সিন্ধু/হরপ্পা সভ্যতার পতনের কারণ

- August 22, 2018
আরনেস্ট ম্যাক-এর খননকার্যের ফলে জানা যায়, ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হরপ্পা সভ্যতা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। অবশ্য এখনও অনেকে বলেন, খ্রিস্টপূর্ব সাতাশ-আঠাশ শতকে সিন্ধু সভ্যতার অবসান হয়। কিন্তু এমন সুবিস্তৃত, সুসমৃদ্ধ ও বিস্ময়কর সভ্যতা কীভাবে, কখন হারিয়ে গেল, অবলুপ্ত হল মাটির অন্ধকারে তা আজও স্থির হয়নি। এ নিয়ে পণ্ডিতেরা নানা অভিমত পােষণ করেন।
হরপ্পা বা সিন্ধু সভ্যতার পতন
অভ্যন্তরীণ অবক্ষয়: হরপ্পা সভ্যতার অবক্ষয় দীর্ঘদিন থেকে চলছিল। সভ্যতার নীচের স্তরগুলিতে নাগরিক সভ্যতা ও জীবনযাত্রার পদ্ধতি ছিল অনেক উন্নত, কিন্তু উপরের স্তরগুলিতে শােচনীয় অবক্ষয়ের চিহ্ন পরিলক্ষিত হয়। বাড়িঘরগুলি রাস্তার উপর উঠে আসছে, গলিগুলি সংকীর্ণতর হচ্ছে, গলিতে ইটের পাঁজা তৈরি হচ্ছে, নর্দমাগুলি পরিষ্কার হচ্ছে না এবং তা ধীরে ধীরে বুজে আসছে। বড়াে বড়াে অট্টালিকার স্থলে তৈরি হচ্ছে ছােটো ছােটো বাড়ি এবং তাও আবার পুরােনাে ইট দিয়ে। বড়াে বড়াে ঘরগুলি ক্রমশ ছােটো ছােটো কক্ষে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। ব্যবসা - বাণিজ্য ও কৃষিকাজের অবনতি ঘটছে এবং মৃৎপাত্র তার পূর্বগৌরব বজায় রাখতে অক্ষম হচ্ছে। এই কারণে স্যার মর্টিমার হুইলার মন্তব্য করেছেন যে, পরবর্তীকালের মহেঞ্জোদারাে ও হরপ্পা ছিল তাদের প্রাথমিক পর্বের ছায়ামাত্র। বিদেশি আক্রমণের অনেক আগেই অভ্যন্তরীণ অবক্ষয়ের ফলে হরপ্পা সভ্যতার প্রাণবায়ু নিঃশেষিত হয় এবং বিদেশি আক্রমণের ফলে তার পতন ঘটে।

রক্ষনশীল মানসিকতা: অনেকের মতে রক্ষনশীল মানসিকতা বা বন্ধ্যাত্ব ছিল হরপ্পা সংস্কৃতির পতনের কারণ। এদের মতে সিন্ধু উপত্যকা অঞ্চলে এই বন্ধ্যাত্ব শুরু হয় মানসিক দিক থেকে এবং পরিণতি লাভ করেছিল অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত্ব। সিন্ধুবাসিরা ব্যাবিলন বা সুমেরু খালের জল দ্বারা সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে চাষ আবাদ করতো। কিন্তু নিজেদের এলাকাই এই পদ্ধতি প্রয়োগের কোনো উদ্যোগ ছিল না। ভারী অস্ত্রশস্ত্র নির্মাণে কারিগরি কৌশল তাদের আয়েত্ত ছিল। কিন্তু এই সব নির্মাণে কোনো উদ্যোগ ছিল না। এইভাবে গুটিয়ে থাকার ফলে হরপ্পা সভ্যতার পতন ঘটে।

ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ুর পরিবর্তন: স্যার মর্টিমার হুইলার বলেন যে, প্রথমদিকে সিন্ধু উপত্যকায় প্রবল বৃষ্টিপাত হত এবং এলাকাটি ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। এখানকার বিভিন্ন সিলে গন্ডার, হাতি, বাঘ, বাইসন, মােষ প্রকৃতি প্রভৃতি জীবজন্তুর ছবি উৎকীর্ণ আছে। এ থেকে বােঝা যায় যে, এই অঞ্চলে এইসব জীবজন্তু বাস করত। সাধারণত বৃষ্টিবহুল স্যাৎসেতে অঞ্চলে এইসব জীবজন্তু বসবাস করে। কালক্রমে নগর সভ্যতার সম্প্রসারণ এবং গৃহ নির্মাণের উদ্দেশ্যে পােড়া-ইট তৈরির জন্য ব্যাপক বৃক্ষচ্ছেদনের ফলে সমগ্র অঞ্চলটি বনশূন্য হয়ে পড়ে। এর ফলে এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে যায়। এর ফলশ্রুতি হিসেবে কৃষিকার্যের অবনতি ঘটে, নিকটবর্তী স্থানে মরুভূমি থাকায় এই অঞ্চলের শুষ্কতা বৃদ্ধি পায়, ভূগর্ভস্থ লবণ ধীরে ধীরে উপরে উঠে আসে এবং কালক্রমে স্থানটি উষর মরুভূমিতে পরিণত হয়। রাইকস, ডাইসন ও ফেয়ারসার্ভিস আবহতত্ত্ব, উদ্ভিদতত্ত্ব ও প্রাণীতত্ত্বের হিসেব-নিকেষ করে জানান যে, সিন্ধু অঞ্চলের আবহাওয়ায় এ ধরনের কোনও বড়াে পরিবর্তন ঘটে নি।

