বিজ্ঞান আশির্বাদ না অভিশাপ রচনা

আমাদের সভ্যতার যে ঝকঝকে রূপ আমরা দেখতে পাচ্ছি, বলার অপেক্ষা রাখে না, এর মুলে রয়েছে বিজ্ঞানের অবদান। দু’হাত তুলে বিজ্ঞান যদি আমাদের আশীর্বাদ না করতো, সভ্যতার এই ভাস্বর ও উজ্জ্বল চেহারা আমরা কখনও দেখতে পেতাম না। দুর আর আমাদের কাছে দূর নেই, বিজ্ঞানের কল্যাণে দুর্গম আজ আমাদের কাছে হয়েছে সুগম। শল্য চিকিৎসার কল্যাণে আমাদের হৃদয় অর্থাৎ হূৎপিণ্ড পরিবর্তন সম্ভব হচ্ছে। বিজ্ঞান মানুষকে দীর্ঘায়ু করেছে, করেছে সক্ষম ও নিরাময়। বিজ্ঞান জয় করেছে প্রকৃতিকে। পাহাড় থেকে সে এনে দিচ্ছে ওষধি, সমুদ্র মন্থন করে আনছে রত্নসম্ভার। মানুষের ভােগের পরিধিকে সে করে দিয়েছে সুবিস্তৃত। আমাদের জনসংখ্যা যে-দিনে দিনে বেড়ে চলেছে তার মুলেও রয়েছে এই বিজ্ঞানের আশীর্বাদ। খ্রিস্টপূর্ব আট হাজার সালে এই পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৬০ লক্ষ। প্রথম খ্রিস্টাব্দে এই সংখ্যা দাঁড়ায় পঁচিশ কোটি পঞ্চাশ লক্ষে। এক হাজার খ্রিস্টাব্দে দেখা যায় এই জনসংখ্যা কমে গেছে ১০ লক্ষ। —এর পরে মানুষের জনসংখ্যা আর কখনাে কমেনি। বরং দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে এই জনসংখ্যা বেড়ে হয়েছিল ১৫ কোটি ৪০ লক্ষ। ১৯০০ -তে ১৬৩ কোটি ৩০ লক্ষ। আর এখন পৃথিবীর জনসংখ্যা হয়েছে ৫০০ কোটি। বলা বাহুল্য, মানুষের এই যে সংখ্যা বৃদ্ধি, এর মূলে রয়েছে বিজ্ঞানের আশীর্বাদ। বিজ্ঞান যদি মানুষের সহায় না হত, তা হলে কিন্তু এই একান্ত দুর্বল জীবটিকে পৃথিবী নামক গ্রহ থেকে কবেই না বিদায় নিতে হত।

প্রাচীন যুগে: হাজার কয়েক বছর আগে মানুষ ছিল অরণ্যচারী। আরও পাঁচটি প্রাকৃতিক জীবের মতন সে ছিল অসহায়। বাস করত প্রকৃতির করুণার ওপর। সেই অরণ্যচারী মানুষ প্রথম আবিষ্কার করেছিল আগুন। সেই আগুনকে সংরক্ষণ করাই ছিল মানুষের বিজ্ঞান-শিক্ষার প্রথম পাঠ। হাজার হাজার বছরের পথ পেরিয়ে আজ আমরা যেখানে এসে পৌছেছি, সেখানে বিজ্ঞানের আয়ােজন কেবল বিপুল নয়, তা রীতিমতাে ভয়ও। গত শতকের শেষ থেকে এ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিজ্ঞান অতি দ্রুত এগিয়ে এসেছে। আর গত চারদশক ধরে তার অগ্রগতি অভাবনীয়ভাবে দ্রুত।

