হরপ্পা সভ্যতার পতনের পরিবেশগত কারণ

- August 23, 2018
হরপ্পা সভ্যতার পতন কী কারণে হয়, সেটা সঠিকভাবে কোনো ঐতিহাসিক বলতে পারে না। তবে অনেকে প্রাকৃতিক কারণকে দায়ী করে থাকে। ১৭৫০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে হরপ্পা সভ্যতার প্রধান দুটি কেন্দ্র হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো বিলুপ্তি ঘটে এবং পরবর্তী ১০০ বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ হরপ্পা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়।
মহেঞ্জোদারো সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ ছবি
ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ুর পরিবর্তন: স্যার মর্টিমার হুইলার বলেন যে, প্রথমদিকে সিন্ধু উপত্যকায় প্রবল বৃষ্টিপাত হত এবং এলাকাটি ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। এখানকার সিলে গন্ডার, হাতি, বাঘ, বাইসন, মােষ প্রকৃতি প্রভৃতি জীবজন্তুর ছবি উৎকীর্ণ আছে। এ থেকে বােঝা যায় যে, এই অঞ্চলে এইসব জীবজন্তু বাস করত। সাধারণত বৃষ্টিবহুল স্যাৎসেতে অঞ্চলে এইসব জীবজন্তু বসবাস করে। কালক্রমে নগর সভ্যতার সম্প্রসারণ এবং গৃহ নির্মাণের উদ্দেশ্যে পােড়া-ইট তৈরির জন্য ব্যাপক বৃক্ষচ্ছেদনের ফলে সমগ্র অঞ্চলটি বনশূন্য হয়ে পড়ে। এর ফলে এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে যায়। এর ফলশ্রুতি হিসেবে কৃষিকার্যের অবনতি ঘটে, নিকটবর্তী স্থানে মরুভূমি থাকায় এই অঞ্চলের শুষ্কতা বৃদ্ধি পায়, ভূগর্ভস্থ লবণ ধীরে ধীরে উপরে উঠে আসে এবং কালক্রমে স্থানটি উষর মরুভূমিতে পরিণত হয়।

এছাড়া রাজপুতানার মরু অঞ্চলের ক্রমপ্রসারকে এই সভ্যতার পতনের জন্যে দায়ী করা হয়। সিন্ধু সভ্যতার বিনাশ প্রসঙ্গে স্যার অরেল ষ্টাইন এর বক্তব্য বিবেচনাধীন। তিনি ভারত সীমান্তে গেড্রোসিয়া বা বেলুচিস্তানের জনহীন উষরভূমির উপর সমৃদ্ধশালী বসতির ধ্বংসবশেষ দেখতে পান। তার মতে বেলুচিস্তানে এই শুষ্কতার সূচনা হয় তাম্র প্রস্তর যুগ থেকে। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে গ্রীকবীর আলেকজাণ্ডারের আক্রমণকালে এই শুষ্কতা বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায় এবং তার সেনাদলের পক্ষে এই শুষ্ক মরু অঞ্চল অতিক্রম করা সহজ হয় নি। হরপ্পা সভ্যতা বিনাশের পক্ষে এই ক্রমবর্ধমান শুষ্কতা বহুলাংশে দায়ী ছিল। রাইকস, ডাইসন ও ফেয়ারসার্ভিস আবহতত্ত্ব, উদ্ভিদতত্ত্ব ও প্রাণীতত্ত্বের হিসেব-নিকেষ করে জানান যে, সিন্ধু অঞ্চলের আবহাওয়ায় এ ধরনের কোনও বড়াে পরিবর্তন ঘটে নি।

সিন্ধু নদের গতিপথ পরিবর্তন: অনেকের মতে, সিন্ধু ও তার শাখানদীগুলি এবং অন্যান্য নদ নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে এই সভ্যতার পতন ঘটে। সিন্ধুনদ তার গতিপথ পরিবর্তন করলে মহেঞ্জোদারাে বন্দর তার গুরুত্ব হারায়। জলাভাব ও শুষ্কতা বৃদ্ধির ফলে মহেঞ্জোদারাে ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহে কৃষিব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। খাল খনন করে হয়তাে এ সমস্যার সমাধান করা যেত, কিন্তু মহেঞ্জোদারােবাসী সে পথে অগ্রসর হয় নি—তারা সম্ভবত নগরটি ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায়। কেবলমাত্র সিন্ধুনদই নয়—শতদ্রু ও যমুনা নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়।

