ভারতের নব্য প্রস্তর যুগের সময়সীমা ও বৈশিষ্ট্য।

author photo
- Sunday, September 09, 2018
advertise here

ভারতের নব্যপ্রস্তর যুগ।


প্রাচীন প্রস্তর যুগের মানুষের জীবন যাত্রার প্রধান ত্রুটি হল খাদ্যর ব্যাপারে প্রকৃতির উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা। মানুষ এ থেকে রেহাই পাবার জন্য অর্থনীতিক বিপ্লব ঘটাই। কৃষির উন্নতি থেকে নগর সভ্যতা উদ্ধব পর্যন্ত সময়কে পুরাতত্ববিদগণ নব্য প্রস্তর যুগ বলেন। আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০০ অব্দ থেকে ভারতে এই যুগের সূচনা। নব্য প্রস্তর যুগ বা নবপোলিয় যুগের ইংরেজি হল Neolithic Age একে নব্য প্রস্তর যুগের বিপ্লব বলা হয়। কারণ এই যুগে কৃষিকাজ ও পাথরের হাতিয়ার প্রভুতির বিশেষ উন্নতি সাধন হয়। এর বিস্তারিত নীচে আলোচনা করা হল।


নব্য প্রস্তর যুগের প্রত্নক্ষেত্রগুলি:

নব্য প্রস্তর যুগের সভ্যতার চিহ্ন ভারতের সর্বত্র কমবেশি পাওয়া গেলেও সবচেয়ে বেশি উত্তর পশ্চিম ভারতে পাওয়া যায়। এই সংস্কৃতির মূল কেন্দ্র ছিল সিন্ধুদেশ ও বেলুচিস্তান, পূর্বভারতের বিহার ও আসামে এই সংস্কৃতির ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়। তবে অনেকের ধারণা পুর্ব ভারতের নিদর্শন গুলিতে স্থানীয় বৈশিষ্ট্য বেশি। বেলুচিস্তানের মেহেরগড়, কিলিগুল মোহাম্মদ, কর্ণাটকের হাল্লুর ও গণ্ডগীরি, তামিলনাডু পেটটমপল্লি, আসামের দেওজালি প্রভুতি হল নব্য প্রস্তর যুগের অন্যতম প্রত্নক্ষেত্র।

নব্য প্রস্তর যুগের সময়সীমা:


ভারতের বিভিন্ন স্থানে নব্য প্রস্তর পর্বের আগমন ভিন্ন ভিন্ন সময়ে হয়েছে। বেলুচিস্তানের মেহেরগড় এই সংস্কৃতির সূচনা হয় ৬ হাজার খ্রি:পূ:। কিলিগুল্ মুহাম্মদ এর এই পর্বের সূচনা হয় খ্রি:পূ: চতুর্থ সহস্রাব্দে মাঝামাঝি সময়ে। কাশ্মীরে নব্য প্রস্তর যুগের সূচনা হয় ২৪০০ খ্রি: পূ: থেকে ১৬০০ খ্রি:পূ: বা তার কিছু পূর্বে। দক্ষিণ ভারত ২০০০ খ্রি:পূ: কাশ্মীরে এই পর্ব প্রায় হাজার বছর স্থায়ী হয়েছিল। দক্ষিণ ভারতে এই পর্ব প্রায় ১৫০০ বছর টিকে ছিল।



নব্য প্রস্তর যুগের বৈশিষ্ট্য:

১) এই যুগের হাতিয়ার গুলি অনেক বেশি মসৃণ, ধারালো ও ব্যবহারে উপযোগী। এই যুগে হাড়ের তৈরি হাতিয়ার বহু গুণে বৃদ্ধি পায়। হাড়ের সুচ, বর্শা, ফলা ইত্যাদি হাতিয়ার দেখা যায়।

২) এই পর্বের মাঝামাঝি সময় থেকে কৃষির ব্যাপকতা লক্ষ্য করা যায়। এই যুগের মানুষ ধান, গম ও বার্লি চাষ করত। ভারতীয় উপমহাদেশে কার্পাস উৎপাদনের প্রাচীনতম নিদর্শন এখানে পাওয়া যায়। পশুপালন এই সময়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। চাষ আবাদের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের যাযাবর জীবনের অবসান ঘটে। ছোট ছোট গ্রাম গড়ে ওঠে।

৩) নব্য প্রস্তর যুগে মৃৎ শিল্প ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। কুমোরের চাকা আবিষ্কৃত হয়। বয়নশিল্প এই যুগের একটি উল্লেযোগ্য আবিষ্কার। এই যুগের মানুষ আগুন জ্বালাতে শিখে।

৪) প্রাপ্ত নিদর্শনের ভিত্তিতে এই যুগের লোকেদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য জানা যায়। এই যুগের মানুষ যেমন পাহাড়ের গুহায় বসবাস করত, তেমনি বসবাসের জন্য চালাঘর নির্মাণ করেছিল। এই সব চালাঘর ছিল কাঠের গুড়ি ও মাটির দেওয়াল ও পেটানো মেঝে। কখনো কখনো মাটির পরিবর্তে একটার পর একটা পাথর দিয়ে দেওয়াল করত। বুজহামের মানুষ মাটির গর্তে বাস করত।

৫) নব্য প্রস্তর যুগে বেশিরভাগ প্রত্নক্ষেত্র থেকে তামা ও ব্রোঞ্জ এর জিনিস পাওয়া গেছে। মনে হয় নব্য প্রস্তর যুগের অন্তত শেষের দিকে ধাতু ব্যবহার শেখে।


৬) এই যুগের ললিতকলার পরিচয় পাওয়া যায়। পাহাড়ের গায়ে আঁকা চিত্র, পোড়া মাটির মূর্তিতে, পাত্রের গায়ে জ্যামেতিক নকশা, পশু, পাখি, গাছ, ফুল ইত্যাদি আঁকা থাকত। লাল কালো প্রভুতি রঙ দিয়ে মৃৎ পাত্র রাঙানো হত।

৭) বেলুচিস্তানের কয়েকটি স্থানে পোড়া মাটির মাত্রিকা মূর্তি পাওয়া গেছে। নব্য প্রস্তর যুগের লোকেরা মাত্রিকা দেবী ও সাপের পূজা করত। মাত্রিকা দেবীর প্রজনন স্বস্তির প্রতীক।

৮) মানুষ মারা গেলে তারা দেহ সমাধি করত। অধিকাংশ ও পূর্ণ উভয় ধরনের সমাধির প্রচলন ছিল। অনেক সময় মৃত দেহ কিছু দিনের জন্য কোন দূরবর্তী স্থানে ফেলে রাখা হত। তারপর তার অস্তি গুলি সমাধি করা হত।অনেক সময় সমাধিতে মানুষের বা কঙ্কালের সঙ্গে পশুর সমাধি পাওয়া গেছে।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে নব্য যুগীয় পর্বে কৃষি ও পশু পালনের বিকাশ, মৃৎ শিল্পের বিকাশ ও বয়নশিল্প সূচনার ফলে মানুষ আত্মবিশ্বাসী ও নিরাপদ হয়ে ওঠে। মেহেরগড় সভ্যতা এই যুগের সভ্যতা।
Advertisement advertise here