প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার উপাদান

- September 30, 2018
প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উপাদানগুলিকে দুভাগে ভাগ করা হয় - (১) সাহিত্যিক উপাদান এবং (২) প্রত্নতাত্বিক উপাদান। সাহিত্যিক উপাদানকে আবার দুভাগে ভাগ করা হয় - (ক) ভারতীয় সাহিত্য ও (খ) বিদেশি সাহিত্য।

(১) সাহিত্যিক উপাদান

প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় সাহিত্যিক উপাদান গুরত্বপূর্ণ। তবে সাহিত্যিক উপাদানকে নির্ভুল বলা যায় না। এতে পক্ষপাতিত্ব দুষ্ট রয়েছে। কিন্তু তা সত্বেও সাহিত্যিক উপাদান থেকে সেই সময়কার দেশীয় ও বিদেশি বিভিন্ন পরিচয় পাওয়া যায়।
প্রাচীন ভারতের মুদ্রা
(ক) ভারতীয় সাহিত্য : খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের পূর্ববর্তী যুগ বা প্রাক বিম্বিসার যুগের কোনও লিখিত বিবরণ পাওয়া যায় নি। বেদ, মহাকাব্য ও পুরাণ থেকে প্রাচীন যুগের কিছু কিছু বিবরণ পাওয়া যায়। ঋক, সাম, যজু ও অথর্ব এই চারটি বেদ এবং সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ এবং সূত্র সাহিত্য নিয়ে বৈদিক সাহিত্য গড়ে উঠেছে। ঋগবেদ থেকে সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে আর্যদের বসতি স্থাপন এবং তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় জীবনের পরিচয় পাওয়া যায়। বৈদিক সাহিত্যের পর গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল রামায়ণ ও মহাভারত।

ইতিহাসের উপাদান হিসেবে পুরাণগুলি যথেষ্ট মূল্যবান। আঠারােটি পুরাণের মধ্যে বিষ্ণুপুরাণ, বায়ুপুরাণ, মৎস্যপুরাণ, ব্রহ্মপুরাণ ও ভবিষ্যপুরাণ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। পুরাণগুলিতে কিংবদন্তির যুগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজবংশের উৎপত্তি, রাজাদের বংশতালিকা, রাজাদের কার্যকলাপ, প্রাচীন ভারতের ভৌগোলিক অবস্থা, বিভিন্ন নদ নদী, পাহাড় পর্বত, প্রাচীন শহর ও তীর্থস্থানগুলির বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে।

বিভিন্ন বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মগ্রন্থগুলিও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। পালি ভাষায় রচিত বৌদ্ধ গ্রন্থ ত্রিপিটক, দীপবংশ, মহাবংশ এবং জাতক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ত্রিপিটক অর্থাৎ বিনয় পিটক, সুত্ত পিটক ও অভিধর্ম পিটকে বৌদ্ধ ধর্ম ও সঙ্ঘ সংক্রান্ত তথ্যাবলী পাওয়া যায়। প্রাকৃত ভাষায় রচিত জৈন ভগবতী সূত্র, আচারঙ্গ সূত্র, ভদ্রবাহু রচিত জৈন কল্পসূত্র জৈন আচার্য হেমচন্দ্র রচিত পরিশিষ্টপার্বণ এবং মেরুতুঙ্গ সম্পাদিত প্রবন্ধচিন্তামণি ও রাজশেখর সম্পাদিত প্রবন্ধকোষ ইতিহাসের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।

কাশ্মীরের বিখ্যাত কবি বিহূন-এর বিক্রমাঙ্কদেব চরিত, সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিত, জয়সিংহ রচিত কুমারপালচরিত, পদ্মগুপ্ত রচিত নবসাহসঙ্কচরিত, বাক্‌পতিরাজ রচিত গৌড়বাহ, ন্যায়চন্দ্র রচিত হামিরকাব্য, চাদবরদৈ রচিত পৃথ্বীরাজচরিত, বল্লাল রচিত ভােজপ্রবন্ধ ইতিহাসের মূল্যবান উপাদান। দ্বাদশ শতকে কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ কলহন রচিত রাজতরঙ্গিনী থেকে কাশ্মীরের ইতিহাস জানা যায়। গুজরাটের ইতিহাস জানা যায় সােমেশ্বর রচিত রাসমালা ও কীর্তিকৌমুদী, অরিসিংহের সুকৃতি সংকীর্তন, মেরুতুঙ্গের প্রবন্ধ চিন্তামণি, রাজশেখরের প্রবন্ধকোষ প্রভৃতি গ্রন্থ থেকে। বালাজুরি রচিত চাচনামা গ্রন্থ থেকে আরবদের সিন্ধু বিজয়ের বিবরণ পাওয়া যায়।

