মধ্যযুগের ইতিহাসের উপাদান।

author photo
- Sunday, September 30, 2018
advertise here

মধ্যযুগের ইতিহাস রচনার উপাদান।


১২০৬ খ্রিস্টাব্দ কুতুবুদ্দিন আইবক দিল্লিতে স্বাধীন সুলতানী শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। সুলতানি যুগকে মধ্যযুগ বলা হয়। মধ্যযুগে ইতিহাস গ্রন্থের অভাব নেই। এই যুগের ইতিহাসের উপাদান হল সরকারি দলিলপত্র, সমসাময়িক ঐতিহাসিকদের রচনা, আঞ্চলিক ভাষা ও সাহিত্য, বিদেশি পর্যটক ও বণিকদের বিবরণ, মুদ্রা ও শিল্প নিদর্শন প্রভুতি।

(১) সরকারি দলিলপত্র [Government documents]:


শাসক বর্গের লিখিত বিবরণ এবং সমসাময়িক দলিলপত্র-বাদশহি হুকুমনামা, ভূমিদানের দলিল, সরকারি চিঠিপত্র বিশেষ উপাদান।



(২) সমসাময়িক ঐতিহাসিকদের রচনা [Composition of contemporary historians]:


১৬০০ খ্রিস্টাব্দ মির মোহাম্মদ মাসুম রচিত তারিখ-ই-সিন্ধ থেকে আরবদের সিন্ধু জয়ের বিবরণ পাওয়া যায়। আরবী ভাষায় কালজুরি রচিত চাচনানা উল্লেখযোগ্য। আবু নাসের বিন উৎবি রচিত কিতাব-উল-ইয়ামিনি গ্রন্থে সবুক্তগিন ও সুলতান মামুদের রাজত্বকাল জানা যায়হাসান নিজামি রচিত তাজ-উল-মাসির গ্রন্থে ১১৯২ থেকে ১২২৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিবরণ পাওয়া যায়। মিনহাজ-উস-সিরাজ রচিত তাবাকাত-ই-নাসিরি গ্রন্থে মোহাম্মদ ঘুরির রাজ্য জয় থেকে শুরু করে ১২৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দিল্লি সুলতানী বিভিন্ন ঘটনা জানা যায়। তিনি সুলতান নাসিরুদ্দিনের আমলে দিল্লির প্রধান কাজী পদে নিযুক্ত ছিলেন। মোহাম্মদ বিন তুঘলক ও ফিরোজ তুঘলকের সভাসদ জিয়াউদ্দিন বরানি রচিত তারিখ-ই-ফিরোজশাহী গ্রন্থে গিয়াসউদ্দিন বলবনের রাজত্বকাল থেকে ফিরোজ শাহের রাজত্বকালের বিবরণ পাওয়া যায়। কায়কোবাদ থেকে গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের আমল পর্যন্ত দিল্লি দরবারের সভাকবি ছিলেন আমির খসরু রচিত কিরান-উস-সাদিন, মুফতা-উল-ফোথ, আশিক, তুঘলকনামা প্রভুতি। আমির খসরু কে 'ভারতের তোতাপাখি' বলা হয়। তার রচিত খাজাইন-উল-ফুতুহু গ্রন্থ থেকে আলাউদ্দিন খলজির দাক্ষিণাত্য অভিযান , তার প্রশাসনিক সংস্কার প্রভুতি জানা যায়। লোদি বংশের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে আব্বাস সেরওয়ানি রচিত তারিখ-ই-শেরশাহী, নিয়ামত উল্লাহ রচিত মাখজাম-ই-আফগান এবং আব্দুল্লাহ রচিত তারিখ-ই-দাউদি। সুলতান ফিরোজ তুঘলকের শামস-ই-সিরাজ আফিফ রচিত 'তারিখ-ই-ফিরোজ-শাহী'সুলতান ফিরোজ তুঘলক রচিত ফতুয়া ই ফিরোজশাহীগ্রন্থ তার ব্যক্তিগত ধর্মীও ধারণা ও শাসন ব্যবস্থার ধারাবাহিক বিবরণ পাওয়া যায়।

(৩) আঞ্চলিক ভাষা ও সাহিত্য [Regional language and literature]:


চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকে ভক্তি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ভারতের বিভিন্ন অংশে আঞ্চলিক সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। বাংলার মঙ্গলকাব্য, কবিরের দোহা, সুরদাস ও নানকের ভোজন এবং মারাঠি ও গুরুমুখি সহিত্যগুলি থেকে ইতিহাসের নানা তথ্য জানা যায়।

(৪) বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ [Details of foreign tourists]:


বিখ্যাত আরব পণ্ডিত অল বিরুনির তহকক-ই-হিন্দ বা কিতাব-উল-হিন্দ গ্রন্থে দশম শতাব্দীর শেষ ও একাদশ শতাব্দীর সূচনায় উত্তর ভারতের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক বিষয় জানা যায়। আফ্রিকার মরক্কোর অধিবাসী ইবন বতুতা ১৪ বছর ভারতে ছিলেন। তার গ্রন্থ কিতাব-উল-রাহলা থেকে মোহাম্মদ-বিন-তুগলুকের রাজত্বকাল সম্পর্কে জানা যায়। ইতালির মার্কো পলো, নিকোল কন্টি, পর্তুগিজ পায়েজ, বরবোসা, নুনিজ, পারস্যর আব্দুর রাজ্জাক, রাশিয়ার নিকিতিন, চীনের মা হুহান প্রমুখ।

(৫) মুদ্রা ও শিল্প নিদর্শন [Currency and industrial patterns]:


ঐতিহাসিক স্ট্যানলি লেনপুুল এর মতে সুলতানী যুগের মুদ্রাগুলো ইতিহাসের প্রধান ভিত্তি। তার মতে এই মুদ্রা থেকে সুলতানদের রাজবংশ, রাজত্বকাল, রাজ্যর আয়তন, সময়, ধর্মমত, প্রতিবেশী রাজ্যগুলির সঙ্গে তার সম্পর্ক, ধাতুশিল্পের অবস্থা প্রভুতি বিষয়ে জানা যায়। এছাড়া এই যুগের মসজিদ, স্মৃতিসৌধ, প্রাসাদ, দুর্গ প্রভুতি নিদর্শন থেকে এই যুগের ইতিহাস জানা যায়।
Advertisement advertise here