হরপ্পা সভ্যতার প্রাচীনত্ব বা কালসীমা

- August 25, 2018
হরপ্পা সংস্কৃতির প্রাচীনত্ব বা কালানুক্রম নির্ণয় করা একটি কঠিন সমস্যা। মহেঞ্জোদারো নীচের দিকে কয়েকটি স্তর জলমগ্ন থাকায় এ সম্পর্কে আলােচনার সুযোগ সীমাবদ্ধ। এছাড়া, নিত্যনতুন তথ্য ও বিচার পদ্ধতি আবিষ্কৃত হওয়ায় এই সভ্যতার প্রাচীনত্ব সম্পর্কে ধারণা সর্বদাই পরিবর্তিত হচ্ছে। হরপ্পা সভ্যতা আবিষ্কারের অব্যবহিত পরেই এর সময়সীমা যতদূর সম্ভব পিছিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। স্যার জন মার্শাল এর সময়সীমা খ্রিস্টপূর্ব ৩২৫০ থেকে ২৭৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে স্থির করেন। এরপর সিন্ধু উপত্যকা ও মেসােপটেমিয়ার বিভিন্ন স্থানে প্রাপ্ত তথ্যাদির তুলনামূলক বিচার, হরপ্পা সংস্কৃতির যুগে ব্যবহৃত মৃৎপাত্রের রঙ-বিশ্লেষণ এবং 'রেডিও কার্বন-১৪ (Radio Carbon-14)' পরীক্ষার মাধ্যমে এই সভ্যতার সময়সীমা কমিয়ে আনার চেষ্টা হয়। অতি সম্প্রতি 'ডেনড্রো ক্রনােলজি (Dendro Chronology)' নামক পরীক্ষার সাহায্যে এর সময়সামা পিছিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
হরপ্পা সভ্যতার কালসীমা
নিম্নতম কালসীমা: এই সংস্কৃতির কালানুক্রম সমস্যার দুটি দিক আছে - নিম্নতম কালসীমা এবং উর্ধ্বতম কালসীমা। নিম্নতম কালসীমা নির্ধারণ অপেক্ষাকৃত সহজ। এখানে দিকচিহ্ন হিসেবে লােহার কথা বলা যায়। হরপ্পা সভ্যতায় লোহার কোনও নিদর্শন মেলে নি। পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে সিন্ধু উপত্যকার ঘনিষ্ঠ যােগাযােগ ছিল। সেখানে লোহার প্রচলন হয় খ্রিস্টপূর্বাব্দ দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মধ্যভাগে। তাই মােটামুটিভাবে বলা যায় যে, ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ সিন্ধু উপত্যকায় লােহার প্রচলন হয়। ভারতে আর্য আক্রমণ হয় ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এবং ঋগ্বেদ রচিত হয় ১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। সুতরাং ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দকে হরপ্পা সভ্যতার নিম্নতম কালসীমা বলে ধরা হয়।

উর্ধতন কালসীমা: উর্ধতন কালসীমা নিয়েই মূল সমস্যা। এ সমস্যা আজও চলছে। প্রথম দিকের ঐতিহাসিকরা মূলত হরপ্পা সভ্যতা ও মেসােপটেমিয় সভ্যতার সাদৃশ্যের উপর নির্ভর করে হরপ্পা সংস্কৃতির সূচনাকাল যতদূর সম্ভব পিছিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। স্যার জন মার্শাল (১৯৩১ খ্রিঃ) এর সময়সীমা নির্দিষ্ট করেছেন খ্রিস্টপূর্ব ৩২৫০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২৭৫০ এর মধ্যে। সিন্ধু উপত্যকার সিলের অনুরূপ কিছু সিল পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে আবিষ্কৃত হয়েছে। হরপ্পা সভ্যতার কালসীমা নির্ধারণে এগুলির গুরুত্ব অপরিসীম।
(১) সি. জে. গ্যাড এ জাতীয় বারােটি সিল পরীক্ষা করে এগুলির সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন খ্রিঃ পূঃ ২৫০০ থেকে খ্রিঃ পূঃ ১৫০০ অব্দ।
(২) ডঃ ফ্রাঙ্কফোর্ট টেল আসমারে প্রাপ্ত দুটি সিল পরীক্ষা করে তাদের সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন খ্রিঃ পূঃ ২৮০০ অব্দ।
(৩) ডঃ ফেব্রি সিন্ধু উপত্যকায় প্রাপ্ত একটি সুমেরীয়-ব্যাবিলনীয় শিলালিপি পরীক্ষা করে তার কালসীমা নির্ণয় করেছেন খ্রিঃ পূঃ ২৮০০ - খ্রিঃ পূঃ ২৫০০ অব্দ।
(৪) স্টুয়ার্ট পিগট (১৯৫০ খ্রিঃ) এবং হুইলার (১৯৪৬ ও ১৯৬০ খ্রিঃ) মেসােপটেমিয় কালানুক্রমের ভিত্তিতে হরপ্পার সময়সীমা খ্রিঃ পূঃ ২৫০০ থেকে খ্রিঃ পূঃ ১৫০০ অব্দের মধ্যে স্থির করেছেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, ২৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দই হল সর্বোচ্চ কালসীমা। আমরা জানি যে, এই সভ্যতা দীর্ঘদিন ভূণ অবস্থায় ছিল। সুতরাং ২৮০০-র সঙ্গে আরও ৫০০ বছর যােগ করলে ৩৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ হয়, এবং এটিই হল এই সভ্যতার জন্মলগ্ন বা সর্বোচ্চ কালসীমা।

রেডিও কার্বন পরীক্ষা: বর্তমানে রেডিও কার্বন-১৪ পরীক্ষাই হল কালনির্ণয়ে শ্রেষ্ঠ পরীক্ষা। এই পরীক্ষার মাধ্যমে ফেয়ারসার্ভিস (১৯৬৫ খ্রিঃ) সময়সীমা ধার্য করেছেন খ্রিঃ পূঃ ২০০০ থেকে খ্রিঃ পৃঃ ১৫০০ । ১৯৬৪ সালে ডি. পি. অগ্রবাল এই পরীক্ষার ভিত্তিতে হরপ্পা নগরী ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তার মতে হরপ্পা নগরীর সময়সীমা হল আনুমানিক খ্রিঃ পূঃ ২৩০০ থেকে খ্রিঃ পূঃ ২০০০ অব্দ। সীমান্ত অঞ্চলে প্রধানত গুজরাট ও রাজস্থানের অন্তর্গত লােথাল, রােজদি এবং কালিবঙ্গানের সময়সীমা হল আনুমানিক খ্রিঃ পূঃ ২২০০ থেকে খ্রিঃ পূঃ ১৭০০ অব্দ। তবে এ কথা ঠিকই যে, কালসীমা-সংক্রান্ত সব আলােচনাই অনুমানভিত্তিক। সিন্ধুলিপির পাঠোদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত এ সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানাে সম্ভব নয়।