(খ) বিদেশি সাহিত্য : খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে জনৈক অজ্ঞাতনামা গ্রিক নাবিক রচিত পেরিপ্লাস অব দি এরিথ্রিয়ান সী (Periplus of the Erythrean Sea), খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে রচিত গ্রিক লেখক টলেমি-র ভূগােল (Geography) এবং খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে লিখিত রােমান পণ্ডিত প্লিনি রচিত প্রাকৃতিক ইতিহাস (Natural Histoy) ভারত ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এই তিনটি গ্রন্থ থেকে ভারতের বিভিন্ন বন্দর, পােতাশ্রয়, আমদানি রপ্তানি দ্রব্য, জীবজন্তু, লতা গুল্ম, খনিজ সম্পদ এবং রােম ভারত বাণিজ্য সম্পর্কে নানা মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায়। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে পলিবিয়াস লিখিত সাধারণ ইতিহাস (General History) থেকে বাহ্রিক গ্রিকদের আক্রমণ সম্পর্কে জানা যায়।

ভারতে শক, পল্লব ও কুষাণ ইতিহাসের ক্ষেত্রে চৈনিক বিবরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিব্বতীয় পণ্ডিত লামা তারানাথ রচিত 'ভারতে বৌদ্ধধর্মের জন্ম' গ্রন্থ থেকে ভারত ইতিহাসের নানা তথ্যাদি জানা যায়। অল মাসুদি, অল বিলাদুরি, হাসান নিজামি প্রমুখের রচনায় মুসলিম শাসনের বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া। অল বিরুনি দীর্ঘকাল ভারতে বসবাস করে ভারতীয় ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান ও সাহিত্য সম্পর্কে অনুশীলন করেন।

(২) প্রত্নতাত্বিক উপাদান

প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের উপাদান হিসেবে প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানকে প্রাচীন ভারত ইতিহাসের নােঙর বলা হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানগুলিকে তিনভাগে বিভক্ত করা হয়েছে — (ক) লিপি, (খ) মুদ্রা এবং (গ) প্রাচীন স্মৃতিসৌধ ও স্থাপত্য ভাস্কর্য।

(ক) লিপি : লােহা, সােনা, তামা, ব্রোঞ্জ, মাটির তৈরি নানা দ্রব্যাদি, ইট, পাথর, ঘর-বাড়ি, মন্দির-গাত্র এমনকী দেবমূর্তির উপর নানা লেখা থেকে ইতিহাসের প্রচুর উপাদান সংগৃহীত হয়েছে। ডঃ ভিনসেন্ট স্মিথ বলেন যে, প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের উপাদান হিসেবে লিপিগুলি সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বপ্রধান স্থানের অধিকারী, কারণ আমাদের প্রয়ােজনীয় তথ্যাদির মধ্যে এগুলি সামগ্রিকভাবে সর্বাধিক গুরত্বপূর্ণ ও বিশ্বাসযােগ্য। তাঁর মতে, এই যুগের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে সন্দেহাতীতভাবে লিপি সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ স্থানের অধিকারী। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার এর মতে প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস রচনায় লিপির গুরুত্ব অপরিসীম।

