মৌর্যোত্তর যুগের সমাজ ব্যবস্থা কেমন ছিল?

মৌর্যোত্তর যুগের সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে ঐতিহাসিকরা মনুসংহিতা, যাজ্ঞবল্ক্য-স্মৃতি, মহাভারত, মিলিন্দপঞহাে এবং বাৎস্যায়ন, পতঞ্জলি, শূদ্রক ও অশ্বঘােষ এর রচনা ও কয়েকটি লিপির উপর নির্ভর করে থাকেন। এইসব উপাদানগুলি সব সময় নির্ভরযোগ নয়। উপাদানগুলিতে অনেক সময়েই পরস্পর-বিরােধী বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে — এমনকী একই উপাদানের অভ্যন্তরে এ ধরনের পরস্পর বিরােধী বক্তব্য নজরে আসে। এইসব গ্রন্থগুলিতে যে সব বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে, তা তৎকালীন যুগের পক্ষে হয়তাে আদর্শ-স্থানীয় ছিল, কিন্তু বাস্তবে ওই আদর্শগুলি সর্বদা অনুসৃত হত না।

যুগ সংকট কাল : মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন থেকে গুপ্ত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা — এই পাঁচশাে বছরে ভারতীয় সমাজ এক গভীর সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছিল। ইতিমধ্যে ব্রাহ্মণ্য সমাজের গুণ ও কর্মভিত্তিক বর্ণাশ্রম প্রথা জন্মভিত্তিক হয়ে উঠছিল। মৌর্য যুগে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার এবং বিশেষ করে সম্রাট অশােকের বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপােষকতা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের অগ্রগতির উপর এক বিরাট আঘাত হানে। মৌর্য যুগের অবসানে শুঙ্গ ও কাণ্ব বংশ সিংহাসনে বসে। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পৃষ্ঠপােষক এই দুই বংশের দেড়শো বছরের (খ্রিঃ পূঃ ১৮৭ – খ্রিঃ পূঃ ৩০) শাসনকালে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম আবার শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই কালপর্বে গ্রিক, শক, পহ্লব, কুষাণ প্রভৃতি বিদেশি জাতিবর্গ ভারতে প্রবেশ করে বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। বিদেশিদের আগমনে ভারতীয় সমাজে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এইসব নানা ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাত ভারতীয় সমাজব্যবস্থায় নানা পরিবর্তনের সূচনা করে।

ব্রাহ্মণ : মৌর্যোত্তর যুগের সমাজে বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র — এই চারটি বর্ণের মধ্যে ব্রাহ্মণের স্থান ছিল সর্বোচ্চ। মনু ও যাজ্ঞবল্কর মতে, ব্রাহ্মণরা কেবলমাত্র বর্ণশ্রেষ্ঠই নন — সমগ্র জীবজগতের উপর তাদের প্রাধান্য ছিল প্রশ্নাতীত। তাদের কর্তব্য ছিল অধ্যয়ন, অধ্যাপনা, যজ্ঞানুষ্ঠান, দানকার্য ও দানগ্রহণ এ সত্ত্বেও এই পর্বে ব্রাহ্মণদের যুদ্ধবিদ্যা, প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি নানা ধরনের বৃত্তি গ্রহণ করতে দেখা যায়। শুঙ্গ বংশের প্রতিষ্ঠাতা ব্রাহ্মণ পুষ্যমিত্র শুঙ্গ সেনাপতি ছিলেন, কাণ্ব বংশের প্রতিষ্ঠাতা বাসুদেব ছিলেন একজন অমাত্য। মহাক্ষত্রপ সোদাস-এর কোষাধ্যক্ষ ছিলেন জনৈক ব্রাহ্মণ। স্মৃতিশাস্ত্রে ব্রাহ্মণদের আপদ ধর্মের কথা বলা হয়েছে, অর্থাৎ আপদকালে ব্রাহ্মণরা অন্য বর্ণের বৃত্তি গ্রহণ করতে পারত — তবে তা ছিল সাময়িক। আপদকাল উত্তীর্ণ হলে প্রায়শ্চিত্ত করে ব্রাহ্মণকে তার স্ববৃত্তিতে ফিরে আসতে হত। আর্য সংস্কৃতি বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ব্রাহ্মণরা তাদের জাতিগত পবিত্রতা হারায়। বহু অনার্য আদিবাসী ব্রাহ্মণ শ্রেণিতে অনুপ্রবেশ করে। স্মৃতিশাস্ত্রে অবশ্য ব্রাহ্মণদের বিশেষ অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। গুরুতর অপরাধেও ব্রাহ্মণদের জন্য লঘুদণ্ডের ব্যবস্থা ছিল। তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা বা প্রাণদণ্ড অবৈধ ছিল। তাদের কোনও কর দিতে হত না। ব্রহ্মহত্যা মহাপাতক বলে বিবেচিত হত। এই যুগের বৌদ্ধ গ্রন্থাদিতে ব্রাহ্মণ-বিরােধী মনােভাব প্রকাশিত হয়েছে। মিলিন্দপঞহাে, ললিতবিস্তার প্রভৃতি বৌদ্ধগ্রন্থে ব্রাহ্মণের স্থান নির্ধারিত হয়েছে ক্ষত্রিয়ের পরে।

