বইমেলা প্রবন্ধ রচনা

মেলার আকর্ষণ আমরা চিরকাল বােধ করি। আজও আমরা মেলা পাগল। মাহেশের রাথের মেলা, গাজন ঝাপানোর মেলা, পিরের মেলা, কেঁদুলির বাউলদের মেলা, এমনকি কুম্ভমেলাও আমাদের আকর্ষণ করে এসেছে যুগ যুগ ধরে। মেলার কিন্তু কোনাে স্বত্ব নেই। এসব মেলা কখনও বসে চৈত্র সংক্রান্তির অপরাহ্নে, কখন আষাঢ়ের বৃষ্টিভরা দিনে। শীতের দিনেও এ মেলা বসে। বসে পৌষ সংক্রান্তিতেও। ‘মেলা’ কথাটির মধ্যে আছে মিলনের ইঙ্গিত। জাতিধর্ম নির্বিশেষে আমরা গিয়ে এক জায়গায় মিলিত হই। তবেই গড়ে ওঠে মেলা। উপলক্ষ্য একটি থাকে, কিন্তু একসময় সেটা একেবারেই বাহ্যিক হয়ে যায়। লক্ষ্য হয়ে ওঠা পরস্পরের মধ্যে মিলেমিশে কিছু দেওয়া নেওয়া। এ যেন অনেকটা রথ দেখা ও কলা বেচার মতন। কলার পসারি কলা বেচতে আসে বটে, কিন্তু বাড়তি যেটা তার কপালে জুটে যায়, তা হল রথ দেখা। মেলা তাই মেলা নয়, আমাদের সকলের মেলবন্ধন।

বইয়ের আকর্ষণ: লােক সংস্কৃতিতে যেসব মেলা অনুষ্টিত হয়, তাতে পসরা থাকে নানা রকমের। বিশেষ একটি পসরাকে নিয়ে মেলা হয় না। আধুনিক পড়ুয়া-সংস্কৃতি বিষয়টিকে কিন্তু একেবারেই উলটে দিয়েছে। এখানে করা হয়েছে পসরা নিয়ে মেলা। এ পসরা হল, বই। বই কেনা-বেচার মেলা। সংক্ষেপে বইমেলা। সত্যি কথা বলতে কি, বইমেলার মধ্যে আশ্চর্য এক আকর্ষণ লুকিয়ে আছে। এমন মেলার কথা আগে ভাবই যেত না। এখানে পসরা হল বই। বই সংগ্রহ করার এবং বই পড়ার জন্য এই মেলা। বই পড়ার নেশা পৃথিবীর সেরা নেশা। একটি বই সংগ্রহের জন্য মানুষ কখনাে কখনাে পাগলের মতাে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ায়। আধুনিককালের বুদ্ধিজীবীরা এবং প্রকাশকরা বইকে নিয়ে একটি মেলা বসিয়ে তাই সত্যিই সত্যিই বড় উপকার করেছেন বইপাগল পাঠককুলের জন্যে।

কলকাতায় বইমেলা: ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের শীতে কলকাতার ময়দানে এর সূচনা হলেও, এর উদ্যোগ ছিল ১৯৬৩ থেকে। বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনের প্রাঙ্গণ খানিকটা ঘিরে নিয়ে খুব আলগাভাবে এই মেলা সেদিন সূচিত হয়েছিল। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে ‘অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস হলে’ ন্যাশনাল বুক ট্রাস্টের উদ্যোগে একটি বইমেলার অনুষ্ঠান হয়। কিন্তু মাঠ না হলে কি মেলা জমে? তাই ১৯৭৬ পর্যন্ত আমাদের থাকতে হল অপেক্ষা করে। ১৯৭৬ -এ ময়দানে ১ লক্ষ বর্গফুট জায়গা নিয়ে প্রকৃত বইমেলার অনুষ্ঠান করলেন বঙ্গীয় প্রকাশক ও পুস্তক বিক্রেতা সংস্থা। সেই থেকে প্রতি বছরই এরা বইমেলা বসিয়ে আসছেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকারও এই বইমেলার অনুষ্ঠানে উৎসাহী। সরকারি আনুকূল্য পেয়ে প্রকাশক ও পুস্তকবিক্রেতারা পশ্চিম বঙ্গের জেলা শহরে এবং অপরাপর বড়াে বড়াে শহরে নিয়মিত বইমেলার অনুষ্ঠান করে চলেছেন।

