প্রাচীন ও মধ্য প্রস্তর যুগের হাতিয়ার, জীবনধারা ও বৈশিষ্ট্য।

author photo
- Monday, September 03, 2018

প্রাচীন ও মধ্য প্রস্তর যুগের বৈশিষ্ট্য[Palaeolithic & Mesolithic Age]


***প্রাগৈতিাসিক যুগে মানুষ পাথরের হাতিয়ার ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করত, তাই এই যুগ প্রস্তর যুগ (Stone Age) নামে পরিচিত। পাথরের হাতিয়ার ও আকৃতি দেখে ঐতিহাসিকরা প্রস্তর যুগ কে তিনভাগে ভাগ করেন। যথা, (ক) প্রাচীন প্রস্তর যুগ (Palaeolithic Age), (খ) মধ্য প্রস্তর যুগ (Mesolithic Age) এবং (গ) নব্য প্রস্তর যুগ (Neolithic Age)।

Read: প্রাচীন ভারতের নব্য প্রস্তর যুগ।

সময়কাল[Duration]:


***পুরা প্রস্তর যুগকে সাধারণত মানুষের খাদ্য সংগ্রহের পর্যায় হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। পুরা প্রস্তর যুগ আবার ক্রমপর্যায় অনুসারে নিম্ন, মধ্য এবং উচ্চ পুরা প্রস্তর যুগে ভাগ করা হয়। গুজরাটের জুনাগড ও উমরেতে থেকে পাওয়া তারিখ যথাক্রমে ১ লক্ষ ৯০ হাজার বছর এবং ৬৯ হাজার বছর আগে। মধ্যপ্রদেশে মান্দাস থেকে উচ্চ পুরা প্রস্তর উপপর্বের তারিখ স্থির হয়েছে মোটামুটি ৩১হাজার বছর আগে। আনুমানিক ৮০০০ খ্রিস্টপূর্বে ভারতে এ যুগ শেষ হয়।

পড়ুন: প্রাচীন ভারতের লৌহ যুগ।

বিস্তৃতি[Expansion]:


***ভারতের দুটি স্থানে প্রাচীন প্রস্তর যুগের নিদর্শন পাওয়া যায়। পাঞ্জাবের সোয়ান নদীর অববাহিকা ও দক্ষিণ ভারতের মাদ্রাজ। তাই এই দুটি সংস্কৃতিকে ' সোয়ান সংস্কৃতি ' এবং ' মাদ্রাজ সংস্কৃতি ' বলা হয়। এছাড়া সিন্ধু প্রদেশে মাইলস্টোন ১০১ ও সুক্কর রাই অঞ্চলে কিছু নিদর্শন পাওয়া গেছে। এছাড়া লাদাক অঞ্চল, উত্তর প্রদেশের মির্জাপুর ও মহীশূর, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাডু, কম্বলপুর, ফুলবনি, গুজরাট, রাচি, হাজারীবাগ, বাঁকুড়ার সুসুমিয়া, বীরভূমের বেশ কিছু পুরা প্রস্তর যুগের নিদর্শন পাওয়া গেছে।

Read: হরপ্পা সভ্যতা বা সিন্ধু সভ্যতার ইতিহাস।

প্রাকৃতিক পরিবেশ[Natural environment]:


*** বৈজ্ঞানিক গবেষণার সাহায্যে সে সময়ের বৃষ্টিপাত, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, উষ্ণতা ও আদ্রতা তারতম্য জানা সম্ভব হয়েছে। কাশ্মীরের আবহাওয়া সম্পর্কে যে তত্ত্ব উপস্থাপন করেন তা কয়েকটি পর্যায়ে বিভক্ত। প্রথম পর্যায়ে ৩৫ লক্ষ বছর থেকে শুরু করে বা তারও আগে পর্যন্ত উষ্ণ নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া। দ্বিতীয় পর্যায় ছিল শীতল নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া। তৃতীয় পর্যায় হল শীতলতম। রাজস্থানের বালিয়াড়ি ঢালে পুরা প্রস্তর যুগের যে নিদর্শন পাওয়া গেছে তার থেকে অনুমান করা সম্ভব যে আবহাওয়া ছিল অতিশয় শুষ্ক। এছাড়া আরব সাগরের নীচ থেকে সংগৃহীত স্তর পরম্পরা নমুনা থেকে অনুমান করা হয়ে থাকে ১৮ হাজার বছর আগে ঠান্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়া একটা পর্যায় ছিল। তবে এ পর্যায়ের বৃষ্টিপাত এর পরিমাণ জানা যায় নি।

পড়ুন: প্রাক হরপ্পা যুগের মেহেরগড় সভ্যতা।


হাতিয়ার[Tool]:


