হরপ্পা সভ্যতার বৈশিষ্ট্য ও রূপ

- August 30, 2018
প্রাচীন যুগে নদীর তীরে সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। যেমন নীলনদের উপর গড়ে উঠেছিল মিশর সভ্যতা, টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরে মেসােপটেমিয়া সভ্যতা, টাইবার নদীর তীরে ইতালীয় সভ্যতা, হােয়াংহাে নদীর তীরে চিনের সভ্যতা, তেমনি ভারতবর্যে গঙ্গা নদীর তীরে গাঙ্গেয় সভ্যতা ও সিন্ধুনদের তীরে গড়ে উঠেছিল সিন্ধু সভ্যতা। হরপ্পা সভ্যতার বৈশিষ্ট্যগুলি নিচে আলোচনা করা হল।
হরপ্পা সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ
নগর পরিকল্পনা ও পেীর জীবন: সিন্ধু তথা হরপ্পা সভ্যতার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল ছিল নগরকেন্দ্রিক। প্রত্নতাত্ত্বিকগণ মহেঞ্জোদারোতে এক বিশাল ও সুগঠিত নগরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেছেন। মহেঞ্জোদারো নগরটি ছিল উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিমে সমভাবে বিভক্ত। নগরের রাস্তাগুলি সােজা, প্রস্থে ৯ ফুট থেকে ৩৫ ফুট এবং দৈর্ঘ্যে কোনাে কোনাে ক্ষেত্রে আধ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। রাস্তার উভয় পার্শ্বে বাড়িঘরগুলি ছিল সুবিন্যস্ত। পয়ঃপ্রণালীর বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থা ছিল। আলােকস্তম্ভ দ্বারা পথ আলােকিত করার ব্যবস্থা ছিল। হরপ্পাতে রাস্তা, গলি, ইটের বাড়ি, স্নানাগার, শস্যাগার, পয়ঃপ্রণালী, কুপ ইত্যাদি পাওয়া গেছে। হরপ্পার রাস্তাঘাট, বাসগৃহ ইত্যাদির বিন্যাস দেখে মনে হয় নগরটি সুপরিকল্পিত ছিল। মহেঞ্জোদারোতে শস্যগার ও স্নানাগার পাওয়া গেছে। পানীয় জলেও ব্যবস্থা ছিল।

রাজনৈতিক জীবন: সিন্ধু সভ্যতার মানুষদের রাজনৈতিক জীবন সম্বন্ধে তেমন কোনাে তথ্য পাওয়া যায়নি। অনুমিত হয় যে, এই শহরগুলিতে বণিক শাসিত অভিজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল অথবা হয়ত পুরােহিতরা এদের শাসন করত। তবে নাগরিকদের সুখসুবিধা লক্ষ্য করার জন্য যে এটি নগর পরিষদ ছিল নিঃসন্দেহে বলা যায়। ঐতিহাসিক S. K. Saraswati বলেন, “সিন্ধু উপত্যকার নগরগুলিৱ সংগঠন দেখে মনে হয় যে সেখানে একই রকমের শক্তিশালী ও কেন্দ্রীয় প্রশাসন ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল এবং এই প্রশাসন জনগণের জীবনষত্র নিয়ন্ত্রণ করত।"

অর্থনৈতিক জীবন: সিন্ধু সভ্যতার ব্যাবসা বাণিজ্য বেশ উন্নত ও সমৃদ্ধ ছিল। সিন্ধু উপত্যকায় অর্থনৈতিক জীবন কৃষি, পশুপালন ও ব্যাবসা বাণিজ্যর উপর বহুল পরিমাণে নির্ভরশীল ছিল। তখনকার লােকেরা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে যথা — দক্ষিণ ও পূর্ব ভারত, কাশ্মীর, মহীশূর শুধু ব্যবসাবাণিজ্য করত না, তারা আফগানিস্তান, বেলুচিস্তান, পারস্য, ইরাক, ইরান প্রভৃতি দেশের সঙ্গেও ব্যাবসাবাণিজ্য চালাত। জলপথে ও স্থলপথে বাণিজ্য চলত। বিভিন্ন ধরনের নৌকা ও জাহাজের ধ্বংসাবশেষ থেকে এ ধারণা জন্মে। বেলুচিস্তানে গরুর গাড়িতে মাল যেত। বিদেশ থেকে আমদানি করা হত তামা, টিন ও দামি পাথর ইত্যাদি। এখানে প্রায় পাঁচশাের অধিক সিলমােহর পাওয়া গেছে। যে সমস্ত সিলমােহর পাওয়া গেছে সেগুলি সম্ভবত মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হত। সিন্ধু উপত্যকা থেকে মেসােপটেমিয়া পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে একই ধরনের সিলমােহর যথেষ্ট সংখ্যা পাওয়া গেছে। ওজন ও পরিমাপের জন্য সম্ভবত কিউবিক প্রথার প্রচলন ছিল।

