সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞা কী?

সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞা: সার্বভৌমত্বের ধারণাই আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভিত্তি। অর্থশাস্ত্রে মূল্যতত্বের গুরুত্ব যেমন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সার্বভৌমত্ব তেমনি গুরুত্বপূর্ণ। লাতিন শব্দ Superanus হতে ইংরেজি ‘Sovereignty’ (সার্বভৌমত্ব) শব্দের উদ্ভব হয়েছে। শব্দগত অর্থে Superanus বলতে বুঝায় চরমত্ব বা সর্বশ্রেষ্ঠত্ব। সুতরাং সার্বভৌমত্ব বলতে রাষ্ট্রের অসীম, অনিয়ন্ত্রিত ও চরম ক্ষমতা বোঝায়। বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সার্বভৌমত্বের বিভিন্ন সংজ্ঞা নির্দেশ করেছেন।

১. ফরাসী লেখক বোদা -র মতে আইন দ্বারা অনিয়ন্ত্রিত, সকল প্রজা ও নাগরিকের ওপর প্রযুক্ত হবার চরম ক্ষমতাই হল সার্বভৌমত্ব।
২. ফ্রেডরিক পােলকের মতে, সার্বভৌমত্ব এমন ক্ষমতা যা সাময়িক নয় যা রাষ্ট্র পরিবর্তন করতে পারে না।
৩. উইলােবির ভাষায়, সার্বভৌমত্ব হল রাষ্ট্রের চরম ইচ্ছার প্রকাশ।
৪. বিখ্যাত মার্কিন অধ্যাপক বার্জেস বলেন, সমস্ত প্রজা ও নাগরিকের একক ও যৌথ অস্তিত্বের ওপর প্রযােজ্য মৌলিক, চরম ও অসীম ক্ষমতাই হল সার্বভৌমত্ব।
৫. ইংরেজ অধ্যাপক বার্কার সার্বভৌমত্বকে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবার অধিকার সমন্বিত রাষ্ট্র কর্তৃত্ব বলে অভিহিত করেছেন।
৬. আধুনিক কালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাফেল বলেছেন যে, কোন রাষ্ট্র সার্বভৌম — এই কথা বলবার অর্থ হল নির্দিষ্ট সমাজে রাষ্ট্রের চরম বা চূড়ান্ত কর্তৃত্ব রয়েছে এবং এর আইন সমাজের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নিয়মকানুনের উর্ধ্বে।

অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব: বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানির সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করলে সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায় রাষ্ট্রের আইনগত চুড়ান্ত ও অবাধ ক্ষমতাই হল সার্বভৌমত্ব। সার্বভৌমত্বের দুটি দিক আছে – অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক। অভ্যন্তরীণ দিক হতে রাষ্ট্রাধীন সকল ব্যক্তি ও সংঘের ওপর আইন বলবৎ করবার চরম ক্ষমতা বোঝায়। এ সকল ব্যক্তি ও সংঘের প্রতি নির্দেশ দান করতে পারে, কিন্তু কারাে কাছ থেকে নির্দেশ লাভ করে না। সুতরাং অভ্যন্তরীণ দিক হতে বিভিন্ন আইনগত দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত মীমাংসা করবার ও ব্যক্তিসংঘের ওপর প্রযােজ্য কর্তৃত্বের চরম ক্ষমতাই হল সার্বভৌমত্ব। কিন্তু রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে চরম ক্ষমতার অধিকারী হলেই চলবে না, বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণমুক্তও হতে হবে। বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব -এর অর্থ হল, রাষ্ট্র অন্য কোন রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ মুক্ত হয়ে আপন নীতি ও কর্মধারা স্থির করতে সম্পূর্ণভাবে সক্ষম। বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্ৰণমুক্ত না হলে অর্থাৎ স্বাধীন না হলে অভ্যন্তরীণ চরম ক্ষমতা রাষ্ট্রের পক্ষে প্রয়ােগ করা সম্ভব হবে না। বাহ্যিক সার্বভৌমত্বকে সে কারণে অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্বাধীনতা বলেছেন। অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বকে কার্যকর করবার জন্যই স্বাধীনতা বা বাহ্যিক সার্বভৌমত্বের প্রয়ােজন। আন্তর্জাতিক আইনে তত্বগতভাবে প্রতি সার্বভৌম রাষ্ট্র জনসংখ্যা, এলাকা বা অর্থনৈতিক সম্পদ নির্বিশেষে অপরাপর রাষ্ট্রের সমান। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়ােজন যে, আন্তর্জাতিক সন্ধি – চুক্তির শর্ত পালনের প্রয়ােজনীয়তা রাষ্ট্রের সর্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ণ করে না।