প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের প্রত্নতাত্বিক উপাদান

- September 28, 2018
প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের উপাদান হিসেবে প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের গুরুত্ব সর্বাধিক। প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানকে প্রাচীন ভারত ইতিহাসের নােঙর (sheet anchor of Ancient Indian history) বলা হয়। ইউরােপীয় পণ্ডিতদের হাতে ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার সূত্রপাত। এইসব পণ্ডিতদের মধ্যে উল্লেখযােগ্য ছিলেন স্যার উইলিয়ম জোন্স, জেমস্ প্রিন্সেপ (এশিয়াটিক সােসাইটির সচিব), হ্যামিল্টন বুকানন, স্যার আলেকজাণ্ডার কানিংহাম, স্যার জন মার্শাল (কেন্দ্রীয় প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের অধিকর্তা), স্যার অরেল স্টাইন এবং জেমস বারজেস্। যে সব ভারতীয় গবেষক এ ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন তারা হলেন রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, দয়ারাম সাহানি, কাশীনাথ দীক্ষিত, ননীগােপাল মজুমদার এবং ভগবান লাল ইন্দ্রজি। প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানগুলিকে তিনভাগে বিভক্ত করা যায় — (১) লিপি, (২) মুদ্রা এবং (৩) প্রাচীন স্মৃতিসৌধ ও স্থাপত্য ভাস্কর্য।
প্রাচীন ভারতের মুদ্রা

লিপি (Script)

প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানগুলির মধ্যে লিপির গুরুত্বই সর্বাধিক। লােহা, সােনা, তামা, ব্রোঞ্জ, মাটির তৈরি নানা দ্রব্যাদি, ইট, পাথর, ঘর-বাড়ি, মন্দির-গাত্র এমনকী দেবমূর্তির উপর নানা লেখা থেকে ইতিহাসের প্রচুর উপাদান সংগৃহীত হয়েছে। ডঃ ভিনসেন্ট স্মিথ বলেন যে, প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের উপাদান হিসেবে লিপিগুলি সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বপ্রধান স্থানের অধিকারী, কারণ আমাদের প্রয়ােজনীয় তথ্যাদির মধ্যে এগুলি সামগ্রিকভাবে সর্বাধিক গুরত্বপূর্ণ ও বিশ্বাসযােগ্য। তাঁর মতে, এই যুগের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে সন্দেহাতীতভাবে লিপি সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ স্থানের অধিকারী। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদাক এর মতে প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস রচনায় লিপির গুরুত্ব সর্বাধিক।

গুরত্ব : ইতিহাসের উপাদান হিসেবে নানা কারণে লিপির গুরুত্ব অপরিসীম।
(১) যুদ্ধ-বিগ্রহ, জন্ম-মৃত্যু বা বিশেষ কোনও ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখা, মন্দির নির্মাণ, ভূমিদান, ধর্মপ্রচার বা রাজকীয় নির্দেশ প্রচার প্রভৃতি বহু উদ্দেশ্যে লিপি উৎকীর্ণ করা হত। এইসব লিপিগুলি ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ। এগুলি থেকে রাজার নাম, রাজত্বকাল, সন-তাৱিখ, বিশেষ রাজার রাজ্যের আয়তন, রাজ্যজয়, ধর্মবিশ্বাস, অন্যান্য কার্যকলাপ এবং সমকালীন বিভিন্ন বিষয়ের কথা জানা যায়।
(২) পাথর এবং বিভিন্ন ধাতুর উপর লিখিত হওয়ায় লিপিগুলি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পােকা-মাকড় ও মহাকালের আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।
(৩) পুরাণ এবং বিভিন্ন সাহিত্য গ্রন্থগুলি যুগ যুগ ধরে পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হয়েছে। লিপিগুলিকে কিন্তু কোনও অবস্থাতেই পরিবর্তন করা যায় না। এই কারণে লিপিণ্ডলির সত্যতা প্রশ্নাতীত।
(৪) বহু লিপিতেই সন তারিখের কোনও উল্লেখ নেই, কিন্তু এ সত্ত্বেও এইসব লিপিতে ব্যবহৃত বর্ণমালা থেকে লিপির কালনির্ণয় করা যায়।
(৫) লিপিগুলির প্রাপ্তিস্থান থেকে বিশেষ কোনও যুগে ওই অঞ্চলের উপর বিশেষ রাজার আধিপত্য বা তার রাজ্যের আয়তন সম্পর্কে একটি ধারণা করা যায়।
(৬) লিপিতে উল্লিখিত বিষয়সমূহ ও রাজার আদেশ দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় জীবনের নানা দিকের উপর আলােকপাত করে।

