ভারত ইতিহাসে ভৌগােলিক পরিবেশের উপাদান ও প্রভাব

- September 30, 2018
মানবসভ্যতাৰ ক্রমবিবর্তনের কাহিনি ইতিহাসের বিষয়বস্তু হলেও ইতিহাসের সঙ্গে ভূগােলের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। রিচার্ড হাকুলিয়াত মন্তব্য করেছেন, "Geography and Chronology are the Sun and the Moon, the right eye and the left eye of all history" ভৌগােলিক প্রভাব ইতিহাসের সঙ্গে এক অনিবার্য বন্ধনে আবদ্ধ। নীলনদ না থাকলে মিশর সাহারা মরুভূমির গর্ভে হারিয়ে যেত। ইজিয়ান সাগর ও ভূমধ্যসাগর পরিবৃত হওয়ায় গ্রিসের অধিবাসীরা বাণিজ্য ও নৌবিদ্যায় পটু। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ড সমুদ্র পরিবেষ্টিত হওয়া এই দেশের বাণিজ্য ও নৌশক্তি উন্নত। তেমনি ভাৱত উপমহাদেশের পশ্চিমে আরব সাগর, পূর্বে বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণে ভারত মহাসাগর অবস্থান করায় আমাদের দেশের ইতিহাসও ভৌগোলিক প্রভাবের দ্বারা প্রভাবিত। ভারতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতি, ভারতবাসীর জীবনদর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গি ভৌগােলিক উপাদানগুলি দ্বারা অনাদিকাল থেকে প্রভাবিত করে আসছে। অবশ্য টয়েনবির কথায় ইতিহাসের নায়ক মানুষ ভৌগােলিক উপাদানকে যেভাবে ব্যবহার করে সেভাবেই সবকিছু নির্ধারিত হয়। 'Geographical facts are the only fact as approached by man' একমাত্র ভৌগােলিক প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে ভারতবাস এক স্বতন্ত্র ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সভ্যতা-সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পেরেছে। 'An Advanced History of India' গ্রন্থে উল্লেখ আছে, "The course of Indian history likely that of other countries in the world, is in large measure determined by its Geography."
হিমালয় পর্বতমালা বরফে ঢাকা
ভারতীয় সভ্যতায় হিমালয়ের প্রভাব : ভারতের ইতিহাসে দেবতাত্মা হিমালয়ের প্রভাব অপরিসীম। ঐতিহাসিক কে. এম. পানিক্কর 'A Survey of Indian History' গ্রন্থে বলেছেন, "মিশরকে যদি নীলনদের দান বলা হয়, তবে ভারতবর্ষকে হিমালয়ের দান বলা যায়।" হিমালয় বহুভাবে ভারতবর্ষকে সমৃদ্ধ করেছে। যেমন-
১) ভারতবর্ষ হল হিমালয়ের মানসকন্যা। ভারতের উত্তরে অর্ধচন্দ্রাকারে রক্ষাপ্রাচীবের ন্যায় পরিবৃত থেকে যুগ যুগ ধরে হিমালয় সীমান্ত সুরক্ষার কাজ করে চলেছে।
২) হিমালয়ের কোলে অবস্থিত খাইবার, বােলান, গােমাল প্রভৃতি গিরিপথ দিয়ে বিদেশি আক্রমণের ফলে বিভিন্ন প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
৩) ভারতের জলবায়ুর মূল নিয়ন্ত্রক মৌসুমি বায়ু। হিমালয়ের গায়ে এই বায়ু ধাক্কা খেয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিশাল অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ঘটাতে সাহায্য করে। ফলে কৃষিব্যবস্থার উন্নতি সম্ভব হয়েছে।
৪) হিমালয় থেকে নেমে আসা হিমবাহপুষ্ট গঙ্গা, সিন্ধু, ব্রম্মপুত্র নদী ও প্রচুর উপনদী ভারতকে সুজলা-সুফলা ও শস্যশ্যামলা করে তুলেছে।
৫) হিমালয়ের বনজ ও খনিজ সম্পদের ভাণ্ডার এদেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধিশালী করেছে।
৬) সাইবেরিয়া থেকে আগত কনকনে ঠান্ডা উত্তুরে হাওয়ার প্রকোপ থেকে হিমালয় আমাদের রক্ষা করেছে। এর ফলস্বরূপ উত্তর ভারতের আবহাওয়া মানুষের বসবাসের যােগ্য হয়েছে।
৭) হিমালয়ের কোল জুড়ে গড়ে উঠেছে অজস্র শৈল নিবাস। তাই পর্যটন শিল্পের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বহুলােকের জীবিকানির্বাহের ব্যবস্থাও সম্ভব হয়েছে।
৮) কাশ্মীর ও নেপাল উপত্যকা অঞ্চলের মানুষদের ভিন্ন ধরনের জীবনযাত্রা ও পৃথক আচার-অনুষ্ঠান পদ্ধতি গড়ে তােলার পেছনে হিমালয়ের প্রভাব অপরিসীম।