ক্ষত্রিয় : মৌর্যোত্তর যুগে নীতিগতভাবে ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকৃত হলেও, অনেক সময়েই ক্ষত্রিয়কে ব্রাহ্মণের সমতুল্য এবং কখনও কখনও ব্রাহ্মণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বলে মনে করা হত। মনু ও যাজ্ঞবল্ক্য-স্মৃতিতে বেদ অধ্যয়ন, যক্ষানুষ্ঠান ও দানকার্যকে কর্তব্যকর্মের অন্তর্ভুক্ত করা হলেও, তাদের প্রধান জীবিকা ছিল যুদ্ধ ও প্রশাসন। মিলিন্দপঞহাে অনুসারে অশ্ব, হস্তি ও রথ পরিচালনা এবং যুদ্ধ হল ক্ষত্রিয়ের প্রধান কর্তব্য। মনুসংহিতা যা বলা হয়েছে যে, আপদকালে ক্ষত্রিয় বৈশ্যবৃত্তি অর্থাৎ কৃষি, পশুপালন ও বাণিজ্যকে বৃত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। মৌর্যোত্তর যুগে সামগ্রিকভাবে ক্ষত্রিয়ের মর্যাদা হ্রাস পায়। এর কারণ হিসেবে ক্ষত্রিয়-প্রধান গণরাজ্যগুলির ক্রমাবনতি এবং যুদ্ধে ভাঙ্গাটে সৈন্যের ব্যবহারের কথা বলা যায়।

বৈশ্য : মনুসংহিতা ও যাজ্ঞবল্ক্য-স্মৃতিতে বৈশ্যদের কর্তব্য হিসেবে অধ্যয়ন, অনুষ্ঠান ও দানকার্যের কথা বলা হলেও, তাদের প্রধান দায়িত্ব ছিল গাে-পালন, কৃষি, বাণিজ্য এবং ঋণদান। স্মৃতিশাস্ত্র ও মহাভারত-এ আত্মরক্ষা, গো-ব্রাহ্মণ রক্ষা এবং বর্ণসংকর নিবারণের জন্য বৈশ্যদের অস্ত্রধারণের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। মিলিন্দপঞহাে-তে কৃষি ও বাণিজ্যকে বৈশ্যের কর্তব্য বলা হয়েছে। সমকালীন উপাদানগুলিতে স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে বৈশ্যদের কোনও উল্লেখ নেই — এর পরিবর্তে গহপতির উল্লেখ পাওয়া যায়। তারা ছিল ধনী ব্যবসায়ী, কৃষক, স্বামী ও ঋণদাতা। জাতকে গহপতিদের পাশাপাশি শ্রেষ্ঠী ও কুটুম্বিন-দের উল্লেখ পাওয়া যায়। এরা সকলে একই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

