PayPal

মেহেরগড় সভ্যতার ইতিহাস

author photo
- Friday, August 31, 2018

মেহেরগড় সভ্যতা

হরপ্পা সভ্যতার বিকাশের আগে বেলুচিস্তান, সিন্ধুপ্রদেশ, পাঞ্জাব, হরিয়ানা প্রভুতি স্থানে কৃষি শিল্প, নগরভিত্তিক, বানিজ্য নির্ভর সমাজের আবির্ভাব হয়। সেটি মেহেরগড় সভ্যতা নামে পরিচিত। এই সভ্যতার প্রধান কেন্দ্র গুলি রানা ঘুন্ডাই, আঞ্জিরা, কুল্লিমেহি, মুস্তিগাক, গুমলা, মেহেরগড় প্রভুতি। এদের মধ্যে মেহেরগড় সভ্যতা হল প্রাচীন। তাই মেহেরগড় সভ্যতাকে সিন্ধু সভ্যতার পটভূমি বলা হয়।
মেহেরগড় সভ্যতার নিদর্শন
মেহেরগড় সভ্যতার আবিষ্কার : বোলান গিরিপথের কাছে এবং কোয়েটা শহর থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরে কাচ্চি সমভূমিতে নব্য প্রস্তর যুগীয় মেহেরগড় প্রত্নক্ষেত্র আবিষ্কার হয়েছে। ১৯৭৪ সালে ফরাসি প্রত্নতত্ববিদ জ্যা ফ্রাসোয়া জারিজ ও তার সহকারী রিচার্ড মিডো মেহেরগড় সভ্যতা আবিষ্কার করেন। এই সভ্যতাই সাতটি স্তর পাওয়া গেছে, তার মধ্যে প্রথম তিনটি হল নব্য প্রস্তর যুগের।

ব্যাপ্তি বা অবস্থান : ড. এস. রত্নাগর উল্লেখ করেছেন, “Mehergarh lies on the frontier between sind and Baluchistan" ব্যাপকভাবে বলতে গেলে, পশ্চিমে সাহারা মরুভূমি ও ভূমধ্যসাগর, পূর্বে হিমালয় ও থর মরুভূমি, উত্তরে বলকান, ককেশাস ও হিন্দুকুশ প্রভৃতি ইউরাে-এশিয়াটিক পর্বতমালা, দক্ষিণে আরব সাগর ও কর্কটক্রান্তিরেখার মধ্যবর্তী অঞ্চলে এই সভ্যতার বিস্তার ঘটেছিল।

মেহেরগড় অবিচ্ছিন্ন সভ্যতা : ড. এন. এস. রাজারাম, ড. এম. আর. রাও, এস. পি. গুপ্ত, শ্রীকান্ত আলগরে প্রমুখ ঐতিহাসিকেরা মেহেরগড়, হরপ্পা সভ্যতা ও বৈদিক সভ্যতাকে এক অবিচ্ছিন্ন সভ্যতার বিভিন্ন পর্যায় বলেছেন। এরা এক সঙ্গে মেহেরগড় সভ্যতাকে সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতা বলেন।

মেহেরগড় সভ্যতার বৈশিষ্ট্য

(১) ড. বি. এন. মুখার্জির মতে, মেহেরগড় সভ্যতা আনুমানিক ৭০০০-৬০০০ খ্রিস্টপূর্বের প্রাচীন সভ্যতা। ৭ টি পর্যায়ে এর নগরপ্রক্রিয়া চলেছিল। প্রথম পর্যায়ের সময়কাল হল খ্রিস্টপূর্বের ৭০০০-৫০০০ খ্রিষ্টপূর্ব (রেডিও কার্বন -১৪ পদ্ধতির দ্বারা পরীক্ষিত)। এই এলাকাটি শিকারি ও পশুপালকদের অস্থায়ী আবাসস্থল ছিল। এবং ধীরে ধীরে কৃষিভিত্তিক জীবনের বিকাশ ঘটে। বাড়ি নির্মাণ হত রোদে শুকানো ইট দিয়ে। এখানে জাতা, হামানদিস্তা, কাস্তে ও পাথরের তৈরি হাতিয়ার ব্যবহার করত। গরু, ভেড়া, ছাগল গৃহপালিত পশু ছিল। এবং কুকুরকে পোষ মানিয়ে ছিল। এখানে নানা প্রজাতির বার্লি ও গমের চাষ হত। এখানে কোন মৃৎপাত্র পাওয়া যায়নি। মেহেরগড় সভ্যতার মৃতদেহ সমাধি দেওয়া হত। সমাধির সঙ্গে দেওয়া হত সামুদ্রিক ঝিনুক জাতীয় লকেট। এ যুগে সামাজিক পার্থক্য ছিল। মধ্য এশিয়া বা পারস্য থেকে Tarquoise এবং আফগানিস্থান থেকে Lapis Lazuli আমদানি করা হত।

