বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য: ভারতের বিভিন্ন বৈচিত্র্যে ও ঐক্য

বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য: ভারতের বিভিন্ন বৈচিত্র্যে ও ঐক্য

- September 27, 2018
প্রকৃতির লীলানিকেতন এই ভারতভূমি। অপুর্ব বৈচিত্রের সমাবেশে এই মনােমুগ্ধকর দেশ গড়ে উঠেছে। আয়তনের বিশালতা, লােকসংখ্যার বিপুলতা, ভূ-প্রকৃতির গঠন ও জলবায়ুর বিভিন্নতা, জাতি, ধর্ম, ভাষা, রীতিনীতি এবং সস্কৃতির বিভিন্নতা এবং প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য ভারতবর্ষকে একটি মহাদেশ বা উপমহাদেশ (Sub-Contiment) বলা যেতে পারে। ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথ এজন্য ভারতকে বিশ্বের ক্ষুদ্র সস্কেরণ বা বিশ্বের সারাংশ (epitome of the world) বলে উল্লেখ করেছেন।
ভারতবর্ষের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য
ভারতের ভৌগােলিক বৈচিত্র্য (Geographic diversity of india): ভৌগােলিক ও প্রাকৃতিক দিক থেকে ভারতের বৈচিত্র্য সীমাহীন। উত্তুঙ্গ পর্বতমালা, উত্তাল সমুদ্র, নদীমাতৃক শস্য-শ্যামলা বিস্তীর্ণ সমভূমি, অসংখ্য নদ নদী, গহন অরণ্যানী, দিগন্ত বিস্তৃত উষর মরুভূমি ভারতকে এক অপরূপ বৈচিত্র্যে পূর্ণ করেছে। জলবায়ু ও আবহাওয়ার দিক থেকেও ভারত বৈচিত্র্যময়। তুষারাবৃত হিমালয়ের প্রবল শৈত্য, মরু অঞ্চলের প্রবল উত্তাপ, বাংলার নাতিশীতােষ্ণ আবহাওয়া এক কথায়, মঙ্গদেশীয় আবহাওয়া (Polar climate), পরিমিত আবহাওয়া (Temperate climate) এবং গ্রষ্মিকালীন আবহাওয়া (Tropical climate) সবই ভারতের বুকে বিদ্যমান।

ভারতের জাতিগত বৈচিত্র্য (Ethnic diversity of india): প্রাকৃতির বৈচিত্রের মতাে ভারতে জনগােষ্ঠীর বৈচিত্র্যও নেহাত কম নয়। ভারতের জনসংখ্যা হল বিশ্বের এক-ষষ্ঠাংশ। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে গ্রিক ঐতিহাসিক হেরােডােটাস লেখেন যে, বিশ্বে ভারতের জনসংখ্যা সর্ববৃহৎ। যুগ যুগ ধরে বহু বিদেশি জাতি ও উপজাতি ভারতে প্রবেশ করেছে। দ্রাবিড়, আর্য, পারসিক, গ্রিক, শক, পহ্লব, কুষাণ, আরব, তুর্কি, আফগান, মােঙ্গল এবং বিভিন্ন ইউরােপীয় জাতিগােষ্ঠীর সমবায়ে ভারতীয় মহাজাতি গড়ে উঠেছে। ভারতের আদিম অধিবাসী কোল, ভিল, মুণ্ডা, গােণ্ড, সাঁওতাল প্রভৃতি শিকার নির্ভর, অরণ্য সন্তান থেকে শুরু করে শহরবাসী অতি আধুনিক চিন্তাধারার মানুষরা এই মহাজাতির অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বের সকল জাতিগােষ্ঠীর মানুষই ভারতে বিদ্যমান এবং এইসব বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে নিয়ে ভারতে এক মিশ্র সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ডঃ স্মিথ তাই ভারতকে নৃতত্ত্বের যাদুঘর বলে অভিহিত করেছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ এর কথায় ভারত হল মহামানবের সাগর।

ভারতের ভাষাগত বৈচিত্র্য (Language diversity of india): ভারতে ভাষার সংখ্যা ১৭৯ এবং উপভাষার সংখ্যা ৫৪৪টি। যে সব ভাষার সঙ্গে সংস্কৃতির যােগ আছে এবং যেগুলির ব্যবহারও সর্বাধিক, তার সংখ্যা মাত্র ১৫ । উত্তর ভারতের ভাষাগুলির মধ্যে হিন্দি, বাংলা, মারাঠি, গুজরাটি, রাজস্থানী, অহমিয়া, ওড়িয়া এবং দাক্ষিণাত্যর ভাষাগুলির মধ্যে তামিল, তেলেগু, মালয়ালাম, কন্নড় প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। উত্তর ভারতের ভাষাগুলি মূলত সংস্কৃত ও প্রাকৃত থেকে এবং দাক্ষিণাত্যের ভাষা গুলি দ্রাবিড় থেকে উৎপন্ন হয়েছে।