শূদ্র : মৌর্যোত্তর যুগের সমাজ ব্যবস্থার সর্বনিম্ন স্তরে ছিল শূদ্রদের স্থান। মনুর মতে উচ্চতর তিন বর্ণের, বিশেষত ব্রাহ্মণদের সেবা করাই ছিল শূদ্রদের প্রধান কাজ। স্মৃতিশাস্ত্ৰ গুলিতে শূদ্রদের সম্পর্কে নানা পরস্পর-বিরােধী বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। মনুর মতে শূদ্রদের ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার ছিল না। তিনি আবার অন্যত্র বলছেন যে, শুদ্র তার সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তি সমানভাবে ভাগ করে দিতে পারত। তিনি শূদ্ৰ কর্তৃক ব্রাহ্মণকে সম্পত্তি-দান অবৈধ বলে ঘােষণা করছেন। মনুর এইসব বক্তব্য থেকে এ কথা পরিষ্কার যে, মৌর্যোত্তর যুগে শূদ্রের সম্পত্তির অধিকার ছিল। শূদ্রদের মধ্যে অনেকেই যে নিজেদের যােগ্যতায় সমাজে খ্যাতি ও মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। মনুসংহিতা থেকেই জানা যায় যে, তাদের কেউ কেউ অধ্যাপনাকে বৃত্তিহিসেবে গ্রহণ করতেন।

অস্পৃশ্য শ্রেণি : শূদ্রদের নীচে ছিল অস্পৃশ্য শ্রেণি। অনেক সময় এদের ‘পঞ্চম জাতি’ বলা হত। এদের মধ্যে প্রধান ছিল চণ্ডালরা। তারা গ্রাম ও শহরের বাইরে বাস করত। তাদের কোনও অধিকার ছিল না এবং তাদের স্পর্শকে অস্পৃশ্য জ্ঞান করা হত। তারা দাবিহীন মৃতদেহের সৎকার এবং জল্লাদদের কাজ করত। মৎস্যজীবী, কর্মকার, ঝাড়ুদার, ঝুড়িনির্মাতা ও রথকাররা এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ছিল। কালক্রমে এই অস্পৃশ্যদের মধ্যেও এক ধরনের জাতিভেদ প্রথা গড়ে ওঠে।

মিশ্র জাতি : মৌর্যোত্তর যুগের সমাজ ব্যবস্থায় চতুর্বর্ণের বাইরে ছিল সংকর বা মিশ্রজাতি। অনুলােম ও প্রতিলােম বিবাহের ফলে এই মিশ্রজাতির সৃষ্টি হয়েছিল। মনুর রচনায় বিভিন্ন বর্ণের মিশ্রজাতি বিবাহজাত সন্তানদের নাম এবং তাদের বৃত্তির উল্লেখ আছে।

পতিত ক্ষত্রিয় : মৌর্যোত্তর যুগে গ্রিক, শক, পহ্লব, কুষাণ প্রভৃতি বিদেশি জাতিবর্গ ভারতে প্রবেশ করে এবং ভারতীয় সমাজের অন্তর্ভুক্ত হয়। হিন্দু সমাজে বর্ণভেদ থাকায় তাদের পক্ষে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করা সহজতর হয়। রাজকীয় ক্ষমতা থাকার দরুন কালক্রমে তারা হিন্দু সমাজের অন্তর্ভুক্ত হতে থাকে। যােদ্ধৃগােষ্ঠী বলে ক্ষত্রিয় হিসেবে তারা হিন্দু সমাজে স্থান পায়। হিন্দু সমাজে বর্ণ একটি জন্মগত বিষয় হওয়ায় বিদেশিরা বিশুদ্ধ ক্ষত্রিয় হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে নি। এই কারণে বিদেশিরা ‘পতিত ক্ষত্রিয়’ হিসেবে হিন্দু সমাজে স্থানলাভ করে।