স্বদেশপ্রেম প্রবন্ধ রচনা

স্বদেশ ও স্বদেশপ্রেম: নিজের দেশকে ভালােবাসেন না এমন লােকের সংখ্যা পৃথিবীতে দুর্লভ। মহাকবি শেক্সপিয়ার তার বিখ্যাত নাটক ‘জুলিয়াস সিজার’ – এ বলেছিলেন, ‘Who is here so vile that will not love his country?’ —অর্থাৎ ‘এখানে কে এমন নরাধম আছেন, যিনি নিজের দেশকে ভালােবাসেন না?’ বায়রন আর এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেছেন, ‘He who loves not his country, can love nothing’. ‘যে নিজের দেশকে ভালােবাসতে অক্ষম, সে আর কাউকে ভালােবাসতেও অপারগ।’ মহাকবি শেক্সপিয়ার এবং মহাকবি বায়রনের কথাগুলি যে কতখানি সত্য, তা স্বদেশপ্রেমিক মাত্রেই বিশেষভাবে উপলদ্ধি করবেন। এই কথাগুলি জানার পর দেশকে না ভালােবেসে কেউ থাকতে পারে?

একজন ভারতীয় হিসাবে আমরা আমাদের দেশকে যে কতখানি ভালােবাসি, ইতিহাস ও পুরাণে তার অনেক প্রমাণ আছে। আমাদের বিষ্ণুপুরাণে লিখিত আছে আমাদের দেশের সীমানা। জানানাে হয়েছে ভারত-সন্তানের কাছে তার জন্মভূমির ভৌগােলিক পরিধি। এই পুরাণে লিখিত আছে— “উত্তরং যৎ সমুদ্রস্য হিমাদ্রেশ্চৈব দক্ষিণম্/বর্ষং তদভারতং নাম ভারতী যত্র সন্ততিঃ।”

ভারত: “সমুদ্রের উত্তরে এবং হিমাদ্রি হিমালয়ের দক্ষিণে যে বর্ষ অবস্থিত, তার নাম হল ভারত। এই বর্ষে ভারতের সন্ততিরা বাস করে।” এই বর্ষ কথাটির অর্থ হল দেশ। মহাকবি শেক্সপিয়ার মহাকবি বায়রন যাকে কান্ট্রি বলেছেন, আমাদের কাছে ওই কান্ট্রি হল ভারতবর্ষ। এই তারতবর্ষকে নিয়েই আমাদের যে ভালােবাসা, সেটাই হল আমাদের স্বদেশপ্রেম। ভারতবর্ষ হল একটি বিশাল দেশ। তাই সব সময় আমাদের স্বদেশপ্রেম এই গােটা দেশকে নিয়েই যে জেগে উঠেছে, তা কিন্তু নয়। খণ্ড খণ্ড রূপে উৎসারিত হয়ে সমগ্র রূপ পেয়েছে আমাদের স্বদেশপ্রেম। আমরা যারা বাঙালি, তাদের কাছে বঙ্গজননী রূপটিই অনেক সময় বেশি প্রত্যক্ষ। তবে এই বঙ্গজননী কখনও কিন্তু ভারতজননীর প্রতিপক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ায়নি। দশভূজা দেবী দুর্গার সঙ্গে যেমন রয়েছেন লক্ষ্মী-সরস্বতী, এটাও অনেকটা সেই রকম। ভারতজননীর রুপ তখনই সার্থক হয়ে উঠেছে, যখন ‘পাঞ্জব-সিন্ধু-গুজরাট-মারাঠা-দ্রাবিড়-উৎকল-বঙ্গের সমবায়ে তার অখণ্ড চিত্র আমাদের স্বদেশপ্রেমে ধ্বনিত হয়েছে। আমরা বিশাল এক দেশের বিপুল ঐশ্বর্যের উত্তরাধিকারী হয়ে নিজেদের গৌরব বৃদ্ধি করেছি।

দেশপ্রেমের স্বরূপ: স্বদেশপ্রেম নিছক একটি তত্ত্ব বা আইডিয়া নয়, স্বদেশপ্রেম হল সত্যি সত্যিই একটি প্রেম। আর সকল প্রেমের মতই এটি হৃদয়ের উৎস থেকে উৎসারিত। শ্রদ্ধা ও অনুরাগে এই প্রেম অভিষিক্ত। সন্তান যেমন জননীর রূপৈশ্বর্যে মাঝে মাঝে গদ হয়ে ওঠে, আমরাও তেমনি ভারতবর্ষের প্রকৃতি এবং সবুজের মায়ায় বারবার হয়েছি মােহিত ও শ্রদ্ধাবনত। ভারতের বিপুল বৈচিত্র্য আমাদের কত ভাবেই না আচ্ছন্ন করেছে। ভারতীয় সাহিত্যের পাতায় পাতায় রয়েছে এই মুগ্ধতার চিত্র। আমরা বারবার বলেছি।
“এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি,
সকল দেশের রাণী সে যে, আমার জন্মভূমি।”

ইতিহাস স্বদেশপ্রেম: আর সব প্রেমের মতন, স্বদেশপ্রেমেরও পরীক্ষা আছে। সােনাকে যাচাই করতে হলে যেমন কষ্টিপাথর দরকার, তেমনি স্বদেশপ্রেম ও পরীক্ষিত হয়, যখন আমাদের দেশ ও জন্মভূমি বিপন্ন ও আক্রান্ত হয়। আমাদের কাছে এর পরীক্ষারও নজির আছে। ইতিহাসের যারা পাঠক, তাদের কাছে রানাপ্রতাপ ও শিবাজির দেশপ্রাণতার কথা অজানা নয়। এঁরা কেউই মুঘলদের আধিপত্য মেনে নিতে রাজি হননি। আমাদের বাংলাদেশেও চাঁদ রায়-কেদার রায়-ঈশা খাঁ প্রমুখ বারাে ভূঁইয়ারা মুঘলদের দাসত্ব মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলেন। তারা দেশজননীকে পরাধীনতা থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। রাখতে চেয়েছিলেন স্বাধীন।