ব্রাহ্মী, খরোষ্ঠী, তামিল, পালি, সংস্কৃত, প্রাকৃত প্রভৃতি ভাষায় লেখা প্রাচীন ভারতীয় লিপিগুলির প্রধান বিষয়বস্তু ছিল ভারতীয় রাজাদের রাজ্যজয়, রাজপ্রশস্তি, ভূমিদান, শাসন, ধর্ম, রাজনৈতিক, ব্যবসাবাণিজ্য প্রভৃতি। প্রাচীন ভারতের লিপি গুলির মধ্যে 'অশোকের শিলালিপি' ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া হরিসেন রচিত 'এলাহাবাদ প্রশস্তি' থেকে সমুদ্রগুপ্তের বিজয় কাহিনী জানা যায়। কলিঙ্গরাজ খারবেলের 'হস্তিগুম্ফা লিপি', প্রতিহার বংশীয় রাজা ভােজের 'গোয়ালিয়র প্রশস্তি', বিজয় সেনের 'দেওপাড়া লিপি', চালুক্যরাজ দ্বিতীয় পুলকেশীর 'আইহোল লিপি' শকরাজা রুদ্রদামনের 'জুনাগড় লিপি' বিশেষ উল্লেখযোগ্য। হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোয় প্রাপ্ত লিপির পাঠোদ্ধার করা আজও হয়নি। দাক্ষিনাত্যের পল্লব, চোল, চালুক্য, রাষ্ট্রকূট, বাকাটক প্রভৃতি রাজবংশের ইতিহাসের জন্য লিপির উপর নির্ভরশীল হতে হয়। ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথ, ড: রমেশচন্দ্র মজুমদার, প্রমুখ ঐতিহাসিক উপাদান হিসাবে লিপিকে প্রথম স্থানে রেখেছেন।

এশিয়া মাইনর, কম্বোডিয়া, চম্পা, যবদ্বীপ, গ্রিস ও পারস্য প্রভৃতি বৈদেশিক অঞ্চলগুলি থেকে পাওয়া লিপিগুলি থেকে এই সমস্ত অঞ্চলের সঙ্গে প্রাচীন ভারতের সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের ইতিহাস পাওয়া যায়। পারস্যের বেহিস্তান পার্সেপলিস ও নাকশ ই রুস্তম নামক স্থানে প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে ভারত ও পারস্য যােগাযােগ ও ভারতের উত্তর পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে পারসিক আধিপত্যের কথা জানা যায়।

(খ) মুদ্রা : মুদ্রাগুলিতে সাধারণত রাজার নাম, সন তারিখ, রাজার মূর্তি ও নানা দেবদেবীর মূর্তি খােদাই করা থাকত। ইতিহাসের উপাদান হিসেবে মুদ্রা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও ধাতুবিদ্যার উৎকর্ষতা মুদ্রা থেকে জানা যায়। মুদ্রায় অঙ্কিত চিত্রের মাধ্যমে সেই রাজার গুণাবলী সম্পর্কে ধারনা করা যায়। যেমন সমুদ্রগুপ্তের মুদ্রায় বীণাবাদনরত মূর্তি থেকে সঙ্গীতানুরাগের পরিচয় পাওয়া যায়। ব্যাকট্রীয়, গ্রিক, শক, কুষাণ রাজাদের কাহিনী মুদ্রা থেকেই জানতে পারা যায় গিয়েছিল। সাতবাহন সাম্রাজ্যের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান উপাদান হল মুদ্রা।

(গ) প্রাচীন স্মৃতিসৌধ ও স্থাপত্য ভাস্কর্য : প্রাচীন নগরের ধ্বংসাবশেষ, স্মৃতিসৌধ, মন্দির, স্থাপত্য, ভাস্কর্য ইত্যাদি ইতিহাসের গুরত্বপূর্ণ উপাদান। হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো ধ্বংসাবশেষ ভারতের ইতিহাস রচনার অমূল্য সম্পদ। বিহারের সারনাথ, পাটলিপুত্র, নালন্দা এবং উত্তর পশ্চিম সীমান্তের তক্ষশিলায় খননকার্যের ফলে বৌদ্ধ ও আর্য সংস্কৃতির নানা নতুন দিক উন্মােচিত হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রাপ্ত ধ্বংসাবশেষ থেকে ভারতবর্ষের বাইরে উপনিবেশ ও সংস্কৃতি কথা জানা যায়।