ভারতের ধর্মগত বৈচিত্র্য (Religion diversity of india): ধর্মের দিক থেকেও ভারতবাসীর বৈচিত্র নজরে আসার মতো। বিশ্বের প্রধান প্রধান প্রায় সকল ধর্মমতই ভারতে বিদ্যমান। হিন্দু, ইসলাম, জৈন, বৌদ্ধ, শিখ, খ্রিস্টান, জরথুষ্ট্রিয় এবং আরও নানা ধর্মমত ভারতে প্রচলিত। ভারতের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ হিন্দুধর্মাবলম্বী হলেও এই ধর্মের মধ্যে নানা বিভাজন, নানা সম্প্রদায়, নানা প্রথা, নানা সংস্কার ও নানা দেবতার অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হয়। এই ধর্ম বৈদিক, পৌরাণিক, শৈব, বৈষ্ণব, একেশ্বরবাদ, দ্বৈত-অদ্বৈত-বিশিষ্টাদ্বৈত, সাকার-নিরাকার, আর্য সমাজ, ব্রাহ্ম সমাজ প্রভৃতি নানা সম্প্রদায় ও মতবাদে বিভক্ত। বৌদ্ধধর্ম আবার মহাযান ও হীনযান, জৈনধর্ম শ্বেতাম্বর ও দিগম্বর প্রভৃতি সম্প্রদায়ে বিভক্ত। ইসলাম ধর্ম শিয়া সুন্নি এবং খ্রিস্টান ধর্ম ক্যাথলিক ও প্রােটেস্ট্যান্ট সম্প্রদায়ে বিভক্ত।

ভারতের সামাজিক বৈচিত্র্য (Social diversity of india): সামাজিক বিন্যাস, জীবনযাত্রা প্রণালী, জীবনচর্য, পােশাক পরিচ্ছদ, খাদ্য প্রভৃতির দিক থেকেও ভারতবাসীর মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। ভারতীয় সমাজ জাতি, বর্ণ ও নানা উপবর্ণে বিভক্ত। সমাজের উচ্চবর্ণের মানুষরা নানা অধিকার ভােগ করলেও তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষরা বহুক্ষেত্রে তা থেকে বঞ্চিত। চণ্ডালদের অবস্থা শূদ্রদের চেয়েও শােচনীয়। জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গ্রাম ও শহরের বাইরে তাদের বাস করতে হত। কোল, ভিল, মুণ্ডা, খােন্দ প্রভৃতি অরণ্যচারী আদিম অধিবাসী থেকে শহরের আধুনিকতম মানুষ — সবই ভারতীয় জনসমাজের অন্তর্গত। পােশাক পরিচ্ছদ, খাদ্যাভ্যাস ও অর্থনৈতিক অবস্থার দিক থেকে দেশবাসীর মধ্যে নানা পার্থক্য আছে। এইসব বৈচিত্র্যের কারণে ডঃ রাধাকুমুদ মুখােপাধ্যায় ভারতকে বিভিন্ন ধর্ম, প্রথা, সংস্কৃতি, বিশ্বাস, ভাষা, জাতিগােষ্ঠী ও সামাজিক ব্যবস্থার যাদুঘর বলে অভিহিত করেছেন।

ভারতের রাজনৈতিক বৈচিত্র্য (Political diversity of india): ভারতের বিশাল আয়তন, সীমাহীন প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য হেতু ভৌগােলিক প্রতিবন্ধকতা এবং জাতি ধর্ম ভাষার পার্থক্য প্রভৃতি কারণে ব্রিটিশ শাসনের পূর্বে সমগ্র ভারতে কোনও রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয় নি। নদ নদী, পাহাড় পর্বত, মরুভূমি ও অরণ্যজনিত কারণে ভারত অসংখ্য জনপদ ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্যে বিভক্ত ছিল। মৌর্য, গুপ্ত, খলজি ও মােগল আমলে অখণ্ড ভারত সাম্রাজ্য গড়ে তােলার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু কেন্দ্রীয় শাসনের দুর্বলতা বা বিদেশি আক্রমণের ফলে ভারতের রাষ্ট্রীয় ঐক্য বারংবার বাধাপ্রাপ্ত হয়। এই কারণে প্রাচীন বা মধ্যযুগে ভারত একটি ঐক্যবদ্ধ দেশ এবং ভারতীয়রা একটি ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত হতে পারে নি।

