হরপ্পা সভ্যতা ও বৈদিক সভ্যতার সম্পর্ক কেমন ছিল?

অনেকের মতে হরপ্পা সভ্যতা ও বৈদিক সভ্যতার সম্পর্ক এক ও অভিন্ন এবং তাদের মধ্যে ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। ভারতবর্ষই হল আর্যদের বাসভূমি এবং বৈদিক সভ্যতা হল হরপ্পা সভ্যতারই অঙ্গ। এইসব ঐতিহাসিকদের মতে এই দুই সভ্যতার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।

হরপ্পা সভ্যতা ও বৈদিক সভ্যতার সাদৃশ্য

(১) হরপ্পাবাসী ও আর্যদের খাদ্য ও পোশাক – পরিচ্ছদ ছিল একই ধরনের। উভয়েই ধুতি ও চাদর জাতীয় বস্ত্র ব্যবহার করত। খাদ্য হিসেবে উভয়ক্ষেত্রেই গম, যব, ছাতু প্রভূতির ব্যবহার প্রচলিত ছিল। বৈদিক যুগের নারীদের কেশবিন্যাস ছিল চেষ্টা হরপ্পা সভ্যতার মতােই। উভয়েই একই ধরনের অলঙ্কার ব্যবহার করত।
(২) উভয় সভ্যতাতেই একই ধরনের জীবজন্তু অর্থাৎ ছাগল, ভেড়া, কুকুর, মহিষ প্রভৃতির অস্তিত্ব দেখা যায়।
(৩) উভয় সভ্যতাতেই তুলাের চাষ, সুতাে তৈরি ও বস্ত্রবয়ন প্রচলিত ছিল।
(৪) সিন্ধু উপত্যকায় আর্যদের কিছু কঙ্কাল মিলেছে । এ থেকে বােঝা যায় যে, দুই সভ্যতার মধ্যে পারস্পরিক যােগাযােগ ছিল।
(৫) বৈদিক দেবতা রুদ্র, অদিতি ও পৃথিবী হল হরপ্পা সভ্যতার শিব ও শক্তির প্রতিচ্ছবি।
(৬) হরপ্পা সভ্যতার চিত্রলিপি ব্রাহ্মীলিপির আদি রূপ, যা পরে সংস্কৃত ভাষায় পরিণত হয়।