বিন্ধ্যপর্বতের প্রভাব : বিন্ধ্যপর্বতের অবস্থানের জন্য উত্তরে আর্যাবর্তের সঙ্গে দক্ষিণের দক্ষিণাপথের পৃথক সংস্কৃতি ও বৈশিষ্ট্য গড়ে উঠেছে। বিন্ধ্যপর্বতের নানা প্রভাব উল্লেখ করা যেতে পারে।
১) বিন্ধ্য পর্বতমালা ভারতকে আর্যাবর্ত ও দক্ষিণাপথ দুটি নামে ভাগ করেছে।
২) বৈদেশিক আক্রমণ থেকে দক্ষিণ ভারতকে যুগযুগান্তর রক্ষা করছে বিন্ধ্য পর্বতমালা। তাই আর্য বা অন্য কোনো বিদেশি জাতি দক্ষিণ ভারতে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি।
৩) বিন্ধ্য পর্বত দক্ষিণ ভারতে পৃথকভাবে দ্রাবিড় সংস্কৃতিকে সমৃণ করেছে।
৪) বিন্ধ্যপর্বতের অবস্থান দক্ষিণ ভারতের ব্যাবসাবাণিজ্যকে বাধাহীন ভাবে বিস্তার লাভে সাহায্য করেছে।
৫) বিন্ধ্যপর্বতের উদ্ভিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ এবং খনিজ দ্রব্য দক্ষিণের অর্থভান্ডারকে সমৃন্ধ করেছে।

গিরিপথের প্রভাব : হিমালয়ের উত্তর, পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বদিকে অবস্থিত খাইবারপাস, জোজিলাপাস, নাথুলাপাস প্রভৃতি গিরিপথগুলি দিয়ে আর্য, গ্রিক, শক, কুষাণ, হুন, তুর্কি, মুঘল প্রভৃতি জাতি যুগে যুগে ভারতে অনুপ্রবেশ করে ভারতীয় সভ্যতায় নিজেদের বিলীন করে এই সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছে। আবার ভারতীয় ধর্ম, ভাষা, কৃষ্টি-সংস্কৃতি হিমালয় কারাকোরাম ও হিন্দুকুশ পর্বতের বাধা অতিক্রম করে মধ্য এশিয়া, চিন ও তিব্বতে ছড়িয়ে পড়েছে।

নদনদীর প্রভাব : ১) নদনদী তার উপত্যকাকে উর্বর করে তােলে। ফলে নদী উপত্যকাগুলি কৃষিকার্যে উন্নত হয়।
২) ভারতের চারদিকে প্রসারিত নদী, উপনদী ও শাখা-নদীগুলি আঞ্চলিক সংস্কৃতির বিকাশে সহায়ক হয়।
৩) নদীর তীরে গড়ে ওঠা বাণিজ্য বন্দরগুলির মধ্যে দিয়ে বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে। হরিদ্বার, পাটলিপুত্র, প্রয়াগ, কনৌজ, হস্তিনাপুর, এলাহাবাদ প্রভৃতি নগর নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে গড়ে উঠেছে।
৪) গঙ্গা-ব্রম্মপুত্র-সিন্ধুবিধৌত সমভূমি পৃথিবী বিখ্যাত। এই সমভূমি এদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিকে পুষ্ট করেছে।
৫) ভারতের নদনদীগুলি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সীমারেখা নির্ধারণে সহায়তা করেছে। যেমন কলিঙ্গের উত্তরে মহানদী, দক্ষিণে গােদাবরী, তামিলনাড়ুর উত্তরে কৃষ্ণা ও দক্ষিণে কাবেরী, মহারাষ্ট্রের উত্তরে তাপ্তী ও দক্ষিণে ভীম এবং কর্ণাটকের উত্তরে ভীম ও দক্ষিণে তুঙ্গভদ্রা ইত্যাদি।