কল্যাণ রূপ: বিজ্ঞানকে মানুষ হাতিয়ার হিসাবে গ্রহণ করেছিল নিজেদের বাঁচাবার জন্য। নিজের সুখের জন্য। এ উক্তি কতখানি সত্য, তা নিজেদের ব্যবহারে লাগা প্রতিদিনের উপঙ্কণ দেখলেই বােঝা যাবে। অন্ধকারকে জয় করতে আমরা সাহায্য নিয়েছি আকাশচর বিদ্যুতের। এই বিদ্যুৎ আমাদের ঘর আলােকিত করছে। পাখা চালিয়ে আমাদের বাতাস দিচ্ছে। এই বিদ্যুৎ দিয়েই আমরা রেডিও চালাচ্ছি। চালাচ্ছি দূরদর্শন। আমাদের রেফ্রিজারেটার চলছে এই বিদ্যুতের জন্য। এমনকি আমাদের বাড়ির জলের ট্যাঙ্কে নীচের তলা থেকে যে জল তুলছি, তাও এই বিদ্যুতের সাহায্যে। এই বিদ্যুৎ শক্তি একাই আমাদের যে- উপকার করছে, তার শেষ নেই। বিজ্ঞানের আশীর্বাদে এইভাবেই আমরা সুখ ও সমৃদ্ধি পেয়েছি। টেলিফোন-টেলিগ্রাফ আমাদের কাছে এনে দিয়েছে দূরের সঙ্গে কথা বলবার সুযােগ। ট্রেন-ট্রাম বাস ব্যবহার করে আমরা কত সহজে দূর দূরান্তরে চলে যেতে পারি। গত শতকে আমরা বেলুনে চড়ে আকাশে উড়তে শিখেছিলাম। এই শতকের গােড়াতে পেলাম, উড়ােজাহাজ। চোখের সামনে দেখতে দেখতে এই উড়ােজাহাজের কত বিবর্তনই না আমরা দেখলাম। এখন এই উড়ােজাহাজগুলি জেট -এর মাধ্যমে উড়ছে। চলছে শব্দের থেকেও দ্রুতগতিতে।

বাড়তি আর একটা জিনিস এসেছে, তা হল হেলিকপটার এবং সবরকম দুর্গম জায়গায় সাহায্য পৌছে দিতে সে সক্ষম। আর বড়াে বড়াে উড়ােজাহাজ পৃথিবীর পরিধিকে খুবই ছােটো করে ফেলেছে। পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে আর -এক প্রান্তে পেীছেতে সময় লাগছে মাত্র কয়েক ঘন্টা। অধুনা এইসঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি। এসেছে কম্পিউটার। এর ফলে পৃথিবীর যে-কোনাে প্রান্তে বসে দূরের জিনিসকে নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে। মানুষ আজ গ্রহ-গ্রহান্তরে যেসব মহাকাশযানকে পাঠাচ্ছে, এইসব যান নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ইলেকট্রনিক যন্ত্রগণকের সাহায্যে। এইভাবেই আমাদের অনুসন্ধিৎসা সাগরের জলেও খুঁজে বেড়াচ্ছে দুর্মূল্য মহারত্নসমূহ। চিকিৎসাবিজ্ঞানেও বিজ্ঞান এনেছে বিরাট ও যুগান্তকারী পরিবর্তন। একদা এক্স-রে দেখেই আমরা চমকিত হতাম, এখন আরও নানারকম এক্স-রে এসেছে। শল্য চিকিৎসার মাধ্যমে আমরা অনায়াসে হার্ট বদল করতে পারছি। কিডনি বদল করা, গ্রাফটিং এবং তৎসহ প্লাস্টিক সার্জারি তাে হামেশাই চলেছে।

এই যুগের আর একটি বড়াে আবিষ্কার হল, আণবিক শক্তির ব্যবহার। আণবিক শক্তি দিয়ে তৈরি হচ্ছে বিদ্যুৎ, এই শক্তিতে চালিত হচ্ছে। জাহাজ এবং ডুবােজাহাজ। মানবকল্যাণে আণবিক শক্তির ব্যবহার প্রভূত। লেসার হল নতুন যুগের আর এক আবিষ্কার। এই ‘সংহত আলােক রশ্মি’র সাহায্যে মানুষের কল্যাণের পথ অনেক সহজ হয়েছে।