(২) দ্বিতীয় পর্যায়ের সময়কাল হল খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০-৪০০০ খ্রিস্টপূর্ব। এই পর্বে মানুষ কার্পাস চাষ করত এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে হরপ্পা সভ্যতার দুহাজার বছর আগে এখানে তুলোর চাষ শুরু হয়। এরা সেচ ব্যাবস্থা জানত। গৃহপালিত পশুর মধ্যে ছিল গরু ভেড়া ছাগল ইত্যাদি। মাটির পাত্রের ব্যবহার ব্যাপকতর হয়। প্রথমে এগুলি হতে বানাত। এরা কুমোরে চাকা ব্যবহার করত। এই অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের পাথর ও শাখের অস্তিত্ব দূরপাল্লার বানিজ্য ইঙ্গিত দেয়।

(৩) তৃতীয় পর্বের সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০-৩২০০ খ্রিস্টপূর্ব। এই পর্বে মৃৎ পাত্র গুলি চাকে তৈরি ও চুল্লির আগুনে পোড়ানো নানা রঙের মৃৎপাত্র প্রচলন ছিল। এই মৃৎপাত্র গুলির উপর নানাপ্রকার জ্যামিতি নক্সা, পশু পাখি, গবাদি পশু এবং গাছপালার ছবি দেখা যায়। এই পর্বে তামার ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। এছাড়া পাওয়া গেছে তামার ছুরি, বর্শি প্রভুতি। পাথর কেটে অলঙ্কার তৈরি করত। এই পর্বে কৃষি ব্যাপক অগ্রগতি দেখা যায়। এই সময় বহির্বানিজ্জ বিস্তার ঘটে।

(৪) চতুর্থ থেকে সপ্তম পর্বের সময়কাল ছিল ৩২০০-২৬০০ অব্দ পর্যন্ত। মেহেরগড় বস্তুগত সংস্কৃতি আরও পরিণতি লাভ করে। মৃৎপাত্র নির্মাণে নানা ধরনের বৈচিত্র্য আসে এবং নানা রঙের ব্যবহার হতে থাকে। পোড়া মাটির নারীমূর্তি ও সিলমোহর তৈরি হতে থাকে। এগুলি হরপ্পা সভ্যতায় প্রাপ্ত নারীমূর্তি ও সিলমোহর পূর্বনিদর্শন। শস্য ক্ষেত্রে জল সেচের জন্য খাল কাটার প্রমাণ পাওয়া যায়। মেহেরগড় নগরায়নের সূচনা হয়েছিল অনেক আগেই। মানুষের জীবযাত্রা, রুচির বিকাশ, রাস্তাঘাটের উন্নতিতে তার ছাপ পাওয়া যায়। তাই মেহেরগড় সভ্যতাকে সিন্ধু সভ্যতার পটভূমি বলা হয়।

মেহেরগড় সভ্যতার গুরুত্ব

মেহেরগড় সভ্যতার আবিষ্কার নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে ভারতীয় সভ্যতা এবং তার পরিপ্রেক্ষিতটিই পরিবর্তিত হয়ে গেছে। (১) এতদিন মনে করা হত যে, সিন্ধু সভ্যতাই ভারতের প্রাচীনতম সভ্যতা, কিন্তু মেহেরগড়ের আবিষ্কার প্রমাণ করেছে যে, সিন্ধু-পূর্ব যুগে ভারতে এক উন্নত সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। (২) এতদিন অনেকেই মনে করতেন যে, হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারাে ছিল মেসােপটেমিয়ার দূরবর্তী উপনিবেশ। এখন সেই ধারণা পরিবর্তিত হয়েছে এবং আজ দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যায় যে, সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টারা বহিরাগত নয়—তারা ভারতেরই মানুষ। (৩) হরপ্পা-মহেঞ্জোদারাের উন্নত নগর সভ্যতা কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়-মেহেরগড় ও সন্নিহিত অঞ্চলে মানব সভ্যতার যে বিকাশ ঘটেছিল, হরপ্পা সভ্যতা তারই এক পরিপূর্ণ রূপ।

মেহেরগড় সভ্যতার পতন : আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ অব্দে মেহেরগড় সভ্যতার পতন ঘটে। এর কারণ গুলি হল - বহিরাক্রমণ, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, জলবায়ুর পরিবর্তন ও সিন্ধু সভ্যতার মধ্য বিলীন হওয়া ইত্যাদি।

উপসংহার : এই সমস্ত প্রমাণ থেকে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ভারতীয় উপমহাদেশে আনুমানিক 7000 খ্রিস্টপূর্বে নব্য প্রস্তর যুগের সংস্কৃতির বিকাশ ও বিস্তৃতি ত্বরাথিত হয়েছিল। বস্তুত মেহেরগড় সভ্যতার আবিষ্কার ভারতীয় উপমহাদেশের গ্রাগৈতিহাসিক সংস্কৃতির সূচনা ও বিকাশ সম্পর্কে যে নতুন তথ্য সাবরাহ করে, তা মানব সভ্যতার বিকাশ সম্পর্কে নতুন ধারণার জন্ম দেয়।

No comments:

Post a Comment