সমুদ্রের প্রভাব : ১) সমুদ্রপথ ধরেই ভারতের সঙ্গে চিন, রোম, মালৰ, সুমাত্রা, জাভা, সিংহল প্রভৃতি দেশের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
২) ভারতের পূর্বে বঙ্গোপসাগর, পশ্চিমে আরবসাগর, দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের অবস্থান ভারতীয় প্রতিরক্ষা বব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করেছে।
৩) সমুদ্রপথ আবিষ্কৃত হওয়ার পর নৌশক্তিতে শক্তিশালী ইউরােপীয় জাতি যেমন, পাের্তুগিজ, ওলন্দাজ, দিনেমার, ফরাসি, ইংরেজ প্রভৃতি শক্তি ভারতবর্ষে আসে। ফলস্বরুপ শেষ পর্যন্ত ইংরেজরা প্রায় দুশাে বছর এখানে ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠা করে।
৪) সমুদ্রের জন্যই প্রাচীনকাল থেকে দক্ষিণ ভারতের চোল জাতি নৌবিদ্যায় ও বাণিজ্যে পারদর্শী ছিল।

সমভূমির প্রভাব : ১) সমভূমি অঞলে বিশেষ করে গঙ্গা ব্রহ্মপুত্র ও সিন্ধুবিধৌত সমভূমি অঞ্চল দুর্গম না হওয়ায় এবং বসবাসের অনুকূল পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক সুযােগসুবিধা থাকায় এই অঞ্চল অধিক মানুষের স্বচ্ছন্দ আবাসস্থল হয়ে উঠেছে।
২) সমভূমি অঞ্চলে বিশেষ করে ভারতের হৃৎপিণ্ড গাঙ্গেয় সমভূমি অনুকূল অবস্থা বিরাজ করায় প্রাচীনকাল থেকেই এখানে বহু শহর, নগর, বন্দর গড়ে উঠেছে।
৩) সমভূমি অঞ্চলে বহু আক্রমণকারী ও বিদেশি জাতি সাম্রাজ্য স্থাপন করায় রাজনীতি, ধর্মনীতি ও অর্থনীতির সমৃদ্ধি ঘটেছে। মৌর্য, গুপ্ত, কুষাণ, পল্লব, চোল, চালুক্য প্রভৃতি জাতি প্রাচীনকালে সমভূমি অঞ্চলগুলিতে রাজ্যবিস্তার করে ভারতীয় সভ্যতার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছে।

উপকূলের প্রভাব : ১) উপকূলগুলি দেশের বাণিজ্য বন্দরগুলির শ্রীবৃদ্ধিতে সাহায্য করেছে। ভারতের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়েছে।
২) উপকূল পথ ধরে পাের্তুগিজ, ওলন্দাজ, দিনেমার, ফরাসি, ইংরেজ প্রভৃতি শক্তি ভারতে আধুনিক ইউরােপীয় সভ্যতা সংস্কৃতির আমদানি করেছে।

মরুভূমির প্রভাব : গঙ্গা সিন্ধু শতদ্র বিধৌত সমভূমির দক্ষিণেই রাজস্থান ও পাকিস্তানের মরু অঞ্চল অবস্থিত। এর আয়তন প্রায় 2 লক্ষ 69 হাজার বর্গ কিলােমিটার। বালি ও পাথরে গঠিত এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাত অতি নগণ্য। রুক্ষ প্রকৃতির ফলে এই অঞ্চলের মানুষ কষ্টসহিষ্ণু, পরিশ্রমী, দুঃসাহসী। তাই মানবিক জীবনযাত্রার উপর মরুভূমির প্রভাব রয়েছে।

উপসংহার : এখানে একটি কথা বলা প্রয়ােজন যে, এ দেশের ইতিহাসের উপর সেই দেশের ভূগোলের প্রভাব অনস্বীকার্য। কিন্তু একথা ঠিক যে,একমাত্র ভূগোল একটি দেশের ইতিহাসের গতি প্রকৃতি নির্ধারণ করে না। সবচেয় বড়ো কথা হল মানুষের উদ্যম, কর্মপ্রচেষ্টা ও সংগ্রামী মনোভাব। সংগ্রামী ও সৃজনশীল মানুষ প্রতিকূল প্রকতিকে জয় করে অনায়াসেই দেশের কৃষি শিল্প বাণিজ্য এবং সাংস্কৃতিক উন্নতি ঘটাতে পারে। আবার অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশের সুযােগ পেয়েও কেবলমাত্র উদ্যম ও সৃজনশীলতার অভাৱে সৰ কিছুই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।