সিন্ধু সভ্যতার সঙ্গে সমকালীন সভ্যতার সম্পর্ক

সিন্ধু জনগণ অলস প্রকৃতির ছিল না। সমকালীন অন্যান্য সভ্যতা যেমন মিশর, ব্যাবিলন, সুমেরীয় ও মেসোপটেমিয়ার সভ্যতার সঙ্গে সিন্ধু জনগণের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ছিল। এরা সামুদ্রিক পথের এদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতো।

সিন্ধু সভ্যতার সঙ্গে সমকালীন সভ্যতার সম্পর্ক

মেসােপটেমিয় সভ্যতা (Mesopotamian Civilization): প্রাচীন বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের সভ্যতার সঙ্গে হরপ্পা সভ্যতার যে ঘনিষ্ঠ যােগাযােগ ছিল সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। সুমের ও মেসােপটেমিয়ার সভ্যতার সঙ্গে হরপ্পা সভ্যতার এক অদ্ভুত সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। এই সাদৃশ্যের জন্য মেসােপটেমিয় অনেকে হরপ্পা সভ্যতাকে ‘ইন্দো-সুমেরীয় সভ্যতা’ বলে অভিহিত করেছেন। হুইলার মনে করেন যে, হরপ্পা সংস্কৃতির উৎস হল সুমের বা মেসােপটেমিয়া, এবং হরপ্পা হল সুমেরীয় সভ্যতার উপনিবেশ।

অধ্যাপক গর্ডন চাইল্ড এর মতে হরপ্পার বণিকরা তাদের পণ্যসম্ভার নিয়ে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদের উপকুলে অবস্থিত বাজারে যেত। পশ্চিম এশিয়ার আক্কাদ নামক স্থানে ভারতীয় বণিকদের উপনিবেশের সন্ধান পাওয়া গেছে। প্রাচীন সুমেরীয় দলিলপত্রে মেলুকা নামে এক স্থানের উল্লেখ আছে। সুমের থেকে জলপথে এই স্থানে যাওয়া যেত। অনেকের মতে এই স্থানটি হল সিন্ধু উপত্যকা।

সিন্ধু উপত্যকার বেশ কিছু সিল সুমেরে এবং সুমেরেরও কিছু সিল সিন্ধু উপত্যকায় পাওয়া গেছে। এইসব অঞ্চলে যে সব সিল, পােড়ামাটির কাজ ও ধাতুনির্মিত তৈজসপত্রাদি পাওয়া গেছে তাদের মধ্যে এক বিস্ময়কর সাদৃশ্য দেখা যায়। উন্নত জীবনযাত্রা ও নগর জীবন, বিভিন্ন ধাতুর ব্যবহার, কুমােরের চাক, চিত্রলিপি, মাতৃদেবীর উপাসনা, কেশবিন্যাস পদ্ধতি, কৃষিকার্য, সেচব্যবস্থা এবং এইসব অঞ্চলে পারস্পরিক স্থানের দ্রব্যাদির অবস্থিতি তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যােগাযােগের অস্তিত্ব প্রমাণ করে।

হুইলার বলেন যে, সুমেরীয় সভ্যতার স্থানান্তরকরণের ফলেই হরপ্পায় এক পরিণত সভ্যতা গড়ে ওঠে। তবে হরপ্পা সভ্যতাকে সুমেরীয় সভ্যতার নিছক অনুকরণ বলা অন্যায় ও অযৌক্তিক। হরপ্পা সভ্যতা সম্পূর্ণ দেশীয় সভ্যতা এবং লিপি, মৃৎশিল্প, ইট ও সিলমােহরের আকার, হাতিয়ার প্রভৃতি নানা দিক থেকে দুই সভ্যতার মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান।

মিশরীয় সভ্যতা (Egyptian Civilization): মিশরীয় সভ্যতার সঙ্গে হরপ্পা সভ্যতার যােগাযােগের কোনও প্রত্যক্ষ প্রমাণ না মিললেও মিশরের অনুকরণে তৈরি টুল, দীপাধার, শিশুসহ মাতৃমূর্তি প্রভৃতি সিন্ধু উপত্যকায় পাওয়া গেছে। অন্যদিকে আবার আদি দ্রাবিড় জাতির ব্যবহৃত নৌকার নমুনা মিশর ও ক্রিট অঞ্চলে পাওয়া গেছে। গুজরাটের লোথালে ধ্বংসস্তূপ আবিষ্কারের পর অনেকে বলেছেন যে মিশর, ক্রিট ও ইজিয়ান অঞ্চলের সঙ্গে সমুদ্রপথে হরপ্পা সভ্যতার যােগাযােগ ছিল। রুশ ভারততত্ত্ববিদ বােনগার্ড লেভিন বলেন যে, হরপ্পা সভ্যতার সঙ্গে মধ্য এশিয়ার ঘনিষ্ঠ যােগযােগ ছিল।

উপসংহার (Conclusion): জন মার্শাল, গ্রেগরি পােজেল প্রমুখের মতে হরপ্পা সংস্কৃতি সমসাময়িক সুমেরীয় ও মিশরীয় সভ্যতা অপেক্ষা অনেক উন্নত ছিল। মার্শাল বলেন যে মহেঞ্জোদারাের বিশাল স্নানাগার, বহুসংখ্যক বিশালায়তন বাসগৃহ, দূষিত জলনিস্কাশনের পাকা ব্যবস্থা প্রভৃতি প্রমাণ করে যে, সেখানকার সাধারণ মানুষ যে ধরনের আরাম ও বিলাসিতা ভােগ করত, পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে তা ছিল না। গর্ডন চাইল্ড হরপ্পা সংস্কৃতির স্বতন্ত্র উৎসে বিশ্বাসী। তিনি বলেন যে, হরপ্পা সভ্যতা সুমেরীয় সভ্যতার স্থানান্তরকরণ বা অনুকরণের ফল নয়।