Advertisement
প্রাচীন ভারতের বর্ণমালা ও ভাষা : ভারতে প্রাপ্ত লিপিগুলির মধ্যে হরপ্পার লিপিই প্রাচীনতম, তবে এই লিপিগুলি আজও সর্বাংশে পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয় নি। বর্তমানে পণ্ডিতরা সােহগাের তাম্রলিপিকেই ভারতের প্রাচীনতম লিপি বলে মনে করেন। এই তাম্রলিপি সম্রাট অশােকের পঞ্চাশ বছর পূর্বে রচিত হয়। হরপ্পাবাসী চিত্রলিপির সাহায্যে তাদের মনের ভাব প্রকাশ করত। ভারতে প্রাপ্ত খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের লিপিগুলিতে প্রাকৃত ভাষা ব্যবহৃত হত। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতক থেকে লিপিগুলিতে সংস্কৃত ভাষার ব্যবহার শুরু হয় এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শতকে প্রচলন বৃদ্ধি পায়। এ সত্ত্বেও লিপির মাধ্যম হিসেবে প্রাকৃত ভাষার ব্যবহার চলতে থাকে। গুপ্ত যুগের পূর্ববর্তীকালের লিপিগুলির শতকরা ৯৫ ভাগই প্রাকৃত ভাষায় লিখিত। গুপ্তযুগ থেকে লিপির মাধ্যম হিসেবে সংস্কৃতের বহুল প্রচলন দেখা দেয়। ভারতের অভ্যন্তরে সম্রাট অশােকের লিপিগুলিতে প্রাকৃত ভাষা ও ব্রাহ্মী লিপিবা হরফ ব্যবহৃত হয়েছে এবং এগুলি বামদিক থেকে ডানদিকে লেখা হত। স্থানীয় জনগণের সুবিধার জন্য কেবলমাত্র সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অশােকের লিপিগুলিতে খরােষ্ঠী লিপি ব্যবহৃত হত এবং এগুলি ডান দিক থেকে বামদিকে লিখিত হত। আফগানিস্তানে প্রাপ্ত অশােকের শিলালিপিগুলিতে গ্রিক ও আরামিক লিপির ব্যবহার দেখা যায়। খ্রিস্টীয় নবম ও দশম শতাব্দী থেকে বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় লিপির ব্যবহার শুরু হয়।

প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন লিপি : লিপিগুলির বিষয়বস্তু বিবেচনা করে পণ্ডিতরা প্রাচীন ভারতীয় লিপিগুলিকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করেছেন-ধর্মলিপি, শাসনতান্ত্রিক লিপি, প্রশস্তিবাচক লিপি, উৎসর্গীকৃত লিপি, দানসূচক লিপি, স্মরণসূচক লিপি, পারিবারিক লিপি ও বিভিন্ন লিপি ব্যক্তিগত লিপি। সম্রাট অশােকের লিপিগুলি থেকে তার ধর্মমত ও বিভিন্ন শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থাদি সম্পর্কে জানা যায়। শকরাজা রুদ্রদামনের জুনাগড় প্রস্তর লিপি এবং হর্ষবর্ধনের বান্সখেরা তাম্রশাসন শাসনতান্ত্রিক লিপির উদাহরণ। সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ প্রশস্তি, কলিঙ্গ রাজ খারবেলের হস্তিগুম্ফা শিলালিপি, চালুক্য রাজ দ্বিতীয় পুলকেশির আইহােল প্রশস্তি, গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীর নাসিক প্রশস্তি, প্রতিহার বংশীয় রাজা ভােজের গোয়ালিয়র প্রশস্তি থেকে ইতিহাসের নানা তথ্যাদি জানা যায়।

