ভারত ইতিহাসে ভৌগোলিক পরিবেশের উপাদান ও প্রভাব

মানবসভ্যতার ক্রমবিবর্তনের কাহিনি ইতিহাসের বিষয়বস্তু হলেও ইতিহাসের সঙ্গে ভূগােলের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। রিচার্ড হাকুলিয়াত মন্তব্য করেছেন, “Geography and Chronology are the Sun and the Moon, the right eye and the left eye of all history” ভৌগােলিক প্রভাব ইতিহাসের সঙ্গে এক অনিবার্য বন্ধনে আবদ্ধ। নীলনদ না থাকলে মিশর সাহারা মরুভূমির গর্ভে হারিয়ে যেত। ইজিয়ান সাগর ও ভূমধ্যসাগর পরিবৃত হওয়ায় গ্রিসের অধিবাসীরা বাণিজ্য ও নৌবিদ্যায় পটু। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ড সমুদ্র পরিবেষ্টিত হওয়া এই দেশের বাণিজ্য ও নৌশক্তি উন্নত। তেমনি ভাৱত উপমহাদেশের পশ্চিমে আরব সাগর, পূর্বে বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণে ভারত মহাসাগর অবস্থান করায় আমাদের দেশের ইতিহাসও ভৌগোলিক প্রভাবের দ্বারা প্রভাবিত। ভারতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতি, ভারতবাসীর জীবনদর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গি ভৌগােলিক উপাদানগুলি দ্বারা অনাদিকাল থেকে প্রভাবিত করে আসছে। অবশ্য টয়েনবির কথায় ইতিহাসের নায়ক মানুষ ভৌগােলিক উপাদানকে যেভাবে ব্যবহার করে সেভাবেই সবকিছু নির্ধারিত হয়। ‘Geographical facts are the only fact as approached by man’ একমাত্র ভৌগােলিক প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে ভারতবাস এক স্বতন্ত্র ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সভ্যতা-সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পেরেছে। ‘An Advanced History of India’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে, “The course of Indian history likely that of other countries in the world, is in large measure determined by its Geography.”

হিমালয়ের প্রভাব: ভারতের ইতিহাসে দেবতাত্মা হিমালয়ের প্রভাব অপরিসীম। ঐতিহাসিক কে. এম. পানিক্কর ‘A Survey of Indian History’ গ্রন্থে বলেছেন, “মিশরকে যদি নীলনদের দান বলা হয়, তবে ভারতবর্ষকে হিমালয়ের দান বলা যায়।” হিমালয় বহুভাবে ভারতবর্ষকে সমৃদ্ধ করেছে। যেমন—
(১) ভারতবর্ষ হল হিমালয়ের মানসকন্যা। ভারতের উত্তরে অর্ধচন্দ্রাকারে রক্ষাপ্রাচীবের ন্যায় পরিবৃত থেকে যুগ যুগ ধরে হিমালয় সীমান্ত সুরক্ষার কাজ করে চলেছে।
(২) হিমালয়ের কোলে অবস্থিত খাইবার, বােলান, গােমাল প্রভৃতি গিরিপথ দিয়ে বিদেশি আক্রমণের ফলে বিভিন্ন প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
(৩) ভারতের জলবায়ুর মূল নিয়ন্ত্রক মৌসুমি বায়ু। হিমালয়ের গায়ে এই বায়ু ধাক্কা খেয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিশাল অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ঘটাতে সাহায্য করে। ফলে কৃষিব্যবস্থার উন্নতি সম্ভব হয়েছে।
(৪) হিমালয় থেকে নেমে আসা হিমবাহপুষ্ট গঙ্গা, সিন্ধু, ব্রম্মপুত্র নদী ও প্রচুর উপনদী ভারতকে সুজলা-সুফলা ও শস্যশ্যামলা করে তুলেছে।
(৫) হিমালয়ের বনজ ও খনিজ সম্পদের ভাণ্ডার এদেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধিশালী করেছে।
(৬) সাইবেরিয়া থেকে আগত কনকনে ঠান্ডা উত্তুরে হাওয়ার প্রকোপ থেকে হিমালয় আমাদের রক্ষা করেছে। এর ফলস্বরূপ উত্তর ভারতের আবহাওয়া মানুষের বসবাসের যােগ্য হয়েছে।
(৭) হিমালয়ের কোল জুড়ে গড়ে উঠেছে অজস্র শৈল নিবাস। তাই পর্যটন শিল্পের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বহুলােকের জীবিকানির্বাহের ব্যবস্থাও সম্ভব হয়েছে।
(৮) কাশ্মীর ও নেপাল উপত্যকা অঞ্চলের মানুষদের ভিন্ন ধরনের জীবনযাত্রা ও পৃথক আচার-অনুষ্ঠান পদ্ধতি গড়ে তােলার পেছনে হিমালয়ের প্রভাব অপরিসীম।