শিল্পকলা: সিন্ধুবাসীগণ বিভিন্ন শিল্পকর্মে দক্ষ ছিল বলে মনে করা হয়। সিন্ধু সভ্যতার ধাতুশিল্প ও মৃৎশিল্পের যথেষ্ট বিকাশ ঘটেছিল। ধাতুর মধ্যে তামা ও ব্রোঞ্জ ছিল প্রধান। মহেঞ্জোদারো স্থাপত্যকলা খুবই সাধারণ, সরল এবং বাস্তব প্রয়ােজনভিত্তিক ছিল। সিন্ধু সভ্যতার শিল্প নিদর্শন পাওয়া যায় বিভিন্ন মূর্তিতে, সিলমােহর ও অন্যান্য জিনিসে। প্রাপ্ত মুর্তির মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযােগ্য ছিল নৃত্যরতা এক নারীর মূর্তি। মাটির পাত্রে বিচিত্র অঙ্গসজ্জিত, সিলমােহরে ক্ষোদিত নানা তীবজন্তুর চিত্র তাদের অপূর্ব শিল্প চাতুর্যের ও সৌন্দর্যবােধের পরিচয় দেয়। বয়নশিল্প, মৃৎশিল্পে তারা বিশেষ উন্নত ছিল। পলিমাটির সঙ্গে বালি মিশিয়ে চাকায় ঘুরিয়ে তারা মাটির জিনিস তৈরি করত। সিলমােহর নির্মাণেও তারা যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিল। নানা আকারে সিল সাধারণত নরম মাটি, হাতির দাঁত ইত্যাদি দিয়ে তৈরি হত। কর্মকার, স্বর্ণকার, সুত্রধর, তন্তুবায়, রাজমিস্ত্রি প্রভৃতি বৃত্তিজীবিদের শিল্পক্ষেত্রে বিশিষ্ট স্থান ছিল।

ধর্মীয় জীবন: ধ্বংসাবশেষে এ সময়কার ধর্মীয় বাতাবরণ ও ধর্ম সম্পর্কে কোনাে প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে সিন্ধু সভ্যতার সম্পর্কে ধারণা করার উৎস হল বিভিন্ন সিলমােহর ও মূর্তি ইত্যাদি। ভূগর্ভ থেকে দেবপূজার জন্য কোনাে মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত এ হয়নি। বিভিন্ন মূর্তি ও সিলমােহর দেখে মনে হয় তখনকার লােকেরা শিব ও দুর্গার কোনাে দেবদেবীর উপাসনা করতেন। হরপ্পার একটি সিলে নবরলির চিহ্ন ধরা পড়েছে। একটি সিলমােহরে তিনটি মস্তক বিশিষ্ট ধ্যানমগ্ন এক যোগী পুরুষের মুর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। একে ঘিরে পাঁচটি পশু-হাতি, বাঘ, গন্ডার, মহিষ ও হরিণ। অনুমান করা হয়েছে যে, সম্ভবত ইনি হলেন পশুপতি মহাদেব। আবার ঠিক শিবলিঙ্গের আকারে প্রস্তরখণ্ডও আবিষ্কৃত হয়েছে। এতে মনে হয় তখন লিঙ্গ পূজা হত। এখানকার অধিবাসীরা ষাঁড়, কুমির, সর্প প্রভৃতি জীবজন্তুকে দেবতা হিসেবে পূজা করত। আবার গাছপালা, জল, আগুনও পূজিত হত। পূজানুষ্ঠানে যজ্ঞ করা হত।