ভারতের ধর্মীয় ঐক্য (Religious Unity of India): ভারতের অধিকাংশ অধিবাসী হিন্দু সমাজের অন্তভূক্ত। হিন্দুদের মধ্যে অসংখ্য ভেদাভেদ থাকলেও বেদ সম্পর্কে সকলেই প্রগাঢ় শ্রদ্ধাশীল। বেদ, উপনিষদ, গীতা, রামায়ণ, মহাভারত সকল হিন্দুর কাছে সমান পবিত্র। শিব ও বিষ্ণু ভারতের সর্বত্রই বিভিন্ন নামে পূজিত এবং তুষারাবৃত হিমালয় থেকে দক্ষিণে কন্যাকুমারী পর্যন্ত এই দেবতাদের নামে অসংখ্য মন্দির নির্মিত হয়েছে। শ্রীরামচন্দ্র ও শ্রীকৃষ্ণের জয়গাথা ভারতের সর্বত্রই সমানভাবে আদৃত। ভারতের সর্বত্রই হিন্দুরা আত্মার অবিনশ্বরতা, অবতারবাদ, কর্মফলবাদ, জন্মান্তরবাদ, মােক্ষ, পবিত্রতা, সততা ও সহনশীলতার আদর্শে বিশ্বাসী। হিন্দু পুরােহিত তার আচমন মন্ত্রে ভারতের বিভিন্ন স্থানে প্রবাহিত গঙ্গা, যমুনা, গােদাবরী, সরস্বতী, নর্মদা, সিন্ধু ও কাবেরি — এই সাতটি নদীর পবিত্রতার কথা অতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। অপর একটি মন্ত্রে একই সঙ্গে অযােধ্যা, মথুরা, মায়া (হরিদ্বার), কাশী, কাঞ্চি, অবন্তিকা, পুরী এবং দ্বারকা প্রভৃতি তীর্থস্থানগুলির কথা বলা হয়েছে।

ভারতের সাংস্কৃতিক ঐক্য (Culture Unity of India): যুগ যুগ ধরে গ্রিক, পারসিক, শক, কুষাণ, পহ্লব, হুন প্রভৃতি বিভিন্ন জাতির মানুষ পৃথক পৃথক সংস্কৃতি ও আচার আচরণ নিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে, কিন্তু ভারতীয় সংস্কৃতির চিরাচরিত মৌলিক রূপকে তারা কোনওভাবেই বিনষ্ট করতে পারে নি। সমন্বয়ের আদর্শে বিশ্বাসী ভারতবর্ষ আগন্তুক মতবাদকে গ্রহণ করে নিজ সংস্কৃতিকে পুষ্ট করেছে এবং বিদেশিরাও ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি গ্রহণ করে কালক্রমে ভারতীয় সমাজে বিলীন হয়ে গেছে।

ভারতের প্রাকৃতিক ঐক্য (Natural Unity of India): আর্য, পারসিক, গ্রিক, শক, পহ্লব, কুষাণ, হুন, আরব , তুর্কি , আফগান , মােগল এবং পরবর্তীকালে ইউরােপীয় জাতিবর্গ ভারতে প্রবেশ করে ভারতীয় পরিবেশে দীর্ঘদিন বাস করে একটি প্রাকৃতিক ঐক্য অর্জন করেছে এবং সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় সত্তার সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। স্যার যদুনাথ সরকার বলেন যে, বিভিন্ন বৈদেশিক জাতি, যারা দীর্ঘকাল ভারতে বাস করেছে, একই ধরনের খাদ্য গ্রহণ করেছে, একই নদীর জল পান করেছে, একই রৌদ্রালােকে পরিপুষ্ট হয়েছে এবং দৈনন্দিন জীবনে একই নিয়ম অনুসরণ করেছে, তাদের দেহাবয়বে এবং জীবনযাত্রায় কিছু পরিমাণে সাদৃশ্য এসে গেছে।

ভারতের রাজনৈতিক ঐক্য (Political unity of India): রাজনৈতিক ঐক্যের আদর্শ অতি প্রাচীনকাল থেকে ভারতীয় মনকে আকৃষ্ট করেছিল। বেদ, পুরাণ প্রভৃতি প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে সম্রাট, রাজাধিরাজ, বিরাট, একরাট, অধিরাজ, রাজচক্রবর্তী প্রভৃতি উপাধি গ্রহণ এবং অশ্বমেধ, রাজসূয় রাজপেয় প্রভৃতি যজ্ঞানুষ্ঠান প্রভৃতি সার্বভৌম সাম্রাজ্য ও ভৌগােলিক একতার আদর্শ প্রচার করা হত। ঐতিহাসিক যুগে মৌর্য, শুঙ্গ, গুপ্ত প্রভৃতি রাজগণ মুসলিম যুগে খলজি, তুঘলক এবং তৈমুর বংশ ভারতে সার্বভৌম রাজ্য স্থাপনে চেষ্টা করেছেন।