বিন্ধ্য পর্বতের প্রভাব: বিন্ধ্য পর্বতমালা নানাভাবে ভারত ইতিহাসকে প্রভাবিত করেছে।
(১) ভারতের মধ্যস্থলে দণ্ডায়মান থেকে বিন্ধ্য পর্বতমালা ভারতকে আর্যাবর্ত ও দাক্ষিণাত্য — এই দু’ভাগে বিভক্ত করেছে ।
(২) ভারতের ঠিক কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত হওয়ায় বিন্ধ্য পর্বতমালা উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মধ্যে সহজ যােগাযােগের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করেছে। এই কারণে প্রাচীন যুগে সমগ্র ভারতে কোনও অখণ্ড রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় নি। উত্তর ভারতের কোনও কোনও সম্রাট দক্ষিণ ভারতে রাজনৈতিক প্রাধান্য স্থাপনে উদ্যোগী হলেও শেষ পর্যন্ত সফল হন নি, আবার দক্ষিণ ভারতীয় রাজন্যবর্গ এই ব্যাপারে উদ্যোগী হলে তাদের পক্ষেও সফলতা অর্জন করা সম্ভব হয় নি।
(৩) উত্তর ভারত বিদেশি শক্রদের দ্বারা বারবার আক্রান্ত হলেও বিন্ধ্য পর্বতই দাক্ষিণাত্যকে বিদেশি হানাদারদের আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করেছে। উত্তর ভারতের রাজনৈতিক ঝড়ঝঞ্জা কোনওভাবেই দাক্ষিণাত্যকে স্পর্শ করতে পারে নি। তাই বিদেশি আক্রমণে উত্তর ভারতের শিল্পকর্মগুলি বিনষ্ট হলেও দাক্ষিণাত্যের প্রাচীন শিল্প – নিদর্শনগুলি আজও বহুলাংশে টিকে আছে।
(৪) বিন্ধ্য পর্বতের জন্যই দাক্ষিণাত্যে আর্য সংস্কৃতির ব্যাপক অনুপ্রবেশ সম্ভব হয় নি। এর ফলে দাক্ষিণাত্যে আর্য সংস্কৃতি থেকে পৃথক এক নতুন সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, যাতে দ্রাবিড় সভ্যতার প্রভাব অধিক পরিমাণে পরিলক্ষিত হয়।
(৫) উত্তর ভারতের ভাষাগুলির অধিকাংশই সংস্কৃত থেকে উদ্ভূত, কিন্তু দক্ষিণ ভারতে ব্যাপকভাবে আর্য অনুপ্রবেশ না হওয়ার জন্য দাক্ষিণাত্যের ভাষাগুলি কিন্তু সংস্কৃত ভাষা থেকে উদ্ভূত নয়।
(৬) পরবর্তীকালে দাক্ষিণাত্যে ব্যাপকভাবে আর্য অনুপ্রবেশ ঘটলেও, প্রাচীন দ্রাবিড় অধিবাসীরা কিন্তু তাদের স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ফেলে নি, বরং আর্য অনার্য সভ্যতার সমন্বয়ে দাক্ষিণাত্যে এক নতুন সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, যার মধ্যে অনার্য দ্রাবিড় সংস্কৃতির প্রভাব সুস্পষ্ট।
(৭) বিন্ধ্যপর্বতের উদ্ভিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ এবং খনিজ দ্রব্য দক্ষিণের অর্থভান্ডারকে সমৃন্ধ করেছে।