বিজ্ঞানের আশীর্বাদ আজ যে কত সহস্র ধারায় আমাদের ওপর বর্ষিত হচ্ছে, তার শেষ নেই। আগামী দিনে আমরা পাবাে আরও অনেক কল্যাণকর সামগ্রী। বিজ্ঞানের অগ্রগতি অন্তত সেই ইশারাই দিচ্ছে। এই বিজ্ঞানের জন্য আমাদের সুখ যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে পরমায়ু ও নিরাপত্তা।

বিজ্ঞান অশুভ শক্তি: কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হল, বিজ্ঞানের বাড়বাড়ন্তে দুর্যোগের ইংগিতও কিছু কম আসছে না। বিজ্ঞানের শক্তিকে অপব্যবহার করে আমরা যেভাবে ইদানীং আত্মহননে নেমেছি, তারও বােধহয় তুলনা হয় না। বিজ্ঞানের আশীর্বাদকে যেমন আমরা দু’হাত তুলে গ্রহণ করেছি, বিজ্ঞানের অভিশাপকেও তেমনি বাধ্য হয়ে আমাদের মেনে নিতে হচ্ছে। তবে এই অভিশাপ যদি আরও রুদ্রমূর্তিতে দেখা দেয়, তাতে মানবসভ্যতার সর্বৈব বিনষ্টিও হতে পারে। ইতিহাসের পাঠকেরা জানেন, মুঘল সম্রাট বাবর প্রথম আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে এদেশে পানিপথের লড়াই জিতেছিলেন। বলা বাহুল্য, মানবসংহারে এদেশে বিজ্ঞানের ব্যবহার সেই প্রথম। এর পর থেকে ভারতের প্রায় প্রতিটি রণক্ষেত্র বারুদের গন্ধে ভারী হয়েছে। গােলাগুলি কামান-বন্দুক ব্যবহৃত হয়েছে যথেচ্ছভাবে। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এই মারণাস্ত্রগুলি হিংস্র থেকে হিংস্রতর হয়েছে। নানা ধরনের বিষাক্ত গ্যাসও বিভিন্ন সময়ে ব্যবহৃত হয়েছে। শত্রুপক্ষকে খতমের জন্য। উড়ােজাহাজ আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে আমরা দেখেছি যুদ্ধের সময় হঠাৎ হঠাৎ উড়ােজাহাজ থেকে বর্ষিত হয়েছে বােমা। আকাশ কালাে করে নেমে এসেছে বিজ্ঞানের অভিশাপ।

১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে জাপানের দুটি শহর নাগাসাকি ও হিরােসিমায় যে বােমা বর্ষিত হয়েছিল, সেই আণবিক বােমা আজ আমাদের কাছে বড়াে অভিশাপ। আজ শক্তিধর দেশগুলি যেসব বােমা ও ক্ষেপণাস্ত্র সঞ্চয় করে রেখেছে, তা কয়েক সেকেন্ডের ভেতরেই সমগ্র পৃথিবীকে ধ্বংস করে দিতে পারে। মুছে দিতে পারে মানবসভ্যতা। এই বােমা ১৯৪৫ -এর বােমার থেকে অনেক ক্ষমতাসম্পন্ন। এগুলিকে নিক্ষেপ করবার জন্য উড়ােজাহাজেরও প্রয়ােজন হয় না। ঘরে বসে একটি বােতাম টেপার অপেক্ষা, মুহূর্তে এটি যন্ত্রগণকের সাহায্যে লক্ষ্যভেদে সমর্থ। আমাদের যে মহাকাশযানগুলি গ্রহ-গ্রহান্তরে পাড়ি দিচ্ছে, সেগুলির মাধ্যমে ‘Star War’ -এর কথাও এখন ভাবছে আমেরিকা। ওই তারকা-যুদ্ধ হবে আকাশ থেকে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সেই যুদ্ধ সংঘটিত হলে, হবে আর এক ভয়ংকর ব্যাপার। ঠিক এইভাবেই লেসার এর সাহায্যে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করবার ব্যবস্থা ভাবা হচ্ছে। মােট কথা, মানবসংহারের এত বড়ো বিপুল আয়ােজন যুদ্ধে বিজ্ঞানে প্রয়ােগ মানবেতিহাসে আর কখনও হয়নি। মানবসভ্যতার কাছে বিজ্ঞান আজ বিরাট এক অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। দেখা দিয়েছে দুঃস্বপ্ন হয়ে। যে-বিজ্ঞান এতদিন নিরাপদে আমাদের বাড়তে দিয়েছিল, সেই বিজ্ঞানই এখন সাক্ষাৎ অভিশাপ হয়ে মানবসভ্যতার বিনাশে এগিয়ে আসছে। অথচ মানুষের বেঁচে থাকার সমস্যা এখনও ফুরােয়নি। এশিয়া-আফ্রিকার বহুদেশে আজও প্রকট হয়ে রয়েছে অন্নাভাব, অসুস্থতা এবং প্রকৃতির বিধ্বংসী রূপ। সুতরাং বিজ্ঞানের দানব মূর্তিকে বাড়তে দিলে আমরা শেষপর্যন্ত আত্মহননে মেতে উঠব।

