হরপ্পা সভ্যতা বা সিন্ধু সভ্যতার ইতিহাস।

author photo
- Thursday, August 30, 2018
advertise here

হরপ্পা বা সিন্ধু সভ্যতার বৈশিষ্ট্য[Feature of Harappan or Indus Valley Civilization]

*** মেসোপটেমিয়া, ব্যাবিলন, মিশর, চীন প্রভুতি বিশ্বের প্রাচীনতম সভ্যতার মত, হরপ্পা বা সিন্ধু সভ্যতা ছিল নদীমাতৃক সভ্যতা। হরপ্পা সভ্যতা গড়ে উঠেছে সিন্ধু নদকে কেন্দ্র করে। এ যুগের মানুষ লোহার ব্যবহার জানত না। এরা ব্রোঞ্জ ও তামার ব্যবহার করত, তাই এই সভ্যতাকে তাম্র প্রস্তর যুগের সভ্যতা বলে। এছাড়া এই যুগের লিপি পাঠ করা সম্ভব হয়নি, তাই এই যুগকে প্রাগৈতিহাসিক সভ্যতা বলা হয়।
Read: হরপ্পা সভ্যতার পতনের পরিবেশগত কারণ।

হরপ্পা সভ্যতার বিস্তার বা নিদর্শন[Expansion or patterns]:

*** এই সভ্যতা সিন্ধু উপত্যকায় সীমাবদ্ধ ছিল না। পাঞ্জাবের কিছু অংশ, সিন্ধু প্রদেশে, বেলুচিস্তান, গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ এই সভ্যতা বিস্তৃত ছিল। এই সভ্যতার পরিধি উত্তরে জম্মু থেকে দক্ষিণে নর্মদা নদী, পশ্চিমের বেলুচিস্তানের মাকরান উপকূল থেকে উত্তর পূর্বে মিরাট পর্যন্ত। হরপ্পা সভ্যতার মধ্যে ৬টি কেন্দ্র আবিষ্কার হয়েছে। যথা, পাঞ্জাবের হরপ্পা, সিন্ধু প্রদেশের মহেঞ্জোদারো, চানহুদারো, গুজরাটের লোথাল, রাজস্থানের কলিবঙ্গান ও হরিয়ানার বনওয়ালি। এছাড়াও অন্যান্য কোটদিজি, রূপার, আলমগীরপুর রংপুর, রজদি, সুরকোট্রা প্রভুতি স্থানে জীবনের নিদর্শন আবিষ্কার হয়েছে
পড়ুন: হরপ্পা বা সিন্ধু সভ্যতার পতনের কারণ।

হরপ্পা বা সিন্ধু সভ্যতার নগর পরিকল্পনা/নাগরিক জীবন/বৈশিষ্ট্য[Citizen Planning]:

***সিন্ধু সভ্যতা ছিল নগরকেন্দ্রিক। শহরগুলির দুটি এলাকা ছিল উচু এবং নিচু এলাকা। মহেঞ্জোদারো শহরটি পশ্চিম দিকে প্রায় ৪০ ফুট উচু একটি দুর্গ ছিল। এই অঞ্চলে শাসকদের বাস ছিল। দুর্গ অঞ্চলেই সর্বসাধারণের ব্যবহার যোগ্য একটি বিরাট বাধানো স্নানাগার ছিল। তার আয়তন দৈর্ঘ্য ১৮০ ফুট ও প্রস্ত ১০৮ ফুট এবং ৮ ফুট ইটের দেয়াল। এর কেন্দ্রস্থলে রয়েছে জলাশয়। জলাশয়ের নোংরা জল নিকাশ ও তাতে পরিষ্কার জল পূর্ণ করার ব্যবস্থা ছিল। ঋতু ভেদে জল গরম ও ঠান্ডা করার ব্যবস্থা ছিল। এই জলাধারের তিনদিকে ছিল বারান্দা ও একদিকে ছিল ছোট ছোট কিছু ঘর। ড:রামসরণ শর্মার মতে, স্নানের পর পোশাক পরিবর্তনের জন্য ঘরগুলি ব্যবহৃত হত। অপরদিকে ড: কসম্বি এই ঘরগুলি কে পতিতাদের বাসস্থান বলেন। হুইলার মনে করেন, স্নানাগারটি ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ব্যবহার হত এবং এর পাশের ঘরগুলি ছিল পুরোহিতদের। এরই পাশে ছিল একটি কেন্দ্রীয় শষ্যাগার। এর আয়তন ছিল দৈর্ঘ্য 200×150 ফুট। এখানে ফসল ঝারাই মারাই হত। এর পাশেই ছিল শ্রমিকদের ঘর। ড: এ. এল.ব্যাসম এটিকে রাষ্ট্রিয় ব্যাংকের সঙ্গে তুলনা করেন।
Read: প্রাচীন ভারত ইতিহাসের প্রত্নতাত্বিক উপাদান গুলির গুরুত্ব।
*** হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো এই দুটি শহরের আয়তন প্রায় এক বর্গমাইল। নগরের উত্তর থেকে দক্ষিণ এবং পুর্ব থেকে পশ্চিম দিকে রাস্তা গুলি গেছে। এগুলি ৯ থেকে ৩৪ ফুট চওড়া। এই রাস্তাগুলি থেকে বেরিয়ে এসেছে অসংখ্য গলি। গলিগুলির দুপাশে নাগরিকদের ঘরবাড়ি, বাড়ি গুলি পুড়া ইটের তৈরি। প্রত্যেক বাড়িতে প্রশস্ত উঠান, স্নানাগার, নর্দমার ব্যাবস্থা ছিল। ম্যানহোলের ব্যবস্থা ছিল। রক্ষণশীলতা বা ঐতিহ্যর প্রতি শ্রদ্ধা হরপ্পা বা সিন্ধু সভ্যতার প্রধান বৈশিষ্ট্য।

Read: প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের উপাদান।

রাজনৈতিক জীবন/বৈশিষ্ট্য[Political Life]:

*** বিরাট এলাকাজুড়ে একই ধরনের ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, হস্তলিপি, নগর পরিকল্পনা, ওজন, মাপ দেখে পণ্ডিতরা মনে করেন যে, এখানে একটি কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা ছিল। ড: এস.ক .সরস্বতী বলেন যে, হরপ্পার নগর গুলি সংগঠন দেখে মনে হয় যে, এই প্রশাসন জনগণের জীবন নিয়ন্ত্রণ করতো। হুইলার মনে করেন যে, সিন্ধু অঞ্চল ছিল একটি সাম্রাজ্য এবং এখানে একটি ধর্মশ্রয়ী শাসনব্যবস্থা ছিল। এর কেন্দ্রে ছিল একজন পুরোহিত-রাজা। তিনি দৈব অধিকারের জোরে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন।এখনকার কেন্দ্রীয় শাসন ছিল শক্তিশালী। এইচ. ডি. সঙ্খালিয়া মতে, এখানকার কেন্দ্রীয় শাসন ছিল একজন উদারনৈতিক শাসকের হতে।
পড়ুন: প্রাচীন ভারতের নব্য প্রস্তর যুগের সময়সীমা ও বৈশিষ্ট্য।


সামাজিক জীবন/বৈশিষ্ট্য[Social Life]:

শ্রেণীবিভক্ত সমাজের অস্থিত্ব হরপ্পা সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শহরের ঘরবাড়ি ও অন্যান্য উপকরণ দেখে মনে হয় যে সমাজে শাসশ্রেণী, ধনী ও ব্যবসায়ী এবং দরিদ্র শ্রমিক ও কারিগররা বাস করত। শ্রেণীবন্যাস এই নগর কেন্দ্রিক সভ্যতার মূল ভিত্তি ছিল কৃষি। সিন্ধু নদের বন্যায় কৃষি জমি ছিল উর্বর। এখনকার অধিবাসীরা গম, বার্লি, ভাত, ফলমূল, তিল, মটর, রাই, মুরগি, গরু ও পাখির মাংস, দুধ, মাছ ও ডিম খাদ্য হিসাবে খেত। গৃহপালিত পশুর মধ্যে ছিল গরু, মহিষ, ভেড়া, উট, হাতি ও ছাগল।
Read: প্রাচীন ও মধ্য প্রস্তর যুগের হাতিয়ার, জীবনধারা ও বৈশিষ্ট্য।
*** সিন্ধুবাসী সুতি ও পসমের বস্ত্র ব্যবহার করত। তাদের দেহের ঊর্ধ্বাংশ ও নিম্নাঙ্গ দুই খণ্ড বস্ত্র দ্বারা আবৃত থাকত। নারী পুরুষ দুজনেই লম্বা চুল রাখত। মেয়েরা নানা ধরনের খোঁপা পড়ত। তারা নানাধরনের প্রসাধন সামগ্রী সুগন্ধি এবং তামা, ব্রোঞ্জ, সোনা, রূপা ও পাথরের তৈরি নানা ধরনের ও নানা আকারের অলঙ্কার তৈরি করত। পাথর, মাটি, তামা, সীসা, ব্রোঞ্জ ও কাঠের তৈরি বাসনপত্র ও গৃহস্থালির টুকিটাকি জিনিস আবিষ্কার করে। সিন্ধু উপত্যকায় পোড়ামাটি, তামা ও ব্রোঞ্জ এর সিল আবিষ্কার হয়।
পড়ুন: প্রাক হরপ্পা যুগের মেহেরগড় সভ্যতার।

অর্থনৈতিক জীবন/বৈশিষ্ট্য[Economic Life]:

*** হরপ্পা সভ্যতার আর্থিক উন্নতির উৎস ছিল কৃষি, শিল্প ও ব্যাবসা বানিজ্য। বৃষ্টিপাত ও বন্যার জলে চাষাবাদ হত। এখানে চাষ হত গম, তুলো, তিল, ধান। লোথাল ও রংপুরে ধানের সন্ধান পাওয়া গেছে। হরপ্পা সভ্যতার শিল্প হল বয়ন, প্রস্তর, ধাতু, মৃৎ, ইট শিল্প প্রভুতি। বস্ত্রবয়ন ছিল হরপ্পার প্রধান শিল্প।রবিশস্য হিসাবে গম চাষ হত। খারিপসস্য হল তুলো ও তিল চাষ হত। পৃথিবীতে ধানের চাষ সিন্ধু উপত্যকা প্রথম শুরু হয়মুরগি পালন হয় সিন্ধু উপত্যকায়। তুলোর চাষ সর্বপ্রথম এখানেই। এরা লাঙলের ব্যবহার জানত না। কলিবঙ্গণে প্রাক হরপ্পা যুগের লাঙলের সন্ধান পাওয়া যায়।

Read: ভারতের ইতিহাস পরীক্ষার ছোটো প্রশ্ন ও উত্তর।



*** স্থল ও জল দুই পথে হরপ্পা বাসী বানিজ্য করত। হিমালয় থেকে দেবদারু কাঠ, কর্ণাটক থেকে সোনা, দক্ষিণ ভারত থেকে সীসা আসত। ভারতের বাইরে বেলুচিস্তান আফগানিস্থান থেকে আমদানি হত সোনা, রূপা, সীসা। সিন্ধু উপত্যকা থেকে রপ্তানি হত সুটিবস্ত্র, তুলো, তামা, হাতির দাঁতের তৈরি নানা জিনিস। আক্কাদের প্রাচীন লিপী তে বলা হয়েছে যে, সিন্ধুর বণিকরা দিলমুন, মাগান ও মেলুহা অঞ্চলে বানিজ্য করতে যেত। অনেকে বাহরাইন ও কুয়েত অঞ্চলকে দিল্মুন বলে মনে করেন। লোথাল হল বিশ্বের প্রাচীনতম বন্দর ও পোতাশ্রয়। মুদ্রার প্রচলন হয়নি। বিনিময় প্রথার মাধ্যমে বানিজ্য চলত। সিন্ধু বাসী দুচাকা বিশিষ্ট ঠেলাগাড়ি এবং গরু ও গাধাই টানা টানা গাড়ি ব্যবহার করত। কিছু সিল নৌকা, মাঝি, মস্তল ও জাহাজের ছবি আছে। ওজন, মাপ ও অন্যান্য ব্যাপারে সিন্ধু বাসী যথেষ্ট দক্ষ ছিল। এই অঞ্চল থেকে পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সুতিবস্ত্র রপ্তানি করা হত।
পড়ুন: প্রাচীন ভারতের লৌহ যুগের বিস্তার ও বৈশিষ্ট্য।

ধর্মীয় জীবন/বৈশিষ্ট্য[Religion Life]:

*** সিন্ধু বা হরপ্পা সভ্যতায় মন্দিরের অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্ধেহ আছে। সিন্ধু উপত্যকার খননকার্য ফলে প্রচুর অর্ধনগ্ন নারীমূর্তি পাওয়া গেছে। মূর্তিগুলিতে ধোঁয়ার চিহ্ন দেখা যায়। এবং একটি সিলে নরবলির চিহ্ন দেখা যায়। তবে এই মাত্তৃদেবী কুমারী, না কোনো পুরুষ দেবতার স্ত্রী এটা বলা শক্ত। এখানে মাতৃদেবীর পূজা প্রচলিত ছিল। এখানে শিব মূর্তির অস্তিত্ব ছিল। যাকে আদি শিব বলা হত। হরপ্পা বাসীদের মধ্যে বৃক্ষ, আগুন, জল, সাপ, বিভিন্ন জীবজন্তু, লিঙ্গ ও যোনির পূজা করা হত। কয়েকটি সিলে সূর্যের প্রতীক স্বস্তিকা ও চক্র পাওয়া গেছে। একটি সিলে বাঘ, হাতি, গন্ডার, মোষ,ও হরিণ - এই ৫ টি পশুর দ্বারা নির্মিত যোগী মূর্তি দেখা যায়। অধ্যাপক ব্যাসম এটিকে আদি শিব বলে অভিহিত করেন। তারা মৃত ব্যক্তি কে কবর দিত। এখানে ৫৭ টি কবর পাওয়া গেছে। সমাধি ছিল তিন ধরনের। অনেকের মতে কবরের এই ভেদাভেদ শ্রেণীবিন্যাস এর পরিচয়। তারা পরলোকে বিশ্বাসী ছিলেন।
Advertisement advertise here