পরাধীনতার জন্য যন্ত্রণা: ইংরেজ শাসনাধীন ভারতবর্ষে স্বদেশপ্রেমের আর এক চিত্র ফুটে উঠল। ইংরেজরা যখন আমাদের ভারতবর্ষকে পদানত করেছিল, তখন আমরা নিজেদের ঠিক চিনে উঠতে পারিনি। পরাধীনতার জন্য সেইসময় আমাদের ভারতবর্য অনেক টুকরাে টুকরাে হয়ে দেশীয় শাসকদের ভেতর বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। দিল্লির কেন্দ্রীয় মুঘল শক্তি দুর্বল হয়ে পড়বার জন্য এরকম ঘটেছিল। এই অঘটনের সহায়ক হয়েছিল আমাদের গৃহবিবাদ এবং মুঘল শাসকদের ‘তখত’ দখলের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র। ইংরেজ সেই সময় সুযােগ বুঝে রাতারাতি বণিকের মানদণ্ড ছেড়ে ধরে ফেলেছিল রাজদণ্ড। ইংরেজরা খুব কৌশল করেই ভারতবর্ষকে পদানত করতে সমর্থ হয়েছিল। কিন্তু কয়েক দশক যেতে-না-যেতেই পরাধীন ভারতবর্ষের জনসাধারণের ভেতর দেখা দিল দুর্বার স্বদেশচেতনা। দেখা দিল স্বাধীনতার জন্য সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা। জন্মভূমি ভারতবর্ষকে বিদেশির নিগড় থেকে মুক্ত করবার জন্য দেশের তরুণরা ঝাপিয়ে পড়ল জীবনপণ করে। কবি লিখলেন :”স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায় !/দাসত্ব শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায় ! মধুসূদন দত্ত তার কাব্যের মধ্যে শত্রুর দ্বারা আক্রান্ত জন্মভূমির ছবি আঁকলেন। মরণ-পণ করা তরুণদের যেন জাগিয়ে তুলে তিনি বললেনঃ “….রিপুদলবলে দলিয়া সমরে,/জন্মভূমি-রক্ষাহেতু কে ডরে মারিতে?/যে ডরে, ভীরু সে মুঢ়: শত ধিক্‌ তারে।”

একালের স্বদেশ প্রীতি: স্বদেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বহু কবিই কবিতা লিখলেন। রবীন্দ্রনাথ-দ্বজেন্দ্রলাল থেকে আরম্ভ করে নজরুল প্রমুখ কবিদের অজস্র কবিতায় আমাদের ঝুলি ভরে উঠল। পরাধীনতার যন্ত্রণা এবং দেশের জনসাধারণকেও যেন নতুন করে ভালােবাসতে শিখলাম। আমাদের কবিরা বললেন: ‘বিনা স্বদেশী ভাষা,/মিটে কি আশা?’ —কোনাে কোনাে কবি আবার জাতীয়তাবােধের সঞ্চার করে লিখলেন: ‘স্বদেশের কুকুর ধরি/বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া।’ কেবল কথা নয়, দেশকে ভালােবেসে বহু তরুণ হাসতে হাসতে ফাসির দড়িতে ঝুললেন। সারা দেশ জুড়ে বিপুল আলােড়ন দেখা গেল। এই আলােড়ন ও আন্দোলন এতই তীব্রতর হল যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ইংরেজকে শেষ পর্যন্ত এই দেশ ছেড়ে পালাতে হল। ভারতবাসীরা জলন্ত স্বদেশপ্রেমের কাছে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজের পশুশক্তি পুড়ে ছাই হয়ে গেল। আমরা স্বাধীন হলাম। আমাদের স্বদেশপ্রেম জয়ী হল। গত ১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্ট থেকে আমরা স্বাধীন।

স্বদেশ গঠন একটি ব্রত: তবে স্বদেশপ্রেমের যে বিপুল শক্তি, তার সমাপ্তি কিন্তু এখানেই সূচিত হয় না। প্রকৃত স্বদেশ প্রেম যথার্থ মহিমায় প্রস্ফুটিত হতে পারে, যদি তা দেশগঠনের ভেতর দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। ক্ষুধার্তকে যদি আমরা অন্ন না-জোগাতে পারি, দুস্থকে যদি সাহায্য না করতে পারি, তাহলে স্বদেশপ্রেম পরিশেষে ব্যর্থ হতে বাধ্য। এবং এই সঙ্গে আরও একটি কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা নিজের দেশকে ভালােবাসতে গিয়ে, আর কাউকে যেন ঘৃণা করে দূরে সরিয়ে না দিই। এই দুটি কথাই ইংরেজ মনীষীরা বলে গেছেন। একজন বলেছেন, ‘No man can be patriot on an empty stomach,’ আর একজন মনে করিয়ে দিয়েছেন,’ Patriotism is not enough. I must have no hatred or bitteress towars any one.

বলার অপেক্ষা রাখে না, ‘স্বদেশপ্রেম’ কথাটি শুনতে জমকালাে হলেও, আদর্শের দিক থেকে থেকেও এটি বড়াে দুরূহসাধ্য-ব্রত। বড় কঠিন। এইজন্য বঙ্কিমচন্দ্র এটিকে নিজের জীবননাৎসর্গের থেকেও বড়াে বলেছিলেন।

RELATED POSTS