August 22, 2018

সিন্ধু/হরপ্পা সভ্যতার পতনের কারণ।

সিন্ধু সভ্যতা/হরপ্পা সভ্যতা ধ্বংসের কারণ।


দীর্ঘ ৬০০ বছর সগৌরবে বিদ্যমান থাকার পর ১৭৫০ খ্রি:পু: নাগাদ সিন্ধু ও তার পার্শ্ববর্তী শহরগুলি অদৃশ্য হয়ে যায়। সিন্ধু সভ্যতার পতনের কারণ সম্পর্কে বিভিন্ন পণ্ডিত বিভিন্ন অভিমত প্রকাশ করেছেন। প্রতিটা অভিমতের পিছনে যুক্তি আছে তবে কোনটি চূড়ান্ত নয়।


রক্ষনশীল মানসিকতা :

অনেকের মতে রক্ষনশীল মানসিকতা বা বন্ধ্যাত্ব ছিল হরপ্পা সংস্কৃতির পতনের কারণ। এদের মতে সিন্ধু উপত্যকা অঞ্চলে এই বন্ধ্যাত্ব শুরু হয় মানসিক দিক থেকে এবং পরিণতি লাভ করেছিল অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত্ব। সিন্ধুবাসিরা ব্যাবিলন বা সুমেরু খালের জল দ্বারা সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে চাষ আবাদ করতো। কিন্তু নিজেদের এলাকাই এই পদ্ধতি প্রয়োগের কোনো উদ্যোগ ছিল না। ভারী অস্ত্রশস্ত্র নির্মাণে কারিগরি কৌশল তাদের আয়েত্ত ছিল। কিন্তু এই সব নির্মাণে কোনো উদ্যোগ ছিল না। এইভাবে গুটিয়ে থাকার ফলে হরপ্পা সভ্যতার পতন ঘটে।



ভূ-প্রকৃতির পরিবর্তন :

কোন কোন ঐতিহাসিক এর মতে ভূ-প্রকৃতির অস্বাভাবিক পরিবর্তন হরপ্পা সভ্যতার পতনের কারণ। এদের মতে সিন্ধুর নিকটবর্তী অঞ্চলে মরুভূমি থাকাই মাটির নিচের জল ক্রমশ নোনা হতে থাকে। এই অঞ্চল ক্রমশ শুষ্ক হয়ে যায়। মরুভূমি থাকাই বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যায়। এর ফলে সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংস হয়।

প্রাকৃতিক কারণ :

অনেকের মতে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকেই হরপ্পা সভ্যতার বা সংস্কৃতির পতন হয়। সিন্ধুর নিকটবর্তী অঞ্চলে ভূমিকম্পের উৎস ছিল।সম্ভবত ভূমিকম্পের কারণে হরপ্পা সভ্যতার পতন হয়। ঐতিহাসিক রাইকসের মতে সিন্ধু নদের জল অবরুদ্ধ হওয়ার ফলে ক্রমাগত বন্যা প্লাবনে সিন্ধু সভ্যতার পতন ঘটে।অধ্যাপক সাহানির মতে প্লাবন বা বন্যায় হরপ্পার পতন হয়। বন্যার প্রকোপ থেকে নিজেদের বাঁচাতে সিন্ধু বাসীরা ৪৩ ফুট একটা বাঁধ নির্মাণ করেছিল এবং দুর্গ সংলগ্ন পয়ঃ প্রণালী উচ্চতা ১৪ ফুট বাড়ানো হয়। তবে এধরনের বন্যার কোনো প্রমাণ নেয়।






বৃক্ষছেদন :

বন্যার হাত থেকে হরাপ্পা বাসিরা আগুনে পোড়ানো ইট দিয়ে বাড়ি নির্মাণ করেছিল। আর এই ইট পোড়াতে গিয়ে তারা যথেষ্ট ভাবে বনজঙ্গল কেটে ফেলেছিল। এর ফলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যায়। ফলে কৃষিকাজের চরম অবনতি ঘটে। বনজঙ্গল কেটে ফেলায় জঙ্গলের প্রাণীকুল নষ্ট হয়ে যায়।

বর্বর সংস্কৃতির প্রভাব :

হরপ্পা সভ্যতায় লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তাই বড় বড় ঘর গুলো ছোট ছোট আকারে ভাগ করা হচ্ছিল। ইতিমধ্যে বিভিন্ন অনগ্রসর এলায় হরপ্পা সংস্কৃতির দ্রুত প্রসার লাভের ফলে ঐসব অঞ্চলের বর্বরতা এই সংস্কৃতিকে গ্রাস করে। এর ফলে হরপ্পা সভ্যতা মলিন ও জীর্ণ হয়ে পড়ে।




রক্তপাত :

অনেকের মতে হরপ্পা সভ্যতার পতন ঘটেছিল রক্তপাতের মধ্য দিয়ে। উপত্যকা অঞ্চলে খনন কার্যের ফলে যত্রতত্র স্তূপীকৃত কঙ্কাল পাওয়া যায়। এই সব মৃতদেহ গুলি কোন সৎকার হয়নি। অনেকে মনে করেন যে, রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধ হরপ্পা সভ্যতার পতন ঘটে। হুইলার, গর্ডন চাইল্ড, স্টুয়াট পিগট, ওলচিন-দম্পতি প্রমুখ মনে করেন যে, আর্যদের আক্রমণের ফলে এই সভ্যতার পতন হয়। ভারতে আর্যদের আগমন কাল এবং হরপ্পা সভ্যতার পতনের সময় অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। এই দুটি সময়কাল আনুমানিক ১৫০০-১৪০০ খৃষ্টপুবাব্দ। ঋগবেদ বর্ণিত 'হরিয়ুপিয়ার যুদ্ধ'কে অনেকে হরপ্পার যুদ্ধ বলে মনে করে। এছাড়া মাথার পিছনে ভারী অস্ত্র দিয়ে আঘাত প্রাপ্ত মাথার খুলি পাওয়া গেছে। এছাড়া ঋগবেদে দেবরাজ ইন্দ্রকে 'পুরন্দর' বা নগরের ধ্বংসকারী বলে অবহিত করা হয়েছে। বলা বাহুল্য, আর্যদের আক্রমণ কালে ভারতে হরপ্পা সভ্যতা ছাড়া আর কোনো সভ্যতা ছিল না। চানহুদারও তে যে কুঠার পাওয়া গেছে সেটি ইরানিদের সঙ্গে মিল আছে। যেহেতু আর্যরা ইরানের মধ্য দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিল তাই এই কুঠারকে আর্যদের কুঠার বলে মনে করা হয়।


উপসংহার :

হরপ্পা সভ্যতার পতনের কোনো একটি কারণকে দায়ী করা হবে না। তাই বলা যেতে পারে সিন্ধু বা হরপ্পা সভ্যতার উথানের ন্যয় পতনের কাহানি আজও রহস্যকৃত।
Category: