সিন্ধু সভ্যতার অবদান

- August 22, 2018
১৯২২ - ২৪ খ্রিস্টাব্দে বাঙালি প্রত্নতত্ত্ববিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, দয়ারাম সাহানি ও মার্শালের প্রচেষ্টায় সিন্ধু সভ্যতা আবিষ্কৃত হয়েছিল। ১৫০০-১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দর পরে হরপ্পা সভ্যতা পতন ঘটেছিল, কিন্তু এই সভ্যতার পতনের সঙ্গে সঙ্গে হরপ্পা সভ্যতার সব শেষ হয়ে যায় নি। পরবর্তীকালে ভারতীয় সভ্যতার শিল্পে, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, সমাজ ও ধর্মীয় জীবনের উপর তার গভীর প্রভাব ফেলে। হরপ্পা সভ্যতা ভারতের প্রাচীনতম সভ্যতা। এর শহর সভ্যতা, সড়ক, শহর পরিকল্পনা সমসাময়িক বিশ্বের বিস্ময়কর ছিল।
ভারতীয় সংস্কৃতিতে হরপ্পা সভ্যতার অবদান
(১) ড. পুসালকার বলেন যে, সিন্ধু সভ্যতার পরবর্তীকালে ছাপ দেওয়া মুদ্রা সিন্ধু সভ্যতাকালের ছাপ দেওয়া সিলের অনুকরণে তৈরি হয়। প্রাচীন ভারতীয় মুদ্রার ছাচ ও কাঠামোর জন্য ভারতবাসী সিন্ধু সভ্যতার কাছে ঋণী। মাপ ও ওজনের জন্য ভারতের মানুষ সিন্ধু সভ্যতার কাছে ঋণী।

(২) হিন্দুধর্ম মূর্তিপূজা, প্রতীক উপাসনা, শিব ও লিঙ্গপুজা, বলিদান প্রথা, বৃশের প্রতি ভক্তি, প্রকৃতিপুজা, বৃক্ষপূজা, পশুপূজা, মাত্তৃপুজা, শস্যফলন পূজা প্রভূতি হরপ্পা সভ্যতার অবদান।

(৩) মহেঞ্জোদারোর ও হরপ্পার মৃৎপাত্র এবং টেরাকোটার আকার, কাঠামোর এবং অলংকরণ খ্রিস্ট জন্মের কয়েক শতাব্দী পূর্বে পাঞ্জাব ও উত্তর পশ্চিম সীমান্তের টেরাকোটা ও মৃৎপাত্র পাওয়া যায়।

(৪) মহেঞ্জোদারোর বিরাট স্নানাগার, পোড়া ইটের তৈরি অট্টালিকা, স্তম্ভযুক্ত বড়ো হলঘর, জল ব্যবস্থাপনা এবং ম্যানহোল সিস্টেমের বাজার হরপ্পা যুগে ব্যবহার করা হয়েছিল, এছাড়া স্থাপত্য শিল্প প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্যর গৌরবময় নিদর্শন।

(৫) সিন্ধু সভ্যতায় ব্যবহৃত তামা রূপা, ব্রোঞ্জ ও সোনা প্রভূতি ধাতুর তৈরি বিভিন্ন শিল্প সৃষ্টি পরবর্তী ভারতীয় হিন্দু শিল্পীরীতিকে প্রভাবিত করেছে।

(৬) সামাজিক জীবনের বৈশিষ্ট্যগুলি যথা, দৈনন্দিন জীবনধারা, প্রসাধন সামগ্রী, খাদ্য সামগ্রী (ধান, গম, যব, বার্লি, ছোলা, মাছ, মাংস ও নানা ধরনের তৈলবীজ) প্রভূতি পরবর্তীকালের জীবনধারার উপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিল।

(৭) মৃৎশিল্পীর চক্র, মাটির পাত্রে চিত্রাঙ্কন, পোড়া মাটির তৈরি খেলনা প্রভূতি অনেক বৈশিষ্ট্য পরবর্তীকালের সভ্যতায় দেখা যায়। হাতির দাঁতের উপর শিল্পকাজ সিন্ধু সভ্যতার অবদান।

(৮) আজ সকলেই এক বাক্যে স্বীকার করেন যে ভারতীয় সভ্যতা প্রাচীন সুমেরীয়, মিশরীয় বা ব্যাবিলনীয় সভ্যতার সমকালীন। “India can now lay claim to the honour of being pioneer civilization along with Sumer, Babylon, Egypt and Assyria.”

(৯) মিশর, সুমেরু দেশের অধিবাসীদের সঙ্গে সিন্ধু সভ্যতার যােগাযােগ ছিল। মেসােপটেমিয়া সভ্যতার অঞলে সিন্ধু সভ্যতার অনুরূপ সিলমােহর পাওয়া গেছে তা থেকে এরূপ সিদ্ধান্ত করা অযৌক্তিক নয়।

(১০) সিন্ধু সভ্যতার আবিষ্কারের ফলে ভারতের ইতিহাস যে অন্তত খ্রিস্টপূর্ব তিন থেকে আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন তা প্রমাণিত হয়েছে। আরও প্রমাণিত হয় যে ভারতবর্ষ পৃথিবীর সুপ্রাচীন দেশগুলির অন্যতম।

(১১) প্রাক বৈদিক যুগ থেকে যে এদেশের নিরবচ্ছিন্ন ইতিহাস আরম্ভ হয়েছে — নিঃসন্দেহে এটি একটি মূল্যবান ঐতিহাসিক তথ্য।

(১২) দৈনন্দিন ব্যবহুত দ্রব্য, মূর্তি, অস্ত্রশস্ত্র, পাত্র, অলংকার ইত্যাদি শ্রমিক, কৃষক ও কারিগরদের নৈপুণ্যের পরিচয় দেয়।

(১৩) প্রাক আর্য যুগে ভারতবাসীরা ছিল অসভ্য ও বর্বর, আর্যদের সংস্পর্শে এসেই তারা প্রথম সুসভ্য হয়ে উঠে, এ ধারণা যে কত ভ্রান্ত তা সিন্ধু সভ্যতার আবিষ্কারের ফলে প্রমাণিত হয়েছে।

গ্রন্থপঞ্জী:
1. জীবন মুখোপাধ্যায় - ভারতের ইতিহাস
2. Basham - The Wonder That was India
3. D.N. Jha - Early India: A Concise History