সিন্ধু নদের গতিপথ পরিবর্তন: অনেকের মতে, সিন্ধু ও তার শাখানদীগুলি এবং অন্যান্য নদ নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে এই সভ্যতার পতন ঘটে। সিন্ধুনদ তার গতিপথ পরিবর্তন করলে মহেঞ্জোদারাে বন্দর তার গুরুত্ব হারায়। জলাভাব ও শুষ্কতা বৃদ্ধির ফলে মহেঞ্জোদারাে ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহে কৃষিব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। খাল খনন করে হয়তাে এ সমস্যার সমাধান করা যেত, কিন্তু মহেঞ্জোদারােবাসী সে পথে অগ্রসর হয় নি—তারা সম্ভবত নগরটি ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায়। কেবলমাত্র সিন্ধুনদই নয়—শতদ্রু ও যমুনা নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়।

ভূমিকম্প তত্ত্ব: অনেকের মতে ভয়াবহ ভূমিকম্পের ফলে হরপ্পার নগরগুলি ধ্বংস হয়েছিল এবং সিন্ধু উপত্যকার নিকটবর্তী অঞ্চলই ছিল ভূমিকম্পের উৎসস্থল। তাদের যুক্তির সমর্থনে তারা মহেঞ্জোদারােতে প্রাপ্ত ইতস্তত বিক্ষিপ্ত মৃতদেহগুলির কথা বলে থাকেন। কঙ্কালগুলির গায়ে ক্ষতচিহ্ন সম্ভবত ভূমিকম্পের ফলে ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ার জন্যই মৃতদেহগুলির গায়ে ক্ষতচিহ্ন ছিল এবং মৃতদেহগুলির সৎকার করাও সম্ভব হয় নি। এই মতবাদ সর্বাংশে গ্রহণযােগ্য নয়, কারণ মহেঞ্জোদারাের ক্ষেত্রে এই মতবাদ প্রযােজ্য হলেও হরপ্পা সভ্যতার অন্যান্য নগরগুলির ক্ষেত্রে ভূমিকম্প তত্ত্ব খাটে না। ডঃ শঙ্খালিয়া প্রশ্ন তুলেছেন যে, মহেঞ্জোদারাে নগরটি ধ্বংস হলে তার অধিবাসীরা পর পর সাতবার তার পুনর্নির্মাণ করে থাকলে ভূমিকম্পের পর কেন তারা আর তার পুনর্নির্মাণ করল না?

বন্যাতত্ত্ব: রাইকস, ডেলস, আরনেস্ট ম্যাকে, এস. আর. রাও, সাহানী প্রমুখেরা হরপ্পা সভ্যতার পতনের কারণ হিসেবে বন্যার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। এম. আর. সাহানী-র মতে প্লাবন সিন্ধু-সংস্কৃতিকে ভাসিয়ে দেয়। রাইকস্ বলেন যে, সিন্ধু নদের জল অবরুদ্ধ হওয়ার ফলে ক্রমাগত বন্যা ও প্লাবন হচ্ছিল, এবং এর ফলেই সিন্ধু সভ্যতার বিলােপ ঘটেছিল। বন্যার প্রকোপ থেকে নিজেদের বাঁচাতে সিন্ধুবাসীরা ৪৩ ফুট একটা বাঁধ নির্মাণ করেছিল এবং দুর্গ সংলগ্ন পয়ঃপ্রণালী উচ্চতা ১৪ ফুট বাড়ানো হয়। তবে এধরনের বন্যার কোনো প্রমাণ নেয়।

বৃক্ষছেদন: হরপ্পাবাসীরা আগুনে পোড়ানো ইট দিয়ে বাড়ি নির্মাণ করেছিল। আর এই ইট পোড়াতে গিয়ে তারা যথেষ্ট ভাবে বনজঙ্গল কেটে ফেলেছিল। এর ফলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যায়। ফলে কৃষিকাজের চরম অবনতি ঘটে। বনজঙ্গল কেটে ফেলায় জঙ্গলের প্রাণীকুল নষ্ট হয়ে যায়।