উপসংহার: পৃথিবীতে আজও মানুষ টিকে থাকার জন্য চলেছে সংগ্রাম করে। আগেই বলেছি আফ্রিকা ও এশিয়ার কোটি কোটি মানুষ আজও নিরন্ন, আজও অশিক্ষিত। বহু কোটি মানুষের মাথার ওপরে আজও ছাদ জোটেনি। চিকিৎসার অভাবে গরিব দেশগুলির মানুষ মারা যাচ্ছে কাতারে কাতারে। এসব দেশে না-আছে শিক্ষার ব্যবস্থা এবং না-আছে পােশাক পরিচ্ছদ। ধনী রাষ্ট্রগুলির এদিকে অণুমাত্র নজর নেই। তারা কোটি কোটি টাকা উড়িয়ে দিচ্ছেন ভয়ংকর সব অস্ত্র তৈরির পরীক্ষায়। একটি যুদ্ধজাহাজ তৈরিতে যে পরিমাণ টাকা খরচ হয়, তাতে অনায়াসে একশাে শয্যাবিশিষ্ট পনেরােটি হাসপাতাল তৈরি হতে পারে। একটি বােমার খরচে নির্মিত হতে পারে দশ মাইল পাকা রাস্তা, একটি ফাইটার ও একটি বােমারু প্লেনের বিনিময়ে আমরা অনায়াসে পাঁচটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় পেতে পারি। আর পারমাণবিক বােমা, ক্ষেপণাস্ত্র ও লেসার ইত্যাদি গবেষণার জন্য যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, তাতে পৃথিবীর যাবতীয় মানুষের দারিদ্র্য দূর করা যেতে পারে। খাদ্যের সংস্থান হতে পারে এবং শিক্ষাসহ মাথা গোঁজার ঠাই করে দেওয়া যায়। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার এই যে, এইসব হিতকর কাজে বিজ্ঞানকে সাথী না করে আমরা বিজ্ঞানকে দানবীয় শক্তি দিয়ে ধ্বংসের কাজে প্রয়ােগ শক্তির জয় করছি। এই অশুভ বুদ্ধি আমাদের এখনই ত্যাগ করা দরকার।

সুতরাং যে-বিজ্ঞান তার বিপুল শক্তি দিয়ে মানুষের প্রভূত কল্যাণ করতে পারতো, সে আজ রুদ্ররূপে মানুষের সভ্যতাকে মুছে দিতে চাইছে। সুতরাং বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ, তা খতিয়ে দেখা আজ বড়ােই জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিজ্ঞানের কোনাে দোষ নেই, দোষ আমাদের। আমরা বিজ্ঞানকে যেভাবে দেখতে চাইব, সে সেইভাবে দেখা দেবে।

RELATED POSTS