হরপ্পা সভ্যতা ও বৈদিক সভ্যতার বৈসাদৃশ্য

অপরপক্ষে, স্যার জন মার্শাল বলেন যে, হরপ্পা সভ্যতা আর্য সভ্যতা অপেক্ষা প্রাচীন ও পৃথকধর্মী।
(১) হরপ্পা সভ্যতা মুলত ভারতের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে গড়ে ওঠে এবং পরে তার প্রভাব গাঙ্গেয় সমভূমি ও দক্ষিণে কিছুটা বিস্তৃত হয়। অপরদিকে আর্য সভ্যতার বিস্তার হয় সারা ভারতে।
(২) হরপ্পা সভ্যতা নগরকেন্দ্রিক, কিন্তু আর্য সভ্যতা গ্রামীণ। আর্যদের ঘরবাড়ি ছিল বাঁশ ও খড়ের তৈরি। অপরপক্ষে হরপ্পা সভ্যতার অধিবাসীরা পােড়া ইটের তৈরি বহুতল গৃহে বাস করত। হরপ্পার প্রশস্ত রাজপথ, উন্নত পয়ঃপ্রণালী ও স্নানাগার সমৃদ্ধ নগর জীবনের সাক্ষ্য বহন করে।
(৩) হরপ্পা সভ্যতা ছিল তামা ও ব্রোঞ্জ যুগের সভ্যতা। এই যুগে লােহার ব্যবহার শুরু হয় নি। অপরপক্ষে, বৈদিক সভ্যতা ছিল লৌহ যুগের সভ্যতা। আর্যরা লােহার হাতিয়ার নিয়েই ভারতের উপর ঝাপিয়ে পড়েছিল।
(৪) হরপ্পা সভ্যতায় ঘােড়া প্রায়-অজ্ঞাত ছিল। হরপ্পা নগর সভ্যতায় কেবলমাত্র একটি ক্ষেত্রে এবং একেবারে উপরের স্তরে ঘােড়ার কঙ্কাল আবিষ্কৃত হয়েছে। হরপ্পা সভ্যতায় ঘোড়া খুব একটা পরিচিত ছিলনা। অপরপক্ষে, আর্যদের কাছে ঘােড়া ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী। তারা ঘােড়ায় চেপে যুদ্ধ করত এবং ঘােড়ায় টানা রথে চড়ত।
(৫) হরপ্পা সভ্যতায় লিখনরীতি সুপ্রচলিত ছিল। বিভিন্ন সিলের উপর সেই লিপি উৎকীর্ণ আছে। অপরপক্ষে, বৈদিক সভ্যতায় লিখন প্রণালীর প্রচলন হয় নি।
(৬) হরপ্পার অর্থনীতিতে শিল্প-বাণিজ্য ছিল প্রধান। আর্য অর্থনীতি ছিল পশুপালন ও কৃষিনির্ভর।
(৭) উভয় সভ্যতার পূজাপদ্ধতিতেও যথেষ্ট পার্থক্য ছিল। হরপ্পা সভ্যতায় মন্দিরের অস্তিত্ব সম্পর্কে সংশয় আছে, কিন্তু বৈদিক সভ্যতায় মন্দির গুরুত্বপূর্ণ স্থানের অধিকারী। হরপ্পা সংস্কৃতিতে মূর্তিপূজার প্রচলন ছিল, কিন্তু বৈদিক সংস্কৃতিতে তা অজ্ঞাত ছিল। তারা ছিল প্রকৃতি পূজারী। হরপ্পা সংস্কৃতিতে বৃষের পূজা হত। বৈদিক সংস্কৃতিতে গাভির পূজা করা হত। হরপ্পাবাসী শিবলিঙ্গ ও মাতৃদেবীর পূজা করত। আর্য সভ্যতায় লিঙ্গপূজা নিন্দনীয় ছিল। হরপ্পা সভ্যতায় স্ত্রী-দেবতার প্রাধান্য ছিল, আর্য সভ্যতায় ছিল পুরুষ-দেবতাদের প্রাধান্য।
(৮) হরপ্পার সমাজ ছিল মাতৃকেন্দ্রিক, বৈদিক সমাজ ছিল পিতৃতান্ত্রিক।
(৯) হরপ্পাবাসীরা মৃতদেহ কবর দিত। আর্যরা মৃতদেহ দাহ করত।
(১০) হরপ্পা সভ্যতায় ঢাল, শিরস্ত্রাণ প্রভৃতি আত্মরক্ষামূলক অস্ত্রের প্রচলন ছিল না, কিন্তু বৈদিক সভ্যতায় তা ছিল।
(১১) মৃৎপাত্রের ক্ষেত্রেও দুই সভ্যতার মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য ছিল। হরপ্পা সভ্যতায় মৃৎপাত্রের রঙ ছিল লাল-কালাে। অপরদিকে আর্যদের মৃৎপাত্রের রঙ ছিল ধূসর।

উপসংহার

দুই সভ্যতার মধ্যে যে যথেষ্ট পার্থক্য ছিল সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। হরপ্পা সভ্যতা ছিল যথেষ্ট উন্নত মানের। সে তুলনায় আর্য সভ্যতা ছিল পশ্চাৎপদ। ঐতিহাসিক অনেকেই তাই আর্যদের বর্বর জাতি বলে অভিহিত করেছেন। এই দুই সভ্যতার মধ্যে নানা দিক থেকে পার্থক্য থাকলেও, ভারতীয় সভ্যতার বিকাশে উভয় সংস্কৃতিরই অবদান ছিল যথেষ্ট।

RELATED POSTS