ভারতীয় উপমহাদেশে আর্যদের আগমন সময়সীমা

খাদ্যাভাব, স্থানাভাব, গৃহবিবাদ প্রভৃতি নানা কারণে আর্যরা তাদের আদি বাসভূমি ত্যাগ করে এশিয়া ইউরােপের নানা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের একটি শাখা ভারতে প্রবেশ করে। বলা বাহুল্য, তাদের ভারতে প্রবেশ এককালীন কোনও চেষ্টার মাধ্যমে হয় নি। দীর্ঘকাল ধরে তরঙ্গের পর তরঙ্গের মতাে ছোটো ছােটো দলে আর্যরা ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে আঘাত হানে এবং দীর্ঘ কয়েক শত বছর ধরে তারা ধীরে ধীরে ভারতে প্রবেশ করে। ভারতীয় উপমহাদেশে আর্যদের আগমন কবে থেকে ঘটে তা নির্ণয় করা খুব কঠিন, কারণ এ বিষয়ে কোনও নির্ভরযােগ্য তথ্য আবিস্কৃত হয় নি।

ম্যাক্সমুলারের মতামত: ঋগ্বেদ হল আর্যদের প্রাচীনতম গ্রন্থ। ঋগ্বেদের রচনাকাল জানলে আর্যদের ভারতে আগননের সময় সম্পর্কে একটি ধারণা করা যাবে। প্রথমে ঋগ্বেদের স্তোত্রগুলি রচিত হলেও তা লিপিবদ্ধ করা হত না—কানে শুনে বা শ্রুতির মাধ্যমে বংশ পরম্পরায় তা চলে আসত। পরে তা লিপিবদ্ধ হয়। স্তোত্রগুলির রচনাকাল এবং তার লিপিবদ্ধ করার মধ্যে কয়েক শতাব্দীর ব্যবধান আছে। ঋগ্বেদের রচনাকাল সম্পর্কে পণ্ডিতরা একমত নন।

বিশিষ্ট জার্মান পণ্ডিত ম্যাক্সমুলার-এর মতে ঋগ্বেদ কোনও একটি নির্দিষ্ট সময়ে রচিত হয় নি। এর বিভিন্ন অংশ রচিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। তার মতে ১২০০-১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে ঋগ্বেদের প্রধান স্রোত্রগুলি রচিত হয়েছিল। ঋগ্বেদের শেষের দিকের স্তোত্রগুলি গৌতম বুদ্ধের জন্মের ৫০০ বছর আগে রচিত হয়। চৈনিক মত অনুসারে যদি বুদ্ধের জন্মকাল ৫৬৭ খ্রিঃ পূঃ ধরা হয, তা হলে ৫৬৭ + ৫০০ অর্থাৎ ১০৬৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দ বা ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ ঋগ্বেদের শেষ স্রোত্রগুলি রচনা হয়েছিল।

পারসিক ও সংস্কৃত ভাষার সম্পর্ক: বিশিষ্ট জার্মান ভারততত্ত্ববিদ উইন্টারনিৎস ঋগ্বেদের ভাষার সঙ্গে প্রাচীন পারসিক ধর্মগ্রন্থ জেন্দ আবেস্তা ভাষার এক সদৃশ লক্ষ করেছেন। সংস্কৃত ও পালির মধ্যে যে পার্থক্য দেখা যায়, সংস্কৃত ও প্রাচীন পারসিক ভাষার মধ্যে পার্থক্য তার চেয়েও কম। পণ্ডিতরা জেন্দ আবেস্তা-র অন্তর্ভুক্ত গাথাগুলি কালনিৰ্ণয় করেছেন ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। এর ভিত্তিতে ঋগ্বেদের রচনাকালও ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ বলে ধরা যায়। এক্ষেত্রে ম্যাক্সমুলারের সিদ্ধান্ত (১০০০ খ্রিঃ পুঃ) উইন্টারনিৎস-এর সঙ্গে মিলে যায়।

প্রত্নতাত্ত্বিক শিলালিপি: বোঘাজ কোই এবং তেল এল আমার্না শিলালিপি দুই-ই, উপরােক্ত মতবাদকে সমর্থন করে। বোঘাজ কোই শিলালিপিতে হিটাইট ও মিত্তানি রাজবংশের মধ্যে একটি বৈবাহিক চুক্তির কথা বলা হয়েছে এবং এতে সাক্ষী হিসেবে ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ, নাসত্য প্রভৃতি বৈদিক দেবতার কথা বলা হয়েছে। তেল-এল-আমার্না লিপিতে সিরিয়ার রাজাদের নামকরণে সংস্কৃত প্রভাব লক্ষ করা যায়। এই লিপি দুটির রচনাকাল ১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ বলে ধরা হয়েছে। এই লিপিটির উপর ভিত্তি করে ঋগ্বেদের রচনাকালও অন্ততপক্ষে ১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ বলে ধরা হয়।

উপসংহার: উপরিউক্ত প্রমাণগুলির সাহায্যে ঋগ্বেদের রচনাকাল ১৪০০-১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ ধরা হয়। অধ্যাপক ব্যাসাম এর সময়কাল চিহ্নিত করেছেন ১৫০০-১০০০ খ্রিস্টপর্ব। ম্যাক্সমুলার ঋগ্বেদের সময়কাল চিহ্নিত করেছেন ১২০০-১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। তাহলে দেখা যাচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশে আর্যদের আগমন ১২০০ বা ১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগে থেকেই শুরু হয়েছিল।

স্যার মর্টিমার হুইলার-এর মতে, ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তাদের হাতেই হরপ্পা সভ্যতা ধ্বংস হয়। হুইলার-এর মতামত সত্য হলে ধরে নিতে হবে যে, এর কয়েকশাে বছর আগে থেকেই আর্যরা ভারতে প্রবেশ করতে শুরু করে। হরপ্পায় আবিষ্কৃত ১৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে কয়েকটি সমাধিতে আদেৱ কঙ্কাল পাওয়া গেছে। তাই মনে হয় যে, খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের গােড়ার দিকেই হরপ্পা সংস্কৃতির ক্রমাবনতির দিনে আর্যরা বেলুচিস্তান ও সিন্ধু উপত্যকায় পৌঁছে গিয়েছিল—তবে এর দ্বারা প্রমাণিত হয় না যে, আর্যরাই হরপ্পা সভ্যতার ধ্বংসকারী।

RELATED POSTS