সাতবাহন শাসন ব্যবস্থা কেমন ছিল?

সাতবাহন শাসনব্যবস্থা ছিল রাজতান্ত্রিক এবং রাজপদ ছিল বংশানুক্রমিক। সাতবাহন রাজাদের নামের সঙ্গে মায়ের নাম জড়িত থাকলেও, পিতার মৃত্যুর পর জ্যেষ্ঠপুত্রই সিংহাসনে বসতেন। জ্যেষ্ঠপুত্রের সিংহাসনলাভই ছিল স্বাভাবিক রীতি এবং এই কারণে সাতবাহন রাজপরিবারে ভ্রাতৃবিরােধের কোনও নজির পাওয়া যায় না।

রাজারা কোনও আড়ম্বরপূর্ণ উপাধি ধারণ করতেন না — তারা রাজন উপাধি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতেন। ধর্মশাস্ত্রে রাজাকে ধর্মের রক্ষক বলে বর্ণনা করা হয়েছে এমনকী দেবতাদের কোনও কোনও গুণও তাদের উপর আরােপ করা হয়েছে। রাজারা নিজেদের উপর রাম, ভীষ্ম, কেশব, অর্জুন প্রভৃতি দেবতার গুণাবলী আরােপ করলেও কখনােই নিজেদের ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতার অধিকারী বা ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলে দাবি করেন নি।

রাজা ছিলেন সর্বশক্তির আধার। তিনি ছিলেন প্রধান শাসক, প্রধান সেনাপতি, প্রধান বিচারক ও প্রধান আইনপ্রণেতা। এ সত্ত্বেও তিনি স্বৈরাচারী ছিলেন না — তার রাজকীয় ক্ষমতা শাস্ত্রীয় নির্দেশ ও প্রচলিত রীতিনীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হত। রাজার কর্তব্য ছিল দেশরক্ষা, বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিরােধ, যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা পরিচালনা, ধর্মরক্ষা, ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও জনহিতকর কর্মসূচি গ্রহণ করা।

সাতবাহন রাজ্যে দু’ধরনের শাসনব্যবস্থা প্রচলিত ছিল— (১) সামন্তশাসিত অঞ্চল এবং (২) রাজার প্রত্যক্ষ শাসনাধীন অঞ্চল। সামন্তশাসিত অঞ্চলের শাসনভার থাকত সামন্তদের হাতে। রাজার অধীনে থেকে তারা শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। উচ্চস্তরের সামন্তরা রাজা উপাধি ধারণ করতেন এমনকী অনেক সময় নিজ নামে মুদ্রাও প্রচলন করতেন। সামন্তপ্রভুদের মধ্যে রাজন, মহাসেনাপতি, মহারথী, মহাভােজ প্রভৃতি বিভিন্ন স্তর ছিল। এইসব সামন্তরা রাজপরিবারের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হতে পারতেন।

সাতবাহনরা মৌর্য প্রশাসনিক বিভাগকে অপরিবর্তিত রেখেছিল। রাজার প্রত্যক্ষ প্রশাসনিক বিভাগ শাসনাধীন অঞ্চল কয়েকটি জনপদে বিভক্ত ছিল। জনপদগুলি আবার মৌর্যদের অনুকরণে আহর বা জেলায় বিভক্ত ছিল। জনপদ এর শাসনকর্তা ছিলেন যুবরাজ। আহর -এর শাসনভার ছিল আমাত্য নামক কর্মচারীদের উপর। গ্রাম ছিল শাসনব্যবস্থার সর্বনিম্ন স্তর। কতকগুলি গ্রাম নিয়ে তৈরি হত আহর। গ্রামের শাসনভার ছিল গ্রামিক বা গৌলমিকা নামক কর্মচারীর উপর। গ্রামিক বা গৌলমিকা একজন সামরিক ব্যক্তি ছিলেন। তার অধীনে ১২ টি রথ, ৯ টি হাতি, ২৫ টি ঘােড়া এবং ৪৫ জন পদাতিক সেনা নিয়ে গঠিত একটি বাহিনী থাকত। গ্রামাঞ্চলে আইন শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

উপরিউক্ত রাজকর্মচারী ছাড়াও সাতবাহনদের বিভিন্ন লিপি থেকে আরও কিছু কর্মচারীর নাম জানা যায়। সেগুলি হল — রাজামাত্য, মহামাত্র, ভাণ্ডাগারিক, লেখক, নিবন্ধকার, দূতক, হৈরণিক, তলবর, মহাতলবর প্রভৃতি। রাজামাত্য ছিলেন রাজার বিশেষ আস্থাভাজন এবং উপদেষ্টাদের একজন। মহামাত্র ছিলেন বিশেষ বিশেষ কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত। ভাণ্ডাগারিক হলেন ভাণ্ডারের দায়িত্বপ্রাপ্ত। লেখক রাজকীয় দলিল-দস্তাবেজ রচনার দায়িত্বে ছিলেন। দূতক হলেন রাজার দূত। তলবর হলেন প্রহরী এবং মহাতলবর পুলিশ বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

সাতবাহন রাজ্যে ব্রাহ্মণ, বৌদ্ধ শ্রমণ এবং রাজকর্মচারীদের করমুক্ত গ্রাম বা জমি দেওয়া হত। এইসব স্থান রাজকীয় প্রশাসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। দানগ্রহীতা ব্রাহ্মণ, শ্রমণ বা রাজকর্মচারীরা এইসব স্থানের শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। শক্তিশালী সামন্তরা রাজা উপাধি নিতেন — এমনকী নিজ নামে মুদ্রা প্রবর্তন করতেন।

ভূমিরাজস্ব ছিল সরকারি আয়ের প্রধান উৎস। এছাড়া সীতা জমি, লবণ শুল্ক, জরিমানা প্রভৃতি থেকেও সরকারের আয় হত। নগদ অর্থ বা শস্যের মাধ্যমে রাজস্ব দেওয়া যেত। সৈন্য ও সরকারি কর্মচারীরা বেতনের পরিবর্তে জমি ভােগ করতেন। কৃষকদের অবস্থা ভালাে ছিল না। সামন্ত প্রথার দরুন তারা নানাভাবে শােষিত হত। সরকারি কর্মচারীরা মাঝে-মধ্যেই কৃষকের জমিতে হস্তক্ষেপ করত।

RELATED POSTS