বহির্ভারতের শিলালিপি : ভারতের বাইরে এশিয়া মাইনরের বােঘাজ কোই নামক স্থানে প্রাপ্ত বােঘাজ কোই শিলালিপি আর্যদের ভারতে আগমন সম্পর্কে আলােকপাত করে। পারস্যের বেহিস্তান পার্সেপলিস ও নাকশ ই রুস্তম নামক স্থানে প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে ভারত ও পারস্য যােগাযােগ ও ভারতের উত্তর পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে পারসিক আধিপত্যের কথা জানা যায়। চম্পা, কম্বােজ এবং বৃহত্তর ভারতের নানা স্থানে প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে বহির্ভারতে ভারতীয় বাণিজ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে নানা তথ্যাদি পাওয়া যায়।

মুদ্রা (Currency)

প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের উপাদান হিসেবে লিপির পরেই মুদ্রা গুরুত্বপূর্ণ স্থানের অধিকারী।
১) সাহিত্য ও শিলালিপি থেকে যে সব তথ্য পাওয়া যায়, সেগুলির সত্যতা যাচাই করতে মুদ্রা যথেষ্ট সাহায্য করে।
২) মুদ্রাগুলিতে সাধারণত রাজার নাম, সন তারিখ, রাজার মূর্তি ও নানা দেবদেবীর মূর্তি খােদাই করা থাকে। ইতিহাসের উপাদান হিসেবে এগুলি অতি গুরুত্বপূর্ণ।
৩) ভারতে প্রচুর পরিমাণ রোমান মুদ্রার অস্তিত্ব রােমের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ট বাণিজ্যিক সম্পর্ক, ভারতের অনুকূল বাণিজ্য, ভারতের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং ভারতবাসীর সমুদ্রযাত্রার সাক্ষ্য বহন করে।
৪) মুদ্রার উপর অঙ্কিত রাজাদের মূর্তি থেকে তাদের মস্তক সজ্জার পরিচয় পাওয়া যায়।
৫) কুষাণ রাজ কণিষ্কের মুদ্রায় অঙ্কিত বিভিন্ন ধর্মের দেবদেবীর মূর্তি থেকে তার সমন্বয় ধর্মাদর্শ পরধর্মমত-সহিষ্ণুতার পরিচয় পাওয়া যায়
৬) গুপ্ত-রাজ সমুদ্রগুপ্তের মুদ্রাগুলো থেকে তার অশ্বমেধ যজ্ঞ, শিকারপ্রিয়তা ও সংগীতানুরাগের কথা জানা যায়।
৭) প্রাচীন ভারতের স্বর্ণ, রৌপ্য, তামা ও সিসার মুদ্রা প্রচলিত ছিল। স্বর্ণমুদ্রার অধিকতর প্রচলন নিঃসন্দেহে রাজ্যের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পরিচায়ক। অপরপক্ষে, কেবলমাত্র তামা বা সিসার মুদ্রার আধিক্য বা মুদ্রায় স্বর্ণর পরিমাণ হ্রস করা রাজ্যের আর্থিক সংকটের পরিচায়ক।

প্রাচীন ভারতীয় মুদ্রার ধরন ভারতে প্রাপ্ত প্রাচীনতম মুদ্রাগুলিতে কেবলমাত্র মূর্তি ও প্রতীক চিহ্নাদি দেখা যায়। অনেক সময় একই মুদ্রার উপর বিভিন্ন যুগ বা বিভিন্ন রাজার একাধিক প্রতীক চিহ্নের অস্তিত্ব দেখা যায়। সম্ভবত মুদ্রার যথার্থতা রক্ষার জন্যই কর্তপক্ষ স্বেচ্ছায় পূর্ববর্তী যুগের মুদ্রার উপর তাদের নিজেদের প্রতীক অঙ্কিত করতেন। প্রাচীন ভারতে মুদ্রার উপর রাজার একচেটিয়া কর্তৃত্বের ধারণা জন্মায় নি, কারণ এ সময় কেবলমাত্র রাজাই নন ব্যক্তিগতভাবে অনেক ব্যবসায়ী, বাণিজ্য সংস্থা ও নগর শাসন সংস্থা মুদ্রা প্রবর্তন করতেন।

