ভারতের লৌহ যুগ - Iron Age in India

- September 02, 2018
যে সময়ে কোন এলাকার ধাতব অস্ত্র ও যন্ত্রপাতি মূলত লোহা দ্বারা তৈরি হত সেই সময়কালকে প্রত্নতত্ববিদ্গণ লৌহ যুগ বলে আখ্যা দেন। লৌহ আবিষ্কার শুধু ভারতের ইতিহাসে নয়, গোটা মানবসভ্যতা ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। খ্রি: পু: ১৪ শো থেকে ১১ শো অব্দে মধ্যে এশিয়ার মাইনোরে হিটাইটরা প্রথম লোহার ব্যবহার শুরু করেন। ভারতের ক্ষেত্রে মনে করা হয় আর্যদের হাত ধরেই লোহা যুগের সূচনা হয়। তবে বিতর্ক রয়েছে।
ভারতের লৌহ যুগ
সাম্প্রতিক গবেষণার ভিত্তিতে মনে করা হয় যে, সম্ভবত খ্রি: পূ: ১১ শো অব্দ নাগাদ ভারতে প্রথম লোহার ব্যবহার শুরু হয়। তবে এ কথা ঠিক যে, ভারতের লোহার ব্যবহার সর্বত্র একেইসঙ্গে শুরু হয় নি। ভারতবর্ষের প্রত্নতাত্বিক দিক থেকে লোহ যুগিয় তিনটি পুরাতাত্ত্বিক সংস্কৃতির নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখ করতে হয়। সে গুলি হল (ক) পেন্টেড গ্রেওয়ার (Painted Grey Ware) বা চিত্রিত ধূসর বর্ণের মৃৎপাত্র সংস্কৃতি। (খ) নর্দান ব্ল্যাক পােলিশ ওয়্যার (Northern Black Polished Ware) বা উত্তরের কৃষ্ণবর্ণ মসৃণ মৃৎপাত্র সংস্কৃতি, এবং (গ) মেগালিথ (Megalith)। ভারতে লৌহ যুগ শুরু হয়েছে ১০০০ থেকে ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে।

লৌহ যুগের বিস্তার (Iron Age Expansion): লৌহ যুগের বিস্তৃতি হল উচ্চগাঙ্গেয় উপত্যকা, মালব মালভূমি এবং তাপ্তি উপত্যকায়, বালুচিস্থান সমভূমি, মধ্য ও নিম্নগাঙ্গেয় উপত্যকা এবং উত্তর পশ্চিম অঞ্চল বিশেষত পেশােয়ার অঞ্চলে। ভারতবর্ষে প্রথম লােহার খোঁজ পাওয়া যায় উচ্চ গাঙ্গেয় উপত্যকায়। পূর্বাঞ্চলীয় তাম্র ব্রোঞ্জ সংস্কৃতির পাশাপাশি লৌহ যুগের নিদর্শন পাওয়া গেছে। এই সব অঞ্চলে মূলত বাঁশ এর কাঠামোর উপর মাটি দিয়ে ঘর তৈরি করা হত এবং খড় দিয়ে চাল দিত। বাড়ি গুলিতে মাটির তৈরি উনুন পাওয়া গেছে। লোহার ব্যবহার শুরুর সাথে সাথে মানবসমাজে কিছু পরিবর্তন দেখা যায়, যার মধ্যে কৃষিব্যবস্থা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং শিল্পকলা অন্যতম। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রসস্ত্র তৈরী করে বিভিন্ন গোষ্ঠী দখলে মত্ত হয়। এই যুগের বিস্তার খুব দ্রুত হয়। অহিসত্র (Ahichhatra), বারাণসী , কোশাম্বী, শ্রাবন্ত্রী এবং উজ্জয়িনী এই কয়েকটি স্থানে লৌহযুগের সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যায়।

লৌহ যুগের বৈশিষ্ট্য (Iron Age Features)

(১) এই যুগের মানুষ সমাজে বসবাস করতে থাকে। এবং এরা লৌহ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের জিনিস আবিষ্কার করে। এগুলি হল বর্শা, তীর-ধর্নুক, তরওয়াল, রথ ও রথের চাকা, কুঠার, বল্লম, বর্ম, ঢাল, শিরস্ত্রাণ প্রভুতি। এই যুগে অশ্বের প্রচলন ছিল।
(২) এই যুগের মানুষ মধ্যে সামাজিক বৈসম্য দেখা গিয়েছিল। তাদের মধ্যে জাতপাতের ভেদাভেদ দেখা যায়। এখানে রাজা গঠিত হয়, এবং তিনি সর্বেসর্বা। তাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য পুরোহিত থাকত। সাম্রাজ্যবাদ বৃদ্ধি পায়। এই যুগের রাজারা বিভিন্ন উপাধি ধারণ করত।
(৩) এই যুগের মানুষ কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য উন্নতি লাভ করেছিল। তারা সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে ফসল উৎপাদন করত। তারা লাঙ্গল, কাস্তে, সারপ্রয়োগ, দা প্রভূতি ব্যবহার করত। জমি ছিল গ্রামের সমষ্টি গত সম্পত্তি। ধীরে ধীরে পরিবার প্রধান জমির মালিকানা ভোগ করতে থাকে।
(৪) লৌহ যুগে মৃত দেহকে দাহ করা হত। এবং এরা প্রকৃতি পূজা, জল, বায়ু, আগুন ইত্যাদির পূজা অর্চনা করত। এবং বিভিন্ন ধর্মের উন্মেষ ঘটিয়েছিল। রাজারা যুদ্ধ জয় করলে যজ্ঞের অনুষ্ঠান করত। এই যুগে বিভিন্ন ধর্মের সৃষ্টি হয়।
(৫) লৌহ যুগের মহিলারা পুরুষদের সঙ্গে তালমিলিয়ে চলত। এরা যোদ্ধা ছিল। এবং উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করত। এই যুগে দেবদাসী ও গণিকাবৃতি প্রসার ঘটে। ফলে নারীদের সম্মান অনেকখানি নষ্ট হয়ে যায়।
(৬) লৌহ যুগের মানুষ শোষিত হতে থাকে। এই যুগে বিভিন্ন গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়। তারা সমাজের উচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত থাকে। সমন্ততন্ত্র প্রথা চালু হয়। নতুন নতুন নগরের সৃষ্টি হয়। অভ্যন্তরীণ ও বহির্বানিজ্য করত। গিল্ড ব্যবস্থা চালু হয়।

পরিশেষে বলা যায়, লৌহ যুগ মানুষের কাছে এক আশির্বাদ রুপে আসে। এই যুগের মানুষ কৃষিতে ব্যাপক উন্নতি সাধন করে। আবার এই যুগে শুরু হয় যুদ্ধ, দ্বন্দ্ব, হত্যা প্রভুতি। এর ফলে প্রাচীন যুগে শুরু হয় গোষ্ঠী দখলের যুদ্ধ। কালক্রমে গড়ে ওঠে বড়ো বড়ো রাজবংশ সৃষ্টি হয়।
Advertisement