ভারতের ভৌগলিক ভূ প্রাকৃতিক - Physical Features of India

- September 30, 2018
প্রাচীন সাহিত্য ভারতবর্ষকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ১) উত্তরাপথ - উত্তর ও উত্তর পশ্চিম ভারত। 2) মধ্যদেশ - সরস্বতী নদীর অববাহিকা অঞ্চল থেকে শুরু করে রাজমহল পাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত গাঙ্গেয় সমতলভূমি। এই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে গঙ্গা ও যমুনা দুটি নদী প্রবাহিত হয়েছে। প্রাচীন কালে এই অঞ্চল আর্যাবত নামে পরিচিত ছিল। ৩) দক্ষিণাপথ - মধ্যদেশের দক্ষিণে অবস্থিত। ৪) প্রাচ্য বা পূর্ব ভারত বা পূর্বদেশ - আর্যাবতের পূর্বে বাংলা, বিহার অবস্থিত। ৫) অপরান্ত - পশ্চিম ভারত অর্থাৎ রাজপুতানা, গুজরাট প্রভূতি নিয়ে গঠিত।

এছাড়া পুরাণে ভারতবর্ষকে দু-ভাগে ভাগ করেছে। ১) আর্যাবত - উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে নর্মদা নদী পর্যন্ত বিস্তৃত ভূ-ভাগ। ২) দাক্ষিণাত্য - তাপ্তী ও কৃষ্ণা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল।
ভারতের ভৌগােলিক ভূ-প্রাকৃতিক পরিবেশ
আধুনিক ভৌগলিকরা ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে বিচার করে ভারতকে পাঁচভাগে বিভক্ত করেছেন। রাজনৈতিক ইতিহাসের দিক থেকে এই বিভাগই যুক্তিযুক্ত। এই বিভাগগুলি হল (১) উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল, (২) সিন্ধু-গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা, (৩) মধ্য ভারতের মালভূমি, (৪) দক্ষিণ ভারতের মালভূমি এবং (৫) সুদুর দক্ষিণ।

(১) উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল: ভারতের উত্তর-পশ্চিম, উত্তর ও উত্তর-পূর্বে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতমালা হিমালয় বিশাল রক্ষাপ্রাচীরের মতাে দণ্ডায়মান। ভারতের উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত পামীর মালভূমি থেকে উথিত হয়ে ২,৫৬০ কিলােমিটার দৈর্ঘ্য এবং ৩২০ কিলােমিটার প্রস্থবিশিষ্ট হিমালয় পর্বতমালা ক্রমশ অর্ধচন্দ্রাকারে উত্তর থেকে পূর্বদিকে চলে গেছে। হিমালয় পর্বতমালা দুর্ভেদ্য প্রাচীরের মতাে ভারতবর্ষকে চীন, তিব্বত ও ব্রহ্মদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। আবার অন্যদিকে সুলেমান ও হিন্দুকুশ পর্বতমালা ভারতকে রাশিয়া, ইরান ও বেলুচিস্তান থেকে পৃথক করেছে। সুবিশাল এই পর্বতমালার বুকেই আছে খাইবার, বােলান, গােমাল, বানিহাল, কুরাম, তােচি প্রভৃতি গিরিপথ। এই সব গিরিপথ ধরেই পারসিক, গ্রিক, কুষাণ, শক, হুন, পল্লব, তুর্কি, আফগান ও মােঙ্গলরা যুগ যুগ ধরে ভারতভূমির উপর আক্রমণ হেনেছে। এই পার্বত্য অঞ্চলের বুকেই কাশ্মীর, নেপাল, সিকিম, ভুটান প্রভৃতি স্থানগুলি অবস্থিত। পর্বতসংকুল অঞ্চলে যােগাযােগের অসুবিধার কারণে ভারতের সমতলভূমির রাজনৈতিক ঝড়-ঝঞা এই অঞ্চলকে কোনওভাবেই প্রভাবিত করতে পারে নি।

