ভারতের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী সম্পর্কে আলোচনা।

author photo
- Sunday, September 30, 2018
advertise here

ভারতের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য।

ভারত এক সুবিশাল ও প্রাচীন দেশ। আর্য-অনার্য-দ্রাবিড়-শক-হুন-পাঠান-মোগল প্রভৃতি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ এই ভারতবর্ষে বিভিন্ন সময়ে এসেছে। মানবগোষ্ঠীর এই বিচিত্র সমাবেশ দেখে ড: ভিনসেন্ট স্মিথ ভারতবর্ষকে 'নৃতাত্ত্বিক জাদুঘর' বলে অভিহিত করেছেন। ভারতবর্ষ এক মিশ্রজাতির দেশ। কোথাও সংমিশ্রণ বেশি হয়েছে, আবার কোথাও বা কম। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিচিত্র সংমিশ্রনের ফলে কেউ নিজেকে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর শুদ্ধ রক্তের অধিকারী বলে দাবি করতে পারে না। তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতকে বলেছেন 'মহামানবের সাগর'।

মানুষের দৈহিক গঠন, মাথার খুলি, চোয়াল ইত্যাদি ও ভাষার ভিত্তিতে নৃতাত্ত্বিকগণ প্রাচীন ভারতের অধিবাসীদের কয়েকটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ড: গুহ ভারতীয় জনগোষ্ঠীকে ৬টি গোষ্ঠীতে বিভক্ত করেন। সেগুলি নীচে বিস্তারিত আলোচনা করা হল।


১) নর্ডিক [Nordic]:

এই গোষ্ঠীর মানুষরা দীর্ঘকায়, রক্তাভ গৌরবর্ণ ও উন্নত নাসিকা সম্পন্ন লোক নর্ডিক জাতিগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট। তাদের চুলের রঙ বাদামি থেকে ঘোরতর কালো। এরাই বৈদিক আর্য সভ্যতার স্রষ্টা। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, পাঞ্জাব, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র প্রভুতি অঞ্চলে এদের দেখা যায়। এদের পাওয়া যায় পাঞ্জাব, রাজপুতানা, উত্তর গাঙ্গেয় উপত্যকায় উচ্চ বর্ণের মধ্যে। এদের ভাষা থেকে সংস্কৃত ভাষার সৃষ্টি হয়েছে। এই জাতিই ভারতে হিন্দু সভ্যতার জনক।


২) নেগ্রিটো [Negrito]:

আফ্রিকার নিগ্রো জাতি থেকে এই গোষ্ঠী উদ্ভূত। প্রস্তরযুগে ভারতে নেগ্রিটো জাতির বসবাসের নিদর্শন পাওয়া যায়। এরা বেঁটে, কালো, চুল কোঁকড়া , নাক চাপটা। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, কোচিন, ত্রিবাঙ্কুর ও বিহারের রাজমহল পার্বত্য অঞ্চলে এবং আসামের কোনো কোনো অঞ্চলে এই গোষ্ঠীর কিছু মানুষ দেখা যায় ।

৩) প্রোটো-অস্ট্রোলয়েড [Proto-Austroloid]:

অস্ট্রেলিয়ার আদি মানবদের সঙ্গে এই গোষ্ঠীর মানুষের অনেক মিল আছে। ভারতের বিভিন্ন স্থানে আদিম অধিবাসীদের মধ্যে এই জনগোষ্ঠী দেখা যায়। বিশেষ ভাবে মধ্য ভারতের কোল, ভিল, মুন্ডা, ভূমিজ প্রভূতির মধ্যে এই জনগোষ্ঠী বেঁচে আছে। এদের গাত্র বর্ণ কৃষ্ণ, চুল তামাটে, কপাল চওড়া এবং নাক লম্বা।


৪) মোঙ্গলয়েড বা মঙ্গোলীয় [Mongoloid]:

এই গোষ্ঠী সম্ভবত মধ্য এশিয়া থেকে ভারতে এসেছিল। এদের গায়ের রঙ পীতাভ, নাক চাপটা, মুখমণ্ডল ও দেহ লোমহীন। সিকিম, ভুটান, নেপাল, আসাম, ত্রিপুরা, চট্টগ্রাম প্রভুতি অঞ্চলে এইসব মানুষদের বসবাস।

৫) মেডিটেরানিয়ান বা ভুমধ্যসাগরীয় [Mediterranean]:

এই গোষ্ঠীর আদি বাসস্থান ভুমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে। কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরল, পাঞ্জাব, সিন্ধু, রাজস্থান ও উত্তরপ্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলে এদের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। সাধারণভাবে এদেরই দ্রাবিড়ভাষী বলা হয়। এদের দেহের গড়ন ও গাত্রবর্ণ মাঝারি।

৬) পাশ্চাত্য গোলমুণ্ড [Western Brachycephals]:

এই গোষ্ঠীর আদি নিবাস সম্ভবত পামীর মালভূমি, তাকলামাকান মরুভূমি, আল্পস পর্বত ও পূর্ব ইউরোপ। বাংলা, বিহার, উড়িশা, গুজরাট, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ প্রভুতি অঞ্চলে এই গোষ্ঠীর মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়।

এইসব বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে ভারতীয় মহাজাতি। এই মিশ্রণের ফলে কোনও গোষ্ঠী নিজ বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে পারেনি। সব জাতিগোষ্ঠী মিলেমিশে ভারতে গড়ে উঠেছে 'মিশ্র সংস্কৃতি'।
Advertisement advertise here