*** এই যুগের হাতিয়ার ছিল আয়তনে অনেক বিশাল এবং তাতে কোন সোন্দর্য ও মসৃণতা ছিল না। পুরা প্রস্তর যুগের হাতিয়ার গুলির মধ্যে ছিল ব্লেড বা লম্বা চিলকা, হাতকুঠা, ছেদক, ব্যাসল্ট চার্ট জাতীয় পাথর প্রভুতি। এছাডা নিম্ন, মধ্য ও উচ্চ পুরা প্রস্তর যুগে কয়েকটি হাতিয়ার ড্রমর, স্ক্রাপার, চাচানি, ইয়াগেট, জ্যাসপার প্রভুতি।

পড়ুন: প্রাচীন ভারতের নব্য প্রস্তর যুগের সময়সীমা ও বৈশিষ্ট্য।

জীবনধারা[Lifestyle]:


*** পুরা প্রস্তর যুগের মানুষের বৈচিত্র্য সংস্কৃতির পরিচয় আমরা পাই প্রধানত তার পাথরের হাতিয়ারের ধরনের পরিপ্রেক্ষিতে। সেই সময়ের মানুষের কোন স্থায়ী বসতি ছিল না। এই যুগের মানুষ কৃশিকার্য ও আগুন জ্বালাতে জানত না। ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে, তারা যাযাবর জীবন যাপন করত। বনের ফল, লতা গুল্ম ও পশুর মাংস খেয়ে তারা জীবন ধারণ করত। এ যুগের মানুষ ছিল খাদ্য সংগ্রাহক, খাদ্য উৎপাদক নয়। তারা ছিল যাযাবর জাতি। সাধারণত পাহাড়ের পাদদেশে উন্মুক্ত মালভূমি অঞ্চল, নদীর তীরবর্তী এলাকা ও অরণ্য বাস করত।

*** মধ্যপ্রদেশের রাইসেন জেলার ভিমভেটকা নামক গুহাতে ১৬.৮ মিলিমিটার গভীরে ৭ টি বাটির মত গর্ত আছে। খনন কার্যের ফলে মানুষের তৈরি উটপাখির খোলা ডিমের উপর নকশা পাওয়া গেছে। এগুলি থেকে প্রাচীন প্রস্তর যুগের শিল্প নিদর্শন এর পরিচয় পাওয়া যায়।

পড়ুন: ভারতের ইতিহাস পরীক্ষার ছোটো প্রশ্ন ও উত্তর।



মধ্য প্রস্তর যুগের বৈশিষ্ট্য[Feature Mesolithic Age]:


***মধ্য প্রস্তর যুগ আনুমানিক ৮০০০-৪০০০ খ্রিষ্টপূর্ব পর্যন্ত ভারতে স্থায়ী ছিল। এই যুগের মানুষ ছোট ছোট ক্ষুদ্র আকৃতির পাথরের হাতিয়ার ব্যবহার করত। বিহার, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, মধ্যপ্রদেশে, রাজস্থান, গুজরাট, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাডু , কর্ণাটক প্রভুতি অঞ্চলে এই যুগের হাতিয়ার পাওয়া গেছে। এই যুগের শেষ দিকে জীবজন্তুকে পোষ মানানো এবং মৃৎ শিল্প কৃষিকাজের সূচনা হয়। কুমোর এর চাকা তখনও আসেনি। মধ্য প্রস্তর যুগ হল প্রাচীন প্রস্তর যুগ ও নব্য প্রস্তর যুগের মধ্যবর্তী এক যুগ।

পড়ুন: হরপ্পা সভ্যতার পতনের পরিবেশগত কারণ।

*** এই মধ্যবর্তী যুগের প্রধান জিনিসগুলি ছিল মাইক্রোলিথ, অর্থাৎ কোণবিশিষ্ট বা অর্ধ-চন্দ্রাকার ফলা ইত্যাদি। এগুলির সাহায্যে দ্রুতগামী পশু মারা হত। মধ্যভারতের ছোটোনাগপুর মালভূমি ও দক্ষিণ ভারতের কৃষ্ণা নদীর উপত্যকায় অনেক মেসোলিথিক স্থান পাওয়া গিয়েছে।

পড়ুন: হরপ্পা বা সিন্ধু সভ্যতার পতনের কারণ।

*** এই সময় থেকে মানুষের মধ্যে বিশেষ বিশেষ ধরনের আর ভাল মানের খাদ্য সংগ্রহের প্রবণতা দেখা যায়। এই প্রবণতাই পরে চাষাবাদের প্রেরণা জুগিয়েছিল। তবে ভারতের বাইরে অন্য অনেক জায়গায় এই যুগ অনুপস্থিত । সেইসব জায়গায় পুরাপ্রস্তরের পর সরাসরি নব্যপ্রস্তর যুগ শুরু হয় । এই সময়ও মানুষ ছিল খাদ্য সংগ্রহকারী, খাদ্য উৎপাদক নয় । কারণ তখনও পর্যন্ত মানুষ চাষ-আবাদ করতে শেখেনি। এই সময়ের অস্ত্রগুলিকে মাইক্রোলিথ (Microlith) বলা হয়; অর্থাৎ, ছোটো, শক্ত ও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ত্রিকোণাকার । মৃৎশিল্পে ও চিত্রশিল্পে মানুষ বেশ পটু হয়ে উঠে।