রক্ত দিন জীবন বাঁচান রচনা

পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে মানুষ আসে, মানুষ যায়। অনাদিকাল ধরে চলেছে যাওয়া আর আসার এই অনন্ত খেলা। মৃত্যু তাে জন্মেরই অনিবার্য পরিণতি। মানুষ তাই যুগে যুগে এই মৃত্যুকে মহিমান্বিত করতে চেয়েছে। চেয়েছে জন্মগ্রহণের ঋণকে অপমা করে তুলতে। মানুষের বড় পরিচয় সে সামাজিক জীব। পারস্পরিক সহযােগিতায় তার অগ্রগতি, পরহিতে প্রাণদান তার স্থায়ী সুখ। প্রেমমৈত্রীর মেলবন্ধনে তার অস্তিত্ব, বিকাশ। বিচ্ছিতায় তার ধ্বংস। স্বার্থপরতায় তার অনগ্রসরতার অভিশাপ। যুগে যুগে তাই ইতিহাস-সাহিত্য-কাব্যে উচ্চারিত হয়েছে মানবসেবার জয়গান। রক্তদান সেই পরহিতব্রতেরই এক সুমহান ঐতিহ্য। বর্তমান বিশ্বে এর ব্যাপ্তি ও গভীরতা তাই আরও বেশি।

রক্ত ও জীবন: সেই সুপ্রাচীন সময় থেকেই রােগ নিরাময়ের চেষ্টা করেছেন ভিষকশ্রেণি (চিকিৎসকশ্রেণি)। সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা বিজ্ঞানেও হয়েছে উন্নতি। কিন্তু এক মানুষের রক্ত অন্য অসুস্থ মানুষে সঞ্চালিত করে তাকে বাঁচিয়ে তােলার জন্য প্রয়ােজন ছিল আধুনিক যুগের। চিকিৎসা বিজ্ঞানীর নিরলস পরীক্ষানিরীক্ষায় একদিন রক্তদানের প্রাথমিক জটিলতা দূর হল। তাঁরা দেখলেন মানবদেহে অন্য প্রাণীর রক্ত সঞ্চালন করলে তার ফল হয় ভয়াবহ, মানুষের রক্তও নির্বিচারে অন্য মানুষের দেহে সঞ্চালিত করা যায় না। ভিয়েনার এক চিকিৎসা বিজ্ঞানী কার্ল ল্যান্ড ষ্টিনার মানুষের রক্তের গ্রুপকে বিভক্ত করলেন— A, B, AB আর 0 গ্রুপ। অবশ্য রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের প্রথম কৃতিত্ব বিজ্ঞানী Landois- এর। রােগাক্রান্ত ব্যক্তির রক্তের গ্রুপের সঙ্গে মিলিয়েই সুস্থদেহের রক্ত তার মধ্যে সঞ্চালিত করা হয়।

অপরিহার্য উপাদান: রক্ত মানবদেহের একটি অপরিহার্য উপাদান। মানুষ প্রতিনিয়ত খাদ্যবস্তু গ্রহণ করছে। সেই খাদ্য পরিপাক যন্ত্রের নানা ক্রিয়া-পদ্ধতির মাধ্যমে ও দেহের ভিতরকার হরমােন ইত্যাদির সংশ্লেষে রক্তে পরিণত হচ্ছে। এই রক্ত সারা দেহে সঞ্চারিত হয়। রক্তই জীবন। রক্তের অভাব হলেই আসে মৃত্যু। কোনাে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় আজও রক্ত তৈরি সম্ভব হয়নি। তাই রক্তের প্রয়ােজনে মানুষ মানুষের কাছেই ছুটে আসে। সতেজ রক্তের ছোঁয়া পেয়েই আর্ত মরণাপন্ন মানুষ বেঁচে ওঠে। প্রয়ােজনের চেয়ে কিছু বেশি পরিমাণ রক্ত মানুষের দেহে থাকতে পারে। চিকিৎসাশাস্ত্রে রক্তের প্রয়ােজনীয়তা ক্রমশই বাড়ছে। রক্তের অভাবে হাজার হাজার শিশুর জীবনে নেমে আসে অকাল মৃত্যুর অভিশাপ। প্রতিদিন মরছে প্রাণদায়ী সতেজ রক্তের অভাবে কত রােগাক্রান্ত মানুষ।