ভূমিকম্প তত্ত্ব: অনেকের মতে ভয়াবহ ভূমিকম্পের ফলে হরপ্পার নগরগুলি ধ্বংস হয়েছিল এবং সিন্ধু উপত্যকার নিকটবর্তী অঞ্চলই ছিল ভূমিকম্পের উৎসস্থল। তাদের যুক্তির সমর্থনে তারা মহেঞ্জোদারােতে প্রাপ্ত ইতস্তত বিক্ষিপ্ত মৃতদেহগুলির কথা বলে থাকেন। কঙ্কালগুলির গায়ে ক্ষতচিহ্ন সম্ভবত ভূমিকম্পের ফলে ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ার জন্যই মৃতদেহগুলির গায়ে ক্ষতচিহ্ন ছিল এবং মৃতদেহগুলির সৎকার করাও সম্ভব হয় নি। এই মতবাদ সর্বাংশে গ্রহণযােগ্য নয়, কারণ মহেঞ্জোদারাের ক্ষেত্রে এই মতবাদ প্রযােজ্য হলেও হরপ্পা সভ্যতার অন্যান্য নগরগুলির ক্ষেত্রে ভূমিকম্প তত্ত্ব খাটে না। ডঃ শঙ্খালিয়া প্রশ্ন তুলেছেন যে, মহেঞ্জোদারাে নগরটি ধ্বংস হলে তার অধিবাসীরা পর পর সাতবার তার পুনর্নির্মাণ করে থাকলে ভূমিকম্পের পর কেন তারা আর তার পুনর্নির্মাণ করল না?

বন্যাতত্ত্ব: রাইকস, ডেলস, আরনেস্ট ম্যাকে, এস. আর. রাও, সাহানী প্রমুখেরা হরপ্পা সভ্যতার পতনের কারণ হিসেবে বন্যার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। এম. আর. সাহানী-র মতে প্লাবন সিন্ধু-সংস্কৃতিকে ভাসিয়ে দেয়। রাইকস্ বলেন যে, সিন্ধু নদের জল অবরুদ্ধ হওয়ার ফলে ক্রমাগত বন্যা ও প্লাবন হচ্ছিল, এবং এর ফলেই সিন্ধু সভ্যতার বিলােপ ঘটেছিল। সিন্ধু নদের বুকে পলি জমে নদীগর্ভ উচু হয়ে ওঠে। এর ফলে বর্ষায় নদীর জল দু-কূল ছাপিয়ে শহরকে প্লাবিত করতে থাকে। মহেঞ্জোদারাে নগরটি যে অন্তত তিনবার বন্যার দ্বারা প্লাবিত হয়েছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। বন্যার হাত থেকে মহেঞ্জোদারাের নগরদুর্গকে রক্ষার উদ্দেশ্যে ৪৩ ফুট চওড়া একটি বাঁধ নির্মাণ করা হয় এবং দুর্গ-সংলগ্ন পয়ঃপ্রণালীর উচ্চতা ১৪ ফুট বাড়ানাে হয়। শহরে বাড়ির ভিতরে যাতে জল ঢুকতে না পারে, সেজন্য বাড়ির ভিত উচু করা হয় এবং বাড়ির যে সব অংশে বন্যার জল লাগতে পারে, সে সব অংশ পােড়ামাটির ইট দিয়ে তৈরি করা হয়। চানহুদারাে, লােথাল, দেশলপার, রংপুর, ভগতরব প্রভৃতি স্থানে বন্যার চিহ্ন স্পষ্ট। আবার অন্যদিকে হরপ্পা, কালিবঙ্গান প্রভৃতি স্থানে নগর ধ্বংসের জন্য বন্যার কোনও ভূমিকা নেই। অনেকে মনে করেন যে, কেবলমাত্র বন্যা এত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পরিব্যাপ্ত এই সভ্যতার বিনাশ ঘটাতে পারে না। রাইকস্ বলেন যে, কোনও সাধারণ বন্যা নয়, ভূ-পৃষ্ঠের পরিবর্তনজনিত একটি ভয়াবহ বন্যাই হরপ্পা সভ্যতা ধ্বংস করেছিল। আবার অনেকের মতে, এ ধরনের বন্যার কোনও ভূ-তাত্ত্বিক প্রমাণ নেই।

উদ্ভিদ ও প্রাণীকুল ধ্বংস: প্রত্নতাত্ত্বিক পােজেল বলেন যে, সিন্ধুবাসীরা নিজেদের প্রয়ােজনে দীর্ঘ পাঁচশাে বছর ধরে এই অঞ্চলের উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলকে নির্মমভাবে ব্যবহার করেছিল। এর ফলে এমন একটা সময় এসেছিল যখন আর জীবনধারণের জন্য জমিতে প্রয়ােজনীয় ফসল উৎপন্ন হচ্ছিল না এবং ক্রমাগত ধ্বংস হওয়ায় জীবজন্তুদের বংশও লােপ পেয়েছিল। এর ফলে এই অঞ্চলে প্রবল খাদ্যসংকট দেখা দেয় এবং হরপ্পা সভ্যতা বিলুপ্ত হয়। এই বক্তব্য গ্রহণযােগ্য নয় কারণ হরপ্পা সংস্কৃতি পাঁচশাে বছরের অনেক বেশি সময় স্থায়ী হয়েছিল, এবং পাঁচশাে বছরের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে কৃষি-উৎপাদন নিঃশেষিত হয়ে যাবে—এ যুক্তিও গ্রহণযােগ্য নয়।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, সিন্ধু সভ্যতা যেভাবে উন্নততর হয়েছিল ঠিক একই ভাবে ধীরে ধীরে পতনের দিকে ধাবিত হয়। তবে সঠিকভাবে কেউ বলতে পারেনি কী কারণে এই সভ্যতা বা সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে যায়। সিন্ধু সভ্যতার লিপি যতদিন না পর্যন্ত পাঠুদ্ধার করা সম্ভব হবে ততদিন পর্যন্ত এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়।
Advertisement