বর্বর সংস্কৃতির প্রভাব: হরপ্পা সভ্যতায় লােকসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। বড়াে ঘরগুলি ছােটো ছােটো আকারে ভাগ করা হচ্ছিল। ইতিমধ্যে বিভিন্ন অনগ্রসর এলাকায় হরপ্পা সংস্কৃতির দ্রুত প্রসার লাভের ফলে ওইসব অঞ্চলের বর্বরতা এই সংস্কৃতিকে গ্রাস করে। এর ফলে হরপ্পা সংস্কৃতি মলিন ও জীর্ণ হয়ে পড়ে। এই মত এখনও অনুমানমাত্র—তবে সাধারণভাবে বলা চলে যে, এই সংস্থতির অবনতি এবং অবসানের জন্য অভ্যন্তরীণ কারণ যতটা দায়ী ছিল, বিদেশিদের আক্রমণ ততটা দায়ী ছিল না।

আর্য আক্রমণ: সিন্ধু উপত্যকায় খননকার্য চালিয়ে রান্নাঘর, কুয়াের ধার, রাস্তা প্রভৃতি স্থানে যত্রতত্র স্তুপীকৃত কঙ্কাল পাওয়া গেছে—যাদের মাথার পিছনে ভারী অস্ত্রাঘাতের চিহ্ন। এইসব মৃতদেহগুলির কোনও সৎকার হয় নি। অনেকে মনে করেন যে, রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধের ফলেই হরপ্পা সভ্যতার পতন ঘটেছিল, এবং বিভিন্ন স্থানে সৎকার না হওয়া স্তুপীকৃত মৃতদেহগুলি হল তারই প্রমাণ।

হুইলার, স্টুয়ার্ট পিগট, গর্ডন চাইন্ড, অলচিন-দম্পতি (ব্রিজে অলচিন ও রেমন্ড অলচিন) প্রমুখ মনে করেন যে আর্যদের আক্রমণের ফলে এই সভ্যতা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এই মতবাদের সমর্থনে কিছু যুক্তি হল - (১) ইতস্তত বিক্ষিপ্ত এবং মাথার খুলিতে আঘাতের চিহ্নসহ সৎকার না হওয়া স্তূপীকৃত মৃতদেহগুলি প্রমাণ করে যে, আকস্মিক আক্রমণের ফলে এইসব নগরবাসী নিহত হয়েছিল। পণ্ডিতদের মতে আর্যরাই ছিল আক্রমণকারী। (২) ভারতে আর্যদের আগমনকাল এবং হরপ্পা সভ্যতার ধ্বংসের সময় অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। এ দুটির সময়কাল আনুমানিক ১৫০০-১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। (৩) ঋগ্বেদে বর্ণিত হরিযুপীয়ার যুদ্ধ-কে হুইলার সহ অনেকেই হরপ্পার যুদ্ধ বলে মনে করেন। (৪) ঋগবেদ দেবরাজ ইন্দ্রকে পুরন্দর বা নগরের ধ্বংসকারী বলে অভিহিত করা হয়েছে। বলা বাহুল্য, আর্যদের আক্রমণকালে ভারতে হরপ্পা সভ্যতা ব্যতীত অপর কোনও নগর সভ্যতা ছিল না। (৫) চানহুদারাে, ঝুকর প্রভৃতি স্থানে তামা ও ব্রোঞ্জের তৈরি এক ধরনের ছোট ও লম্বা কুঠার পাওয়া গেছে। স্থানীয় কুঠারের সঙ্গে এর কোনও মিল নেই, বরং ইরানীয় কুঠারের সঙ্গে এর মিল আছে। যেহেতু আর্যরা ইরানের মধ্য দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিল, তাই এই কুঠারকে আর্যদের কুঠার বলে মনে করা হয়।

এই মতবাদের কিছু বিপক্ষে যুক্তি হল - (১) মহেঞ্জোদারােতে প্রাপ্ত কঙ্কালগুলি দ্বারা একমাত্র আর্য আক্রমণ প্রমাণিত হয় না। এর জন্য গৃহযুদ্ধ, প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রভৃতি কারণকেও দায়ী করা যায়। (২) আর্য আক্রমণে মহেঞ্জোদারাে ধ্বংস হলেও সিন্ধুর অন্যান্য শহরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের প্রমাণ নেই। (৩) আক্রমণকারীরা যে আর্য ছিল তাও নিশ্চিত করে বলা যায় না। ম্যাকের মতে আক্রমণকারীরা ছিল বেলুচিস্তানের অধিবাসী। সুতরাং আর্য আক্রমণ তত্ত্ব সর্বাংশে গ্রহণযােগ্য নয়।

উপসংহার: হরপ্পা সভ্যতার পতনের কোনো একটি কারণকে দায়ী করা যাবে না। তাই বলা যেতে পারে সিন্ধু বা হরপ্পা সভ্যতার উথানের ন্যয় পতনের কাহানি আজও রহস্যকৃত। R. S. Sharma বলেন, "At the end of this period it (Indus valley Culture) goes out of history practically unwept and unsung."
Advertisement