রক্ত সংরক্ষণ: রক্তদান শুভচেতনাসম্পন্ন মানুষের কাছে এক মহান ব্রত। পরহিতের এক অভ্রান্ত প্রমাণ। মুমুর্য মানুষকে বাঁচানাের প্রয়ােজনে ছাত্র-যুবক, কত খ্যাত-অখ্যাত মানুষ এসে মিলিত হয় এই কর্মযজ্ঞে। রক্তদান সম্পর্কে অনেকের মধ্যেই রয়েছে এক ভ্রন্ত ধারণা। কিন্তু উপযুক্ত বয়েসে একজন সুস্থ ব্যক্তির দেহ থেকে ২৫০ সি. সি. রক্ত একবারে টেনে নেওয়া যায়। এতে শরীরের কোন ক্ষতি হয় না। ঘাটতি রক্ত সাতদিনের মধ্যেই পূর্ণ হয়ে যায়। শুধু রক্তদান নয়, রক্ত সংরক্ষণও এর একটি প্রয়ােজনীয় দিক। চিকিৎসা-বিজ্ঞানীরা গ্রহণ করেছেন রক্তদানের বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ব্লাড ব্যাঙ্ক, হাসপাতালে চিকিৎসা কেন্দ্রে রয়েছে এই ব্লাড ব্যাংক। রক্তের গ্রুপ ধরে প্রত্যেকটি বােতলকে পৃথক পৃথক শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। প্রতিটি বােতলের গায়ে সেই রক্তের ব্যবহারযােগ্য সময়সীমাও উল্লেখ থাকে। রক্তের অবিকৃত থাকা নির্ভর করে তাপমাত্রা ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিকতার ওপর। ৪ ডিগ্রি থেকে ৬ ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেড তাপসমন্বিত ফ্রিজে তিনমাস পর্যন্ত এই রক্ত বিশুদ্ধ থাকে।

সেচ্ছায় রক্তদান: ১৯২৫ সালে কলকাতায় শুরু হয় রক্তদান সঞ্চালনের কাজ। আজ পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যেক মহকুমায় স্থাপিত হয়েছে ব্লাড ব্যাংক। অর্থের বিনিময়ে অনেক নিরুপায়, দরিদ্র মানুষ রক্তদান করেন। কিন্তু প্রয়ােজনের তুলনায় সেই রক্তের পরিমাণ খুবই অল্প। দিকে দিকে আজ সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে সাধারণ মানুষকে রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। এর জন্য আলােচনা-চক্র, স্লাইড প্রদর্শন ইত্যাদি নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। দিন দিনই রক্ত দানের সংখ্যা বাড়ছে। এগিয়ে এসেছেন অনেক সমাজ সচেতন মানুষ। স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস ও নানা উৎসব অনুষ্ঠানে খােলা হয় স্বেচ্ছা রক্তদান শিবির। তবু প্রয়ােজনের তুলনায় সেই রক্তের পরিমাণ খুবই কম।

উপসংহার: রক্তদান মানুষের সবৃত্তির এক অমলিন অভিজ্ঞান। এখানে সাদা-কালাের ভেদ ঘুচে যায়। ধর্মান্ধতার ঠাই নেই। সব রক্তের রংই লাল। জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে রক্তদান এক পবিত্র কর্তব্য। মনে রাখতে হবে, রক্তদানের অর্থ একটি অকাল মৃত্যুকে রােধ করা, একজন মুমূর্যকে বাঁচিয়ে তােলা। এ জনসেবারই অঙ্গ। স্বার্থপরতার পাষাণ প্রাচীরে আজ মানুষের বিবেক মাথা কুটছে। কেঁদে কেঁদে ফিরছে এক দগ্ধ প্রাণ। রক্তদান হয়তাে মানুষের এই কান্নার অবসান, দহন-জ্বালায় শীতল প্রলেপ। সময় এসেছে এই মহান ব্রতকে দিক দিগন্তে ছড়িয়ে দেওয়ার। সময় এসেছে নবজাতকের কাছে এক মহৎ অঙ্গীকার রেখে যাওয়ার। এ অঙ্গীকার মানবতার, এ অঙ্গীকার নতুন করে উজ্জীবনের, এ অঙ্গীকার স্বার্থপরতার নির্মোহ ভাঙার, আত্মপরতা বলিদানের।

RELATED POSTS