সমুদ্রের প্রভাবঃ পূর্বে বঙ্গোপসাগর, পশ্চিমে আরব সাগর এবং দক্ষিণে ভারত মহাসাগর — তিনদিকে ভারত সমুদ্র দ্বারা পরিবেষ্টিত। ভারতের উপকূলভাগের দৈর্ঘ্য প্রায় ৫ হাজার মাইল। ভারতীয় ইতিহাস ও জনজীবনে সমুদ্র এক গুরুত্বপূর্ণ স্থানের অধিকারী।
(১) ভারতের দীর্ঘ উপকূলভাগের অধিকাংশই সরল ও ঋজু হওয়ায় এখানে বেশি পােতাশ্রয় গড়ে ওঠে নি। এই কারণেই ভারতবাসী গ্রিক বা ইংরেজদের মতাে সমুদ্রাশ্রয়ী জাতি হিসেবে গঠিত হয় নি। নৌবলে বলীয়ান না হলেও নৌবিদ্যায় ভারতবাসী পারদর্শী ছিল।
(২) সমুদ্র ভারতকে বহিরাক্রমণ থেকে নিরাপত্তা দিয়েছে। ইউরােপীয়দের আগমনের পূর্বে সমুদ্রের দিক থেকে ভারত যথেষ্ট সুরক্ষিত ছিল। সমুদ্রপথে ভারতে এসে ইউরােপীয় বণিকরা ভারতে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয় এবং এ ব্যাপারে ইংরেজদের ভূমিকা কারাে অজানা নয়।
(৩) ভারত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তােলে। সমুদ্রপথেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরােপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক যােগাযােগ গড়ে উঠেছিল।
(৪) বাণিজ্যের সূত্র ধরে এশিয়া, ইউরােপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারতের সাংস্কৃতিক যােগাযােগ গড়ে ওঠে এবং ভারতীয় সংস্কৃতি ওইসব দেশের জনজীবনকে নানাভাবে প্রভাবিত করে।
(৫) সামুদ্রিক বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে ভারতীয়রা দক্ষিণ – পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে উপনিবেশ স্থাপন করে। এইভাবে এইসব অঞ্চলে ভারতীয় সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করে এবং ভারতের বাইরে গড়ে ওঠে বৃহত্তর ভারত।
(৬) ভারতের দক্ষিণ পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিম ভূ – ভাগ সমুদ্রবেষ্টিত হওয়ায় এই অঞ্চলের জনসাধারণ সামুদ্রিক কার্যকলাপে উত্তর ভারতের অধিবাসীদের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রসর। কেবলমাত্র জনসাধারণই নয় — উত্তর ভারতের রাজন্যবর্গও বাস্তবিকপক্ষে সমুদ্রের উপর তেমন গুরুত্বই আরােপ করেন নি এবং এর ফল তাদের ভুগতে হয়। অপরপক্ষে চোল, চের, পাণ্ড্য, রাষ্ট্রকূট প্রভৃতি শক্তি নৌশক্তিতে বলীয়ান হয়ে উঠে নানা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে যায়।
(৭) ভারতের সমৃদ্ধশালী কৃষিব্যবস্থাও বহুলাংশে সমুদ্রের উপর নির্ভরশীল। ভারত মহাসাগর থেকে প্রবাহিত মৌসুমি বায়ু বৃষ্টিপাত ঘটিয়ে ভারতকে শস্য-শ্যামল করে তােলে।

গিরিপথের প্রভাব: হিমালয়ের উত্তর, পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বদিকে অবস্থিত খাইবারপাস, জোজিলাপাস, নাথুলাপাস প্রভৃতি গিরিপথগুলি দিয়ে আর্য, গ্রিক, শক, কুষাণ, হুন, তুর্কি, মােগল প্রভৃতি জাতি যুগে যুগে ভারতে অনুপ্রবেশ করে ভারতীয় সভ্যতায় নিজেদের বিলীন করে ভারতীয় সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছে। আবার ভারতীয় ধর্ম, ভাষা, কৃষ্টি-সংস্কৃতি হিমালয় কারাকোরাম ও হিন্দুকুশ পর্বতের বাধা অতিক্রম করে মধ্য এশিয়া, চিন ও তিব্বতে ছড়িয়ে পড়েছে।