পাঠক ও গ্রন্থরুচি: বইমেলা সবথেকে বড় যে কাজটি করছে, তা হল পাঠক এবং গ্রন্থের সঙ্গে সরাসরি যােগসাধন। মেলাতে পরপর বসছে বইয়ের স্টল। সামনেই থরে থরে সাজানাে রয়েছেই নতুন ঝকঝকে বই। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় আমার প্রিয় লেখক। একটি স্টলে গিয়ে যখন বিভূতিভূষণের বইগুলি একসঙ্গে দেখতে পেলাম, তখন আমি যেন তড়িদাহত হয়ে গেলাম। বইগুলিকে বারবার নাড়াচাড়া করলাম। এবং ‘চাঁদের পাহাড়’ আর ‘মরণের ডঙ্কা বাজে’ কিনে রাজ্য জয় করা আনন্দ ও খুশিতে বাড়ি ফিরলাম। আমার এক বন্ধু সত্যিজিৎ রায়ের শঙ্কুর খুব ভক্ত। সে শঙ্কুর বইগুলি দেখে আনন্দে আত্মহারা। সেও শঙ্কুর একটি বই কিনে সানন্দে বাড়ি ফিরল। কেবল কেনা কেন, বইমেলাতে ঘােরাও বিশেষ আনন্দদায়ক। এই মেলাতে কেবল পাঠক এবং পুস্তক-বিক্রেতার মিলন ঘটে না, মিলন ঘটে লেখক এবং পাঠকদের সঙ্গেও। কলকাতার বইমেলায় আমি একবার প্রখ্যাত সাহিত্যিক সমরেশ বসুকে দেখেছিলাম। আমার বন্ধু এবং আমি খুবই সাহস করে তার কাছে এগিয়ে গিয়ে চেয়েছিলাম ‘অটোগ্রাফ’। তিনি মৃদু হেসে আমাদের খাতায় দিয়েছিলেন অটোগ্রাফ। সে সই আজও আমরা রেখে দিয়েছি যত্ন করে।

উপসংহার: কেন জানি না, বইমেলার প্রতি সারা বছর ধরে কেমন একটা টান অনুভব করছি। একটু একটু করে জমিয়ে রাখছি পয়সা। মনে মনে পরিকল্পনা নিচ্ছি কী কী বই কিনব। আর যেগুলি কিনছি, সেগুলি ভালাে করে পড়ছি এবং সযত্নে সাজিয়ে রেখে দিয়েছি আলমারিতে। বুঝতে পারছি, নিজের মধ্যে রুচিবােধের বদল হচ্ছে। মেলায় গিয়ে বইগুলি নাড়াচাড়া করতে করতে নানা বিষয়ে ঔৎসুক্য জাগছে। ‘বইমেলা’র টানকে অনেকটা ‘নেশা’র টানে’র মতন মনে হচ্ছে। যদিও নেশা কাকে বলে তা জানি না, তবু ‘নেশা ‘ কথাটাই ব্যবহার করলাম। তবে এ নেশা সর্বনাশা নয়, এ নেশা সর্বসিদ্ধিপ্রদ। শুনেছি বইমেলা’র অনুষ্ঠানে আমাদের মতাে খুদে পাঠকের কেবল উপকার হয় না, উপকার হয় প্রকাশকদেরও। তারা এই মেলা উপলক্ষে লাখ লাখ টাকার ব্যবসা করেন। অনেক নতুন নতুন বই প্রকাশ করেন মেলা উপলক্ষ্যে। এর ফলে বাংলা সাহিত্যে প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা বাড়ে। এইভাবে দেখতে দেখতে বইমেলা পঁচিশ বছরে পড়ছে। আসছে বছর বইমেলা’র রজত জয়ন্তীবর্ষ।

RELATED POSTS