(২) সিন্ধু-গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা: হিমালয়ের পাদদেশের দক্ষিণ থেকে শুরু করে মধ্য ভারতের মালভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলটি সিন্ধু-গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা নামে পরিচিত। সিন্ধু, রাজপুতানা, অবিভক্ত পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, উত্তর বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও বাংলাদেশের বিশাল এলাকা নিয়ে এই অঞ্চল গঠিত। এই অঞ্চলটি উত্তর ভারতের সমভূমি নামেও পরিচিত। সমগ্র এলাকাটি পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ২৫০০ কিলােমিটার এবং উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ২৪০ থেকে ৩২০ কিলােমিটার বিস্তৃত। এই অঞ্চলের উপর দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে সিন্ধু, গঙ্গা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও তাদের অসংখ্য শাখা-প্রশাখা। নদী-বিধৌত এই অঞ্চলটি খুবই উর্বর এবং প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ। নদীপথে যােগাযােগের সুবিধা থাকায় বাণিজ্যিক দিক থেকেও এই অঞ্চলটি খুবই সমৃদ্ধশালী। এই অঞ্চলের নদী-তীরবর্তী স্থানগুলিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে প্রাচীন ভারতের বহু বিখ্যাতনগর, বন্দর ও সাম্রাজ্য। এই অঞ্চলের সম্পদের লােভেই স্মরণাতীত কাল থেকে বিদেশি আক্রমণকারীরা বারংবার ভারতের বুকে ঝাপিয়ে পড়েছে। এই অঞ্চলেই সংঘটিত হয়েছে আর্য সভ্যতার বিকাশ, ধর্মীয় আন্দোলন এবং ভারত ইতিহাসের যুগান্তকারী বিভিন্ন যুদ্ধসমূহ। বহু সাম্রাজ্য ও সভ্যতার উত্থান ও পতনের পীঠভূমি হল এই অঞ্চল।

Advertisement
(৩) মধ্য ভারতের মালভূমি: সিন্ধু-গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা থেকে বিন্ধ্য পর্বতের পাদদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা মধ্য ভারতের মালভূমি নামে পরিচিত। বিন্ধ্য পর্বতমালা উত্তর ভারতকে দাক্ষিণাত্য থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। এই অঞ্চলের গহন অরণ্য ও পার্বত্র অঞ্চল ভারতের আদিম অধিবাসী-কোল, ভীল, মুণ্ডা, সাঁওতাল প্রভৃতি আদিবাসীদের বাসস্থান। ছােটোনাগপুর, সাঁওতাল পরগণ প্রভৃতি স্থান এই অঞ্চলেই অবস্থিত।

(৪) দক্ষিণ ভারতের মালভূমি: বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণ থেকে কৃষ্ণা-তুঙ্গভদ্রা নদীর উত্তরের ভূ-ভাগ পর্যন্ত অঞ্চল দক্ষিণ ভারতের মালভূমি নামে পরিচিত। মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, অন্ধ প্রভৃতি রাজ্য এবং পশ্চিমঘাট পর্বতমালা এই মালভূমির অন্তর্ভুক্ত। প্রাচীন যুগে এই অঞ্চলে রাষ্ট্রকূট, চালুক্য প্রভৃতি শক্তিশালী রাজ্যের উদ্ভব হয়। বিন্ধ্য পর্বত উত্তরের আক্রমণকারীদের হাত থেকে দাক্ষিণাত্যকে দীর্ঘদিন রক্ষা করেছে। মৌর্য ও গুপ্তরা এই অঞ্চলের উপর আধিপত্য স্থাপন করলেও তা স্থায়ী হয় নি। আলাউদ্দিন খলজি এই স্থান দখল করেছিলেন। মহম্মদ-বিন-তুঘলকের আমলে সুলতানি শাসনকে উপেক্ষা করে এখানে বিজয়নগর ও বাহমনি রাজ্যের উৎপত্তি ঘটে।

(৫) সুদুর দক্ষিণ: দাক্ষিণাত্যের মালভূমির দক্ষিণে অবস্থিত সমগ্ৰ অঞ্চলটিই সুদূর দক্ষিণ নামে পরিচিত। কৃষ্ণা-তুঙ্গভদ্রা নদীর দক্ষিণ থেকে ভারত মহাসাগরের উপকূল পর্যন্ত এই অঞ্চলটি বিস্তৃত। উর্বর ও শস্য-শ্যামল এই অঞ্চলে উৎপন্ন হত মশলা, চন্দনকাঠ, গজদন্ত, মুক্তা প্রভৃতি মূল্যবান সামগ্রী। সমুদ্র-উপকূলবর্তী এই অঞ্চলের অধিবাসীরা স্বাভাবিকভাবেই নৌবিদ্যায় পারদর্শী হওয়ায় প্রাচীনকাল থেকেই শ্রীলঙ্কা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে এই অঞ্চলের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কাবেরিপত্তনম ও কোচিন ছিল এই অঞ্চলের বিখ্যাত বন্দর। প্রাচীনকালে এই অঞ্চলে চোল, চের, পাণ্ড্য, কেরল প্রভৃতি রাজ্যগুলি গড়ে ওঠে। উত্তর ভারত থেকে বঙ্গ দূরে অবস্থিত হওয়ায় উত্তর ভারতের রাজন্যবর্গের পক্ষে এই অঞ্চলের স্থায়ী কোনও সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় নি। এর ফলে এই স্থানটি হয়ে ওঠে তামিল সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র।
Advertisement