সামাজিক জীবন: সিন্ধু সভ্যতার সমাজ সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায়নি। তবে বিভিন্ন ধরণের ঘরবাড়িতে পাওয়া জিনিসপত্রের ভিত্তিতে সামাজিক শ্রেণীভেদের পরিচয় পাওয়া যায়। সম্ভবত প্রাচীর দ্বারা ঘেরা দুর্গ এবং বৃহৎ শস্যগার শাসক শ্রেণির অস্তিত্বের প্রমাণ দেয়। আর বড় বড় বাড়িতে যেখানে বেশী পরিমাণ ধনসম্পদের চিহ্ন আছে সেগুলাে বিত্তবান শ্রেণির, আর সারিবদ্ধ কুটিরগুলি শ্রমিক শ্রেণির ইঙ্গিত দেয়। তাই বলা যায় সিন্ধু উপত্যকার সমাজে ধনী পুরােহিত, মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ী, কারিগর, শ্রমিকশ্রেণি ছিল।

হরপ্পা সভ্যতার ব্যবসা বাণিজ্য: সিন্ধু সভ্যতায় নগরবাসীদের অন্যতম জীবিকাই ছিল ব্যবসা বাণিজ্য। এই যুগের ব্যবসায়ীরা নিজেদের এলাকার বাইরে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় যেমন ব্যবসা বাণিজ্য করত, তেমনি আবার দূরপাল্লায় বাণিজ্য করত। জলপথ ও স্থলপথেও তারা আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করত। হরপ্পার বণিকদের সাথে মিশর, ব্যাবিলন, পারস্য, বেলুচিস্তান, আফগানিস্তান, রাজস্থান, মহীশূর, কাশ্মীর, গুজরাট, নীলগিরি প্রভৃতি স্থানের সঙ্গে তাদের বাণিজ্য চলত। সম্ভবত পণ্য বিনিময়ের দ্বারাই বাণিজ্য চলত। সুতিবস্ত্র, নীলকান্ত পাথর, মণিমুত্তা, খাদ্যশস্য, ময়ূর, হাতির দাঁত, কাঠ ইত্যাদি।

সিন্ধু সভ্যতার নারীমুর্তি: সিন্ধু উপত্যকায় প্রাপ্ত অসংখ্য অর্ধ-নগ্ন দন্ডায়মান নারীমূর্তির ভিঞ্চিতে পণ্ডিতরা মনে করেন সেখানকার মানুষ মাতৃদেবীর আরাধনা করত। মুর্তির দেহে ধোঁয়ার চিহ্ন দেখে পণ্ডিতরা মনে করুন ধূপ, দীপ সহকারে পূজা অর্চনা করা হত। একটি নারী মুক্তির কোমরে হাত ও উখিত পদ দেখে পণ্ডিত মনে করেন সেকালের মেয়েরা নৃত্যচর্চা করত।

সিন্ধু সভ্যতার সীলমোহর: সিন্ধু সভ্যতায় কিছু অক্ষর বিশিষ্ট শীলমােহর পাওয়া গেছে। এদের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। এছাড়া পশুর প্রতিচ্ছবি বিশিষ্ট কতকগুলি তাম্রপাত্রও পাওয়া গেছে। এতে প্রায় ২৭০ ধরণের অক্ষর বা হরফ প্রচলিত ছিল। যার সচিত্র লেখন অনেকটা মিশরের হাইরােগ্লিফিক লেখার মতো। এগুলি সম্ভবত ব্যক্তি বিশেষের নাম বা সম্পত্তির নির্দেশ করে। কোনাে কোনাে শীলে স্বস্থিকা চিহ্ন, ছাগল, বাঘ, হাতি প্রকৃতি জীবজন্তুর প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। ভাষাতত্তের দিক থেকে এই শীলমােহরগুলি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এগুলি ছিল সেইযুগের জনগণের বর্ণমালা ও হস্তলিপি।