাদের সম্পর্কে বদ্ধহল, আশ্রিতহলিক প্রভৃতি শব্দ ব্যবহৃত হলেও, এই কথাগুলি ভূমিদাসের সমার্থক কিনা তার উল্লেখ পুরাণে নেই। এছাড়া সুভাষিত রত্নকোষ নামক গ্রন্থের একটি কাহিনি থেকে জানা যায় যে, জনৈক ভূস্বামীর অত্যাচারে কৃষকেরা দলবদ্ধভাবে স্থানান্তরে গমন করে। সুতরাং এ কথা মানা কঠিন যে, এই যুগে ভারতীয় কৃষকদের অবস্থা ভূমিদাসদের স্তরে পৌছেছিল।

ডঃ ব্রজদুলাল চটোপাধ্যায় সাক্ষ্যের ভিত্তিতে প্রমাণ করেছেন যে ওই যুগে বহু নগর তাদের উজ্জ্বল অস্তিত্ব বজায় রেখেছিল, এবং বহু নগরের পূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল। উত্তরপ্রদেশের অহিছত্র, অত্রঞ্জিখেড়া, রাজঘাট, বিহারের চিরান্দ, উত্তর - পশ্চিম ভারতের পেহােয়া, গােপাদি প্রভৃতি নগর তাদের ধারাবাহিক অস্তিত্ব বজায় রাখে। এই যুগে সারা ভারত জুড়ে বহু নগরের বিকাশ লক্ষ করা যায়। কৃষির প্রসার এই নগরায়নে সাহায্য করে। ডঃ চট্টোপাধ্যায় এই পর্বের নগরায়নকে তৃতীয় দফার নগরায়ন বলে অভিহিত করেছেন। প্রথম নগরায়ন ঘটে হরপ্পায়, দ্বিতীয় নগরায়ন হয় খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে আর তৃতীয় নগরায়ন সংঘটিত হয় আদি মধ্যযুগে (৬৫০ - ১২০০ খ্রিঃ)।

আদি মধ্যযুগে ভারতবর্যে সামন্ততন্ত্রের অস্তিত্ব একটি বিতর্কিত বিষয়। এ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। আসলে পশ্চিম ইউরােপের ধাঁচে ভারতে সামন্ততন্ত্রের অস্তিত্ব প্রমাণ করা সম্ভব নয়। ডঃ ব্যাসাম এই যুগের ভারতীয় পরিস্থিতিকে আধা - সামন্ততান্ত্রিক বা সামন্ততান্ত্রিক ধাঁচের বেশি কিছু বলতে রাজি নন।