গ্রীক শাসনের ইতিহাস : ভারতে গ্রিক আক্রমণের পর মুদ্রার উপর রাজার নাম লেখার পদ্ধতি প্রচলিত হয়। পাঞ্জাব ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে ব্যাকট্রিয়ার গ্রিক রাজাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের মুদ্রার শিল্প নৈপুণ্য, মুদ্রার উপর রাজার নাম খােদাই, রাজা বা অন্য কোনও মূর্তি অঙ্কন রীতি ভারতীয় মুদ্রাব্যবস্থায় উল্লেখযােগ্য পরিবর্তন আনে এবং ভারতীয় মুদ্রাতেও রাজার নাম, সময় ও মূর্তি অঙ্কনের পদ্ধতি শুরু হয়। বলা বাহুল্য, এই গ্রিক মুদ্রাগুলি থেকে এই অঞ্চলের পূর্ণ রাজনৈতিক ইতিহাস জানা যায়। গ্রিক লেখকদের রচনায় এই অঞ্চলে রাজত্বকারী মাত্র চার পাঁচজন রাজার উল্লেখ আছে। অপরদিকে মুদ্রাগুলি থেকে ত্রিশজন রাজা ও রানির নাম পাওয়া যায়।

প্রাচীন স্মৃতিসৌধ ও স্থাপত্য ভাস্কর্য (Ancient monuments and architectural sculptures)

প্রাচীন নগর, মঠ, মন্দির, দুর্গ, অট্টালিকার ধ্বংসাবশেষ, সমাধি, স্তম্ভ, স্মৃতিস্তম্ভ, প্রাচীন শিল্পকীর্তি, মৃৎশিল্প, মৃৎপাত্র ও তৈজসপত্রাদি প্রাচীন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। রাজনৈতিক ইতিহাসের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ না হলেও সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও শিল্পকলার বিবর্তনে এইসব উপাদানের গুরুত্ব অপরিসীম। এগুলি থেকে বিশেষ যুগের শিল্পকলা, ধর্ম ও অর্থনৈতিক অবস্থার চিত্র পাওয়া যায়। সিন্ধু সভ্যতা আবিষ্কারের পর ভারতের বিভিন্ন স্থানে খননকার্য চালিয়ে নতুন নতুন সভ্যতা আবিষ্কৃত হয়েছে। বিহারের সারনাথ, পাটলিপুত্র, নালন্দা এবং উত্তর পশ্চিম সীমান্তের তক্ষশিলায় খননকার্যের ফলে বৌদ্ধ ও আর্য সংস্কৃতির নানা নতুন দিক আমাদের সামনে উন্মােচিত হয়েছে। তক্ষশিলা থেকে গ্রিক, পল্লব, শক ও কুষাণ যুগের সভ্যতার নানা নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। হস্তিনাপুর ও কৌশাম্বি থেকে পৌরাণিক যুগের নানা নিদর্শন পাওয়া যায়। মৌর্য যুগের বরাবর গুহা, গুপ্তযুগে অজন্তা ইলােরার গুহা চিত্রাবলী, ভিতরগাঁও ও দেওগড়ের মন্দির এবং দক্ষিণের চোল চালুক্য পল্লব রাজাদের স্থাপত্য ভাস্কর্য ইতিহাসের মূল্যবান উপকরণ। বেলুচিস্তান ও তুর্কিস্তানে খননকার্যের ফলে ওইসব অঞ্চলের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ যােগাযােগের কথা জানা যায়। খোটানে খননকার্য কুষাণ যুগে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা যায়। কম্বােজের আঙ্কোরভাট ও জাভার বরোবুদুরের মন্দির দুটি ভারতের ঔপনিবেশিক ও সাংস্কৃতিক বিস্তারের সাক্ষ্য বহন করে।
Advertisement