ভারতের প্রাচীন প্রস্তর যুগ - Palaeolithic Age in India

- September 03, 2018
আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪০০,০০০ অব্দ থেকে ২০০,০০০ অব্দের মাঝামাঝি সময়কে বলা হয় প্রাচীন প্রস্তর যুগ (ইংরেজি: Palaeolithic Age)। অধুনা পাঞ্জাবের সােয়ান নদীর উপত্যকায় দক্ষিণ ভারতের চেন্নাই, মুঙ্গের, পূর্বঘাট পর্বতমালার উপকূলে এই সময়কার সংস্কৃতির চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে। এই সময় মানুষ নদীর তীরবর্তী অঞ্চল ও গুহায় বসবাস করত। এরা গাছের ফলমূল ও নদীর কাঁকড়া ধরে খেত। এদের স্থায়ী বাসস্থান ছিল না।
ভারতের প্রাচীন প্রস্তর যুগের জীবনযাত্রা
প্রাচীন প্রস্তর যুগকে সাধারণত মানুষের খাদ্য সংগ্রহের পর্যায় হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। পুরা প্রস্তর যুগ আবার ক্রমপর্যায় অনুসারে নিম্ন প্রাচীন প্রস্তর, মধ্য প্রাচীন প্রস্তর এবং উচ্চ প্রাচীন প্রস্তর যুগে ভাগ করা হয়। গুজরাটের জুনাগড ও উমরেতে থেকে পাওয়া তারিখ যথাক্রমে ১ লক্ষ ৯০ হাজার বছর এবং ৬৯ হাজার বছর আগে। মধ্যপ্রদেশে মান্দাস থেকে উচ্চ পুরা প্রস্তর উপপর্বের তারিখ স্থির হয়েছে মোটামুটি ৩১হাজার বছর আগে। আনুমানিক ৮০০০ খ্রিস্টপূর্বে ভারতে প্রাচীন প্রস্তর যুগ শেষ হয়।

ভারতে দুটি অঞ্চলে প্রাচীন প্রস্তর যুগের প্রচুর নিদর্শন পাওয়া গেছে। একটি হল পাঞ্জাবের সােয়ান নদীর অববাহিকা, এবং অপরটি হল দক্ষিণ ভারতের মাদ্রাজ। ফলে এই দুটি সংস্কৃতির একটিকে বলা হয় সােয়ান সংস্কৃতি (Soan Culture) এবং অপরটিকে বলা হয় মাদ্রাজ সংস্কৃতি (Madras Culture)। দুটি সংস্কৃতির সময়কাল ও বৈশিষ্ট্য একই এবং তাদের উৎপত্তিস্থল হল নদী উপকুল। এছাড়া সিন্ধু প্রদেশে মাইলস্টোন ১০১ ও সুক্কর রাই অঞ্চলে কিছু নিদর্শন পাওয়া গেছে। এছাড়া লাদাক অঞ্চল, উত্তর প্রদেশের মির্জাপুর ও মহীশূর, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাডু, কম্বলপুর, ফুলবনি, গুজরাট, রাচি, হাজারীবাগ, বাঁকুড়ার সুসুমিয়া, বীরভূমের বেশ কিছু প্রাচীন প্রস্তর যুগের নিদর্শন পাওয়া গেছে।

ভারতে প্রথম মানুষের আবির্ভাব হয় খ্রিস্ট পূর্ব তিন থেকে দুই লক্ষ বছরের মধ্য। এটার প্রমাণ পাওয়া যায় দক্ষিণ ভারত এবং সোয়ান উপত্যকা অঞ্চলে প্রাপ্ত প্রাগৈতিহাসিক পাথরের অস্ত্রশস্ত্র থেকে। আধুনিক হোমােসেপিয়েন্স মানুষের প্রথম আবির্ভাব ঘটে প্রায় ৩৬ হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে। প্রাচীন প্রস্তর যুগে আদিম মানুষের অস্তিত্ব ছিল ৮০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত।

বৈজ্ঞানিক গবেষণার সাহায্যে প্রাচীন প্রস্তর যুগের বৃষ্টিপাত, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, উষ্ণতা ও আদ্রতা তারতম্য জানা সম্ভব হয়েছে। কাশ্মীরের আবহাওয়া সম্পর্কে যে তত্ত্ব উপস্থাপন করেন তা কয়েকটি পর্যায়ে বিভক্ত। প্রথম পর্যায়ে ৩৫ লক্ষ বছর থেকে শুরু করে বা তারও আগে পর্যন্ত উষ্ণ নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া। দ্বিতীয় পর্যায় ছিল শীতল নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া। তৃতীয় পর্যায় হল শীতলতম। রাজস্থানের বালিয়াড়ি ঢালে পুরা প্রস্তর যুগের যে নিদর্শন পাওয়া গেছে তার থেকে অনুমান করা সম্ভব যে আবহাওয়া ছিল অতিশয় শুষ্ক। এছাড়া আরব সাগরের নীচ থেকে সংগৃহীত স্তর পরম্পরা নমুনা থেকে অনুমান করা হয়ে থাকে ১৮ হাজার বছর আগে ঠান্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়া একটা পর্যায় ছিল। তবে এ পর্যায়ের বৃষ্টিপাত এর পরিমাণ জানা যায় নি।

প্রাচীন প্রস্তর যুগের হাতিয়ার ছিল আয়তনে অনেক বিশাল এবং তাতে কোন সোন্দর্য ও মসৃণতা ছিল না। পুরা বা প্রাচীন প্রস্তর যুগের হাতিয়ার গুলির মধ্যে ছিল ব্লেড বা লম্বা চিলকা, হাতকুঠা, ছেদক, ব্যাসল্ট চার্ট জাতীয় পাথর প্রভুতি। এছাডা নিম্ন, মধ্য ও উচ্চ প্রাচীন প্রস্তর যুগে কয়েকটি হাতিয়ার ড্রমর, স্ক্রাপার, চাচানি, ইয়াগেট, জ্যাসপার প্রভুতি। তারা একই হাতিয়ার দিয়ে মাংস কাটা, কাঠ কাটা ও শিকারের কাজ করত। এগুলিকে হাত কুঠার বলা হত। ব্রুস ফুটি ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে প্রাগৈতিহাসিক হাতকুঠার আবিষ্কার করেন আতিরাম পক্কম (চেন্নাই)।

পুরা প্রস্তর যুগের মানুষের বৈচিত্র্য সংস্কৃতির পরিচয় আমরা পাই প্রধানত তার পাথরের হাতিয়ারের ধরনের পরিপ্রেক্ষিতে। সেই সময়ের মানুষের কোন স্থায়ী বসতি ছিল না। এই যুগের মানুষ কৃষিকার্য ও আগুন জ্বালাতে জানত না। ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে, তারা যাযাবর জীবন যাপন করত। বনের ফল, লতা গুল্ম ও পশুর মাংস খেয়ে তারা জীবন ধারণ করত। এ যুগের মানুষ ছিল খাদ্য সংগ্রাহক, খাদ্য উৎপাদক নয়। তারা ছিল যাযাবর জাতি। সাধারণত পাহাড়ের পাদদেশে উন্মুক্ত মালভূমি অঞ্চল, নদীর তীরবর্তী এলাকা ও অরণ্য বাস করত। এযুগে ভারতে নেগ্রিটো জাতির মানুষ অধিক সংখ্যক ছিল।
Advertisement