নদ-নদীর প্রভাব: ভারতীয় সভ্যতায় নদনদীর প্রভাবও কম নয়। যেমন—
(১) নদনদী তার উপত্যকাকে উর্বর করে তােলে। ফলে নদী উপত্যকাগুলি কৃষিকার্যে উন্নত হয়।
(২) ভারতের চারদিকে প্রসারিত নদী, উপনদী ও শাখা-নদীগুলি আঞ্চলিক সংস্কৃতির বিকাশে সহায়ক হয়।
(৩) নদীর তীরে গড়ে ওঠা বাণিজ্য বন্দরগুলির মধ্যে দিয়ে বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে। হরিদ্বার, পাটলিপুত্র, প্রয়াগ, কনৌজ, হস্তিনাপুর, এলাহাবাদ প্রভৃতি নগর নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে গড়ে উঠেছে।
(৪) গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-সিন্ধুবিধৌত সমভূমি পৃথিবী বিখ্যাত। এই সমভূমি এদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিকে পুষ্ট করেছে।
(৫) ভারতের নদনদীগুলি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সীমারেখা নির্ধারণে সহায়তা করেছে। যেমন কলিঙ্গের উত্তরে মহানদী, দক্ষিণে গােদাবরী, তামিলনাড়ুর উত্তরে কৃষ্ণা ও দক্ষিণে কাবেরী, মহারাষ্ট্রের উত্তরে তাপ্তী ও দক্ষিণে ভীম এবং কর্ণাটকের উত্তরে ও দক্ষিণে তুঙ্গভদ্রা ইত্যাদি।

সমভূমির প্রভাব: ভারতীয় সভ্যতায় সমভূমির কয়েকটি প্রভাব উল্লেখযােগ্য—
(১) সমভূমি অঞ্চলে বিশেষ করে গঙ্গা-ব্রম্মপুত্র ও সিন্ধুবিধৌত সমভূমি অঞ্চল দুর্গম না হওয়ায় এবং বসবাসের অনুকূল পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক সুযােগসুবিধা থাকায় এই অঞ্চল অধিক মানুষের স্বচ্ছন্দ আবাসস্থল হয়ে উঠেছে।
(২) সমভূমি অঞ্চলে বিশেষ করে ভারতের হৃৎপিণ্ড গাঙ্গেয় সমভূমি অনুকূল অবস্থা বিরাজ করায় প্রাচীনকাল থেকেই এখানে বহু শহর, নগর, বন্দর গড়ে উঠেছে।
(৩) সমভূমি অঞ্চলে বহু আক্রমণকারী ও বিদেশি জাতি সাম্রাজ্য স্থাপন করায় রাজনীতি, ধর্মনীতি ও অর্থনীতির সমৃদ্ধি ঘটেছে। মৌর্য, গুপ্ত, কু্যাণ, পল্লব, চোল, চালুক্য প্রভৃতি জাতি প্রাচীনকালে সমভূমি অঞ্চলগুলিতে রাজ্যবিস্তার করে ভারতীয় সভ্যতার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছে।

উপসংহার: এখানে একটি কথা বলা প্রয়ােজন যে, একটি দেশের ইতিহাসের উপর সেই দেশের ভূগোলের প্রভাব অনস্বীকার্য। কিন্তু একথা ঠিক যে, একমাত্র ভূগোল একটি দেশের ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে না। সবচেয় বড়ো কথা হল মানুষের উদ্যম, কর্মপ্রচেষ্টা ও সংগ্রামী মনোভাব। সংগ্রামী ও সৃজনশীল মানুষ প্রতিকূল প্রকৃতিকে জয় করে অনায়াসেই দেশের কৃষি শিল্প বাণিজ্য এবং সাংস্কৃতিক উন্নতি ঘটাতে পারে। আবার অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশের সুযােগ পেয়েও কেবলমাত্র উদ্যম ও সৃজনশীলতার অভাবে সব কিছুই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

RELATED POSTS